Six Point of Tabligh

by Md. Sojol Mia, CoU


Views: Key:: Views

Six Point of Tabligh

by Md. Sojol Mia, CoU

আল্লাহপাক হুজুর সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। এই দ্বীন মোতাবেক চলার মধ্যেই সমস্ত মানব জাতির দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি ও কামিয়াবী রয়েছে। কিন্তু আজ আমরা দ্বীন মানার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি। তাই কয়েকটি গুনের উপর মেহনত করে আমল করতে পারলে দ্বীনের উপর চলা অতি সহজ। গুন কয়টি হল: ১. কালেমা ২. নামাজ ৩. এলেম ও জিকির ৪. একরামুল মুসলেমিন ৫. এখলাসে নিয়ত ৬. দাওয়াত ও তাবলীগ।

কালেমা / ঈমান

First Point

মানুষের দুনিয়া এবং আখিরাতের সকল সমস্যা সমাধানের মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা। আল্লাহ তাআ'লা সেই জাত যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন কোন পূর্ব নমুনা ছাড়া। আল্লাহ তাআ'লা সেই সত্তা যিনি আসমান সমূহ সৃষ্টি করেছেন কোন খুটি ছাড়া। আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা এই মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু - পরমাণুর স্রষ্টা। আল্লাহ তাআ'লা মালেক। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন মালিক নাই। আল্লাহ তাআ'লা রাজ্জাক। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন রিজিক দাতা নাই। আল্লাহ তাআ'লা হাফিজ। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন হেফাজতকারী নাই। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন সাহায্যকারী নাই।আল্লাহ তাআ'লার হাতে হায়াত - মউত,আল্লাহ তাআ'লার হাতে সুখ - দু:খ, আল্লাহ তাআ'লার হাতে লাভ - লোকসান, ইজ্জত - বেইজ্জত। আল্লাহ তাআ'লার হাতে সম্মান - অসম্মান। আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আার যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। আল্লাহ তাআ'লা যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন আর যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন। Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "আসমান ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই, যা চান তিনি সৃষ্টি করেন। যাকে চান কন্যা-সন্তান দেন, যাকে চান পুত্র সন্তান দেন। "Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "অথবা তাদেরকে দেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই। আর যাকে ইচ্ছে বন্ধ্যা করেন। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বাধিক অবহিত ও ক্ষমতাবান।"(Ash-Shuraa 42: Verse 49-50) ভাই দুস্ত বুজুর্গ আজিজু -- অতীতে যা কিছু ঘটেছে তা একমাত্র আল্লাহ তাআ'লার হুকুমেই ঘটেছে। বর্তমানে যা কিছু ঘটছে তা একমাত্র আল্লাহ তাআ'লার হুকুমেই ঘটছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবে তা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লার হুকুমেই ঘটবে। মানুষের চিন্তা - ভাবনা চেষ্টা মেহনতের দ্বারা কিছুই হয়না যা কিছু হয় একমাত্র আল্লাহ তাআ'লার হুকুমেই হয় এর নামই হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। মেরে ভাই দুস্ত বুজুর্গ আজিজু-- এই কালেমার দুটি অংশ। প্রথম অংশ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দ্বিতীয় অংশ মুহাম্মাদর রসুলুল্লাহ।

" কালেমার প্রথম অংশ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ "

কালেমার উদ্দেশ্য / মাকছাদ : আমরা যা কিছু দেখি বা দেখি না, আল্লাহ ছাড়া সবকিছু মাখলুক (সৃষ্ট)। মাখলুক কিছুই করতে পারেনা আল্লাহর হুকুম ছাড়া। আল্লাহ সবকিছু করতে পারেন মাখলুক ছাড়া। একমাত্র হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নূরানী তরীকায় রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি ও কামিয়াবী (সফলতা)।

" দ্বিতীয় অংশ মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ"

(১) সুন্নাহ মেনে চলুন নবিজি (সা.) তাঁর পুরো জীবনধারা এবং অজ্জল জীবনদৃষ্টির উত্তরাধিকারী রেখে গেছেন আমাদের মাঝে। নবিজির আশীর্বাদধন্য পরিবার, সহচর এবং আলিমগণই সেই উত্তরাধীকারী। নবিজির জীবনধারা অনুসরণের চেষ্টা করুন, তিনি কীভাবে ঘুমাতেন বা কীভাবে খেতেন- নেহাত এমন জাগতিক জিনিসগুলোও স্পিরিচুয়াল এনার্জি এবং প্রোডাক্টিভিটির অন্যতম বড়ো উৎস। আমির আয়াদ রচিত Healing Body and Soul বইটিতে নবিজি (সা.)-এর একটি ছোট্ট সুন্নাহ অনুসরণ করার শক্তি তুলে ধরা হয়েছে এভাবে- প্রোডাক্টিভ মুসলিম ‘অনেকদিন আগে যখন মুসলিমগণ ও পারস্য সাম্রাজ্য যুদ্ধরত ছিল। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দফা মুসলিমরা পরাজিত হয়। তাই সেনাপতি সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস তাঁর লোকদের পজিশন এবং রিসোর্সের পুনর্মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে একত্রিত করেন। সবকিছু স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। মুসলিমদের ছিল প্রচুরসংখ্যক যোদ্ধা এবং সরঞ্জামাদি। তবে সমস্যাটা আসলে কী ছিল? সাদ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন— এই পরাজয় নিজেদের পাপের কারণে আল্লাহর তরফ থেকে শাস্তি হতে পারে। সুতরাং তিনি তাদের প্রত্যেককে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং কৃত কোনো অন্যায় কাজ বা ছুটে যাওয়া কোনো আমল খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। আন্তরিক উদ্দেশ্য, সদিচ্ছা এবং শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তিতে তারা সবাই ছিলেন ভালো মুসলিম। তবুও তাঁর প্রবল ধারণা ছিল, তারা অবশ্যই আল্লাহ অথবা তার রাসূলের কোনো আদেশের অবহেলা করেছে। তারা তাদের দুর্বল দিকটি খুঁজে বের করতে ফরজ, নফল এবং তারপরে নবিজির পুরো সুন্নাহর মধ্য দিয়ে অনুসন্ধান করে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যায়ে সাদ বুঝতে পারলেন, তারা দাঁতব্রাশ হিসেবে পাছের মূল বা মিসওয়াকের সুন্নাহর অবহেলা করছেন। আমাদের নবিজি যেভাবে সালাতের আগে মিসওয়াক করতেন, তারা সেভাবে করছেন না। ভাৰতে কতটা আশ্চর্য লাগে—যুদ্ধের ময়দানে থাকা মানুষগুলো ভাবছিলেন, তাদের দুর্বলতার বিষয়টি নাকি দিনে পাঁচবার দাঁতব্রাশ না করা! সাদ (রা.) প্রত্যেক মুসলিমকে মিসওয়াক বিতরণের আদেশ দেন এবং তাদের সবাইকে নবিজির সুন্নাহর অনুসরণের আহ্বান জানান। কেউ তর্ক তোলেনি, কেউ তাঁর আদেশের কারণ জানতে চায়নি; কেউ তোলেনি—দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জয় বা পরাজয়ে মিসওয়াকের কী ভূমিকা থাকতে পারে! ইতোমধ্যে পারস্য সেনাবাহিনী মুসলিম শিবিরগুলো নজরদারি করতে গুপ্তচর পাঠিয়েছিল। সে সময়ে পার্সিয়ানরা আরবদের একটি আদিম, অসভ্য জাতি হিসেবে দেখত। সুতরাং গুপ্তচররা যখন আরবদের শিবিরে পৌঁছে লাঠির সাহায্যে দাঁত ব্রাশ করতে দেখে, কী ঘটতে যাচ্ছে তা বুঝতে ব্যর্থ হয়। তাদের একজন চিৎকার করে বলে উঠে- “আমাদের জীবন্ত খেয়ে ফেলতে তারা দাঁতে শান দিচ্ছে; তারা নরখাদক।" পারস্য গুপ্তচররা তাদের শিবিরে ফিরে আসতেই খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পুরো সেনাবাহিনী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং বেশিরভাগ পারস্যদুর্গ পরিত্যক্ত হয়ে যায় এবং সহজেই মুসলিমদের হাতে পরাজিত হয়।

(২) উদাহরণ স্বরূপ—যেমন ওযূর একটি সুন্নত হইল মিসওয়াক, যাহার প্রতি সাধারণতঃ গাফলতি করা হয়। অথচ হাদীস শরীফে বর্ণিত হইয়াছে, যে নামায মিসওয়াক করিয়া পড়া হয়, উহা ঐ নামায হইতে সত্তর গুণ উত্তম যাহা বিনা মিসওয়াকে পড়া হয়। এক হাদীসে আছে, তোমরা মিসওয়াকের এহতেমাম করিতে থাক ; ইহাতে দশটি উপকার আছে ঃ ১. মুখ পরিষ্কার করে ২. আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির কারণ হয় ৩. শয়তানকে রাগান্বিত করে ৪. মিসওয়াককারীকে আল্লাহ তায়ালা মহব্বত করেন এবং ফেরেশতাগণও মহব্বত করেন ৫. দাঁতের মাড়ী মজবুত করে ৬. কফ দূর করে ৭. মুখে সুগন্ধি আনয়ন করে ৮. পিত্তরোগ দূর করে ৯. দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে ১০, মুখের দুর্গন্ধ দূর করে। সর্বোপরি মিসওয়াক করা সুন্নত। ওলামায়ে কেরাম লিখিয়াছেন, মিসওয়াকের এহতেমাম করার মধ্যে সত্তরটি উপকার রহিয়াছে। তন্মধ্যে একটি এই যে, মৃত্যুর সময় কালেমায়ে শাহাদত নসীব হয়। কিন্তু মিসওয়াকের বিপরীতে আফিম সেবনে সত্তর প্রকারের ক্ষতি রহিয়াছে। তন্মধ্যে একটি এই যে, মৃত্যুর সময় কালেমা স্মরণ হয় না।

কালেমার লাভ বা ফজিলত:

(১) যে ব্যক্তি এ কালেমা একবার পাঠ করবে আল্লাহ পাক তার পিছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন, (সুবহানাল্লাহ)। (২) হাদিসে আছে যে ব্যক্তি প্রতিদিন এ কালেমা 100 বার পাঠ করবে কিয়ামতের দিন তার চেহারা পূনিমার চাদের নেই উজ্জ্বল করে উঠাবেন। (সুবহানাল্লাহ) (৩) হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে অজু করে অতঃপর কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে আল্লাহ পাক তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেন সেই ব্যক্তি যে দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।(সুবহানাল্লাহ) (৪) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন, একবার হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তায়ালার পাক দরবারে আরজ করিলেন, হে আল্লাহ! আমাকে এমন কোন ওজীফা শিখাইয়া দিন, যাহা দ্বারা আমি আপনাকে স্মরণ করিব এবং আপনাকে ডাকিব। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়িতে থাক। তিনি আরজ করিলেন, হে পরোয়ারদিগার! ইহা তো সকলেই পড়িয়া থাকে। আল্লাহ তায়ালা পুনরায় বলিলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়িতে থাক। হযরত মূসা (আঃ) আরজ করিলেন, হে আমার রব! আমি তো এমন একটি বিশেষ জিনিস চাহিতেছি যাহা একমাত্র আমাকেই দান করা হয়। এরশাদ হইল, হে মূসা ! সাত তবক আসমান এবং সাত তবক জমীনকে যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর অপর পাল্লায় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ রাখা হয়, তবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-ওয়ালা পাল্লাই ঝুকিয়া যাইবে। (তারগীব ঃ নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, হাকিম)

ঈমানের ঘটনা সমূহ:

ঘটনা (১) :

হযরত আবু যার (রাযিঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিয়াছে অতঃপর উহার মৃত্যুবরণ করিয়াছে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করিবে। আমি আরজ করিলাম, যদিও সে যেনা করিয়া থাকে, যদিও সে চুরি করিয়া থাকে? তিনি এরশাদ করিলেন, (হাঁ) যদিও সে যেনা করিয়া থাকে, যদিও সে চুরি করিয়া থাকে। আমি পুনরায় আরজ করিলাম, যদিও সে যেনা করিয়া থাকে, যদিও সে চুরি করিয়া থাকে? তিনি এরশাদ করিলেন, যদিও সে যেনা করিয়া থাকে, যদিও সে চুরি করিয়া থাকে। আমি আরজ করিলাম, যদিও সে যেনা করিয়া থাকে, যদিও সে চুরি করিয়া থাকে? তিনি এরশাদ করিলেন, যদিও সে যেনা করিয়া থাকে, যদিও সে চুরি করিয়া থাকে; আবু যারের অপছন্দ হইলেও সে জান্নাতে অবশ্যই প্রবশ করিবে। (বুখারী)

ঘটনা (২) :

হযরত আবু হুরইরহ রদিয়াল্লহু আ’নহু (أبىْ هريْرة رضى الله عنْه) হইতে বর্ণিত আছে যে, রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, আপন ঈমানকে তাজা করিতে থাক। কেহ আরজ করিল, ইয়া রসুলুল্লহ! আমরা আপন ঈমান কিভাবে তাজা করিব? তিনি বলিলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লহ বেশি বেশি বলিতে থাক। (মুসনাদে আহমদ, তাবারানী, তারগীব)

ঘটনা (৩) :

হযরত আবু হুরইরহ রদিয়াল্লহু আ’নহু (أبىْ هريْرة رضى الله عنْه) হইতে বর্ণিত আছে যে, রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রহিয়াছে। তন্মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হইল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হইল, রাস্তা হইতে কষ্টদায়ক জিনিস সরাইয়া দেওয়া এবং লজ্জা ঈমানের একটি (বিশেষ) শাখা। (মুসলিম)

ঘটনা (৪) :

হযরত আবু হোরায়রা (রায়িঃ) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরশাদ নকল করেন যে, বেশী বেশী লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সাক্ষ্য দিতে থাক, ঐ সময় আসার পূর্বে যখন তোমরা (মৃত্যু অথবা রোগ ব্যাধি ইত্যাদির কারনে) এই কলেমা উচ্চারণ করিতে পারিবে না।(আবু ইয়ালা, তারগীব)

নামাজ

2nd Point

সালাত হলো দ্বীনের খূঁটি। আল্লাহ আমাদের উপর দিন রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। আল্লাহর নিকট প্রিয় ইবাদাত হলো তাঁর ফরয কাজসমূহ। যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ফরয কাজসমূহ আদায় করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ওবাদা ইবন সামেত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ বান্দাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি সালাতসমূহের হকে কোন প্রকার কমতি ও তাচ্ছিল্য না করে সঠিকভাবে সেগুলো আদায় করে, তার জন্য আল্লাহর এ অঙ্গিকার যে, তিনি তাকে জান্নাত দান করবেন। আর যে এগুলোর ব্যাপারে কমতি ও তাচ্ছিল্য করে তা আদায় করবে, তার প্রতি আল্লাহর কোন অঙ্গিকার নেই। তিনি চাইলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন, আবার ক্ষমাও করতে পারেন’’। [হাদীসটি মোয়াত্তায়ে মালিক, মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে। আর আলবানী একে সহীহ বলেছেন]। হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে নামাজ পড়তে বলেছেন এবং সাহাবাদেরকে যেভাবে নামাজ শিক্ষা দিয়েছেন সেভাবে নামাজ পড়ার যোগ্যতা অর্জন করার চেষ্টা করা। ভাই দুস্ত বুজুর্গ আজিজু - আমাদের পাঁচটি গুনের সাথে নামাজ পড়া দরকার। গুণ কয়টি হলো - (১) কালেমা ওয়াল একিন (২) মাসায়েল ওয়াল এলেম (৩) ফাজায়েল ওয়ালা শক (৪) একলাস ওয়ালা নিয়ত (৫) আল্লাহ ওয়ালা ধ্যান।

নামায হাসিল করার তলীকাঃ

ফরজ নামাযগুলো আমরা মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করবো, সুন্নাত ও ওয়াজিবের পাবন্দি করবো, নফল নামায বেশী-বেশী পড়বো এবং উমরি কাযাগুলো খুজে-খুজে আদায় করবে। এবং নামাযের লাভ জেনে নিজে বেশী-বেশী নামায আদায় করবো এবং অন্যকে দাওয়াত দিবো এবং আল্লাহর নিকট দোয়া করবো, হে আল্লাহ! যেভাবে নামায পড়লে তুমি রাযি ও খুশি হও সেভাবে নামায পড়ার তওফীক তুমি আমাকে দান করো আবং সমস্ত উম্মতে মুহাম্মাদীকে দান করো।

## হাতেম আসাম্ম (রহঃ) এর নিকট কেহ তাঁহার নামাযের অবস্থা জিজ্ঞাসা করিল। তিনি বলিতে লাগিলেন, যখন নামাযের সময় হয় তখন অজু করিয়া নামাযের জায়গায় যাইয়া কিছুক্ষণ বসি যাহাতে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শান্ত হইয়া যায়। অতঃপর নামাযের জন্য দাঁড়াই। এই ধ্যান করি যে, কাবা শরীফ আমার সামনে, পুলসিরাত আমার পায়ের নীচে, ডান দিকে জান্নাত, বামদিকে জাহান্নাম আর মালাকুল মউত আমার পিছনে দাঁড়ানো। আর মনে করি যে, ইহাই আমার জীবনের শেষ নামায। অতঃপর পূর্ণ একাগ্রতার সহিত নামায পড়ি। অতঃপর আশা ও ভয়ের মাঝে থাকি, কারণ জানিনা আমার নামায কবুল হইল কিনা। (এহ্ইয়া)

নামাজ সম্পর্কে কুরআনের আয়াত সমূহ :

(১) হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ! আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে নামাযের হুকুম করিতে থাকুন এবং নিজেও উহার পাবন্দি করুন। আমি আপনার নিকট রিযিক চাহি না বরং রিযিক আপনাকে আমিই দিব আর উত্তম পরিণতি তো পরহেজগারীর জন্যই। (সূরা ত্বাহা, আয়াত : ১৩২)

(২) অর্থাৎ, পরম দয়ালু আল্লাহ তায়ালার খাছ বান্দা হইল তাহারা, যাহারা যমীনের উপর বিনয়ের সহিত চলে (অর্থাৎ অহংকারের সহিত। চলাফেরা করে না) যখন তাহাদের সহিত জাহেল লোকেরা (মূর্খের মত) কথাবার্তা বলে, তখন তাহারা বলে—সালাম। (অর্থাৎ তাহারা শান্তির কথা বলে যাহাতে অশান্তি দূর হয়, অথবা দূর হইতে তাহারা সালাম বলিয়াই ক্ষান্ত হয়) এবং ইহারা ঐ সমস্ত লোক যাহারা রাতভর আপন রবের উদ্দেশ্যে সেজদা এবং নামাযে দণ্ডায়মান থাকিয়া কাটাইয়া দেয়।” (সূরা ফোরকান, আয়াত : ৬৩/৬৪)

(৩) অর্থাৎ, এই সকল লোককে তাহাদের ধৈর্যের (অথবা দ্বীনের উপর অটল থাকার) বদলাস্বরূপ বেহেশতের বালাখানাসমূহ দান করা হইবে এবং সেখানে তাহাদিগকে ফেরেশতাদের তরফ হইতে দোয়া ও সালাম দ্বারা স্বাগত জানানো হইবে। তাহারা চিরকাল সেখানে অবস্থান করিবে। তাহা কতই না উত্তম ঠিকানা ও আবাসস্থল। (সূরা ফোরকান, আঃ ৭৫/৭৬)

(৪) অর্থাৎ, ফেরেশতাগণ তাহাদের নিকট প্রত্যেক দরজা দিয়া প্রবেশ করিবে এবং তাহাদিগকে বলিবে, তোমাদের উপর সালাম (শান্তি)–কেননা তোমরা দ্বীনের উপর অটল থাকিয়া ধৈর্য ধারণ করিয়াছ। অতএব, কতই না চমৎকার শেষ আবাসস্থল। (সূরা রায়াদ, আয়াত : ২৩-২৪)

(৫) অর্থাৎ, তাহারা এমন লোক, যাহাদের পার্শ্বদেশ আরামের বিছানা হইতে পৃথক থাকে, (অর্থাৎ তাহারা নামাযে মগ্ন থাকে) আপন রবকে আজাবের ভয় ও সওয়াবের আশায় ডাকিতে থাকে এবং তাহারা আমার দেওয়া নেয়ামত হইতে খরচ করিয়া থাকে। এইসব লোকের জন্য অদৃশ্য কি কি পুরস্কার মওজুদ জগতে তাহাদের চক্ষু শীতল করার মত রহিয়াছে ; তাহা কেহই জানে না। যাহা তাহাদের নেক আমলের বদলা স্বরূপ হইবে। (সূরা আলিফ, লাম, মীম সেজদা, আয়াত : ১৬-১৭)

(৬) অর্থাৎ, নিশ্চয় মুত্তাকীগণ বেহেশতের বাগান ও ঝর্ণাসমূহের মধ্যে অবস্থান করিবে। আপন পরওয়ারদিগারের দানকে তাহারা আনন্দচিত্তে গ্রহণ করিতে থাকিবে। নিশ্চয় তাহারা ইতিপূর্বে (দুনিয়াতে) নেক আমলকারী ছিল, রাত্রে তাহারা খুব কমই নিদ্রা যাইত, শেষ রাত্রে উঠিয়া তাহারা এস্তেগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা করিত।(সূরা জারিয়াত, আয়াতঃ ১৫-১৮)

(৭) যাহারা বে-দ্বীন তাহাদের সহিত কি ঐ সমস্ত লোকের তুলনা হইতে পারে, যাহারা রাত্রিতে কখনও সেজদায় পড়িয়া থাকে আবার কখনও নিয়ত বাঁধিয়া (আল্লাহর এবাদতে) দাঁড়াইয়া থাকে। আখেরাতকে ভয় করে এবং স্বীয় পরওয়ারদিগারের রহমতের আশা পোষণ করে। (আপনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করুন) যাহারা জানে আর যাহারা জানে না এই দুই শ্রেণী কি কখনও সমান হইতে পারে? (আর ইহা নিতান্তই স্পষ্ট বিষয়। যে, যাহারা জানে তাহারা আপন রবের এবাদত করিবেই; আর যাহারা এমন দয়ালু মাওলার এবাদত করে না তাহারা শুধু অজ্ঞ নয় বরং অজ্ঞ হইতেও অজ্ঞ।) বস্তুতঃ উপদেশ গ্রহণ করে একমাত্র বুদ্ধিমান ব্যক্তিরাই। (সূরা যুমার, আয়াত : ৯)

(৮) অর্থাৎ, নিশ্চয় মানুষকে অস্থির চিত্তরূপে সৃষ্টি করা হইয়াছে। কোনরূপ | বিপদে পড়িলেই সে অতিমাত্রায় হাহুতাশ আরম্ভ করে, আর যখন সে কোনরূপ কল্যাণ লাভ করে তখন সে কৃপণতা শুরু করে (যাহাতে আর কেহ এই কল্যাণ লাভ করিতে না পারে)। তবে ঐসব নামাযী লোকদের ব্যাপার স্বতন্ত্র যাহারা পাবন্দী ও স্থিরতার সহিত নামায আদায় করে। এই আয়াতের পর আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করার পর এরশাদ করিয়াছেন : (সূরা মায়ারিজ, আয়াত : ১৯-২৩)

(৯) অর্থাৎ, আর যাহারা নিজেদের নামাযসমূহের হেফাজত করে তাহারাই ঐ সকল লোক যাহাদিগকে বেহেশতে সম্মানিত করা হইবে। (সূরা মায়ারিজ, আয়াত : ৩৪-৩৫)

নামাজের ফজিলত :

(১) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন যে, আল্লাহ তায়ালা ফরমাইয়াছেন, আমি আপনার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করিয়াছি এবং প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, যে ব্যক্তি এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায সময় মত গুরুত্ব সহকারে আদায় করিবে আমি তাহাকে নিজ দায়িত্বে জান্নাতে প্রবেশ করাইব। আর যে ব্যক্তি গুরুত্ব সহকারে এই নামাযসমূহ আদায় করিবে না, তাহার ব্যাপারে আমার কোন দায়িত্ব নাই। (দুররে মানসূর ঃ আবূ দাউদ, ইবনে মাজাহ)

(২) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন এখলাসের সহিত এইভাবে নামায পড়ে যে, তাহার তকবীরে উলা ছুটে না তবে সে দুইটি পরওয়ানা লাভ করিবে একটি জাহান্নাম হইতে মুক্তি দ্বিতীয়টি মুনাফেকি হইতে মুক্তি।

(৩) এক হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে যে, যে ব্যক্তি নামাযের এহতেমাম করে আল্লাহ তায়ালা তাহাকে পাঁচ প্রকারে সম্মানিত করেন। প্রথমতঃ তাহার উপর হইতে রুজি-রোজগারের অভাব দূর করিয়া দেওয়া হয়। দ্বিতীয়তঃ তাহার উপর হইতে কবরের আজাব হটাইয়া দেওয়া হয়। তৃতীয়তঃ কিয়ামতের দিন তাহার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হইবে। (যাহাদের অবস্থা সূরায়ে আল-হাক্কাতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, যাহাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হইবে তাহারা খুবই আনন্দ ও খুশির সহিত প্রত্যেককে দেখাইতে থাকিবে) চতুর্থতঃ সে ব্যক্তি পুলসিরাতের উপর দিয়া বিদ্যুতের মত পার হইয়া যাইবে। পঞ্চমতঃ বিনা হিসাবে বেহেশতে প্রবেশ করিবে।

(৪) এখানে একটি সুন্দর ঘটনা উল্লেখ করিয়া এই পরিচ্ছেদ শেষ করিতেছি। হাফেজ ইবনে হজর (রহঃ) মুনাব্বেহাত কিতাবে লিখিয়াছেন, একবার হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিলেন : এই দুনিয়াতে তিনটি জিনিস আমার প্রিয়—খুশবু, নারী আর নামাযে আমার চোখের শীতলতা। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তখন কয়েকজন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। তন্মধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাযিঃ) বলিলেন, আপনি সত্য বলিয়াছেন, আমার নিকটও তিনটি জিনিস প্রিয়—আপনার চেহারা মুবারক দেখা, আমার অর্থ-সম্পদ আপনার জন্য খরচ করা এবং আমার কন্যা আপনার বিবাহে রহিয়াছে। হযরত ওমর (রাযিঃ) বলিলেন, আপনি সত্য বলিয়াছেন, আমার নিকটও তিনটি জিনিস প্রিয়—সৎ কাজে আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ এবং পুরাতন কাপড় পরিধান করা। হযরত উসমান (রাযিঃ) বলিলেন, আপনি সত্য বলিয়াছেন। আমার নিকটও তিনটি জিনিস প্রিয়—ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান করা এবং কুরআন পাকের তেলাওয়াত। হযরত আলী (রাযিঃ) বলিলেন, আপনি সত্য বলিয়াছেন, আমারও তিনটি জিনিস প্রিয়—মেহমানের খেদমত, গরমের দিনে রোযা রাখা এবং দুশমনের উপর তলোয়ার চালানো। এমন সময় হযরত জিব্রাঈল (আঃ) তশরীফ আনিলেন এবং আরজ করিলেন, আমাকে আল্লাহ তায়ালা পাঠাইয়াছেন। অতঃপর বলিলেন যে,মআমি (জিবরাঈল) যদি দুনিয়াবাসীদের একজন হইতাম তবে কি পছন্দ করিতাম, বলিব কি? হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিলেন, বলুন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) আরজ করিলেন, পথহারাদের পথের সন্ধান দেওয়া, গরীব এবাদতকারী লোকদেরকে মহব্বত করা এবং সন্তান-সন্ততিওয়ালা গরীব লোকদেরকে সাহায্য করা। আর আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের তিনটি কাজ পছন্দ করেন—জান-মালের শক্তি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা, গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হইয়া ক্রন্দন করা এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় ছবর করা।

(৫) হাফেজ ইবনে কাইয়্যিম (রহঃ) 'যাদুল-মাআদ’ কিতাবে লিখিয়াছেন, নামায রুজী আকর্ষণ করে, স্বাস্থ্য রক্ষা করে, রোগ-ব্যাধি দূর করে, অন্তরকে শক্তিশালী করে, চেহারার নূর ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, মনে আনন্দ দেয়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সঙ্গীবতা আনে, অলসতা দূর করে, অন্তর খুলিয়া দেয়। নামায রূহের খোরাক, দিলকে নূরানী করে, আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে রক্ষা করে, আল্লাহর আজাব হইতে বাঁচাইয়া রাখে, শয়তানকে দূর করিয়া রাখে, রহমানের সহিত নৈকট্য সৃষ্টি করে। মোটকথা দেহ এবং আত্মার সুস্থতা রক্ষার জন্য নামাযের বিশেষ দখল ও আশ্চর্যজনক তাছীর রহিয়াছে। ইহা ছাড়া দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় ক্ষতি ও অনিয় দূরীকরণ ও দোজাহানের যাবতীয় কল্যাণ সাধনে নামাযের বিশেষ ভূমিকা রহিয়াছে।

(৬) কথিত আছে, আগেকার যুগে মানুষ শয়তানকে দেখিতে পাইত। এক ব্যক্তি শয়তানকে বলিল, তুমি আমাকে এমন কোন পন্থা শিখাইয়া দাও, যাহা করিলে আমিও তোমার মত হইতে পারি। শয়তান বলিল, এমন আবদার তো আজ পর্যন্ত আমার নিকট কেহ করে নাই, তোমার কি প্রয়োজন দেখা দিল? লোকটি বলিল, আমার মন এরূপ চাহিতেছে। শয়তান বলিল, ইহার পন্থা এই যে, নামাযে অবহেলা করিও এবং সত্য-মিথ্যা কসম খাইয়া কথা বলিতে কোনই পরওয়া করিও না। লোকটি বলিয়া উঠিল, আমি আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা করিতেছি যে, জীবনে কখনও নামায ছাড়িব না এবং কসমও খাইব না। ইহা শুনিয়া শয়তান বলিল, আজ পর্যন্ত চালবাজি করিয়া তুমি ছাড়া আর কেহ আমার নিকট হইতে কথা নিতে পারে নাই। আমিও প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, মানুষকে কখনও উপদেশ দিব না।

(৭) হাফেজ ইবনে হজর (রহঃ) ‘মুনাব্বিহাত’ কিতাবে হযরত উসমান গণী (রাযিঃ) হইতে নকল করিয়াছেন, যে ব্যক্তি পাবন্দি সহকারে সঠিক সময়ে নামাযের এহতেমাম করে, আল্লাহ তায়ালা নয়টি পুরস্কারের দ্বারা তাহাকে সম্মানিত করেন। (১) আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাহাকে ভালবাসেন। (২) তাহাকে সুস্থতা দান করেন। (৩) ফেরেশতাগণ তাহার হেফাজত করেন। (৪) তাহার ঘরে বরকত দান করেন। (৫) তাহার চেহারায় বুযুর্গদের নূর ফুটিয়া উঠে। (৬) তাহার দিল নরম করিয়া দেন। (৭) পুলসিরাতের উপর দিয়া সে বিজলীর মত দ্রুত পার হইয়া যাইবে। (৮) তাহাকে জাহান্নাম হইতে নাজাত দিয়া দেন। (৯) জান্নাতে এমন লোকদের প্রতিবেশী হিসাবে সে স্থান পাইবে, যাহাদের সম্পর্কে কুরআনে এই সুসংবাদ আসিয়াছে : অর্থাৎনকেয়ামতের দিন না তাহাদের কোন ভয়ভীতি থাকিবে আর না তাহাদের কোন প্রকার চিন্তা থাকিবে। (সূরা বাকারাহ, আয়াতঃ ৬২)

(৮) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন, নামায দ্বীনের খুঁটি এবং ইহার মধ্যে দশ প্রকার উপকারিতা রহিয়াছে : (১) নামায চেহারার উজ্জ্বলতা (২) দিলের নূর (৩) শরীরের আরাম ও সুস্বাস্থ্যের কারণ। (৪) কবরের সঙ্গী (৫) আল্লাহর রহমত নাযিলের ওসীলা (৬) আসমানের চাবি (৭) নেক আমলের পাল্লা ভারী হওয়ার বস্তু (উহা দ্বারা নেক আমলের পাল্লা ভারী হইয়া যায়) (৮) আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ (৯) বেহেশতের মূল্য (১০) দোযখের প্রতিবন্ধক। যে ব্যক্তি নামায কায়েম করিল সে দ্বীনকে কায়েম রাখিল আর যে নামায ত্যাগ করিল সে নিজের দ্বীনকে ধ্বংস করিল।

(৯) বিখ্যাত বুযুর্গ সূফী হযরত শাকীক বলখী (রহঃ) বলেন যে, আমি পাঁচটি জিনিস তালাশ করিয়াছি এবং তাহা পাঁচ জায়গায় পাইয়াছি। (১) রুজীর বরকত চাশতের নামাযে। (২) কবরের জ্যোতি তাহাজ্জুদ নামাযে (৩) মুনকার নাকীরের প্রশ্নের জওয়াব কুরআন তেলাওয়াতের মধ্যে। (৪) সহজে পুলছেরাত পার হওয়া রোযা ও ছদকার মধ্যে। (৫) আরশের ছায়া নির্জনতার মধ্যে।

(১০) আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিতেছেন, হে আদমসন্তান ! দিনের শুরুতে তুমি চারি রাকআত নামায আদায়ে অক্ষম হইও না। আমি সারাদিন তোমার যাবতীয় কাজ সমাধা করিয়া দিব। থাক। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাযিঃ) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হইতে নকল করিয়াছেন যে, সমস্ত আমলের মধ্যে আমার নিকট নামাযই সবচেয়ে প্রিয় আমল।

(১১) হযরত আবু মুসলিম খাওলানী (রহঃ) নিজ ঘরে নামায পড়ার জায়গায় একটি চাবুক লটকাইয়া রাখিয়াছিলেন। নিজের নফসকে সম্বোধন করিয়া বলিতেন, উঠ, দাঁড়াইয়া যা, আমি তোকে (এবাদতের মধ্যে) ভাল করিয়া এমনভাবে হেঁচড়াইব যে, তুই ক্লান্ত হইয়া যাইবি ; কিন্তু আমি ক্লান্ত হইব না। যখন তাহার মধ্যে একটু অলসতা দেখা দিত, তখন তিনি ঐ চাবুক দ্বারা নিজের পায়ের গোছার উপর মারিতেন এবং বলিতেন, মার খাওয়ার জন্য এই গোছাগুলি আমার ঘোড়া হইতে বেশী উপযুক্ত। তিনি ইহাও বলিতেন, সাহাবায়ে কেরাম (রাযিঃ) এইরূপ মনে করেন (যে, জান্নাতের সমস্ত মর্যাদা) তাঁহারাই দখল করিয়া লইবেন, না ; আমরা তাহাদের সহিত (এইসব মর্যাদার ব্যাপারে) ভালভাবে মোকাবেলা করিব। যেন তাঁহারাও বুঝিতে পারেন যে, তাঁহারা তাঁহাদের পর যোগ্য লোকদেরকেই রাখিয়া আসিয়াছেন।

বে-নামাযীর কোন ওজর আপত্তি গ্রহণ করা হবেনা :

বেনামাজির শাস্তি Punishment of benamaji : আপনাকে প্রশ্ন করা হলো— আপনি নামাজ পড়েন না কেনো? আপনি বিভিন্ন অযুহাত দেখান। বলেন— সারাদিন ব্যস্ত থাকি, চাকরী করি, ব্যবসা করি, ক্ষেতে কাজ করি ইত্যাদি ইত্যাদি। নানান ধরনের অযুহাত দেখান। অথচ আপনাকে যদি বলা হয় একবার না খেয়ে থাকতে তখন কিন্তু আর আপনি অযুহাত দেখাবেন না। আপনাকে বলা হলো— সিনেমা দেখে আসতে, মাঠে গিয়ে খেলে আসতে তখন আপনি অযুহাত দেখান না। দুনিয়ার কাজের ক্ষেত্রে আপনার কোন অযুহাত নেই। যত অযুহাত সব আসে— দ্বীনের কাজ অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসূলের কাজ করতে গেলে। আপনি তো ঠিকই বলেন সময় পাইনা নামাজ পড়ার জন্য। অথচ নাটক, মুভি দেখা ও খেলাধুলা করার জন্য আপনার সময় ঠিকই হয় কিন্তু নামাজ পড়ার জন্য সময় হয় না। ধরেন— আপনি বেনামাজি অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলেন।নআপনাকে আল্লাহ পাক যখন জিজ্ঞেস করলেন তুমি নামাজ পড়নি কেন? তখনোও কি আপনি অযুহাত দেখাবেন! আর আপনার অযুহাত তখন কোন কাজে আসবে না। আপনি বলবেন আমি অসুস্থ ছিলাম, ব্যবসা করতাম, চাকরী করতাম ইত্যাদি ইত্যাদি তাই নামাজ পড়ার সময় পাই নি এবং নামাজ পড়িনি।

১. শাসন ও রাজকার্য বা চাকুরীর ওজরঃ

শাসন ও রাজকার্যে নিয়োজিত ব্যক্তি বা সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে চাকুরীরত ব্যক্তিরা যদি এসব দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে কিয়ামতে ওযর পেশ করে যে, এসব কাজের ব্যস্ততার কারণে নামায পড়তে পারিনি। আল্লাহ তা’য়ালা তখন হযরত দাউদ আ., হযরত সোলাইমান আ. প্রমুখ রাষ্ট্রনায়ক ও সরকার পরিচালনাকারী নবীগণকে হাজির করে বে-নামাযীকে প্রশ্ন করবেন, রাজত্ব বা সরকারী চাকুরী যদি নামাযের পথে বাঁধা হতো, তাহলে তাঁদের ও নামায তরক করতে হত। অথচ তাঁরাতো কখনো নামায ত্যাগ করেন নাই। অতএব, তোমার অলসতাই তোমার নামায ত্যাগ করার কারণ। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতাকে বলবেন, যাও, একে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর।

২. রোগ-যন্ত্রণা বা স্বাস্থ্যহানীর ওজর ঃ

কেউ যদি কিয়ামতে এ ওজর পেশ করে যে, রোগ-যন্ত্রণা ও স্বাস্থ্যহানীর দরূন আমি নামায পড়তে পারিনি, তখন আল্লাহ তা’য়ালা কঠিন পীড়াগ্রস্ত আইউব আ. কে হাজির করে বে-নামাযীকে প্রশ্ন করবেন যে, তুমি মিথ্যাবাদী, কারণ, রোগ যদি সত্যিই নামায পড়তে বাধা হত তাহলে আইয়ুব একবার ও নামায পড়তে পারতেননা। অথচ তিনি এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহকে ভূলে যাননি। সুতরাং রোগ বা স্বাস্থ্য খারাপ হওয়া তোমার ছলনা মাত্র। অলসতা করে তুমি নামায পড়নাই। এরপর ফেরেশতাকে বলবেন, যাও, একে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর।

৩. রুজি-রোজগারে অত্যধিক ব্যস্ত থাকার ওজর

এক ব্যক্তি কিয়ামতে বলবেন, হে আল্লাহ, পরিবার পরিজনের লালন-পালন এবং তাদের জন্য খাদ্য উপার্জনে সারাক্ষণ ব্যস্ত ছিলাম বিধায় নামায পড়ার সুযোগ হয়নি। তখন হযরত ইয়াকুব আ. কে হাজির করে ঐ বে-নামাযীকে বলবেন, তেমাদের মধ্যে কার সন্তান-সন্ততি বেশী ছিল? সন্তানের বিয়োগ ব্যাথায় তুমি বেশী কষ্ট পেয়েছ, না ইয়াকুব বেশী কষ্ট পেয়েছে? তার পুত্র ইউসুফকে হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শেষ পর্যন্ত অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কোমর বেঁকে গিয়েছিল। বার্ধ্যক্যের কারণে কষ্টে কালযাপন করেছে। কিন্তু এক বারের জন্য ও সে নামায ত্যাগ করে নাই। অতঃপর ফেরেশতাকে বলবেন, যাও, একে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর।

৪. স্বামীর সংসারে অত্যধিক কাজ কর্মের ওজর:

কিয়ামতে আল্লাহর আদালতে একজন বে-নামাযী মহিলাকে নামায না পড়ার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলবে, হে আল্লাহ! আমার স্বামীর সংসারে বহু কাজকর্ম ছিল এবং তার ভয়ে সবসময় অস্থির থেকে সংসারের নানাবিধ কাজে সারাক্ষণ লিপ্ত থাকতাম। একারণে নামায পড়ার কোন সময়ই পাইনি। আল্লাহ তা’য়ালা তখন ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া রা. কে হাজির করবেন এবং বে-নামাযী মহিলাটিকে বলবেনঃ দেখ, স্বামীর জুলুম নামাযের পথে বাঁধা হলে আছিয়া কিছুতেই নামায পড়তে পারতনা। কেননা আছিয়ার স্বামী ফেরাউন ছিল তোমার স্বামীর চেয়ে অধিকতর বড় জালিম। আজ তোমার ওজর সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা। তুমি অলসতা করেই নামায পড়নাই। অতঃপর ফেরেশতাকে নির্দেশ দিবেন। যাও, একে জাহান্নামে ফেলে দাও। [রুহুল বয়ান, মেরী নামায]

এলেম ও যিকির

3rd Point

ইলমের উদ্দেশ্যঃ

যখন আমরা নামায পড়বো তখন আমাদের নামায সহীহ হওয়ার জন্য ইলম প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালার কখন কি আদেশ নিষেধ করেছেন এবং হজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া য়াসাল্লাম এর তরীকা জেনে সে অনুযায়ী আমাল করার চেষ্টা করা।

ইলমের লাভঃ

১.আল্লাহ তা‘য়ালা এরশাদ করেন, অর্থঃ-আল্লাহ তা‘য়ালা তোমাদের মধ্যে ঈমানদারদের এবং যাদের দ্বীনের জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের উচ্চ মর্যাদা দান করবেন। সূরা, মুজদালা- ১১

২.আল্লাহ তা‘য়ালা এরশাদ করেন, অর্থঃ- (হে নবী!) আপনি বলে দিন যাহারা জ্ঞানী এবং যাহারা মূর্খ তারা কি সমান হতে পারে? সুরা, যুমার-৭৯

৩. নবী করীম (স.) এরশাদ ফরমানঃ- অর্থঃ-যে ব্যক্তি ইলমে দ্বীন শিক্ষা করার জন্য কোন রাস্তা অবলম্বন করে আল্লাহ তা‘য়ালা তার জন্য এর বিনিময়ে জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন। (আবু দাউদ)

৪. নবীজী আরো এরশাদ ফরমান, অর্থঃ- এবং ফেরেশতাগণ ইলমে দ্বীন শিক্ষাকারীদের সন্তুষ্টির জন্য আপন পাখা বা পর বিছিয়ে দেন। (আবু দাউদ)

৫.আরো এরশাদ ফরমান, অর্থঃ-এবং আসমান জমিনের সকল মাখলূক এমনকি পানির মাছ পর্যন্ত আলেমের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করে। (আবু দাউদ)

৬. হুযুর (স.) আরো বলেন, অর্থঃ- হযরত আবু উমামা বাহেলী রা. হতে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ (স.) এর সম্মুখে দুই ব্যক্তির আলোচনা করা হলো, তন্মধ্যে একজন আবেদ ও অপরজন আলেম ছিল রসূলুল্লাহ (স.) এরশাদ করলেন, আলেমেন মর্যাদা আবেদের উপর এমন, যেমন আমার মর্যাদা তোমাদের মধ্য হতে একজন সাধারন ব্যক্তির উপর। অতপর নবী করীম (স.) এরশাদ করলেন, যারা লোকদেরকে ভাল কথা শিক্ষাদেয় তাদের উপর আল্লাহ তা‘য়ালা রহমত নাযিল করেন, তার জন্য ফেরেশতাগণ, আসমান-জমিনের সমস্ত মাখলূক এমনকি পিঁপড়া আপন গর্তে এবং মাছ ( পানির ভিতর আপন আপন প্রদ্ধতিতে) রহমতের দোয়া করে।( তিরমিজি)

ইলম হাসিল করার তরীকাঃ

এই এলম আমরা কয়েক ভাবে শিক্ষা করবো, ফাযায়েলে ইলম তা‘লীমের হালকায় বসে শিক্ষা করবো, আর মাসলা-মাসায়েলের ইলম উলামায়েকেরামের নিকট জিজ্ঞাসা করে শিক্ষা করবো। এবং এই ইলমের লাভ জেনে আমি বেশী-বেশী ইলম শিক্ষা করবো এবং অপর ভাইকে দাওয়াত দিবো এবং আল্লাহর নিকট দোয়া করবো যে, হে আল্লাহ! যেভাবে ইলম শিক্ষা করলে তুমি রাযি-খুশি হও সেভাবে বেশী-বেশী ইলম শিক্ষা করার তওফীক আমাকে দান করো এবং সমস্ত উম্মতে মুহাম্মাদিকে দান করো।

(১) হযরত উ’সমান ইবনে আ’ফফান রদিয়াল্লহু আ’নহু (عثْما بْن عفّان رضى الله عنْه) হইতে বর্ণিত আছে যে, রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে কুরআন শরীফ শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়। (তিরমিযী)

(২) হযরত আবু যার (রায়িঃ) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরশাদ করিয়াছেন, হে আবু যার, তুমি যদি সকালবেলা যাইয়া কালামুল্লাহ শরীফের একটি আয়াত শিখিয়া লও তবে তাহা একশত নফল নামায হইতে উত্তম। আর যদি এলেমের একটি অধ্যায় শিখিয়া লও, চাই তাহা সেই সময় আমল হউক বা না হউক, (যেমন তায়াম্মুমের মাসায়েল) তবে হাজার রাকাত নামায পড়া হইতে উত্তম। (ইবনে মাজাহ)

(৩) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ইলম হাসিল করার জন্য কোন রস্ত৷ অতিক্রম করে, আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাতের রাস্ত৷ সহজ করে দেন। অর যে ব্যক্তির আমল তাকে পেছনে ফেলে রাখবে, তার বংশ-গরিম৷ তাকে এগিয়ে দেবে না। ( আবু দাউদ)

ইলমের লাভঃ

সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার ধ্যান-খেয়াল দিলে পয়দা করা। হার-হালতে বা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘য়ালার ধ্যান ও খেয়াল অন্তরে পয়দা করা। অর্থাৎ আমি যে সকল ইবাদত করছি- আল্লাহ আমাকে দেখছেন- এ মনোভাব নিয়ে ইবাদত করা। আমি যে জিকির করছি- আল্লাহ পাক তা শুনছেন- এ মনোভাব নিয়ে জিকির করা।

জিকিরের লাভঃ

(১) আল্লাহ তা‘য়ালার এরশাদ, অর্থঃ-খুব ভাল করে বুঝে লও যে, আল্লাহ তা‘য়ালার জিকির দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়। সুরা রাদ-২৮

২. হুযুর (স.) এরশাদ করেন, অর্থঃ-হযরত আবু মুসা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন ,রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘য়ালার জিকির করে আর যে ব্যক্তি করে না এই দুই জনের উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মত। যে জিকির করে সে জীবিত আর যে জিকির করেনা সে মৃত। (বুখারী,মুসলিম)।

৩. নবীজী (স.) আরো এরশাদ করেন, অর্থঃ-হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূলুূল্লাহ (স.) এরশাদ ফরমান, আল্লাহর জিকির হতে বড় মানুষের আর কোন আমল কবর আজাব হতে অধিক নাজাত দানকারী নেই। (দুররে মানসুর, মোসনাদে আহমাদ)

৪. অর্থঃ-হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ (স.)এরশাদ ফরমান, তোমরা যখন জান্নাতের বাগান সমূহের নিকট দিয়ে যাও তখন খুব বিচরণ কর। কেহ আরজ করলো ইয়া রসূলুল্লাহ (স.) জান্নাতের বাগান সমূহ কি? এরশাদ করলেন জিকিরের হালকাসমূহ। (মোসনাদে আহমাদ,তিরমিযী)

৫. নবীজী (স.) আরো ফরমান, হযরত আবু দারদা (রা.) বলেন, যাদের জিব্বা আল্লাহর জিকির দ্বারা তরু-তাজা থাকে তারা কাল কিয়ামতের দিন হাসতে হাসতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (ফাজায়েলে আমল,জিকির-৩০)

৬. এক হাদিসে এসেছে, এক মুহূর্ত জিকির করা সত্তর বছর ইবাদত করার চেয়ে ও উত্তম। (ফাজায়েলে আমল ,জিকির-৩৩)

৭. হুযুর (স.) এরশাদ ফরমান যদি তোমরা সব সময় জিকিরে মশগুল থাক তবে ফেরেস্তাগণ তোমাদের বিছানায় ও পথে তোমাদের সহিত মোসাফাহা করতে শুরু করবে। (ফাজায়েলে আমল-৩৪)

৮. হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন জান্নাতের আটটি দরজা আছে। তন্মধ্যে একটি দরজা শুধু জিকিরকারীদের জন্য রয়েছে (ফাজায়েলে আমল-জিকির-৩৪)

৯. অন্য হাদিসে আছে ,যে ব্যক্তি বেশী বেশী আল্লাহর জিকির করে সে মুনাফেক হতে মুক্ত। (ফাজায়েলে আমল-জিকির-৩৪)

১০. অন্য হাদিসে আছে আল্লাহ তা‘য়ালা জিকিরকারীকে মহব্বত করেন। (ফাজায়েলে আমল জিকির-

জিকির হাসিল করার তরীকাঃ

জিকির আমরা কয়েক ভাবে করব, সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির “লা ইলাহা ইল্লাল্লহ” বলা, উত্তম জিকির কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করা, জায়গা বিশেষ মাসনূন দোয়া পড়া, কোন হক্কানী পীর সাহেবের ওয়াযীফা থাকলে তা সময় মত আদায় করা। এই জিকিরের লাভ জেনে আমরা বেশী বেশী জিকির করবো এবং অপর ভাইকে দাওয়াত দিবো এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করবো যে, হে আল্লাহ! এই জিকির বেশী বেশী করার তাওফিক আমাকে দাও, এবং সমস্ত উম্মতে মুহাম্মাদীকে দাও।

(১) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, সর্বোত্তম যিকির হইল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর সর্বোত্তম দোয়া হইল, আল-হামদুলিল্লাহ। (মিশকাত : তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)

জিকির -২ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ মীযানের পাল্লাকে ভারী করে দেয় এবং সর্বোত্তম দোআ’। [তিরমিযী-৫/৪৬২,ইবনে মাযাহ-২/১২৪৯,হাকিম-১/৫০৩,সহীহ আল জামে’-১/৩৬২]

জিকির -৩ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সর্বোত্তম যিকর। [তিরমিযী-৫/৪৬২,ইবনে মাযাহ-২/১২৪৯,হাকিম-১/৫০৩,সহীহ আল জামে’-১/৩৬২]

জিকির -৪ ‘সুবহান আল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর’ এই কালিমাগুলি আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় এবং নবী (সঃ) বলেনঃ পৃথিবীর সমস্ত জিনিসের চইতে আমার নিকট অধিক প্রিয়। [ সহীহ মুসলিম -৩/১৬৮৫, ৪/২০৭২]

জিকির -৫ যে ব্যক্তি ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’ প্রতিদিন ১০০ বার পাঠ করবে সমুদ্রের ফেনা পরিমান (সগীরা) গুনাহ থাকলে ও তাকে মাফ করে দেওয়া হবে। [সহীহ আল-বুখারী-৭/১৬৮,সহীহ মুসলিম-৪/২০৭১]

জিকির -৬ নবী (সঃ) বলেনঃ ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াবি হামদিহী সুবহানাল্লিল আযীম’ এই কালীমাগুলি জিহ্বায় উচ্চারনে সহজ , মীযানের পাল্লায় ভারী ,দয়াময় আল্লাহর নিকট প্রিয় । [সহিহ আল- বুখারী-৭/১৬৮,সহীহ মুসলিম-৪/২০৭২]

জিকির -৭ যে ব্যক্তি ‘সুবহানাল্লাহিল আযীমি ওয়াবি হামদিহী’ পাঠ করবে প্রতিবারে তার জন্য জান্নাতে একটি করে (জান্নাতী) খেজুর গাছ রোপন করা হবে । [আত-তিরমিযী-৫/৫১১,আল-হাকীম-১/৫০১, সহীহ আল-জামে’-৫/৫৩১, সহীহ আত-তিরমিজী-৩/১৬০]

জিকির -৮ নবী (সঃ) বলেনঃ ‘লা হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ’ হচ্ছে জান্নাতের গুপ্তধন সমুহের মধ্যে একটি গুপ্তধন। [ সহীহ আল-বুখারী -১১/২১৩, সহীহ মুসলিম-৪/২০৭৬]

জিকির -৯ নবী (সঃ) বলেনঃ ‘সুবহান আল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ’ এই কালীমাগুলি হচ্ছে “অবশিষ্ট নেকআ’মল সমুহ” । [ আহমাদ (সহীহ)-৫১৩, মাজমাউজ জাওয়াঈদ-১/২৯৭ ]

জিকির -১০ নবী (সঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দুরুদ পাঠ করবে আল্লাহ তাআ’লা তার প্রতি দশ বার রহমত বরষন করবেন- “আল্লাহুম্মা সাল্লি ’আলা মুহাম্মাদিঁওয়া ’আলা আলি মুহাম্মাদিন্ কামা সাল্লায়তা ’আলা ইব্রাহীমা ওয়া ’আলা ’আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজিদ আল্লাহুম্মা বারিক ’আলা মুহাম্মাদিঁওয়া ’আলা আলি মুহাম্মাদিন্ কামা বারাকতা ’আলা ইব্রাহীমা ওয়া ’আলা ’আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজিদ এবং তিনি (সঃ) আরো বলেনঃ যে ব্যক্তি আমার প্রতি সকালে দশবার এবং বিকেলে দশবার দুরুদ পাঠ করবে সে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত পাবে ।” [তাবারানী, মাজময়াউজ জাওয়াঈদ-১০/১২০, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব-১/২৭৩] আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক ভাবে আমল করার তৌফিক নসীব করুন আমীন।

(২) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন, ফেরেশতাদের একটি জামাত রহিয়াছে, যাহারা পথেঘাটে ঘুরিয়া বেড়াইতে থাকে। যেখানেই তাহারা আল্লাহর যিকিরকারী লোকদেরকে দেখিতে পায়, তাহারা পরস্পর একে অপরকে ডাকিয়া সকলেই জমা হইয়া যায় এবং যিকিরকারীদের চতুর্দিকে আসমান পর্যন্ত জমা হইতে থাকে। যখন ঐ মজলিস শেষ হইয়া যায়, তখন তাহারা আসমানে উঠিয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা সবকিছু জানা সত্ত্বেও জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কোথা হইতে আসিয়াছ? তাহারা বলে, আমরা আপনার বান্দাদের অমুক জামাতের নিকট হইতে আসিয়াছি, যাহারা আপনার তাসবীহ, তাকবীর ও তাহমীদে (মহত্ত্ব বর্ণনা ও প্রশংসায়) মশগুল ছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাহারা কি আমাকে দেখিয়াছে? ফেরেশতারা বলে, হে আল্লাহ! তাহারা আপনাকে দেখে নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাহারা যদি আমাকে দেখিত, তবে কি অবস্থা হইত? ফেরেশতারা আরজ করে, তাহারা আরও বেশী এবাদতে মশগুল হইত এবং আরও বেশী আপনার প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনায় মগ্ন হইত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাহারা কি চায়? ফেরেশতারা আরজ করে, তাহারা জান্নাত চায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাহারা কি জান্নাত দেখিয়াছে? ফেরেশতারা আরজ করে, তাহারা তো জান্নাত দেখে নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাহারা যদি জান্নাত দেখিত তবে কি অবস্থা হইত? ফেরেশতারা আরজ করে, আরও বেশী শওক ও আকাঙ্খা সহকারে উহা পাইবার চেষ্টায় লাগিয়া যাইত। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাহারা কোন্ জিনিস হইতে পানাহ চাহিতেছিল? ফেরেশতারা আরজ করে, তাহারা জাহান্নাম হইতে পানাহ চাহিতেছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাহারা কি জাহান্নাম দেখিয়াছে? ফেরেশতারা আরজ করে, তাহারা জাহান্নাম দেখে নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যদি দেখিত তবে কি অবস্থা হইত? ফেরেশতারা আরজ করে, আরও বেশী উহা হইতে পলায়ন করিত এবং বাঁচার চেষ্টা করিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আচ্ছা, তোমরা সাক্ষী থাক আমি ঐ মজলিসের সকলকে মাফ করিয়া দিলাম। এক ফেরেশতা বলে, হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি ঐ মজলিসে ঘটনাক্রমে নিজের কোন প্রয়োজনে আসিয়াছিল ; সে উহাতে শরীক ছিল না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ইহা এমন মোবারক জামাত, যাহাদের সহিত উপবেশনকারীও বঞ্চিত হয় না। (কাজেই তাহাকেও মাফ করিয়া দিলাম।) (মিশকাত ঃ বুখারী, মুসলিম)

(৩) ‘বাহজাতুন-নুফূস’ কিতাবে আছে,

এক অত্যাচারী বাদশাহের জন্য জাহাজ ভর্তি করিয়া শরাব আনা হইতেছিল। এক বুযুর্গ ব্যক্তি সেই জাহাজের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি শরাবের মটকাগুলি ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। কিন্তু একটি মটকা না ভাঙ্গিয়া ছাড়িয়া দিলেন। তাহাকে বাধা দেওয়ার মত সাহস কাহারও হয় নাই। কিন্তু সকলেই অবাক হইল যে, এই লোক কি করিয়া এমন অত্যাচারী বাদশার মোকাবেলা করার সাহস করিল! বাদশাহকে জানানো হইল। বাদশাও অবাক হইল যে, একজন সাধারণ লোক এমন সাহস কিভাবে করিল ! আবার সবগুলি মটকা ভাঙ্গিয়া একটিকে ছাড়িয়া দিল কেন? বাদশাহ তাহাকে ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন তুমি ইহা করিলে? তিনি উত্তরে বলিলেন, আমার দিলে ইহার প্রবল ইচ্ছা সৃষ্টি হইয়াছে, তাই এইরূপ করিয়াছি। তোমার মনে যাহা চায় আমাকে শাস্তি দিতে পার। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিল, একটি মটকা কেন রাখিয়া দিলে? তিনি বলিলেন, প্রথমে আমি ইসলামী জোশের কারণে ভাঙ্গিয়াছি। কিন্তু শেষ মটকাটি ভাঙ্গিবার সময় আমার মনে এক ধরনের খুশী আসিল যে, আমি একটি নাজায়েয কাজকে খতম করিয়া দিয়াছি। তখন আমার মনে খটকা হইল যে, হয়ত আমার মনের খুশীর জন্য ইহা ভাঙ্গিতেছি। কাজেই একটিকে না ভাঙ্গিয়া ছাড়িয়া দিয়াছি। বাদশাহ বলিল, লোকটিকে ছাড়িয়া দাও, কেননা (ঈমানের কারণে) সে অপারগ ছিল।

(৪) ইমাম গাযযালী (রহঃ) ‘এহয়াউল উলূম’ কিতাবে লিখিয়াছেন

, বনী ইসরাঈল গোত্রে একজন আবেদ ছিল। সবসময় সে এবাদতে মশগুল থাকিত। একবার একদল লোক আসিয়া তাহাকে বলিল, এখানে কিছু লোক একটি গাছের পূজা করে। ইহা শুনিয়া সে অত্যন্ত রাগান্বিত হইল এবং কুড়াল কাঁধে লইয়া গাছটি কাটিবার জন্য রওয়ানা হইল। পথে শয়তান এক বৃদ্ধ লোকের বেশ ধরিয়া আবেদকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কোথায় যাইতেছ? সে বলিল, অমুক গাছটি কাটিতে যাইতেছি। শয়তান বলিল, গাছের সাহিত তোমার কি সম্পর্ক ; তুমি নিজের এবাদতে মশগুল থাক। একটি বেহুদা কাজের জন্য তুমি নিজের এবাদত ছাড়িয়া দিয়াছ কেন? আবেদ বলিল, ইহাও একটি এবাদত। শয়তান বলিল, আমি তোমাকে কাটিতে দিব না। এইবার দুইজনের মধ্যে মোকাবেলা হইল। আবেদ শয়তানের বুকের উপর চড়িয়া বসিল। শয়তান অপারগ হইয়া অনুনয়-বিনয় করিয়া বলিতে লাগিল, আচ্ছা, একটি কথা শুন। আবেদ তাহাকে ছাড়িয়া দিল। শয়তান বলিল, গাছ কাটা আল্লাহ তায়ালা তোমার উপর ফরজ করেন নাই এবং ইহাতে তোমার কোন ক্ষতিও হইতেছে না। আর তুমি নিজেও উহার এবাদত করিতেছ না। আল্লাহ তায়ালার বহু নবী আছেন। ইচ্ছা করিলে কোন নবীর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা গাছটি কাটাইয়া দিতেন। আবেদ বলিল, আমি ইহা অবশ্যই কাটিব। এই কথার উপর আবার দুইজনের মধ্যে মোকাবেলা হইল। আবেদ শয়তানের বুকের উপর চড়িয়া বসিল। শয়তান বলিল, আমি একটি মীমাংসার কথা বলিব কি? যাহা তোমার জন্য লাভজনক হইবে। আবেদ বলিল, হাঁ বল। শয়তান বলিল, তুমি একজন গরীব লোক, দুনিয়ার উপর বোঝা হইয়া আছ। তুমি গাছ কাটা হইতে বিরত হইলে আমি তোমাকে দৈনিক তিনটি করিয়া স্বর্ণমুদ্রা দিব, যাহা প্রতিদিন তুমি শিয়রের কাছে পাইবে। ইহাতে তোমার প্রয়োজনও মিটিয়া যাইবে এবং আত্মীয়-স্বজন ও গরীবদেরও সাহায্য করিতে পারিবে। আরও অন্যান্য সওয়াবের কাজও করিতে পারিবে। আর গাছ কাটিলে মাত্র একটি সওয়াব পাইবে। আবার তাহাও বেকার। কেননা, ঐসব লোক এই গাছের পরিবর্তে আরেকটি গাছ লাগাইয়া লইবে

ঐসব লোক এই গাছের পরিবর্তে আরেকটি গাছ লাগাইয়া লইবে শয়তানের কথা আবেদের মনে লাগিল এবং মানিয়া লইল। দুইদিন পর্যন্ত সে স্বর্ণমুদ্রা ঠিকমতই পাইল কিন্তু তৃতীয় দিন আর পাইল না। আবেদ রাগান্বিত হইয়া কুড়াল হাতে লইয়া আবার গাছ কাটিতে চলিল। পথে সেই বৃদ্ধের সহিত দেখা হইল, জিজ্ঞাসা করিল, কোথায় যাইতেছ? আবেদ বলিল, ঐ গাছটি কাটিতে যাইতেছি। বৃদ্ধ বলিল, তুমি উহা কাটিতে পারিবে না। এই বলিয়া দুইজনের মধ্যে মোকাবেলা হইল। এইবার বৃদ্ধ আবেদের উপর জয়ী হইয়া গেল এবং আবেদের বুকের উপর চড়িয়া বসিল। আবেদ অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, এইবার তুমি কিভাবে জয়ী হইলে? বৃদ্ধ বলিল, আগে তোমার রাগ খালেছ আল্লাহর জন্য ছিল ; কাজেই আল্লাহ তায়ালা আমাকে পরাস্ত করিয়াছিলেন। আর এইবার তোমার মনে স্বর্ণমুদ্রার খেয়াল ছিল বলিয়া তুমি পরাস্ত হইয়াছ। আসল কথা হইল, যে কাজ খালেছ আল্লাহর জন্য হয় উহা অত্যন্ত শক্তিশালী।

একরামুল মুসলিম

4th Point

ইকরামুল মুসলিমীনের উদ্দেশ্যে :

নবী ও সাহাবাওয়ালা হুসনে আখলাক হাসিল করা। মুসলমানের মর্যাদা বুঝে কদর করা, তথা মানুষের হক আদায় করা। অর্থাৎ পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশির হক আদায় করা। কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত না হওয়া। উপরন্তু গীবত, কুধারণা এবং কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকা।

একরামুল মুসলিমীনের হাক্বীক্বত :

হার মাখলূকের উপর এহসান করা, মুসলমান ভায়ের কী¡মত বুঝে ক্বদর করা। এই একরামুল মুসলিমীনের দ্বারা আমলের হেফাযত হয়।

একরামুল মুসলিমীনের লাভঃ

১. হুযুর (স.) এরশাদ করেন, অর্থঃ-হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (র.) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (স.) এরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি যদি তার ভায়ের উপকার করার জন্য পায়ে হেঁটে যায় তবে তার এ কাজ দশ বছরের এতেকাফের চেয়েও উত্তম বিবেচিত হবে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘য়ালাকে রাযী করার জন্য একদিন এতেকাফ করে আল্লাহ তা‘য়ালা তার নিকট হতে দোযখ তিন খন্দক পরিমান দূরে সরিয়ে দেন। আর প্রতি খন্দক আসমান ও জমিনের দূরত্বের চেয়েও অধিক প্রসারিত। (তাবারানী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)

২. হুযুর (স.) আরো ফরমান, অর্থঃ-হযরত সালেম (রা.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (স.)এরশাদ ফরমান যদি কোন ব্যক্তি তার মুসলমান ভায়ের প্রয়োজন পূরণ করে আল্লাহ তা‘য়ালা তার প্রয়োজন পূরণ করেন।

৩. আরো এরশাদ ফরমান, অর্থঃ-হযরত সালেহ (রা.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন রসূলুল্লাহ (স.) এরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি যদি দুনিয়াতে বিপদগ্রস্ত মানুষের বিপদ দূর করে তবে আল্লাহ তা‘য়ালা তার আখেরাতের বিপদ দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন মানুষের দোষ গোপন করবে আল্লাহ তা‘য়ালা আখেরাতে তার দোষ গোপন করবেন। আর মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত তার মুসলমান ভায়ের সাহায্য করবে, আল্লাহ তা‘য়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে সাহায্য করতে থাকবেন। (মুসনাদে আহমাদ)

৪.এক হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের একটি হাজত পুরা করে, আল্লাহ তা‘য়ালা তার তেহাত্তরটি হাজত পুরা করবেন, তন্মধ্যে সবচেয়ে হালকা বস্তুু হলো তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। (ফাজায়েলে ছাদাকাত-১০৭ )

৫.অন্য হাদিসে আছে, আল্লাহ তা‘য়ালা তার সত্তরটি হাজত পূর্ণ করবেন উহার মধ্যে সর্ব নিম্ন হলো গুনাহ মাফ করা। (ফাজায়েলে ছাদাকাত-১১৫)

একরাম হাসিল করার তরীকাঃ-

এই একরাম আমরা কয়েক ভাবে করবো : ১.বড়দের সম্মান করবো। ২. ছোটদের স্নেহ করবো। ৩. আলেমদের তা‘যীম বা শ্রদ্ধা করবো। কেননা রসূলুল্লাহ (স.) এরশাদ করেন, অর্থঃ-হযরত ওয়াবাদা ইবনে সামেত (রা.) হতে বর্ণিত রসূলুল্লাহ (স.) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না আর আলেমদের হক বুঝে না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত না। (মুসনাদে আহমাদ,তাবারানী,মাজমাউয যাওয়ায়েদ) আর সবচেয়ে বড় একরাম হলো, আল্লাহ ভুলা মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে দেওয়া। এই একরামের লাভ জেনে আমরা বেশী-বেশী একরাম করবো এবং অপর ভাইকে দাওয়াত দিবো এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করবো যে, হেআল্লাহ! এই একরাম বেশী বেশী করার তাওফিক আমাকে দান কর এবং সমস্ত উম্মতী মুহাম্মাদীকে দান কর।

(১) অর্থ, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ-ত্রুটি ঢাকিয়া রাখে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাহার দোষ-ত্রুটি ঢাকিয়া রাখিবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ- ত্রুটি প্রকাশ করিয়া দেয়, আল্লাহ তায়ালা তাহার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করিয়া দেন, এমনকি ঘরে বসিয়া থাকা অবস্থায় তাহাকে অপদস্থ করিয়া দেন। (ইবনে মাজাহ)

(2) সাহাবায়ে কেরাম (রাযিঃ)এর অপরের খাতিরে পিপাসায় মৃত্যুবরণ :

হযরত আবু জাহম ইবনে হুযাইফা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, আমি ইয়ারমুকের যুদ্ধে আপন চাচাত ভাইয়ের তালাশে বাহির হইলাম। কেননা, তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। আর সঙ্গে এক মশক পানি লইয়া গেলাম। যাহাতে পিপাসার্ত থাকিলে পান করাইতে পারি। ঘটনাক্রমে তাহাকে একস্থানে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়িয়া থাকিতে দেখিলাম, তাহার মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হইয়া গিয়াছিল। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এক ঢোক পানি দিব কি? সে ইশারায় হাঁ বলিল। এমন সময় তাঁহার নিকটবর্তী মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর পড়িয়া থাকা আর এক ব্যক্তি আহ্ করিয়া উঠিল। আমার চাচাত ভাই তাহার আওয়াজ শুনিয়া আমাকে তাহার নিকট যাওয়ার ইশারা করিল। আমি তাহার নিকট পানি লইয়া গেলাম। তিনি ছিলেন হিশাম ইবনে আবিল আস। তাহার নিকট পৌছিবা মাত্রই মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর পড়িয়া থাকা তৃতীয় আরেক ব্যক্তি আহ্! করিয়া উঠিল। হেশাম আমাকে তাহার নিকট যাওয়ার জন্য ইশারা করিলেন। তাহার নিকট। পৌঁছিয়া দেখি, তিনি আর ইহজগতে নাই। অতঃপর হিশামের নিকট ফিরিয়া আসিয়া দেখিলাম ; তিনিও ইহজগত ত্যাগ করিয়াছেন। অতঃপর আমার চাচাত ভাইয়ের নিকট আসিলাম ; ইত্যবসরে সেও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়াছে। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। (দিরায়াহ্)

ফায়দা :

এই ধরনের বহু ঘটনা হাদীসের কিতাবসমূহে বর্ণিত রহিয়াছে। এই আত্মত্যাগের কি কোন সীমা আছে যে, আপন ভাই মরণাপন্ন আর পিপাসায় কাতর এমতাবস্থায় অন্য কাহারও প্রতি লক্ষ্য করাই তো কঠিন ব্যাপার ; তদুপরি তাহাকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় রাখিয়া অন্যকে পানি পান করাইবার জন্য চলিয়া যাওয়া। আল্লাহ এই সকল প্রাণ বিসর্জনকারীদের রূহকে অশেষ দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা সম্মানিত করুন যাহারা মৃত্যুকালে যখন জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পাইয়া যায় তখনও অন্যের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করিতে যাইয়া জীবন দান করেন।

(৩) এক হাদীসে আছে, গরীবদের সহিত বেশী সম্পর্ক রাখ এবং তাহাদের উপর অধিক পরিমাণে অনুগ্রহ ও এহসান কর। কেননা, তাহাদের নিকট বড় সম্পদ রহিয়াছে। কেহ আরজ করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ সম্পদ কি? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তাহাদেরকে কিয়ামতের দিন বলা হইবে, যে ব্যক্তি তোমাদেরকে একটি রুটির টুকরা খাওয়াইয়াছে অথবা পানি পান করাইয়াছে অথবা কাপড় দিয়াছে, তাহাকে হাত ধরিয়া জান্নাতে পৌঁছাইয়া দাও।

(৪) এক হাদীসে আছে, আল্লাহ তায়ালা গরীবদের নিকট কিয়ামতের দিন। এমনভাবে ওজর পেশ করিবেন, যেমন মানুষ মানুষের নিকট ওজর পেশ করিয়া থাকে আর বলিবেন, আমার ইজ্জত ও বড়ত্বের কসম, আমি দুনিয়াকে তোমার নিকট হইতে এইজন্য দূরে সরাই নাই যে, তুমি আমার নিকট অপদস্থ ছিলে। বরং এইজন্য সরাইয়াছি যে, আজ তোমার জন্য বড় সম্মান রহিয়াছে। হে আমার বান্দা! তুমি ঐ সমস্ত জাহান্নামী লোকদের কাতারের মধ্যে চলিয়া যাও ; যে ব্যক্তি তোমাকে আমার সন্তুষ্টির জন্য খানা খাওয়াইয়াছে অথবা কাপড় দিয়াছে, সে তোমার। সেই গরীব এমন অবস্থায় তাহাদের মধ্যে প্রবেশ করিবে যে, তাহারা মুখ পর্যন্ত ঘামের মধ্যে ডুবন্ত থাকিবে। সে তাহাদিগকে চিনিয়া জান্নাতে দাখেল করিবে। (রওজ)

(৫) এক হাদীসে আসিয়াছে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামী লোকদেরকে এক কাতারে দাঁড় করানো হইবে। তাহাদের নিকট দিয়া একজন (জান্নাতী কামেল) মুসলমান অতিক্রম করিবে। ঐ কাতার হইতে এক ব্যক্তি তাহাকে বলিবে, তুমি আমার জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট সুপারিশ করিয়া দাও। সে জিজ্ঞাসা করিবে, তুমি কে? জাহান্নামী ব্যক্তি বলিবে, তুমি আমাকে চিন না? তুমি দুনিয়াতে একবার আমার নিকট পানি চাহিয়াছিলে, তখন আমি তোমাকে পানি পান করাইয়াছিলাম। ইহা শুনিয়া সে সুপারিশ করিবে (এবং তাহার সুপারিশ কবুল হইয়া যাইবে)। এমনিভাবে অপর ব্যক্তি বলিবে, তুমি আমার নিকট দুনিয়াতে অমুক জিনিস চাহিয়াছিলে। আমি উহা তোমাকে দিয়াছিলাম। (কানজ)

(৬) আর এক হাদীসে আছে, জাহান্নামীদের কাতারের নিকট দিয়া একজন জান্নাতী লোক অতিক্রম করিবে। তখন তাহাদের মধ্য হইতে এক ব্যক্তি তাহাকে ডাকিয়া বলিবে, তুমি আমাকে চেন না? আমি তো ঐ ব্যক্তি যে, অমুক দিন তোমাকে পানি পান করাইয়াছিলাম, অমুক সময় তোমাকে ওযুর পানি দিয়াছিলাম। (মিশকাত) অন্য এক হাদীসে আছে, কেয়ামতের দিন যখন জান্নাতী ও জাহান্নামী লোকদের কাতার তৈয়ার হইবে, তখন জাহান্নামীদের কাতার হইতে এক ব্যক্তির দৃষ্টি জান্নাতীদের কাতারের কোন এক ব্যক্তির উপর পড়িবে, তখন সে তাহাকে স্মরণ করাইবে যে, আমি দুনিয়াতে তোমার উপর অমুক এহসান করিয়াছিলাম। ইহা শুনিয়া ঐ জান্নাতী ব্যক্তি তাহার হাত ধরিয়া আল্লাহ তায়ালার নিকট আরজ করিবে, হে আল্লাহ! আমার প্রতি এই ব্যক্তির অমুক এহসান রহিয়াছে। আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে এরশাদ হইবে, আল্লাহ তায়ালার রহমতের উসিলায় তাহাকে জান্নাতে দাখেল করিয়া দেওয়া হোক।

(৭) হাফেজ (রহঃ) বলেন, এই সম্পর্কে হযরত সালমান (রাযিঃ)- এর আপন মেহমানের সহিত একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। (ফাত্হ) সেই ঘটনার প্রতি হাফেজ (রহঃ) ইঙ্গিত করিয়াছেন। ইমাম গাযযালী (রহঃ) উহা বর্ণনা করিয়াছেন ঃ হযরত আবু ওয়ায়েল (রাযিঃ) বলেন, আমি এবং আমার একজন সাথী হযরত সালমান (রাযিঃ) এর সহিত সাক্ষাত করিতে গেলাম। তিনি আমাদের সম্মুখে যবের রুটি ও আধাপিষা লবণ রাখিলেন। আমার সাথী বলিতে লাগিল, ইহার সঙ্গে যদি সা'তার (একপ্রকার পুদিনা) হইত, তবে বড় মজাদার হইত। হযরত সালমান (রাযিঃ) উঠিয়া বাহিরে গেলেন। এবং ওজুর লোটা বন্ধক রাখিয়া সা’তার খরিদ করিয়া আনিলেন। যখন আমাদের খাওয়া-দাওয়া শেষ হইল তখন আমার সাথী বলিল : (সমস্ত প্রশংসা ঐ আল্লাহ তায়ালার জন্য যিনি আমাদেরকে উপস্থিত খানার উপর তুষ্ট থাকিবার তওফীক দিয়াছেন) হযরত সালমান বলিলেন, উপস্থিত খানার উপর যদি তোমরা তুষ্টি হইতে তবে আমার লোটা বন্ধক রাখিতে হইত না। (এহইয়া) মোটকথা, মেজবানকে এমন কোন ফরমায়েশ করা যাহাতে তাহার কষ্ট হয়, ইহাও মেজবানকে কষ্টে ফেলার অন্তর্ভুক্ত। অন্যের ঘরে যাইয়া এটা ওটা ফরমায়েশ করা কিংবা ইহা চাই উহা চাই এইরূপ বলা কখনও সমীচীন নয়। মেজবান যাহা হাজির করিতেছে, উহা সবর ও শোকরের সহিত আনন্দচিত্তে আহার করা চাই।

(৮) এক ব্যক্তি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হইয়া ক্ষুধা ও অভাবের অভিযোগ করিল। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবিদের ঘরে লোক পাঠাইলেন। কিন্তু কোথাও খাওয়ার কিছু পাওয়া গেল না। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিরে পুরুষদেরকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, এমন কেহ আছে কি? যে এই ব্যক্তিকে মেহমান হিসাবে লইয়া যাইবে? কোন কোন বর্ণনা মতে আবু তালহা (রাযিঃ) নামে একজন আনসারী সাহাবী তাহাকে নিজের ঘরে লইয়া গেলেন এবং স্ত্রীকে বলিলেন, এই ব্যক্তি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেহমান। তাহার খুব সমাদর কর এবং ঘরের কোন কিছু তাহাকে না দিয়া রাখিয়া দিও না। স্ত্রী বলিলেন, ঘরে তো শুধু বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবার রাখা আছে, আর কিছুই নাই। হযরত আবু তালহা (রাযিঃ) বলিলেন, বাচ্চাদেরকে ভুলাইয়া ঘুম পাড়াইয়া দাও। অতঃপর আমরা যখন খানা লইয়া মেহমানের সহিত বসিব, তখন তুমি বাতি ঠিক করিবার জন্য উঠিয়া উহাকে নিভাইয়া দিও। যাহাতে আমরা খাওয়া। হইতে বিরত থাকি আর মেহমান খাইয়া লয়। সুতরাং তাহার স্ত্রী এইরূপই করিলেন। সকাল বেলা যখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হইলেন, তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আচরণ বড় পছন্দ করিয়াছেন।

(৯) ইমাম গাযযালী (রহঃ) লিখিয়াছেন, একজন অগ্নিপূজক হযরত ইবরাহীম (আঃ)এর খেদমতে হাজির হইয়া তাহার মেহমান হইতে চাহিল। তিনি বলিলেন, তুমি যদি মুসলমান হইয়া যাও, তবে আমি তোমাকে মেহমান হিসাবে গ্রহণ করিব। ইহা শুনিয়া অগ্নিপূজক চলিয়া গেল। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে ওহি আসিল, হে ইবরাহীম! তুমি এক ওয়াক্তের খানা ধর্ম পরিবর্তন না করিবার কারণে খাওয়াইতে পারিলে না। আর আমি সত্তর বছর যাবত তাহার কুফুরা সত্ত্বেও তাহাকে খানা খাওয়াইতেছি। এক বেলা খানা খাওয়াইয়া দিলে কি ক্ষতি ছিল? হযরত ইবরাহীম (আঃ) তৎক্ষণাৎ তাহার খোঁজে দৌড়াইতে লাগিলেন এবং তাহাকে পাইয়া গেলেন। তাহাকে সঙ্গে করিয়া ফিরাইয়া আনিলেন এবং খানা খাওয়াইলেন। অগ্নিপূজক লোকটি জিজ্ঞাসা করিল, আপনি কেন নিজে আমার তালাশে বাহির হইলেন? হযরত ইবরাহীম (আঃ) ওহির ঘটনা শুনাইলেন। শুনিয়া অগ্নিপূজক বলিতে লাগিল, আমার সহিত তাঁহার এই আচরণ! তাহা হইলে আপনি আমাকে ইসলাম শিক্ষা দিন। এই বলিয়া সে তখনই মুসলমান হইয়া গেল। (এহইয়া)

সহিহ নিয়াত

5th Point

তাসহীহে নিয়তের উদ্দেশ্য :

সহী নিয়ত অর্থ হলো নিয়তকে খালেস করা তথা সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য করা। আল্লাহর দরবারে আমল কবুল হবে নিয়তের বিশুদ্ধতার দ্বারা। আমরা যে কোন নেক আমল করবো তা একমাত্র আল্লাহ তা‘য়ালাকে রাযী-খুশি করার জন্যই করবো। মানুষকে দেখানো বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে না করা। এক কথায়, আমাদের আত্মায় যত রোগ আছে, যেমন: রিয়া, অহংকার, লোভ ইত্যাদি থেকে দিলকে সাফ করা এবং উত্তম গুণাবলী তথা সবর, শোকর, তাকওয়া ইত্যাদি দ্বারা নিজের দিলকে সজ্জিত করা।

তাসহীহে নিয়তের গুরুত্ব :

আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, অর্থঃ- তাদেরকে একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকেই ইবাদত করার জন্য আদেশ করা হয়েছে। সূরা বায়্যিনা, সূরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে বান্দার উৎসর্গিত মনোভাব কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। ওই আয়াতে বলা হয়েছে, 'আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর জন্য যিনি সমগ্র বিশ্বজাহানের মালিক।'

তাসহীহে নিয়তের লাভঃ-

১. হুযুর (স.) এরশাদ করেন, অর্থঃ-তোমরা দ্বীনকে খাঁটি কর, অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ঠ হবে।

২.হুজুরে পাক (স.) এরশাদ করেন,যে ব্যক্তি হালাল পবিত্র মাল হতে একটি খুরমা-খেজুরও (আল্লাহর জন্য) দান করে, কেননা হক তায়ালা শুধুমাত্র পবিত্র মালই কবুল করেন, তবে তিঁনি সেইরূপ ছদকাকে প্রতিপালন করে বাড়াতে থাকেন, যেমন নাকি তোমরা গরুর বাচ্চাকে প্রতিপালন করে থাক এমন কি সেই ছদকা বর্ধিত হতে হতে পাহাড় সমতুল্য হয়ে যায়।

৩. অন্য হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি একটি খেজুর আল্লাহর রাস্তায় দান করল আল্লাহ পাক উহার ছওয়াব এত বেশী বাড়িয়ে দেন যে উহা উহুদ পাহাড় সমতুল্য হয়ে যায়। (ফাযায়েলে সাদাকাত-২৩)

তাসহীহে নিয়ত হাসিল করার তরীকাঃ

এই তাসহীহে নিয়তের লাভ জেনে আমরা বেশী বেশী নিয়তকে সহীহ করবো এবং অপর ভাইকে দাওয়াত দিবো এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করবো যে, হে আল্লাহ! তুমি আমাদের নিয়তকে সহীহ করে দাও এবং সমস্ত উম্মতে মুহাম্মাদীর নিয়তকে সহীহ করে দাও।

(১) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, যে| ব্যক্তি লোক দেখানোর নিয়তে নামাজ পড়িল, সে শিরক করিল। যে ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে রোযা রাখিল, সে শিরক করিল। যে ব্যাক্ত লোক দেখানোর নিয়তে সদকা করল, সে শিরক করিল। (মিশকাত : আহমদ)

(2) হযরত আবু হুরইরহ রদিয়াল্লহু আ’নহু (أبىْ هريْرة رضى الله عنْه) বর্ণনা করেন যে, রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, আল্লহ তায়া’লা তোমাদের বাহ্যিক আকার আকৃতি এবং তোমাদের ধন-সম্পদ দেখেন না; বরং তোমাদের দিল ও তোমাদের আমাল দেখেন। (মুসলিম)

(3) এক হাদীসে আছে, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাহাদের ফয়সালা হইবে, তাহাদের মধ্যে একজন শহীদ ব্যক্তি হইবে, তাহাকে ডাকিয়া দুনিয়াতে তাহার প্রতি আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতসমূহ স্মরণ করানো হইবে। অতঃপর তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, আল্লাহ তায়ালার এই সকল নেয়ামতের মধ্যে থাকিয়া তুমি কি নেক আমল করিয়াছ? সে আরজ করিবে, আমি তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য জেহাদ করিয়াছি, এমনকি শহীদ হইয়া গিয়াছি (এবং তোমার উপর কুরবান হইয়া গিয়াছি)। এরশাদ হইবে, ইহা মিথ্যা কথা। তুমি জিহাদ এইজন্য করিয়াছিলে যে, লোকেরা বড় বাহাদুর বলিবে। তাহারা তোমাকে অনেক বড় বাহাদুর বলিয়াছে (আমলের যে উদ্দেশ্য ছিল উহা পূর্ণ হইয়া গিয়াছে)। অতঃপর তাহাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার হুকুম করা হইবে। হুকুম অনুযায়ী তাহাকে উপুড় করিয়া টানিয়া জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে।

দ্বিতীয় ব্যক্তি একজন আলেম হইবে, তাহাকে ডাকিয়া আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতসমূহ স্মরণ করাইয়া জিজ্ঞাসা করা হইবে যে, আল্লাহ তায়ালার এই সকল নেয়ামতের মধ্যে থাকিয়া তুমি কি আমল করিয়াছ? সে বলিবে, আমি এলেম শিখিয়াছি, লোকদেরকে শিখাইয়াছি, তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য সর্বদা কুরআন পাক পড়িয়াছি। এরশাদ হইবে, এইসব মিথ্যা কথা। এ সমস্ত কিছু এইজন্য করিয়াছ যে, লোকেরা বলিবে, অমুক ব্যক্তি বড় আলেম, বড় কারী। সুতরাং লোকেরা বলিয়া দিয়াছে (এই মেহনতের যে উদ্দেশ্য ছিল, উহা হাসিল হইয়া গিয়াছে)। অতঃপর তাহাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করার হুকুম করা হইবে। হুকুম অনুযায়ী তাহাকে উপুড় করিয়া টানিয়া জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে।

তৃতীয় ব্যক্তি একজন দানশীল হইবে, যাহাকে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে বড় সচ্ছলতা দান করিয়া রাখিয়াছিলেন। সর্বপ্রকার সম্পদ তাহাকে দান করিয়াছিলেন। তাহাকে ডাকা হইবে এবং যে সমস্ত নেয়ামত আল্লাহ তায়ালা তাহাকে দুনিয়াতে দিয়াছিলেন, উহা স্মরণ করাইয়া জিজ্ঞাসা করা হইবে, এই সমস্ত নেয়ামতের মধ্যে থাকিয়া তুমি কি করিয়াছ? সে আরজ করিবে, আপনার পছন্দনীয় সব জায়গায় শুধু আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য খরচ করিয়াছি। এরশাদ হইবে, ইহা মিথ্যা কথা। তুমি শুধু এইজন্য খরচ করিয়াছ যে, লোকেরা বলিবে, বড় দানশীল ব্যক্তি। অতএব বলা হইয়াছে। অতঃপর তাহাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করার হুকুম হইবে। হুকুম অনুযায়ী উপুড় করিয়া টানিয়া তাহাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে। ( মিশকাত : মুসলিম)

(৪) এক হাদীসে আসিয়াছে, মানুষ যখন গোপনে কোন আমল করে, তখন ঐ আমলকে গোপন আমল হিসাবে লিখিয়া লওয়া হয়। অতঃপর সে যখন কাহারও নিকট ঐ আমলটি প্রকাশ করিয়া দেয়, তখন উহাকে গোপনের স্থলে প্রকাশ্য আমল হিসাবে বদলাইয়া দেওয়া হয়। তারপরও যদি সে মানুষের নিকট বলিয়া বেড়ায়, তবে উহাকে প্রকাশ্য আমল হইতে লোক দেখানো আমলে পরিবর্তন করিয়া দেওয়া হয়। (এহইয়া)

(৫) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন, সাত প্রকার মানুষ এমন আছে, যাহাদেরকে আল্লাহ তায়ালা আপন রহমতের ছায়াতলে এমন দিনে স্থান দিবেন, যেদিন তাঁহার ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া হইবে না। এক. ন্যায়বিচারক বাদশাহ। দুই ঐ যুবক, যে যৌবনে আল্লাহর এবাদত করে। তিন, ঐ ব্যক্তি যাহার দিল মসজিদেই আটকিয়া থাকে। চার. ঐ দুই ব্যক্তি যাহারা একে অপরকে আল্লাহর জন্য মহব্বত করিয়াছে, আল্লাহর জন্যই তাহারা একত্রিত হয় এবং আল্লাহর জন্যই তাহারা পৃথক হয়। পাঁচ. ঐ ব্যক্তি যাহাকে কোন উচ্চবংশীয় সুন্দরী মহিলা নিজের দিকে আকৃষ্ট করে আর সে বলিয়া দেয় যে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। ছয়. ঐ ব্যক্তি, যে এমন গোপনে সদকা করে যে, তাহার অন্য হাতও টের পায় না। সাত. ঐ ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহর যিকির করে এবং তাহার দুই চোখ দিয়া পানি গড়াইয়া পড়ে। (তারগীব, মিশকাত ঃ বুখারী, মুসলিম)

(৬) হযরত ইবনে আ’ব্বাস রদিয়াল্লহু আ’নহুমা (ابْن عبّاس رضى الله عنْهما) হইতে বর্ণিত আছে যে, রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, আল্লহ তায়া’লা নেকী ও বদী সম্পর্কে একটি ফযসালা ফেরেশতাদিগকে লিখাইয়া দিয়াছেন । অতঃপর ইহার ব্যাখ্যা এইরূপ বয়ান করিয়াছেন যে, যে ব্যক্তি নেক কাজের ইচ্ছা করিল, অতঃপর (কোন কারণে) করিতে পারিল না, তাহার জন্য আল্লহ তায়া’লা একটি পূর্ণ নেকী লিখিয়া দেন। আর যদি ইচ্ছা করার পর ঐ নেক কাজটি করিয়া লয় তবে তাহার জন্য দশ হইতে সাতশত পর্যন্ত বরং উহা হইতেও কয়েক গুণ পর্যন্ত লিখিয়া দেন। যে ব্যক্তি কোন গুনাহের ইচ্ছা করে অতঃপর উহা হইতে বিরত হইয়া যায় আল্লহ তায়া’লা তাহার জন্য একটি পূর্ণ নেকী লিখিয়া দেন। (কেননা তাহার গুনাহ হইতে বিরত হওয়া আল্লহ তায়া’লার ভয়ের কারণে হইয়াছে।) আর যদি ইচ্ছা করিবার পর সেই গুনাহ করিয়া ফেলে, তবে আল্লহ তায়া’লা তাহার জন্য একটি গুনাহ(ই) লিখেন। (বুখারী)

দাওয়াত ও তাবলীগ

6th Point

পূর্বে উল্লেখিত গুনাবলী আমার মধ্যে ঐ সময় আসবে যখন আমি আল্লাহর দেওয়া জান আল্লাহর দেওয়া মাল আল্লাহর দেওয়া সময় নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে জান,মাল ও সময়ের সঠিক ব্যবহার শিক্ষা করবো এবং ঐ গুনাবলীর উপর মেহনত করবো এবং হুজুর (সাঃ) এর দ্বীনকে কিভাবে সারা বিশ্বে প্রচার করা যায় তার ফিকির করা ।

আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার লাভঃ

১. হুযুর (স.) এরশাদ ফরমান, অর্থঃ-হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (স.) এরশাদ ফরমান, আল্লাহর রাস্তায় এক সকাল অথবা এক বিকাল দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তা থেকে উত্তম। (বুখারী)

ফায়দাঃ- অর্থ্যাৎ দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তা যদি সম্পূর্নই আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয় তবুও আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় এক সকাল অথবা এক বিকাল অবস্থান করাই অধিক উত্তম। (মেরকাত)

২. এক হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (স.) এরশাদ ফরমান, আল্লাহর রাস্তার ধুলা-বালি এবং দোযখের ধোঁয়া কোন বান্দার পেটে কখনো একত্র হবে না। এবং কৃপণতা ও ঈমান কোন বান্দার অন্তরে একত্র হবে না। (নাসাঈ)

৩. এক হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলল্লাহ (স.) এরশাদ ফরমান, আল্লাহর রাস্তার ধুলা-বালি এবং দোযখের ধোঁয়া কোন মুসলমান বান্দার নাকের ছিদ্রে একত্র হবে না। (নাসাঈ)

৪. হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত আবু আব্স (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (স.) এরশাদ ফরমান, আল্লাহর রাস্তায় যে ব্যক্তির উভয় পা ধুলিযুক্ত হবে তার উপর আল্লাহ তায়ালা দোযখের আগুন হারাম করে দিবেন। (মুসনাদে আহমাদ)

৫. অন্য হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রসূল (স.) কে একথা বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর রাস্তার এক দিন আল্লাহ রাস্তা ব্যতিত হাজার দিনের চেয়েও উত্তম। (নাসাঈ)

৬. এক হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন, রসূল (স.) এরশাদ ফরমান, কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহর রাস্তায় এক বিকালও বাহির হয়, তার দেহে বা শরীরে যে পরিমাণ ধুলা-বালি লাগবে, কেয়ামতের দিন সে সেই পরিমাণ মেশক-খুশবু লাভ করবে। (ইবনে মাজা)

৭. এক হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বর্ণনা করেন, রসূল (স.) এরশাদ ফরফান, আল্লাহর রাস্তায় গিয়ে যার মাথা ব্যথা হয় এবং এই মাথা ব্যথার কারণে সে ছওয়াবের আশা রাখে তার পূর্ববর্তী সকল পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (তাবারানী)

৮.হাদীস শরীফে আছে, অর্থঃ-হুযুর (স.) এরশাদ ফরমান, তোমাদের কাহারো আল্লাহর রাস্তায় কিছু সময় দাড়িয়ে থাকা নিজের ঘরে ৭০ বছর নামায আদায় করার চেয়েও উত্তম।(তিরমিযী)

৯.এক হাদীসে আছে, অর্থঃ-হযরত সোহাইল (র.) বর্ণনা করেন, আমি রাসূল (স.) কে একথা বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের কাহারো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা তার পরিবার পরিজনের মধ্যে অবস্থান করে জীবনভর নেক আমল করার চেয়েও উত্তম। (মোস্তাদরাকে হাকেম)

১০.এক হাদীসে আছে, অর্থঃ-হযরত আবু উমামা হতে বর্ণিত, রাসূল (স.) এরশাদ ফরমান, তিন ব্যক্তি আল্লাহ তা‘য়ালার দায়িত্বে¡ রয়েছে। যদি তারা বেচে থাকে তবে রিজিক দেওয়া হবে এবং তাদের কাজে সাহায্য করা হবে। আর যদি তারা মারা যায় তবে আল্লাহ তা‘য়ালা তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, ১. যে ব্যক্তি নিজের ঘরে প্রবেশ করে গৃহবাসীকে সালাম দেয়। ২. যে ব্যক্তি মসজিদে গমন করে। ৩. যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় বের হয়। (ইবনে হিব্বান)

১১.হাদীস শরীফে আছে, অর্থঃ- হযরত আবু হুরায়রা (র.) বর্ণনা করেন যে, আমি রসূল (স.) কে একথা বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর রাস্তায় কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকা ক্বদরের রাত্রে হাজারে আসওয়াদের সামনে এবাদত করার চেয়েও উত্তম কাজ। (ইবনে হাব্বান)

১২. এক হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত খোরাইম ইবনে ফাতেক (রা.) বর্ণনা করেন, রসূল (স.) এরশাদ ফরমান, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় কোন কিছু খরচ করে তা সেই ব্যক্তির আমলনামায় সাতশতগুণ লেখা হয়। (তিরমিযী)

১৩.অন্য হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত মোয়াজ (র.) বর্ণনা করেন, রসূল (স.) এরশাদ ফরমান, আল্লাহর রাস্তায় অর্থ-সম্পদ খরচ করার চেয়ে নামায, রোযা এবং জিকিরের ছওয়াব সাতশতগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। (আবূ দাউদ)

১৪. হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, অর্থঃ- হযরত মোয়াজ (রা.) বর্ণনা করেন, রসূল (স.) এরশাদ ফরমান, আল্লাহর রাস্তায় জিকিরের ছওয়াব আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ খরচ করার চেয়ে সাতশতগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এক বর্ণনায় উল্লেখ আছে, সাত লক্ষগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। (মোসনাদে আহমদ)

১৫.এক হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন, রসূল (স.) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একটি রোযা রাখবে এই এক দিনের রোযার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা সেই ব্যক্তি এবং দোযখের মধ্যে সত্তর বছরের ব্যবধান সৃষ্টি করে দিবেন। (নাসাঈ)

১৬.অন্য হাদীসে আছে, অর্থঃ- হযরত আমর ইবনে আবাসা (রা.) বর্ণনা করেন, রসূল (স.) এরশাদ করেন, আল্লাহর রাস্তায় যে ব্যক্তি এক দিন রোযা রাখবে তার এই রোযা রাখার কারণে তার নিকট হতে দোযখের আগুন একশত বছরের দূরত্বে চলে যাবে। (তাবারানী)

তাশকীলঃ-

ছয় নাম্বার দিয়ে বয়ান করার পর তাশকীলের সময় এই কথা বলা যে, মুরুব্বীরা বলেন এই কাজ শিখতে হলে জীবনে একাধারে তিন চিল্লা দিয়ে শিক্ষা করা এবং মৃত পর্যন্ত এই করতে থাকা, ইনশাআল্লাহ আমার তো তিন চিল্লা দেওয়ার নিয়ত আছে, এখন আপনাদের কার কি নিয়ত বলি, বলি ইনশাআল্লাহ বলি, ভাই দাঁড়িয়ে যায়, মাশাআল্লাহ।

তাবলীগ সম্পর্কে কুরআনের আয়াত সমূহ :

(১) ঐ ব্যক্তির কথা হইতে উত্তম কথা আর কাহার হইতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে এবং নিজে নেক আমল করে ও বলে যে, নিশ্চয় আমি মুসলমানদের মধ্য হইতে একজন। (সূরা হা-মিম সিজদাহ, আয়াতঃ ৩৩) (বয়ানুল কুরআন)

(২) হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ! আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে নামাযের হুকুম করিতে থাকুন এবং নিজেও উহার পাবন্দি রুন। আমি আপনার নিকট রিযিক চাহি না বরং রিযিক আপনাকে আমিই দিব আর উত্তম পরিণতি তো পরহেজগারীর জন্যই। (সূরা ত্বাহা, আয়াত : ১৩২)

(৩) হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ! আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে নামাযের হুকুম করিতে থাকুন এবং নিজেও উহার পাবন্দি রুন। আমি আপনার নিকট রিযিক চাহি না বরং রিযিক আপনাকে আমিই দিব আর উত্তম পরিণতি তো পরহেজগারীর জন্যই। (সূরা ত্বাহা, আয়াত : ১৩২)

(৪) হে বৎস! নামায পড়িতে থাক, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করিতে থাক এবং তোমার উপর যে বিপদ আসে উহাতে ধৈর্য ধারণ কর। নিঃসন্দেহে ইহা হিম্মতের কাজ। (সূরা লুকমান, আয়াত : ১৭) (বয়ানুল কুরআন)

(৫) তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের (মঙ্গলের জন্য তোমাদিগকে বাহির করা হইয়াছে। তোমরা সৎকাজে আদেশ করিয়া থাক এবং অসৎকাজ হইতে নিষেধ করিয়া থাক এবং আল্লাহর উপর ঈমান রাখ। (সূরা আলি ইমরান, আয়াত : ১১০,

(৬) তোমাদের মধ্য হইতে একটি জামাত এমন হওয়া জরুরী ; যাহারা মঙ্গলের দিকে আহবান করিবে, সৎকাজে আদেশ করিবে ও অসৎকাজে নিষেধ করিবে তাহারাই পূর্ণ কামিয়াব হইবে। (সূরা আলি ইমরান, আয়াত : ১০৪)

(৭) "হে মু’মিনগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে আর তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতা। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা তারা অমান্য করে না, আর তারা তাই করে, তাদেরকে যা করার জন্য আদেশ দেয়া হয়।" (At-Tahrim 66: Verse 6)

(৮) হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য কর, তাহা হইলে আল্লাহ পাকও তোমাদের সাহায্য করিবেন এবং শত্রুর মোকাবেলায় তোমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখিবেন। (সূরা মুহাম্মদ, আয়াতঃ ৭)

(৯) যদি আল্লাহ পাক তোমাদেরকে সাহায্য করেন, তবে তোমাদের উপর কেহই জয়লাভ করিতে পারিবে না। আর যদি তিনি তোমাদেরকে সাহায্য না করেন, তবে আর কে আছে যে, তোমাদেরকে সাহায্য করিতে পারে? আর মুমিনদের একমাত্র আল্লাহ উপরই ভরসা করা উচিত। (সূরা আলি ইমরান, আয়াত : ১৬০)

আল্লাহ তাআ'লার পথে তাবলীগ করার কিছু আয়াত:

(১) তুমি মানুষকে তোমার রবের পথে আহবান কর হিকমাত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সুন্দরভাবে। তোমার রাব্ব ভাল করেই জানেন কে তাঁর পথ ছেড়ে বিপথগামী এবং কে সৎ পথে আছে।( সূরা নাহল আয়াত -১২৫)

ব্যাখ্যা ১ :

এ আয়াতে আল্লাহর পথে ডাকার পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এতে বর্ণিত মূলনীতি হল তিনটি- ( ক ) হিকমত ( খ ) সদুপদেশ ও ( গ ) উৎকৃষ্ট পন্থায় বিতর্ক। হিকমতের মর্ম হল- সত্য - সঠিক বিষয়বস্তুকে অকাট্য দলীল - প্রমাণের মাধ্যমে স্থান - কাল - পাত্রকে বিবেচনায় রেখে উপস্থাপন করা। সদুপদেশের অর্থ- যাকে দাওয়াত দেওয়া হবে তার ইজ্জত - সম্মানের প্রতি লক্ষ রেখে তার কল্যাণ কামনাৰ্থে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ও নম্রতার সাথে তাকে বােঝানাের চেষ্টা করা। আর উৎকৃষ্ট পন্থায় বিতর্ক করার অর্থ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা ও প্রতিপক্ষকে তা বােঝানাের নিয়তে সত্যনিষ্ঠার সাথে ভদ্রোচিত ভাষায় যথােপযুক্ত যুক্তি - তর্ক ও দলীল - প্রমাণ পেশ করা, প্রতিপক্ষের মনে আঘাত লাগতে পারে বা জিদ সৃষ্টি হতে পারে এ জাতীয় আচরণ পরিহার করা এবং সর্বাবস্থায় মাত্রাবােধ ও ন্যায় - ইনসাফের পরিচয় দেওয়া।

ব্যাখ্যা ২ :

উক্ত আয়াতে ইসলাম প্রচার ও তাবলীগের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। তা হল মানুষকে দীনের দিকে আহ্বান করতে হবে হিকমত দ্বারা এবং সদুপদেশের মাধ্যমে। এখানে হিকমত বলতে ঐ পদ্ধতিকে বুঝানো হয়েছে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে যে পদ্ধতি অবলম্বন করলে মানুষের বুঝতে সুবিধা হবে এবং উপযোগী হয়। আর তা হতে হবে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে। ঐ দীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে যদি তর্কও করতে হয় তাহলে তা হতে হবে সদ্ভাবে। কর্কশ ও রূঢ় স্বভাবের হওয়া চলবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَلَا تُجَادِلُوْآ أَهْلَ الْكِتٰبِ إِلَّا بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ) “তোমরা উত্তম পন্থা ব্যতীত কিতাবীদের সাথে বিতর্ক কর না।” (সূরা আনকাবুত ২৯:৪৬) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন যে, (فَقُوْلَا لَه۫ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّه۫ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشٰي)‏ ‘তোমরা তার সাথে নম্র কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সূরা ত্বা-হা- ২০:৪৪)

(২) "হে মু’মিনগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে আর তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতা। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা তারা অমান্য করে না, আর তারা তাই করে, তাদেরকে যা করার জন্য আদেশ দেয়া হয়।" (At-Tahrim 66: Verse 6)

মাগরিব বাদ বয়ান - ১

by Md. Sojol Mia, CoU

আলহামদুলিল্লাহহ! আল্লাহ তায়ালার বহুত বড় এহসান, যে তিনি আমাদেরকে মাগরিবের ৩ রাকাত ফরয নামায,মসজিদে এসে জামাতের সহিত,ইমামের পিছে আদায় করার তৌফিক দিছেন! এবং আমাদেরকে এরুকুম ইমানি মজলিসে একত্রিত করছেন,কিছু কথা বলা এবং শুনার তৌফিক দান করছেন! এই জন্য আমরা সবাই দিল থেকে শুকরিয়া আদায় করি,আল্হামদুলিল্লাহ ! এখন প্রশ্ন আসতে পারে ইমানি মজলিস কি? ইমানি মজলিস ঐ মজিসকে বলা হয়, যে মজলিসে আল্লাহ তায়ালার বড়াই এবং বড়ত্বের কথা বলা হয় ! আল্লাহ'র বড়াই এবং বড়ত্বের কথা বলার দ্বারা আল্লাহ'র জাতের প্রতি বান্দার একিন পয়দা হয়! আল্লাহ তায়ালা যে করনে ওয়ালা জাত,তিনি যে সমস্ত কিছু করতে সক্ষম, তিনি ছাড়া যে সমস্ত কিছু অক্ষম,এই কথার একিন বান্দার দিলে বসানো ! আর যে মজলিসে বসার দ্বারা এই একিন পয়দা হয় সেই মজলিসকেই ইমানি মজলিস হিসেবে আক্ষায়িত করা হয়! সাহাবি আজমাইনগণ ইমানি মজলিস কায়েম করতেন! এটা ছিল মসজিদে নববীর আমল! বড় বড় জলিলুল কদর এবং আসহাবগণ মসজদে নববীতে ইমানি মজলিস কায়েম করতেন! তো এটাই মাকসাদ আর একটাই উদ্দেশ্য,এই মজলিসে বসার দ্বারা যে সমস্ত আলোচনা করা হয় তা বলার এবং শুনার দ্বারা যেন আল্লাহ তায়ালার রুবুবিয়াত,তার বড়াই এবং বড়ত্বের একিন ও ভয় আমার দিলে পয়দা হয়! আর ইমানি মজলিসে যে আমি বসলাম,ইমানি কথা শুনলাম এর দ্বরা উদ্দেশ্য কি? এর দ্বারা উদ্দেশ্য যে,ইমানি মজলিসের দ্বারা আমার মধ্যে ইমানকে এরকুম জমানো হয়, এর দ্বারা ইমানকে বাড়ানো হয়! আর ইমান যখন বাড়তে থাকবে তখন বান্দার জন্য আল্লাহ তায়ালার হুকুম সমূহ পূরা করা সহজ হবে! আর আল্লাহ তায়ালা তার হুকুমের সাথে তার ওয়াদাকে রাখছেন! বান্দা যখন আল্লাহ'র হুকুম পূরা করবে,আল্লাহ তায়ালাও তার ওয়াদা পূরা করবেন! আর আল্লাহ'র ওয়াদা হল তার হুকুম পুরা করার বিনিময়ে তিনি দুনিয়ার জীবনে যেমনি আমাদের সূখ- শান্তি,সফলতা,আমন,ইজ্জত নিরাপত্তা দিয়ে পালবেন তেমনি পরকালের অনন্তকালের জীবনে আমাদেরকে জান্নাত দান করবেন! আল্লাহ তায়ালা মানব জাতীকে বড় মহব্বত করে সৃষ্টি করছেন! তিনি ২ টি তরিকাকে অবলম্বন করছেন! একতো আসমান থেকে কিতাবকে নাযিল করছেন, আর দ্বিতীয়ত আমবিয়ায়ে সালাতুস সালামদেরকে দুনিয়ায় পাঠায়ছেন,যারা তার পক্ষ থেকে মুন্তাখাব প্রাপ্ত বা নির্বাচিত! আসমান থেকে কিতাব নাযিল করে তিনি বুঝায়ছেন যে,মানুষের জিন্দেগি সে কিভাবে গড়বে! তার জীবনের রুটিন বা সিলেবাস কি হবে? কোন তরিকায় তার জীবন চলবে? এই জন্য তিনি তার পাক কালামকে নাযিল করছেন! আর নবীদের পাঠানোর উদ্দেশ্য হল আমাদের জীবনের আইকন বা মডেল কি হবে ? কাকে আমরা আমাদের অনুসরনীয় আদর্শ বানাবো ? কাকে অনুসরন করলে আমরা হেদায়েতের পথ পাবো ?? মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি? আল্লাহ তায়ালা কূরআনে কারিমে একটি আয়াত নাযিল করে ডিক্লিয়ারেশন দিতেছেন,মানবজাতী এবং জ্বীন জাতীর জন্য,তিনি এরশাদ করেন - (১) আমি জ্বীন ও ইনসানকে শুধু মাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি (আয যারিয়াত-৫৬ ) তো আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত দ্বারা সমগ্র মানব জাতীর জন্য একটা উদ্দ্যেশ্য তৈরি করেদিছেন! মানুষ রিযিকের পিছনে ঘুরবে,রিযিকের চিন্তা করবে,তো আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারিমে আরেক আয়াতে এরশাদ করেন - (২) "পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোন প্রাণী নেই, যার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে গ্রহন করেন নাই" (সুরা হুদ-৬) তো সমস্ত রিযিক তো আল্লাহ'র হাতে! ঘটনা – (১) আব্দুল্লাহ ইবনে আশআরি (রাঃ) এর ঘটনা -(গায়েবি খানা) তো যে আল্লাহ গায়েব থেকে খাওয়াইতে পারেন,সেই আল্লাহ কি আসবাব থেকে খাওয়াইতে পারেন না?? সমস্ত আসবাব শেষ হয়ে গেলেও তো সেই আল্লাহ'ই আমাকে রিযিক পৌছাবেন! এই জন্য তিনি তার বান্দাকে রিযিকের চিন্তাসহ সমস্ত চিন্তা থেকে ফারেগ হতে বলছেন! একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য যে খালেস হয়ে যায়, তিনি তো তার সব কিছুর ব্যাবস্থা করেদেন! তো কেউ যদি আল্লাহ'র প্রতি তায়াক্কুল করে, আর সে যদি পাহাড়ের গৃহায়ও অবস্থান করে,তবে সেখানেও আল্লাহ তায়ালা তার জন্য উত্তম রিযিকের ব্যাবস্থা করবেন! আজকে মানবজাতী আল্লাহ'র উপর ঐরকম তায়াক্কুল করতে পারতেছেনা বিধায় তার পক্ষ থেকে কোন গায়েবি নূসরত এবং সাহায্যও আসতেছেনা! আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জমানায় প্রত্যেক কওমকে নবীদের দ্বারা বুঝায়ছেন,যে কিভাবে মানুষের সম্পর্ক আল্লাহ তায়ালার সাথে হয়ে যেতে পারে! আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন কওমকে দুনিয়ায় পাঠায়ছেন যারা বিভিন্ন ফেত্না দ্বারা আচ্ছন্ন ছিলো ! তাদের সাথে যে সমস্ত ফিত্না ছিল তার বিপরীতে আবার নবীদেরকে পাঠায়ছেন! নবীদের দ্বারা ঐসব কওমকে তরবিয়তের উপর উঠানোর চেষ্টা করিয়েছেন! নবীগন এসে তাদের এক আল্লাহ'র দাসত্বের দিকে, কল্যাণের দিকে আহব্বান করেছেন! মুয়ামেলা যে সমস্ত হয়েছে নবীদের সাথে তাদের কওমের সাথে, এরকুম অনেক ঘটনা আল্লাহ পাক কুরআনে কারিমে তুলে ধরছেন! যাতে করে তা কিয়ামত পর্যন্ত আনেওয়ালা সমস্ত মানুষের জন্য শিক্ষনিয় দৃষ্টান্তমূলক হয়ে থাকতে পারে! যেমন- আদ জাতীর ঘটনা, সামূদ জাতীর ঘটনা, সাবা তীর ঘটনা, সোয়ায়েব (আঃ) এর এক জাতী ছিল তার ঘটনা! তো এই সমস্ত জাতীর কাছে আল্লাহ তায়ালা তার নবীদেরকে পাঠায়ছেন ! যে জিনিষের মধ্যে তারা তাদের কামিয়াবিকে খুজতেছে তার বিপরীতে নবীদেরকে দাওয়াত পরিচালনা করতে বলছেন ! যারা নবীর দাওয়াতকে গ্রহণ করছে, আল্লাহকে রব হিসেবে স্বীকার করছে তারা কামিয়াব হয়েগেছে! দুনিয়ার জীবনে যেমনি তাদের আল্লাহ তায়ালা সুখ-শান্তি,সফলতা,আমন,ইজ্জত নিরাপত্তা দিয়ে পালছেন তেমনি জান্নাতের সুসংবাদও তাদেরকে নবীদের মাধ্যমে জানিয়ে দিছেন! আর যারা নবীদের দাওয়াতকে গ্রহণ করে নাই, আল্লাহ তায়ালাকে রব হিসেবে স্বীকার করে নাই তারা দুনিয়াতেও নাকামিয়াব এবং আখিরাতেও! তাদের অনেককে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে তো জিল্লতি,অশান্তি,পেরেশানির মধ্যে রাখছেনই এমনকি অনেককে তৎক্ষনাত তার আযাব দ্বারা পাকড়াও করছেন! আর অনন্ত কালের জিন্দেগিতে আল্লাহ'র অবাধ্যতা যে তাদের জাহান্নামের উপযুক্ত করেছে তার খবরও নবীরা তাদের জানিয়ে দিছেন! হুজুর পাক (সাঃ) যখন মক্কার বুকে প্রেরণ করা হয়, তখন ঐ যুগকে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ বা অন্ধকার,অজ্ঞতার যুগ বলে আঙ্খায়িত করা হত! ঐ যুগে আরবের পৌত্তলিকতায় লিপ্ত এবং নানা কূসংষ্কারে লিপ্ত মানুষদেরকে সর্বনিকৃষ্ট ও অসভ্য জাতি হিসেবে গন্য করা হত! তৎকালিন বিশ্ব পরাশক্তি রোম-পারস্ব,কায়সার-কিসরার বাদশারা পর্যন্ত আরবের লোকদের উপর কর্তৃত্ব খাটাতে অস্বীকার করতো! যারা সে সময় গোটা বিশ্ব শাসন করতো তারাই আরবদের এহেন বর্বর জাতী হওয়ার কারনে এড়িয়ে চলতো! তাহলে ইসলাম পূর্ববর্তি যুগে তাদের অবস্থাটা ছিল কি হুজুর পাক (সাঃ) যখন দীনের দাওয়াত নিয়ে আসলেন, এবং এই সব বর্বর মানুষগুলোর দিলের পেছনে মেহনত শুরু করলেন, তখন দাওয়াতকে গ্রহণ করার কারনে আল্লাহ তায়ালা তাদের মধ্য থেকে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)গণের জামাত কে বের করলেন! হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), উমর ফরুক (রাঃ), উসমান গনি (রাঃ), জাফর (রাঃ) বিলাল (রাঃ), আলি (রাঃ) এর মত বড় বড় সাহাবা তাদের মধ্যে তৈরি হল ! যাদের সম্পর্কে হুজুর পাক (সাঃ) এরশাদ করেন - 'আমার এক একজন সাহাবী আসমানের এক একটা তারকার ন্যায়, তোমরা যাকেই অনুসরণ করবে, হেদায়েতের পথ পেয়ে যাবে!' ঘটনা - (২) আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এর মর্যাদা - ঘটনা - (৩ ) উমর ফারুক (রাঃ) এর মর্যাদা - ঘটনা - (৪ ) উসমান (রাঃ) এর মর্যাদা - ঘটনা - (৫ ) বিলাল (রাঃ) এর মর্যাদা - ঘটনা - (৬ ) উকবা ইবনে নাফে (রাঃ) এর ঘটনা - ঘটনা - (৭) আলা ইবনে হাযরামি (রাঃ) এর ঘটনা - তো দীনকে গ্রহণ করার কারনে সাহাবী আজমাইনগণ কে আল্লাহ তায়ালা কত দামি বানায় দিছেন! আর সাহাবীগণ নিজের ইমান ও আমলকে বানায়ছেন মেহনত দ্বারা! নিজের জান ও মালের কুরবানী দ্বারা! (৩) নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নিকট হতে তাদের জান এবং মাল জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন (সূরা তওবা, আয়াত নং-১১১)। ঐ সাহাবী ওয়ালা ইমান আমি তখনই লাভ করতে পারবো যখন আমার জান ও মাল দ্বারা ইমান ও আমল এর পেছনে মেহনত করতে থাকবো, প্রয়োজনে সফর করবো দীনকে শিখার জন্য! সবাই ইনশা আল্লাহ নিয়ত করি অন্তত ৩ দিন সময় দিয়ে এই কাজকে বুঝবো এবং তিন চিল্লাহ/৪ মাস সময় লাগিয়ে এই কাজকে শিখবো! এবং মউত পর্যন্ত এই কাজের সাথে লেগে থাকবো! কার কার নিয়ত আছে ইনশা আল্লাহ?? যাদের ৩ চিল্লাহ হয়নি তারা তিন চিঃ নিয়ত করি এবং যাদের তিন চিল্লাহ হইছে তারা বিদেশ সফরের জন্য নিয়ত করি! আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন! জান, মাল, সময় নিয়ে আল্লাহ'র রাস্তায় বের হবার তৌফিক দান করুন! (আমিন)

বাদ মাগরীব বয়ান - ২

by Md. Sojol Mia, CoU

আলহামদুলিল্লাহ ! আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের লাখো-কোটি শুকরিয়া যে তিনি আমাদেরকে মুসলমান হিসেবে,শেষ নবীর উম্মত হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়ে সম্মানিত করছেন ! মেহেরবানি করে আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মত হিসেবে বাছাই করছেন ! আজ আমাদের পরিবারে আমাদের সমাজে দীনের সঠিক চর্চা না থাকার কারণে,দীনি আলোচনা না থাকার কারণে,দীনি শিক্ষার অভাবে মানুষ দীন ইসলাম থেকে কত দূরে সরে যাইতেছে ! দলে দলে এই উম্মত জাহান্নামের দিকে চলে যাইতেতে ! কিন্তু আফসোস ! দুনিয়াকে পাবার জন্য তাদের মধ্যে যেই প্রতিযোগিতা দেখা যায় তার বিন্দুমাত্রও দীনের জন্য দেখা যায়না ! জান্নাত আমরা সবাই চাই কিন্তু তার জন্য মেহনত করতে আমরা রাজি নই ! সাহাবী আজমাইনগণ ৯-১৩ বছর ইমানের পেছনে মেহনত করছেন,ইমানকে শিখছেন,ইমানকে বানায়ছেন l তারা প্রথমে ছিলেন দায়ি এর পর আলেম তারপর আবেদ l আর বর্তমানে আমরা আগে হই আলেম এরপর আবেদ ! দায়ী ওয়ালা সিফত আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে যাইতেছে ! ফলে মক্তব-মাদ্রাসা,খানকাগুলো তো আবাদ হচ্ছে কিন্তু মসজিদ খালি ! মসজিদে মুসল্লি নাই ! সমস্ত পাপাচার আর অশ্লিলতার যায়গায় মুসলমানের উপচে পড়া ভিড় ! কিন্তু মসজিদে তারা আসতে পারতেছেনা ! কিছু মানুষ দীনি প্রতিষ্ঠানে যেয়ে বা আলেম-উলামাদের সংষ্পর্সে থেকে দীন শিখতেছে,কিছু মানুষ হক্কানি পীর-মাশায়েখ এর হাতে বাইয়াত হচ্ছে কিন্তু এছাড়া যে বিরাট জনগোষ্ঠি মসজিদে আসতে পারতেছেনা,দীন শিখতে পারতেছেনা, যারা বিভিন্ন জরুরত বা হালতের কারনে মসজিদ বিমূখ হয়ে আছে তাদের কি হবে !? কে তাদের মসজিদমুখি করার চিন্তা-ফিকির করবে ?? কে তাদের দাওয়াত দিবে ?? কে তাদের ঘরে-ঘরে গিয়ে তবলীগ করবে ?? তাদেরকে মসজিদে আনার,আল্লাহ'র দিকে ডাকার দায়িত্য কার ?? নিশ্চয় যারা মসজিদে সালাত আদায় করতে আসতে পারতেছে তাদের ?? মুসলমাদের জন্য হল ঈমানের দাওয়াত আর অমুসলীমদের জন্য কালীমার দাওয়াত ! বনী-ঈসরাইলের এক আবেদ ছিল ! আল্লাহ তায়ালা যখন গোটা এলাকা আযাব দ্বারা ধ্বংস করতে ফেরেস্তাদের পাঠালেন তখন সর্বপ্রথম তাকে আযাব দ্বারা পাকড়াও করলেন ! কারণ সে নিজে মসজিদে ইবাদত-বন্দেগি করতো অথচ তার জাতী অজ্ঞতা,পাপাচার আর যুলুম-অত্যাচারের রাজত্ব কায়েম করেছিল ! কিন্তু সে নিজে ইবাদতগার হলেও কাওকে সৎকাজের আদেশ বা অসৎ কাজে বাধা প্রদান করতো না ! ঐ সমস্ত লোক যে মসজিদে আসতেছেনা তার জন্য সে কখনও ফিকির করতোনা l এই জন্য আল্লাহ তায়ালা আজায প্রেরণ করে তাকেও পাকড়াও করলেন ! এই ছিল পূ্র্ববর্তি কওমের সাথে আল্লাহ তায়ালার মুয়ামেলা l অথচ পূর্ববর্তি লোকদের উপর দাওয়াতের জিম্মাদারি ফরয ছিলনা ! চলতে ফিরতে উঠতে বসতে কিছু দাওয়াত হয়তো তারা দিয়ে থাকতো ! দাওয়াতের কাজে অবহেলা করায় তাদের সাথে যদি আল্লাহ তায়ালার এই ব্যাবহার হয়ে থাকে ? তাহলেতো এই উম্মতের উপর দাওয়াত এর কাজ কে ফরয করা হয়েছে ! এই কাজে অবহেলা কি আমাদের উপর তার চেয়েও ভয়াবহ শাস্তি নামিয়ে আনার জন্য যথেষ্ঠ না ?? হচ্ছেও তাই এই কাজকে ছেড়ে দেয়ার জন্য গোটাবিশ্বে মুসলমান আজ নির্যাতীত,নিপিড়িত অসহায় এক জাতী ! পূর্বের জমানার নবীদের ওপর দাওয়াতের জিম্মাদারি ছিল কিন্তু তাদের কওমের ওপর এই জিম্মাদারি বাদ্ধতামূলক ছিলনা l যদিও স্বল্প পরিসরে তারাও কিছু দাওয়াত এর কাজ করতো l নবীগন এসে তাদের এক কালেমার উপর উঠানোর মেহনত করেছেন আর কওমের লোকেরা তার উপর আমল করেগেছে l যেহেতু নবীদের সিলসীলা তখন জারী ছিল ! এক নবীর পর আরেক নবী এসে দওয়াতের জিম্মাদারি আদাহ করতো তাই তাদের কওমকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি l কিন্তু আমাদের নবী যেহেতু শেষ নবী,এর পর আর কোন নবী আসবেনা তাই এই জিম্মারি নবীজি তার বিদায় হজ্বের সময় আমাদের দিয়েগেছেন l নবীজি এরশাদ করেন - রেফারেন্স - (১) তিনি বলেন, আমিই শেষ নবী আমার পর আর কোন নবী আসবেনা ! তিনি আরো বলেন - রেফারেন্স - (২) আমার পক্ষ থেকে যদি একটি আয়াতও জানো তবে তা অপরের নিকট পৌছে দাও ! দায়াত এর কাজ নিষ্পাপ নবীদের কাজ ছিল l আর এই নবী ওয়ালা মেহন এই দায়িত্ব্যের কারনেই এই উম্মত এত দামি ! আল্লাহ তায়ালা সমস্ত কওমের উপর (নবীগন ব্যতীত) এই উম্মত কে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন ! আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কূরআনে এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে এরশাদ করেন l রেফারেন্স - (৩) আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানের ১১০ নং আয়াতে এরশাদ করতেছেন - “তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে”। (আলে ইমরান ১১০). উপরোক্ত আয়াতে শেষ্ঠ উম্মত বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এই ইঙ্গিতে এর কারণও উল্লেখ করা হয়েছে যে,তোমরা 'আমর বিল-মারূফ ও নাহী আনীল-মুনকার' অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করিয়া থাকো ! রেফারেন্স - (৪) সূরা হা-মীন-সিজদাহ ৩৩ নং আয়াতে এরশাদ করেন - ঐ কথার চাইতে উত্তম কথা আর কাহার হইতে পারে,যে মানুষকে আল্লাহ'র দিকে ডাকে এবং নেক আমল করে,এবং বলে যে নিশ্চয় আমি মুসলমানদের মধ্য হইতে একজন ! [সূরা হা-মীন-সিজদাহ আয়াত নং ৩৩] মুফাস্সীরগণ লিখেছেন, কোন ব্যাক্তি যে কোন পন্থায় মানুষকে আল্লাহ'র দিকে ডাকবে সে উপরোক্ত আয়াতের সুসংবাদ ও প্রসংসার অন্তর্ভূক্ত হবে ! হতে পারে তা আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) মাজেযা দ্বারা,মুজাহিদগণের তরবারির দ্বারা,মুয়ায্যীনগনের আযানের দ্বারা বা ওয়াজ-নসীহত ও তাবলীগের দ্বারা ! মোট কথা যে কোন ব্যাক্তি কাউকে মঙ্গলের দিকে আহব্বান করবে সে উক্ত আয়াতের অন্তর্ভূক্ত হবে ! আমি নিজে নামাযি,মসজিদে আসতেছি,আমল করতেছি অথচ আমার পরিবারের দীনদ্বারির কি অবস্থা ? আমার আত্মীয়-স্বজন মহল্লাবাসী এছাড়া ত মানুষ আজ দীনকে ভূলে বদ্দিনির পিছনে ছুটতেছে ! আমিকি কখনো তাদের নামাযর দাওয়াত দিয়েছি,ইমানের দাওয়াত দিয়েছি ?? সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করেছি ?? আল্লাহ তাআলা বলেন : হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর’ (সূরা আত-তাহরীম : ৬)। অথচ এটাতো একজন মুসলাম হিসেবে আমার নৈতিক দায়িত্য ! আমার উপর নবী কর্তৃক অর্পিত দায়িত্য !! কারও ব্যাক্তিগত আমল নিয়ে কখনও সে কেয়ামতের দিন আল্লাহ'র সামনে দাড়াতে পারবেনা l শুধু ব্যাক্তিগত আমল নিয়ে সেদিন কেউ পার পাবেনা,প্রত্যেকে অবশ্যই সেই জিম্মাদারি সম্পর্কে জিজ্ঞাসীত হবে যা তাকে দেওয়া হয়েছিল l কেউ নিজ পরিবারের জিম্মাদার,কেউ গোষ্ঠি,দল বা রাষ্ট্রের ! নিশ্চই প্রত্যকে নিজ নিজ জিম্মাারি সম্পর্কে জিজ্ঞাসীত হবে l হাদীসে এসেছে : তোমাদের প্রত্যেকেই তত্ত্বাবধায়ক আর তোমাদের প্রত্যেককে তার অধিনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে' (বুখারী)। এই জন্য ভাই নিজে নেক আমল করবো,ইমান ও আমল বানাবো এবং মানুষকে আল্লাহ'র দিকে ডাকবো ! আখেরি নবীর উম্মত হওয়ার কারনে উম্মতে মুহাম্মদি সর্বোচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ! আর এই গূন সমূহের কারণ হল আমাদের উপর অর্পিত জিম্মাদারি ! এই মর্যাদা,সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণই হল নবীওয়ালা কাজ ! মানুষের দ্বারে দ্বারে বারে বারে গিয়ে দাওয়াত পৌছানো ! তাদেরকে জান্নাতের পথে ডাকা,আল্লাহ'র সাথে সম্পর্ক জুড়ে দেয়া ! এই কাজ প্রত্যেক আমবিয়ায়ে আসসালাতু আসলামগণের কাজ ,এই কাজ আখিরী নবীর কাজ,এই কাজ সাহাবী আজমাইনগনের কাজ . . . এই কাজ উম্মতের মুহাম্মদির প্রত্যেকের কাজ ! আপনার,আমার কাজ ! আর এই কাজকে আঞ্জাম দিয়ে আমাদের পূর্ববর্তিদের পথে চলার মধ্যেই সফলতা,কামিাবি, দুনিয়া এবং আখিরাতে ! রেফারেন্স - (৫) এই আমার পথ ! আমি আল্লাহ'র দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই ,আমি এবং আমার অনুসারিরা ! আল্লাহ পবিত্র l আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত নই ! [সূরা ইউসূফ আয়াত - ১০৮] সবাই ইনশা আল্লাহ নিয়ত করি অন্তত ৩ দিন সময় দিয়ে এই কাজকে বুঝবো এবং তিন চিল্লাহ/৪ মাস সময় লাগিয়ে এই কাজকে শিখবো !এবং মউত পর্যন্ত এই কাজের সাথে লেগে থাকবো ! কার কার নিয়ত আছে ইনশা আল্লাহ ?? যাদের ৩ চিল্লাহ হয়নি তারা তিন চিঃ নিয়ত করি এবং যাদের তিন চিল্লাহ হইছে তারা বিদেশ সফরের জন্য নিয়ত করি ! আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন ! জান,মাল,সময় নিয়ে আল্লাহ'র রাস্তায় বের হবার তৌফিক দান করুন ! ( আমিন )

ফজর বাদ বয়ান

by Md. Sojol Mia, CoU

আলহামদুলিল্লাহ সমস্ত প্রশংসাই আল্লাহ পাকের, যিনি আমাদেরকে অর্ধমৃত অবস্থা থেকে জাগাইয়া আল্লাহপাকের মহান হুকুম ফজরের দুই রাকআত ফরজ নামাজ মসজিদে এসে জামায়াতে তাকবীর উলার সহিত আদায় করার তৌফীক দান করেছেন, তাই দিল থেকে সবাই শুকরিয়া আদায় করি বলি আলহামদুলিল্লাহ।

এশার নামাজ বাদ আমরা কয়েক দলে বিভক্ত হয়ে গিয়াছিলাম। একদল রাত্রিকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করিয়া সারা রাত্রি ইবাদতে মশগুল ছিলেন। আর এক দল রাত্রিকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করিয়া সারা রাত্রি জেনা, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি ও দস্যবৃত্তি করে কাটিয়ে দিয়েছেন। কাহারো নিদ্রা চিরনিদ্রায় পরিণত হয়েছে। কেহ হাসপাতালে সারা রাত্রি অশান্তিতে কাটিয়ে দিয়েছেন।

কোন ব্যক্তি ফজরের আযান শুনিয়া উত্তম রূপে অজু করিয়া মসজিদের দিকে রওয়ানা হইল, সে যেন এহরাম বেধে হজ্জের দিকে রওয়ানা হইল। তার প্রতি কদমে একটি করে নেকী লেখা হয় ও একটি করে গুনাহ মাফ হয়ে যায়। মসজিদে যত সময় নামাজের জন্য দেরি করবে তত সময় নামাজেরই ছাওয়াব পাইতে থাকিবে।

নামাজী ব্যক্তি যত সময় নামাজে থাকিবে তত সময় আল্লাহর রহমত বৃষ্টির মত পড়িতে থাকিবে। দাড়াইয়া নামাজ আদায় করিলে কেরাতের প্রতি হরফে ১০০ করিয়া নেকী পাইবে। বসিয়া পড়িলে ৫০ নেকী করিয়া পাইবে । প্রথম তাকবীরে শরীক হওয়া দুনিয়ায় যত নেক আমল আছে তার চেয়ে উত্তম। নামাজ সর্বশেষ্ঠ জেহাদ। নামাজী যখন রুকুতে যায়, তখন তাহার নিজের ওজন বরাবর স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় দান করার ছাওয়াব তার আমলনামায় লেখা হয়। নামাজি যখন আত্তাহিযযাতু পড়ার জন্য বসে তখন সে হযরত আইউব (আঃ) ও হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর মত দুইজন ছাওয়াব অর্জনকারীর ছাওয়াব পায়। যে পর্যন্ত হুজুর পাক (সঃ) উপর দুরূদ পাঠ করা না হয়, তত সময় দোয়া আসমান ও যমীনের মাঝে ঝুলিতে থাকে। ডান দিকে ছালাম ফেরালে বেহেশতের ৮টি দরজা খোলা হয়ে যায়। আর বাম দিকে ছালাম ফেরালে দোষখের ৭টি দরজা বন্ধ হয়ে যায়। নামাজ বাদে যদি কেহ যিকিরকারীর পাশে বসে থাকে, তাহলে সে ৪জন গোলাম আজাদ করার ছাওয়াব পাইবে। ১টি গোলামের মূল্য ১২ হাজার টাকা, ৪টির মূল্য ৪৮ হাজার টাকা দান করার ছাওয়াব পাইবে। তার পর দুই রাকআত এশরাক নামাজ সূর্য উদয়ের ২২/২৩ মিনিট পরে পড়ে তবে একটি উমরা হজ্জ ও একটি কবুল কৃত হজ্জের ছাওয়াব পাইবে। আর ও দুই রাকআত নামাজ আদায় করলে আল্লাহ্‌ পাক তাহার সারাদিনের জিন্মাদার হয়ে যাইবেন।

সুরা হাশরের শেষ আয়াত পাঠ করিলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য মাগফেরাত কামনা করিবেন। মাগরিবের নামাজের পর পড়িলে সারা রাত্রি মাগফেরাতের দোয়া করিতে থাকেন। ১০০ বার ছুবহানাল্লাহ পাঠ করিলে ১০০ গোলাম আজাদ করার ছাওয়াব পাইবে। ১০০ বার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করিলে যুদ্ধের ময়দানে ছামানাসহ ১০০ ঘোড়া দান করার ছাওয়াব পাইবে । ১০০ বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু পাঠ করিলে আসমান যমীনের ফাকা জায়গা নেকীতে ভর্তি হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকা-লাহু আহদান সামাদান লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ ওয়ালাম ইয়াকল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ” পাঠ করিবে। সে বিশ লক্ষ নেকী পাইবে। হুজুর পাক (সা.)-এর হাদীসে আছে- (মোন তামাচ্ছাকা বিসুন্নতী ইনদা ফাছাদি উন্মাতি ফালাহু আজরু মিয়াতি সাহীদিন) যে ব্যক্তি ফেতনা-ফাসাদের জামানায় আমার একটি সুন্নাতকে আকড়ে ধরে সে ১০০ শহীদের ছাওয়াব লাভ করিবে। এক ওয়াক্ত নামাজ যে আদায় করিল সে ৩,৩৫,৫৪,৪৩২ নেকী পাইল । আর যে এ নামাজ ছাড়িয়া দিল সে ২৩০৪০০০০০০ লক্ষ বছর শাস্তি ভোগ করিবে, অর্থাৎ ৮০ হোকবা। কাজা আদায় করিলে ৭৯ হোকবা মাফ অর্থাৎ ১ হোকবা ২ কোটি ৮৮ লক্ষ বৎসর শাস্তি ভোগ করিবে।যারা নামাজে আসে নাই তারা ক্ষতিথন্ত হয়ে গেল। তাদের ডাকার জিদ্মাদারী হুজুর পাক (সা:) আমাদের উপর রেখে গেছেন। আল্লাহ ভুলা বান্দাকে ডেকে নামাজে দীড় করাইয়া দিলে কবুল কৃত নামাজের ছাওয়াব পাওয়া যাইবে। ভাই দাওয়াতের জন্য কে কে রাজী আছেন, খুশি খুশি বলুন ।

গাস্তের আদব বলার নিয়ম

by Md. Sojol Mia, CoU

আল্লাহ্ পাক মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি সুখ সফলতা রেখেছেন একমাত্র দ্বীনের মধ্যে। যেমন মাছের শান্তি রেখেছেন পানির মধ্যে। আল্লাহ্ পাকের হুকুম নবীর তরীকায় পুরা করাকে দ্বীন বলে। মানুষ যখনই দ্বীন থেকে গাফেল হয়ে গেছে, আখিরাতকে ভূলে দুনিয়ামুখী হয়েছে, একমাত্র আল্লাহ্ পাকের উপর ভরসাকে ছেড়ে সৃষ্ট বস্তুর উপর একীন করেছে তখনই আল্লাহ্ পাকনমানুষের কামিয়াবী ও নাজাতের জন্য পর্যায়ক্রমে লক্ষাধিক নবী রাসূলকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। দাওয়াতের এই মেহনত করতে গিয়ে কোন নবীকে আগুনের মধ্যে যেতে হয়েছে, কাউকে মাছের পেটে যেতে হয়েছে, কারও শরীর থেকে লোহার চিরুনী দ্বারা চামড়া-গোশত খসিয়ে নেওয়া হয়েছে। তথাপি তারা কেহ দ্বীনের মেহনতে সামান্যটুকু কমতি করেন নি। হযরত ঈসা (আঃ) এর পর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুয়ত প্রাপ্তি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় দাওয়াতের মেহনত বন্ধ থাকায় গোটা আরব বদ্বীনীতে ভরপুর হয়ে যায় অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে তারা নিজের কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়েছে। এমনকি ক্বাবা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি ঢুকিয়েছিল এজন্য ঐ যুগকে অন্ধকার যুগ বলা হয়। এজন্য আল্লাহ্ পাক দয়াপরবশ হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সারা দুনিয়ার সমস্ত মানব জাতির হেদায়েতের জন্য হযরত মোহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আখেরী নবী করে দুনিয়ায় পাঠালেন। নবুয়ত প্রাপ্তির পর মাত্র ২৩ বছরের মেহনতে সেই অসভ্য, বর্বর, ঘৃনীত মানুষগুলো সোনার মানুষে পরিনত হলেন। যেহেতু আর কোন নবী দুনিয়াতে আসবেন না তাই এই মেহনতের জিম্মাদারী এখন আমাদের সবার উপর। আমরা যদি এই দাওয়াতের মেহনত না করি কাল কিয়ামতের মাঠে আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে। আর আমরা যদি এই মেহনত করি আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে ইজ্জত ও সম্মান দান করবেন। এই মেহনত করার জন্য সবাই তৈয়ার আছি না ভাই??

ফজিলত :

(১) আল্লাহ্ পাক বলেন ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে ভাল কথা কার হতে পারে যে মানুষকে আল্লাহ্র পথে ডাকে এবং নেক আমল করে এবং বলে যে নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের মধ্যে একজন। [আল-কোরআন]

(২) আল্লাহ্ পাকের রাস্তায় এক সকাল অথবা এক বিকাল ব্যয় করা দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়ে উত্তম | [বুখারী]

(৩) আল্লাহ্র রাস্তায় ধূলাবালি আর জাহান্নামের ধূয়া কখনো একত্রিত হবে না | [তিরমিজী]

(৪) আল্লাহ রাস্তায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা শবে ক্বদরের রাত্রে হাজরে আসওয়াদ পাথরের পার্শ্বে দাড়িয়ে সারারাত ইবাদকত করার চেয়ে উত্তম | [ইবনে হিব্বান] (৫) আল্লাহ্র রাস্তায় কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকা আপন ঘরে থেকে ৭০ বছর নামায পড়ার চেয়ে উত্তম | [তিরমিজী]

তরতীবঃ

জামাতের মধ্যে দুইটি অংশ হইবে একটি মসজিদের ভিতরে থাকবে আর অন্যটি গাস্তে যাবে। যে জামাত গাস্তে যাবে তাতে থাকবে একজন রাহবার, একজন মুতাকাল্লিম, কয়েকজন মামুর এবং একজন যিম্মাদার। রাহবার এলাকার লোক হইলে খুব ভাল হয়। সারা দুনিয়াকে সামনে নিয়ে আল্লাহ্ পাকের রাজির জন্য গাস্তে যাওয়া। গাস্তে যাওয়ার আগে নিজের দুর্বলতা পেশ করে দোয়া করা। ৭-১০ জন সাথী হলে ভালো হয়। নজরের হেফাজত করা জিকিরে ফিকিরে যাওয়া রাস্তার ডান দিক দিয়ে চলা মহল্লার শেষ প্রান্ত থেকে শুরু করে মসজিদের দিকে আসা মসজিদেও আমল চলবে এক ভাই ঈমান একীনের কথা বলবে, কিছু ভাই কথা শুনবে, ২/১ ভাই এস্তেকবাল করবে, ২/১ ভাই দোয়া ও জিকিরে লিপ্ত থাকবে। রাহবারের কাজঃ রাহবারের কাজ হলো মহল্লার ডান দিক দিয়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে এক এক করে সকল লোকের নিকট জামাতকে নিয়ে যাওয়া এবং সালাম দিয়ে বলা যে আল্লাহ্র রাস্তার মেহমানেরা আসছে আপনার সাথে কথা বলবে। যদি তিনি কাজে ব্যস্ত থাকেন তবে কাজ থেকে ফারেক করে মুতাকাল্লিমের কাছে নিয়ে আসবেন। রাহবার, মুতাকাল্লিম, যিম্মাদার ছাড়া অন্য কেউ সালাম দিবেন না, সালামের উত্তরও দিবেন না। মুতাকাল্লিমের কাজঃ মুতাকাল্লিম ভাই নরম নরম স্বরে তিন কথার উপর দাওয়াত দিবেন। তাওহীদ, রিসালাত এবং আখিরাতের উপর দাওয়াত এমনভারে দিতে হবে যে যেন বয়ানও না হয় এবং এলানও না হয়।

তবলীগের আদবের মধ্যে ইহাও একটি আদব যে, নম্রতা অবলম্বন করিবে। খলীফা মামুনুর রশীদকে কোন ব্যক্তি কঠোর ভাষায় নসীহত করিলে তিনি বলিলেন, নম্রভাবে নসীহত করুন। কেননা, আল্লাহ পাক আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হযরত মূসা ও হযরত হারুন (আঃ)কে আমার চাইতে অধম ফেরাউনের নিকট যখন পাঠাইয়াছিলেন তখন নম্রভাবে নসীহত করিতে বলিয়াছিলেন অর্থাৎ, তোমরা তাহাকে নম্রভাবে উপদেশ দিবে, হয়ত সে নসীহত কবুল করিয়া নিবে। (সূরা ত্বাহা, আয়াত : ৪৪)

গাস্তের আদব - ২

by MKA SOMRAT

আলহামদুলিল্লাহ, সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ সুবাহানু ওয়া তায়ালার জন্য, যিনি সব কিছুর একমাত্র মালিক, যিনি আমাদেরকে আসরের চার রাকাত ফরজ নামাজ শেষ করে এক দ্বীনি মজলিসে বসা ও কথা বলার নিয়ামত দান করেছেন, সেজন্য সবাই দিল থেকে শুকরিয়া আদায় করি, আলহামদুলিল্লাহ।

ভাই দ্বীন আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মাহবুব। এই দ্বীনকে সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য, মানুষকে আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালা হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত অসংখ্য নবী রাসুলকে এই দুনিয়াতে প্রেরণ করেছিলেন, ভাই তারা মানুষের দ্বারে দ্বারে পাড়ে পাড়ে গিয়ে এরকম বলতেন যে, হে মানুষ সকল বল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোন মাবুদ নাই তাহলে তোমরা কামিয়াবী হয়ে যাবা। যারা নবী-রাসূলগণের কথা মেনে আল্লাহ তালার উপর ঈমান এনেছিলেন তারা দুনিয়াতেও সফলকাম হয়েছেন এবং আখিরাতে ও তাদের স্থান জান্নাত, সুবহানাল্লাহ।

তো ভাই দাওয়াত এত জরুরী যেমন মাছের জন্য পানি জরুরী, মানুষের দেহের জন্য যেমন মাথা (Brain) জরুরী তার চেয়ে ও বেশি দ্বীনের জন্য দাওয়াত জরুরী। এই দ্বীনি কাজ আল্লাহ সুবহানাতায়ালা নবী রাসূলগণদের দ্বারা করাইছেন, শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশেষ নবী ও রাসুল, উনার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা নবী রাসূল আসার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। তো ভাই এই দ্বীনের দাওয়াত কে পৃথিবীর সব জায়গায়, আনাচে কানাচে পৌঁছে দেওয়ার জিম্মাদার আমার আপনার সকলের উপর , এই জিম্মাদারি আদায় করার জন্য সবাই প্রস্তুত আছি তো, ইনশাআল্লাহ।

তো এই কাজের লাভ, আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আল কুরআনের সূরা হা-মিম আস সাজদাহ আয়াত নাম্বার ৩৩ এ বলেন, "ঐ ব্যক্তির কথা থেকে উত্তম কথা আর কাহার হইতে পারে যে মানুষকে আল্লাহ তাআলার দিকে ডাকে এবং নিজেও নেক আমল করে ও বলে যে আমি একজন সাধারন মুসলমান এর অন্তর্ভুক্ত।"

সহীহ মুসলিম শরীফের ২৬৭৮ নাম্বার হাদিসে আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "কেউ হেদায়েতের দিকে আহ্বান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরন করেছে তাদের সওয়াবের কোন কমতি হবে না।

হাদিসে কমবেশি এরকম আছে যে, দ্বীনি কাজে এক সকাল ও এক বিকাল ঘোরাফেরা করা দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়ে অধিক উত্তম।

এ রাস্তায় প্রত্যেকটা নেক আমলের বদলা আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালা অগণিত দিয়ে থাকেন, যেমন এ রাস্তায় বের হয়ে যে কোন নেক আমলই করা হোক না কেন সেই নেক আমলের সওয়াব আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালা ৪৯ কোটি গুণ বা তার চেয়েও বেশি দান করেন।

এ রাস্তায় বের হয়ে, শরীরে কোথাও ধুলাবালি লাগলে, সেই ধুলাবালি লাগার স্থানে জাহান্নামের আগুন স্পর্শও করবে না, সুবহানাল্লাহ।

তো ভাই এই কাজের তরতিব বা নিয়ম হইলো, একটা জামাতের দুইটা অংশ থাকবে এক অংশ মাসজিদের ভিতরে কাজ করবে ও অন্য অংশ মাসজিদের বাইরে কাজ করবে। মাসজিদের ভিতরে যে অংশ কাজ করবে সেখানে একজন মোতাকাল্লিম ভাই থাকবেন, যিনি ঈমান ও এ্কিনের কথা বলবেন, কিছু ভাই শুনবেন, একজন বা দুইজন দোয়া ও জিকিরে থাকবেন, একজন বা দুজন ইস্তিকবালে থাকবেন।

আর মাসজিদের বাইরে যে অংশ কাজ করবেন, সেখানে একজন জিম্মাদার ভাই থাকবেন যিনি এই জামাতকে পরিচালনা করবেন, কয়েকজন মামুর ভাই থাকবেন যাদের অন্তরে থাকবে ফিকির এবং মুখে থাকবে জিকির, রাস্তার ডান সাইড দিয়ে চলবে, তারা সালাম দিবেনও না সালামের উত্তরও নিবেন না। একজন মোতাকাল্লিম ভাই থাকবেন যিনি তিনটি বিষয়ের উপর অর্থাৎ তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত এর উপর ফোকাস করে দাওয়াত দিবেন। দাওয়াত এত বড় না হওয়া যাতে করে যাকে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে সে বিরক্ত বোধ করে। যখন মুতাকাল্লিম ভাই দাওয়াত দিবেন তখন তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা গুলো শ্রবণ করা এবং যাকে দেওয়া হচ্ছে তার জন্য অন্তরে ফিকির করা, যাতে সে মাসজিদ মুখি হয়ে যায়। আর একজন রাহবার ভাই থাকবেন, যিনি মানুষকে দুনিয়াবী কাজ থেকে ফারাগ করে নিয়ে মোতাকাল্লিম ভাইয়ের সাথে পরিচয় করায় দিবেন।

তো ইনশাল্লাহ এখন যাওয়া যায়।

তারফি কথা - ১

by Md. Sojol Mia, CoU

প্রত্যেক জমানায় আল্লাহ তায়ালা দীনকে জিন্দা করছেন, হিজরত ও নূসরতের দ্বারা ! আল্লাহ'র রাসূল যখন তায়েফে হিযরত করলেন,তখন তায়েফবাসী তাকে নূসরত তো করলোই না বরং নবীজিকে প্রচন্ড কষ্ট দিয়ে সেখান থেকে বের করে দিল ! ফলে তাৎক্ষনিক সেখান থেকে দীন জিন্দা হয়নি !

যখন নবীজি আবিসীনিয়ায় সাহাবীদের জামাত প্রেরণ করলেন,তখন আবিসীনিয়ার ন্যায় পরায়ন বাদশা তাদের দুনিয়াবি লাইনে তো নূসরত করলো কিন্তু দীনি লাইনে কোন নূসরত করলোনা ! একারনে তাৎক্ষনিক ভাবে সেখানেও দীন জিন্দা হয়নি ! এরপর যখন আল্লাহ'র হুকুমে হুজুর (সাঃ) মদীনায় হিজরত করলেন,তখন মদীনাবাসী তাকে দীনি-দুনিয়াবী হরলাইনে নূসরত করলেন ! আর আল্লাহ তায়ালা সেখান থেকে দীনকে গোটা দুনিায় জিন্দা করলেন ! তিনি মদীনাকে এত দামি বানায়লেন,মদীনাবাসীকে এত দামি বাায়লেন যে,গোটা দুনিয়ার দাওয়াতের মারকাজ মদীনাকে করলেন ! যারা হিজরত করে আসছেন তারা হল মুহাজির আর যারা,তাদের বিভিন্ন লাইনে নূসরত করছে তারা হল আনসার ! হুজুর পাক (সাঃ) বলেন,'আনসারগণ হল আমার জামার ভিতরের অংশ, এবং মুহাজিরগণ হল আমার জামার বাহিরের অংশ' আনসারদের সম্পর্কে হুজুর (সাঃ) আরো বলেন,'সবাই যদি এক পথে চলে আর আনসাররা যদি ভান্ন পথে চলে ! তবে আমার মন চায় আমি যেন আনারদের পথেই চলি l' হুজুর (সাঃ) আনসারদের জন্য দুয়া করতেন,'হে আল্লাহ ! আপনি আনসারদেরকে মাফ করুন,তাদের আওলাদদেরকে মাফ করুন,তাদের আওলাদদের আওলাদদেরকেও মাফ করুন ' শুধু মাত্র দীনকে সাহায্য করার কারনে আল্লাহ তায়ালা মদীনার আনসারদরকে কত দামি বানায় দিছেন ! 'যে আল্লাহ'র দীনকে সাহায্য করে আল্লাহ তায়ালা তাকে সাহায্য করেন !' তো আমরাও সেই একই নকল হরকত নিয়ে আপনাদের মহল্লায় , আপনাদের মসজীদে সফর করে আসছি ! আমরা দুনিয়ার লাইনে সমস্ত আসবাব,সামান তো নিয়ে আসছি বাকি আপনারা যদি আমাদেরকে শুধু দীনি লাইনে নূছরত করেন,তাহলে আল্লাহ চাইলে এই মহল্লা থেকেও তিনি দীনকে চম্কাবেন,এই মহল্লা এবং মহল্লাবাসীকেও দামি বানায় দিবেন ! আমাদের মাঝে উলামায়ে হযরতগণ আছেন, ডাঃ আছেন,ইঞ্জিঃ আছেন,চাকুরিজীবি আছেন,ব্যাবসায়ী আছেন,ছাত্র আছেন ! আপনারা আমাদের আপনাদের চাহিদা অনুযায়ী মেহনত করাইতে পারেন ! সব তবকার মানুষের কাছে দাওয়াত দেয়ার জন্য নিয়ে গেলেন ! কত ভাই আছেন মহল্লায় যারা বিভিন্ন হালত , বিভিন্ন জরুরতের জন্য মসজিদে আসতে পারতেছেনা ,তাদের দারে দারে নিয়ে গিয়ে গাস্ত করাইলেন ! আমরা ইনশা-আল্লাহ সব সময় তৈয়ার ! তো তিন দিন বেড়িং সহ আমাদের সাথে যে যে ভাই থাকবেন,এবং যে যখন যতটুকু পারেন দীনের খাতিরে আমাদের সময় দিন ! ইনশা-আল্লাহ এই মহল্লাহ থেকেও আল্লাহ দীনকে জিন্দা করবেন, ইনশাআল্লাহ।

তারুফি কথা - ২

by Md. Sojol Mia, CoU

আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ পাকের বহুৎ বড় এহসান, আর ফজল ও করম তিনি নিজ দয়ায়, নিজ মায়ায় আমাদের সকলকে মসজিদে আসার তৌফিক দান করেছেন। আল্লাহ পাক যাদের পছন্দ করেন, তাদেরই মসজিদে আসার তৌফিক দান করেন। তারপর দ্বীনের এক ফিকির নিয়ে বসার সুযোগ দিয়েছেন। এক লাখ বা দুই লাখ চব্বিশ হাজার পয়গাম্বর যে কাজ করে গেছেন আমাদের সেই কাজে লাগিয়েছেন। সে জন্য মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি, আলহামদুলিল্লাহ্।

কুরআনের ঘোষণা এই যে, হে দুনিয়ার মানুষ তোমরা আল্লাহ কে এক বলে স্বীকার করে নাও, তোমরা কামিয়াব হয়ে যাবে। অর্থাৎ তোমরা জান্নাতি হয়ে যাবে।

মানুষ যখনই দ্বীন থেকে গাফেল হয়ে গেছে, আখিরাতকে ভূলে দুনিয়ামুখী হয়েছে, একমাত্র আল্লাহপাকের উপর ভরসাকে ছেড়ে সৃষ্ট বস্তুর উপর একীন করেছে তখনই আল্লাহপাক মানুষের কামিয়াবী ও নাজাতের জন্য পর্যায়ক্রমে লক্ষাধিক নবী রাসূলকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক নবী রাসূলই মানুষকে এক আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সমস্ত নবী ও পয়গাম্বর কষ্ট মুজাহাদা সহ্য করে গেছেন।

হযরত ইব্রাহীম আঃ নমরুদের আগুনে প্রবেশ করেছেন। হযরত ইউনুছ আঃ মাছের পেটে গিয়েছিলেন, হযরত ঈসা আঃ এর পরে ছয়শত বছরের উর্ধে দ্বীনের দাওয়াত না থাকার কারণে কাবাগৃহে ৩৬০ টি দেব মূর্তি আশ্রয় নিয়েছিল। আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুওয়াত প্রাপ্ত হয়ে দ্বীনের দাওয়াত যখন মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছাতে লাগলেন তখন তাকে অপমানিত ও লাঞ্চিত হতে হয়েছে। যে দেহে মশা মাছি পড়া হারাম ছিল, সেই দেহে তায়েফবাসীরা পাথর মেরে শরীর রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। এমনকি তাহার জুতা মোবারক পায়ে আটকে গিয়েছিল। তবুও তিনি তাদের অভিশাপ দেন নাই।

মক্কার কাফেররা যখন চরমভাবে কষ্ট দিতে লাগল তখন সাহাবীদের দুটি জামাত আফ্রিকার আবিসিনিয়া নামক দেশে হিজরত করেন। আবিসিনিয়ার অধিবাসীরা এই জামাতকে সর্বদিক থেকে সাহায্য সহযোগিতা করে কিন্তু দ্বীন কবুল করে নাই। ফলে সেখানে দ্বীন জিন্দা হয় নাই। পরবর্তীতে নবিজী (সাঃ) আল্লাহ পাকের হুকুমে মদীনায় হিজরত করেন। মদীনা বাসীরা তাঁহাকে জান-মাল ও সময় দিয়ে নুছরত করেন ও সেখানে দ্বীন জিন্দা হয়।পাখি যেমন এক ডানা দিয়ে উড়তে পারে না, সাইকেল যেমন এক চাকা দিয়ে চলতে পারে না ঠিক তেমনি হিজরত এবং নুসরত ছাড়া দ্বীন জিন্দা হয় না।যারা হিজরত করেছিল তারা মুহাজের নামে এবং যারা নুছরাত করেছিল তাহারা আনছার নামে পরিচিত।

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতকারী এবং নুসরতকারী অর্থাৎ মোহাজের এবং আনসারদের জন্য গুনাহ মাফের দোয়া করেছেন, তাদেরকে খাটি মুমিন বলেছেন। তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক রিযিক এবং তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।বিশেষ করে আনসারদের জন্য অনেক দোয়া করেছেন। নবীজী এক জায়গায় বলেছেন, হে আল্লাহ আপনি আনসার ও তাদের পুত্রদের এবং তাদের পৌত্রদের মাফ করে দিন। অন্য বর্ননায় এরকম আছে যে তাদের স্ত্রীগণকেও মাফ করে দিন। তাদের প্রতিবেশী এবং গোলামদের মাগফিরাতের জন্যও দোয়া করেছেন।

আল্লাহ পাক কুরআনে বলেছেন "তোমরা যদি একটি কথাও জান তবে অন্যের নিকট পৌঁছিয়ে দাও।" ভাই দ্বীনের দাওয়াতের একটি নকল হরকত নিয়ে এক মুবারক জামায়াত আপনাদের মহল্লার মসজিদে উপস্থিত।আমরাতো ভাই অল্প সময়ের জন্য আপনাদের এলাকায় হিজরত করে এসেছি এজন্য আপনাদের কাছ থেকে নুসরত বা সহযোগিতা কামনা করছি। হতে পারে আপনাদের এবং আমাদের সম্মিলিত চেষ্টার ফলে এই মহল্লায় দ্বীনী পরিবেশ কায়েম হবে ইনশাআল্লাহ। জামায়াত এই মসজিদে ৩ দির থাকবে। কোন কোন ভাই নুছরতের জন্য তৈরি আছেন।

ঈমান ও একীনের কথা

by Md. Sojol Mia, CoU

মানুষের দুনিয়া এবং আখিরাতের সকল সমস্যা সমাধানের মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা। আল্লাহ তাআ'লা সেই জাত যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন কোন পূর্ব নমুনা ছাড়া। আল্লাহ তাআ'লা সেই সত্তা যিনি আসমান সমূহ সৃষ্টি করেছেন কোন খুটি ছাড়া। আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা এই মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু - পরমাণুর স্রষ্টা। আল্লাহ তাআ'লা মালেক। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন মালিক নাই। আল্লাহ তাআ'লা রাজ্জাক। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন রিজিক দাতা নাই। আল্লাহ তাআ'লা হাফিজ। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন হেফাজতকারী নাই। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন সাহায্যকারী নাই।আল্লাহ তাআ'লার হাতে হায়াত - মউত,আল্লাহ তাআ'লার হাতে সুখ - দু:খ, আল্লাহ তাআ'লার লাভ - লোকসান, ইজ্জত - বেইজ্জত। আল্লাহ তাআ'লার হাতে সম্মান - অসম্মান। আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আার যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। আল্লাহ তাআ'লা যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন আর যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন। Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "আসমান ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই, যা চান তিনি সৃষ্টি করেন। যাকে চান কন্যা-সন্তান দেন, যাকে চান পুত্র সন্তান দেন। "Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "অথবা তাদেরকে দেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই। আর যাকে ইচ্ছে বন্ধ্যা করেন। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বাধিক অবহিত ও ক্ষমতাবান।"(Ash-Shuraa 42: Verse 49-50) ভাই দুস্ত বুজুর্গ আজিজু -- অতীতে যা কিছু ঘটেছে তা একমাত্র আল্লাহ তাআ'লার হুকুমেই ঘটেছে। বর্তমানে যা কিছু ঘটছে তা একমাত্র আল্লাহ তাআ'লার হুকুমেই ঘটছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবে তা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লার হুকুমেই ঘটবে। মানুষের চিন্তা - ভাবনা চেষ্টা মেহনতের দ্বারা কিছুই হয়না যা কিছু হয় একমাত্র আল্লাহ তাআ'লার হুকুমেই হয় এর নামই হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

আল্লাহ তাআ'লার সৃষ্টি সম্পর্কে কুরআনের আয়াত সমূহ :

(১) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "আল্লাহ পানি হতে সমস্ত জীবন সৃষ্টি করেছেন। তাদের কতক পেটের ভরে চলে, কতক দু’পায়ের উপর চলে, আর কতক চার পায়ের উপর চলে। আল্লাহ যা চান তাই সৃষ্টি করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ের উপর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী।"(An-Nur 24: Verse 45)

(২) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said : "যখন ইবরাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি মৃতকে কীরূপে জীবিত করবে আমাকে দেখাও’। আল্লাহ বললেন, ‘তুমি কি বিশ্বাস কর না’? সে আরয করল, ‘নিশ্চয়ই, তবে যাতে আমার অন্তঃকরণ স্বস্তি লাভ করে (এজন্য তা দেখতে চাই)’। আল্লাহ বললেন, তাহলে চারটি পাখী নাও এবং তাদেরকে বশীভূত কর। তারপর ওদের এক এক টুকরো প্রত্যেক পাহাড়ের উপর রেখে দাও, অতঃপর সেগুলোকে ডাক দাও, তোমার নিকট দৌড়ে আসবে। জেনে রেখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" (Al-Baqarah 2: Verse 260)

( ৩) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said : "তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ যদি তোমাদের উপর রাতকে ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করতেন তাহলে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ আছে কি যে তোমাদেরকে আলো এনে দিত? তবুও কি তোমরা কর্ণপাত করবে না?"Allah Subhanahu Wa Ta'ala said:"তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ যদি তোমাদের উপর দিনকে ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করতেন তাহলে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ আছে কি যে তোমাদের জন্য রাত্রি এনে দিত যাতে তোমরা আরাম করতে? তোমরা কি চিন্তা করে দেখবে না?"( Al-Qasas 28: Verse 71-72)

(৪) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said : আমি রাত ও দিনকে করেছি দু’টি নিদর্শন; রাতকে করেছি নিরালোক এবং দিনকে করেছি আলোকময়, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বর্ষ সংখ্যা ও হিসাব স্থির করতে পার; এবং আমি সব কিছু বিশদভাবে বর্ণনা করেছি।(Al-Isra' 17: Verse 12)

(৫) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "তোমরা কি পানি সম্পর্কে চিন্তা করে দেখেছ যা তোমরা পান কর?" "তা কি তোমরাই মেঘ থেকে বর্ষণ কর, নাকি তার বষর্ণকারী আমিই? "আমি ইচ্ছে করলে তাকে লবণাক্ত করে দিতে পারি, তাহলে কেন তোমরা শোকর আদায় কর না?" (Al-Waqi'ah 56: Verse 68-70)

চার জন বড় বড় ফেরেস্তার আলোচনা

চার ফেরেশতাগনের নাম ও পরিচয় : কোরআন হাদীসের আলোকে বোঝা যায় চার জন সবচেয়ে বড় ফেরেশতা আছেন। যাদের নাম ভিন্ন এবং কাজ‌ও ভিন্ন। তাহারা আল্লাহর হুকুম পালনে বদ্ধপরিকর। কোন ফেরেশতা মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণ করতে পারে না। আল্লাহ্‌ ছাড়া কেউ কারো কোন কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক নয়। ফেরেশতা, জিন, মানুষ, নবী, ওলী কেউ না। ফেরেশতাগন মানুষের ন্যায় আল্লাহর আরেক সৃষ্টি। তারা দিনরাত ক্লান্ত না হয়ে আল্লাহ্‌-র পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করেন এবং আল্লাহর অবাধ্য হবার কোনো ক্ষমতা তাদের নেই। ফেরেশতারা নূর তথা আলোর তৈরি। তারা খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করেন না। তারা পবিত্র স্থানে অবস্থান করেন। তারা যেকোনো স্থানে গমনাগমন ও আকৃতি পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখেন।

■ হযরত জিবরাঈল ( আঃ ) এর পরিচিতি

ওহী নাযিল করার দায়িত্ব ছিল হযরত জিবরাঈল (আঃ) এর কাজ। হযরত জিবরাঈল ( আঃ) কে বলা হয় সকল ফেরেশতা গনের সরদার। তিনার নাম তিনবার কুরআন শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে তাকে পবিত্র আত্মা বা রুহুল কুদুস বলা হয়েছে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ এবং সংবাদ আদান-প্রদান যেসব ফেরেশতার দায়িত্ব, জিব্রাইল তাদের প্রধান। বলা হয়, জিব্রাইল-ই আল্লাহর নবীদের বা বাণীবাহকদের কাছে ওহী পৌছিয়ে দিতেন।

■ হযরত ইসরাফিল ( আঃ ) এর পরিচিতি

হযরত ইসরাফীল (আঃ) এর দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ ক্রমে শিঙায় ফুৎকার দেয়া। এবং তিনাকে এই কাজের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আর এই কাজটি করা হবে পৃথিবী ধ্বংসের দিন অর্থাৎ কেয়ামতের দিন। এই দিন সকাল থেকেই যথাক্রমে তিনবার ফু দেওয়া হবে তখনই পুরো পৃথিবীসহ পুরো জগত চন্দ্র সূর্য আকাশ গ্রহ নক্ষত্র সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। তার নাম কুরআন শরীফে নেই কিন্তু হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।

■ হযরত মীকাইল ( আঃ ) এর পরিচিতি ।

হযরত মীকাঈল ফেরেশতার কাজ হচ্ছে তিনি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী বৃষ্টি বর্ষণ করান, উদ্ভিদ উৎপাদন, প্রভৃতি কাজে নিয়োজিত। কুরআনে এই ফেরেশতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

■ হযরত আজরাইল ( আঃ ) পরিচিতি

প্রাণীকুলের জান কবজের কাজে নিয়োজিত ফেরেশতা হলো মালাকুল মাওত হযরত আজরাঈল ( আঃ )। কুরআনে মালাক আল-মাউত নামে অভিহিত করা হয়েছে হযরত আজরাইল ( আঃ ) কে।

মানুষ নিয়ে আলোচনা করা :

মহান আল্লাহ পাক রাববুল আলআমিন এই পৃথিবীতে প্রায় ১৮,০০০ মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন ।আর এই সকল সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ট হল মানুষ। মানুষকে আল্লাহ পাক তৈরী করেছেন সুন্দর আকার এবং আকৃতিতে আর তাকে দিয়েছেন চিন্তা করার এবং স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ।এই চিন্তা করার এবং স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আল্লাহ পাক তার আর কোন সৃষ্টিকে দেননি ।আর অসীম এই মহাবিশ্বে অসংখ্য উদাহরন রয়েছে চিন্তাশীল মানুষের জন্য।

মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের জানার ইচ্ছা অসীম।মানুষ এ দুনিয়াতে কোথা থেকে এসেছে বা দুনিয়াতে আসার আগে সে কোথায় কি ভাবে ছিল এবং এ দুনিয়া থেকে যাবার পর বা মরনের পর মানুষ কোথায় যাবে বা মরনের পরেই কি জীবনের শেষ না এর পরেও আরো জীবন আছে এ সম্পর্কে ধর্মের বাইরেও সাধারন মানুষ এবং বিজ্ঞানীদের কৌতুহল অসীম। আর তাই সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং তার জন্ম প্রক্রিয়ার ইতিহাস জানার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচছে।মানব সৃষ্টির রহস্য নিয়ে চিন্তাশীলরা নানা ধরনের ধারনা পোষন করতেন সেই প্রাচীন কাল থেকেই।

আল্লাহ তাআ'লা রিজকদাতা আলোচনা করা:

রিজিক মানে শুধু খাদ্য সামগ্রী নয়, বরং জীবন-উপকরণের সবকিছু। অর্থাৎ সব প্রাণীর জীবন-উপকরণের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা নিজেই গ্রহণ করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের প্রতি দয়ালু, যাকে ইচ্ছা রিজিক দান করেন, তিনি প্রবল পরাক্রমশালী। ( সুরা শুরা: আয়াত ১৯) রিজিক কমবেশি কেন হয়? কেউ পায় কম, কেউবা বেশি। কেউ ধনী হয়, কেউবা গরীব। এর উত্তরও আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে দিয়েছেন ; আল্লাহ তায়ালা যদি তার সব বান্দাকে প্রচুর রিজিক দিতেন, তাহলে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা (রিজিক) সে পরিমাণ অবতীর্ণ করেন। (সুরা শুরা: আয়াত ২৭) অপর আয়াতে এসেছে, তারা কি তোমার পালনকর্তার অনুগ্রহ বণ্টন করে?( না, বরং ) আমিই তাদের মধ্যে রিজিক বণ্টন করি পার্থিব জীবনে এবং তাদের একজনের মর্যাদা অপরজনের ওপরে উন্নত করেছি; যেন তারা একে অন্যকে সেবক রূপে গ্রহণ করতে পারে। (সুরা জুখরুফ: আয়াত ৩২) আরও এরশাদ হয়েছে, তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন; সুতরাং তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তার রিজিক থেকে আহার কর। আর তার নিকটই তোমাদের পুনরুত্থান। ( সুরা মুলুক : আয়াত ১৫) আল্লাহ তায়ালা বান্দার তাকদিরে যা লিখে রেখেছেন এবং যতোটুকু লিখে রেখেছেন, তা সে ততোটুকু পাবেই। চাই সে অক্ষম হোক বা সক্ষম।

(১) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "যমীনে বিচরণশীল এমন কোন জীব নেই যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর নেই, তিনি জানেন তাদের থাকার জায়গা কোথায় আর কোথায় তাদেরকে (মৃত্যুর পর) রাখা হয়, সব কিছুই আছে সুস্পষ্ট লিপিকায়।" (QS. Hud 11: Verse 6)

(২) "তখন তার প্রতিপালক তাকে সন্তুষ্টি সহকারে গ্রহণ করলেন এবং তাকে উত্তমরূপে লালন পালন করলেন এবং যাকারিয়াকে তার তত্ত্বাবধায়ক করলেন। যখনই যাকারিয়া মারইয়ামের কক্ষে প্রবেশ করত, তার কাছে খাদ্য সামগ্রী দেখতে পেত; জিজ্ঞেস করত- হে মারইয়াম! ‘এসব কোত্থেকে তোমার কাছে আসে’? মারইয়াম বলত, ‘ওসব আল্লাহর নিকট হতে (আসে)’। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বেহিসাব রিযক দান করেন।" (Ali 'Imran 3: Verse 37)

(৩) "তোমরা যদি সঠিকভাবে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে, তাহলে তিনি তোমাদের সেভাবে রিজক দিতেন, যেভাবে তিনি পাখিদের রিজক দিয়ে থাকেন—তারা সকালবেলা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বেরিয়ে যায়, আর সন্ধ্যায় ফিরে আসে ভরা-পেটে!" (তিরমিযি, ২৩৪৪) হাদীসটি আমরা অনেকেই জানি। তাওয়াক্কুল নিয়ে বিখ্যাত হাদীস। কিন্তু তারপরও কি আমরা সত্যিকার অর্থে তাওয়াক্কুল করতে পেরেছি? - যখন পছন্দের ভার্সিটিতে চান্স পাই না, আমরা হতাশ হয়ে যাই যখন বয়স হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে হয় না, তখন আমরা হতাশ হয়ে যাই যখন ভাইবা দিলেও চাকরীর ডাক আসে না, তখন আমরা হতাশ হয়ে যাই - যখন অনেক কষ্টে গড়া ব্যবসায় লাভের দেখা মেলে না, তখন আমরা হতাশ হয়ে যাই - যখন অন্যদের বেতন বাড়লেও আমাদের বেতন বাড়ে না, তখন আমরা হতাশ হয়ে যাই আমরা কি আসলেই পেরেছি আল্লাহ তায়ালা র উপর তাওয়াক্কুল করতে ।

(৩) ইবনে সিমাক (রহঃ) এক বাদশাহর নিকট গেলেন। বাদশাহর হাতে পানির গ্লাস ছিল। বাদশাহ তাহার নিকট আবেদন করিল যে, আমাকে কোন নসীহত করুন। ইবনে সিমাক বলিলেন, যদি ইহা বলা হয় যে, এই এক গ্লাস পানি তোমার রাজত্বের বিনিময়ে পাওয়া যাইতে পারে, অন্যথায় পিপাসিতই থাকিতে হইবে ; পানি পাওয়ার অন্য কোন ব্যবস্থা নাই, তবে কি তুমি সমগ্র রাজত্বের বিনিময়ে পানি খরিদ করিতে রাজী হইবে, না পিপাসায় মৃত্যুবরণ করিবে? বাদশাহ বলিল, অবশ্যই রাজী হইয়া যাইব। ইবনে সিমাক (রহঃ) বলিলেন, এই রকম রাজত্বের উপর আনন্দের কি আছে, যাহার সম্পূর্ণটার মূল্য মাত্র এক গ্লাস পানি।

কুর্দ একটি গোত্রের নাম। এই গোত্রে একজন বিখ্যাত ডাকাত ছিল। সে নিজের ঘটনা বর্ণনা করে যে, আমি আমার সাথীদের একদলের সহিত ডাকাতি করিবার জন্য যাইতেছিলাম। রাস্তায় আমরা এক জায়গায় বসিয়াছিলাম। সেখানে আমরা খেজুরের তিনটি গাছ দেখিলাম। তন্মধ্যে দুইটি গাছ খুব ফলে পরিপূর্ণ, আর একটি গাছ একেবারে শুকনা। একটি ছোট্ট পাখি বারবার আসে এবং ফলদার গাছগুলি হইতে তাজা খেজুর ঠোঁটে লইয়া ঐ শুকনা গাছের উপর যায়। আমরা ইহা দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলাম। আমি দশবার ঐ পাখিটিকে খেজুর লইয়া যাইতে দেখিলাম। তখন আমার খেয়াল হইল যে, গাছটিতে চড়িয়া দেখি, পাখিটি এই খেজুরগুলিকে কি করে। সুতরাং আমি গাছের চূড়ায় যাইয়া দেখিলাম, সেখানে একটি অন্ধ সাপ মুখ খুলিয়া পড়িয়া আছে। আর পাখিটি সেই তাজা খেজুর উহার মুখে ঢালিয়া দেয়। ইহা দেখিয়া আমার এমন শিক্ষা হইল যে, আমি কাঁদিতে লাগিলাম। আমি বলিলাম, হে আমার মাওলা! এই সাপ যাহাকে তোমার নবী মারিয়া ফেলিবার হুকুম দিয়াছেন, যখন এই সাপটি অন্ধ হইয়া গিয়াছে, তখন তুমি তাহাকে রিযিক পৌঁছাইবার জন্য একটি পাখীকে নিযুক্ত করিয়া দিয়াছ। আর আমি তোমার বান্দা, তোমার একত্ববাদে বিশ্বাসী, তুমি আমাকে মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনের কাজে লাগাইয়া দিয়াছ। এই কথা বলার পর আমার দিলে এই কথা ঢালা হইল যে, আমার দরজা তওবার জন্য তো খোলা রহিয়াছে। আমি তখনই আমার তলোয়ার ভাঙ্গিয়া ফেলিলাম—যাহা মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনের ব্যাপারে আমার কাজে আসিত এবং আমি আমার মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করিতে করিতে ‘একালাতান একালাতান' (অর্থাৎ ক্ষমা ক্ষমা) বলিয়া চিৎকার করিতে লাগিলাম। তখন গায়েব হইতে আমাকে আওয়াজ দেওয়া হইল—আমি ক্ষমা করিয়া দিলাম, ক্ষমা করিয়া দিলাম। আমি আমার সাথীদের নিকট আসিলাম। তাহারা বলিতে লাগিল, তোমার কি হইয়াছে? বলিলাম, আমি পরিত্যক্ত ছিলাম, এখন সন্ধি করিয়া লইয়াছি। এই বলিয়া আমি সমস্ত ঘটনা তাহাদিগকে শুনাইলাম। তাহারা বলিতে লাগিল, আমরাও সন্ধি করিতেছি। এই বলিয়া সকলেই নিজ নিজ তলোয়ার ভাঙ্গিয়া ফেলিল এবং সমস্ত লুটের মাল ফেলিয়া আমরা এহরাম বাঁধিয়া মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইয়া গেলাম। তিন দিন চলিয়া একটি গ্রামে পৌঁছিলাম। সেখানে একজন অন্ধ বৃদ্ধাকে পাইলাম। সে আমার নাম লইয়া আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করিল যে, তোমাদের মধ্যে এই নামের কোনো কুর্দী ব্যক্তি আছে কি? লোকেরা বলিল, আছে। সে কিছু কাপড় বাহির করিল এবং বলিল, তিনদিন হইয়াছে, আমার ছেলে মারা গিয়াছে। সে এই কাপড়গুলি রাখিয়া গিয়াছে। আমি তিনদিন যাবৎ প্রতিদিন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখিতেছি। তিনি বলিতেছেন, তাহার কাপড়গুলি অমুক কুর্দী ব্যক্তিকে দিয়া দাও। সেই কুর্দী বলেন, আমি সেই কাপড়গুলি লইয়া লইলাম এবং আমরা সকলেই উহা পরিধান করিলাম। (রওজ) এই ঘটনার মধ্যে দুইটি জিনিসই শিক্ষণীয়। এক—অন্ধ সাপের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে রিযিকের ব্যবস্থা এবং হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হইতে কাপড় দান। যখন আল্লাহ তায়ালা কোন ব্যক্তিকে সাহায্য করিতে চাহেন, তখন তাহার জন্য আসবাব ও উপকরণ সৃষ্টি করা কোন মুশকিল নয়। সচ্ছলতা ও অভাবের সমস্ত উপকরণ তিনিই পয়দা করেন। আর সত্যিকার তওবার বরকতে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হইতে কাপড় পাওয়ার সম্মান। স্বয়ং একটি গর্বের বিষয়। এই ঘটনা জলদি মৃত্যুর দ্বারা সচ্ছলতা হাসিল হওয়ার একটি উদাহরণ।

আল্লাহ তাআ'লার নিয়ামতর শুকরিয়া আদায় সম্পর্কে আলোচনা : নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করা হবে :

অন্য এক হাদীসে আছে, একবার প্রখর রৌদ্রের মধ্যে দুপুরের সময় হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযিঃ) মসজিদে নববীতে তশরীফ আনিলেন। হযরত ওমর (রাযিঃ) খবর পাইয়া নিজ ঘর হইতে তশরীফ আনিলেন| এবং হযরত আবু বকর (রাযিঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই সময় কেন আসা হইল? তিনি বলিলেন, প্রচণ্ড ক্ষুধা বাধ্য করিয়াছে। হযরত ওমর (রাযিঃ) বলিলেন, ঐ পবিত্র সত্তার কসম, যাহার হাতে আমার জান, এ অস্থিরতা আমাকেও বাধ্য করিয়াছে। তাহারা উভয়ে এই অবস্থাতেই ছিলেন এমন সময় হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গৃহ হইতে তশরীফ আনিলেন এবং তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা এ সময় কেন আসিলে? তাহারা আরজ করিলেন, হুযূর ! ক্ষুধার তীব্রতা বাধ্য করিয়াছে। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, এই অবস্থায় বাধ্য হইয়া আমিও আসিয়াছি। এই তিন হযরতই উঠিয়া হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাযিঃ)এর বাড়ীতে গেলেন। তিনি নিজে তো উপস্থিত ছিলেন না, তাহার স্ত্রী অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করিলেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করিলেন, আবু আইয়ুব কোথায়? স্ত্রী আরজ করিলেন, হুযূর! তিনি এখনই আসিতেছেন। এমন সময় আবু আইয়ুব (রাযিঃ) আসিয়া গেলেন এবং দ্রুত খেজুরের একটি ছড়া ছিড়িয়া আনিলেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, পূর্ণ ছড়াটি কেন ছিড়িলে? উহা হইতে পাকা পাকা খেজুরগুলি বাছিয়া কেন লইলে না? তিনি আরজ করিলেন, হযরত ! এই খেয়ালে ছিড়িয়াছি যে, পাকা, আধা কাঁচা, শুকনা ও তাজা সব রকমের খেজুর সামনে থাকিবে—যেরূপ খাইতে ইচ্ছা হয় গ্রহণ করিবেন। তাহারা সবরকমের খেজুর ঐ ছড়া হইতে খাইলেন। ইত্যবসরে হযরত আবু আইয়ুব (রাযিঃ) একটি বকরির বাচ্চা জবেহ করিয়া দ্রুত কিছু অংশ আগুনে ভুনা করিলেন, আর কিছু অংশ পাতিলে রান্না করিলেন এবং তাহাদের সম্মুখে আনিয়া রাখিলেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামান্য গোশত একটি রুটিতে পেঁচাইয়া আবু আইয়ুব (রাযিঃ)কে দিয়া বলিলেন, ইহা ফাতেমাকে দিয়া আস, সেও কয়েক দিন যাবৎ এইরূপ কোন জিনিস খায় নাই। তিনি তাড়াতাড়ি দিয়া আসিলেন। তাঁহারা গোশত-রুটি খাইলেন। তারপর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, (আল্লাহ তায়ালার এত নেয়ামত খাইলাম) গোশত-রুটি, কাঁচা খেজুর, পাকা খেজুর ইহা বলিতে বলিতে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চক্ষু মোবারক অশ্রুতে ভরিয়া আসিল। অতঃপর এরশাদ করিলেন, এইগুলিই ঐ সমস্ত নেয়ামত, যাহা সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হইবে। ইহা শুনিয়া সাহাবায়ে কেরামের নিকট বড় কঠিন মনে হইল (যে, এইরূপ কঠিন ক্ষুধার্ত অবস্থায় এই সমস্ত জিনিসও কি জিজ্ঞাসা করার উপযুক্ত?)। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, নিশ্চয়ই। তবে উহার প্রতিকার এই যে, যখন খাইতে শুরু কর, তখন বিসমিল্লাহর সহিত শুরু কর, আর যখন শেষ কর, তখন এই দোআ পড় অর্থাৎ, সমস্ত প্রশংসা শুধু আল্লাহর জন্য, কেননা তিনি আমাদিগকে (কেবল আপন দয়া ও মেহেরবানীতে) পেট ভরিয়া দান করিয়াছেন ; আমাদের উপর নেয়ামত বর্ষণ করিয়াছেন এবং অনেক বেশী পরিমাণে দান করিয়াছেন। (দুররে মানসূর)

হযরত মূসা (আঃ) এর চাচাতো ভাই এর ঘটনা:

ককুরআনের আয়াত-৩ :

কারুন হযরত মূসা (আঃ) এর চাচাতো ভাই ছিল। তাহার ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ। কুরআন পাকে সুরা কাসাসের অষ্টম রুকু সম্পূর্ণটায় তাহার ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে। ব্যাখ্যাসহ উহার তরজমা এই- কারুন (হজরত) মূসা (আঃ) এর স্মপ্রদায়ভুক্ত ( তাহার চাচাতো ভাই) ছিল । অন্তর সে ( সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে) তাহাদের স্মমুখে অহ্নকার করিতে লাগিল। আর আমি তাহাকে এত অধিক পরিমাণ ধনভাণ্ডার দান ক্রিয়াছিলাম যে, উহার চাবিসমূহ কয়েকজন শক্তিশালী লোকের জন্য অত্যন্ত ভারী বোঝা হইত। ( অর্থাৎ, তাহারা অতি কষ্ট বহন করিত, যখন ভাণ্ডারের চাবিই এত বেশী, তখন, জানা কথা, সম্পদও অনেক বেশী হইবে। সে এই অহংকার তখন করিয়াছিল ) যখন তাহাকে তাহার সম্প্রদায়ের লোকেরা (হযরত মূসা ও অন্যান্যরা উপদেশমূলক ) বলিল, তুমি ( এই ধনসম্পদের কারণে) গর্ব করিও না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা যেই পরিমাণ দান করিয়াছেন, উহাতে আখেরাতের ও অন্বেষণ ক্র এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ (আখেরাতে লইয়া যাইতে) ভুলিও না । আর যেইরুপ আল্লাহ তায়ালা তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন, তদ্রূপ তুমিও (তাহার বান্দাদের প্রতি) অনুগ্রহ কর (আর আল্লাহ তায়ালার নাফরমানী ও ওয়াজিব হকসমূহ নষ্ট করিয়া) দুনিয়াতে ফাসাদ কামনা করিওনা । নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ফাসাদকারীদিগকে পছন্দ করেন না। কারুন (তাহাদের উপদেশ শুনিয়া ) বলিল, এই সমস্ত ধন- সম্পদ আমি নিজের বুদ্ধিমত্তার বলেই পাইয়াছি। ( অর্থাৎ, আমার কাজের দক্ষতা দ্বারা এই সম্পদ সঞ্চয় করিয়াছি। ইহাতে কোন অদৃশ্য অনুগ্রহ বা কাহারও কোন হক নাই। আল্লাহ তায়ালা তাহার এই কথার জওয়াবে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিয়া বলেন,) সে (কারুন) কি ইহা জানে না যে, আল্লাহ তায়ালা তাহার পূর্বে বিগত জাতিসমুহের মধ্য হইতে এমন লোকদের ধবংস করিয়াছেন, যাহারা সম্পদের শক্তিতেও ছিল তাহার অপেক্ষা বহুগুণে প্রবল এবং (জনগোষ্ঠী হিসাবেও ) তাহাদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশী। (ইহা তো দুনিয়াতে হইয়াছে, আর আখেরাতে জাহান্নামের আযাব ভিন্ন রহিয়াছে।) আর পাপীদেরকে তাহাদের পাপকার্য সম্পর্কে (জানিবার উদ্দেশ্যে ) জিজ্ঞাসাও করা হিইবে না ( কেননা, প্রক্যেক ব্যক্তির সম্পূর্ণ অবস্থা আল্লাহ তায়ালা জানেন, তবে নালিশের কারণে জিজ্ঞাসাবাদ করা ভিন্ন কথা।) অতঃপর (কারুন একবার ) আপন জাঁক- জমকের সহিত সম্প্রদায়ের লোকদের সম্মুখে বাহির হইল। (তাহার সম্প্রদায়ের মধ্যে) যাহারা দুনিয়ার প্রতি আগ্রহী ছিল, তাহারা বলিতে লাগিল, আহা! কি উত্তম হইত, আমরাও যদি এই সাজ- সরঞ্জাম প্রাপ্ত হইতাম, যাহা কারুন প্রাপ্ত হইয়াছে । বাস্তবিকই সে (কারুন) বড় ভগ্যবান, । ( তাহারা সম্পদের আকাঙ্ক্ষা ও লোভের কারণ এইরূপ বলিয়াছিল, ইহাতে তাহারা কাফের হইয়া যায় নাই। এখনও অনেক মুসলমান অন্যান্য সম্প্রদায়ের সুনিয়াবী উন্নতি দেখিয়া সর্বদা লোভ করিতে থাকে এবং এই চেষ্টায় রত থাকে , জাহাতে কাহাদের ন্যায় আমাদেরও পার্থিব উন্নতি নসীব হয়।) আর যাহাদেরকে দ্বীনী এলেম (এবং উহার বুঝ) দান করা হিয়াছিল,তাহারা এই লোভীদেরকে ) বলিতে লাগিল, আরে তোমাদের নাশ হউক ( তোমরা এই দুনিয়ার ব্যাপারে কিসের লোভ করিতেছ?) আল্লাহ তায়ালার দেওয়া প্রতিদান ( এই কয়েক দিনের ধন-সম্পদ হইতে লক্ষ লক্ষ গুণ) উত্তম। যাহা এমন লোকেরা পাইবে, যাহারা ঈমান আনিয়াছে এবং নেক কাজ করিয়াছে ( তাহাদের মধ্যেও পূর্ণ মর্যাদার সওয়াব) ঐ সমস্ত লকদেরকেই দেওয়া হইবে , যাহারা ধৈর্যশীল। অতঃপর (যখন আমি কারুনের অবাধ্যতা ও ফাসাদের কারণে) তাহাকে ও তাহার মহলকে জমিনে ধসাইয়া দিলাম, তখন এমন কোন দল হয় নাই যাহারা তাহাকে আল্লাহর আজাব হইতে বাঁচাইতে পারে এবং সে নিজেও কোন বুদ্ধি করিয়া বাঁচিতে পারে না এবং কেহ বাঁচিতে পারে না । কারুনের উপর এই আযাবের অবস্থা দেখিয়া) গতকল্য যাহার মত হইবার আকাঙ্ক্ষা করিতেছিল, তাহারা বলিতে লাগিল , মনে হইতেছে , ( রিযিকের প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতার ভিত্তি সোভাগ্য বা দূর্বাগ্যের উপর নয়, বরং ) আল্লাহ তায়ালা তাহার বান্দাদের মধ্য হইতে যাহাকে ইচ্ছা, রুজির প্রশস্ততা দান করেন , আর যাহার জন্য চাহেন, সংকীর্ণ করিয়া দেন। ( ইহা আমাদের ভুল ছিল যে , উহার প্রশস্ততাকে সোভাগ্য মনে করিতেছিলাম । বাস্তবিকই ) যদি আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানী না হইত, তবে আমাদিগকেও ধসাইয়া দিতেন ( কেননা, আমরাও তো গোনাহগার )। এখন বুঝে আসিয়া গেল যে , কাফেরদের জন্য সফলতা নাই ( যদিও তাহারা এই কয়েক দিনের জীবনের স্বাদ উপভোগ করিয়া লয় )। ( বয়ানুল কুরআন; কিঞ্চিত পরিবর্তিত) ( কাসাসঃ ৭৬-৮২)

ফায়দাঃ

হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, কারুন হযরত মূসা (আঃ) এর সম্প্রদায়ের লোক ছিল। তাহার চাচাতো ভাই ছিল । (দুনিয়াবী) বিদ্যা- বুদ্ধিতে যথেষ্ট উন্নতি করিয়াছিল । হযরত মূসা (আঃ) এর প্রতি হিংসা পোষণ করিত। মূসা (আঃ) তাহাকে বলিলেন , আল্লাহ তায়ালা আমাকে তোমার নিকট হইতে যাকাত উসুল করিতে আদেশ দিয়েছেন। সে যাকাত প্রদান করিতে অস্বীকার করিল এবং লোকদের নিকট বলিতে লাগিল, মূসা যাকাতের নামে তোমাদের সম্পদ আত্নসাৎ করিতে চায়। সে নামাযের হুকুম –আহকাম জারি করিয়াছে, সেইগুলিকে তোমরা সহ্য করিয়াছ । এখন সে তোমাদেরকে যাকাতের হুকুম করিতেছে, তোমরা কি ইহাও সহ্য করিবে ? লোকেরা বলিল, আমরা ইহা সহ্য করিব না । তুমিই কোন বুদ্ধি বলিয়া দাও। সে বলিল , আমি এই বুদ্ধি করিয়াছি যে, কোন চরিত্রহীনা মহিলাকে এই মর্মে রাজি করাইব যে, সে মূসার উপর অপবাদ দিবে যে , তিনি আমার সহিত ব্যভিচার করিতে চান । লোকেরা একটি চরিত্রহীনা মহিলাকে অনেক পুরস্কার দিবে বলিয়া এই বিষয়ে সম্মত করাইল। সে রাজি হওয়ার পর কারুন হযরত মূসা (আঃ) এর নিকট গেলে এবং তাহাকে বলিল , আল্লাহ তায়ালা আপনাকে যেই সমস্ত হুকুম- আহকাম দিয়াছেন, উহা সমস্ত বনী ইসরাইলকে একত্রিত করিয়া সুনাইয়া দিন । হযরত মূসা (আঃ) ইহা পছন্দ করিলেন এবং সমস্ত বানী ইসরাইলকে সমবেত করিলেন । যখন সবাই সমবেত হইল, তখন হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তায়ালার হুকাম- আহকাম বলিতে আরম্ভ করিলেন , আল্লাহ তায়ালা আমাকে এই হুকুম করিয়াছেন যে , তোমরা তাহার আবাদত কর, কাহাকেও তাহার সহিত শরীক করিও না। আত্নীয়-সবুনের সহিত সৎ ব্যবহার কর । এইভাবে আরও অন্যান্য হুকুম শুনাইলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি ইহাও বলিলেন যে, যদি কোন বিবাহিত পুরুষ ব্যভিচার করে তবে তাহাকে পাথর নিক্ষেপ করিয়া হত্যা করা হইবে । লোকেরা বলিল , যদি আপনি নিজে ব্যভিচার করেন ? হযরত মূসা (আঃ) বলিলেন , যদি আমি ব্যভিচার করি তবে আমাকেও পাথর নিক্ষেপ করা হইবে, লোকেরা বলিল, আপনি ব্যাভিচার করিয়াছেন? । হযরত মূসা (আঃ) (অবাক হইয়া ) বলিলেন, আমি! লোকেরা বলিল, জি¦ হাঁ আপনি। এই বলিয়া তাহারা ঐ মেয়েলোকটিকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তুমি হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে কি বল? হযরত মূসা (আঃ) ও তাহাকে কসম দিয়া বলিলেন, তুমি কি বল? মেয়ে লোকটি বলিল, যখন আপনি কসম দিলেন, তখন বলিতে হয় যে, ইহারা আমকে অনেক পুরস্কার দেওয়ার ওয়াদা করিয়াছে, যাহাতে আমি আপনার উপর অপবাদ দেই। আপনি এই অপবাদ হইতে সম্পূর্ণ পবিত্র। ইহা শুনিয়া হযরত মূসা (আঃ) কাঁদিতে কাঁদিতে সেজদায় পরিয়া গেলেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে সেজদার মধ্যেই ওহি আসিল -হে মূসা! কাঁদিবার কি আছে, তোমাকে আমি এই সকল লোকদেরকে শাস্তি দেওয়ার জন্য জমিনের উপর ক্ষমতা দান করিলাম। ইহাদেরকে শাস্তি দেওয়ার জন্য জমিনের উপর ক্ষমতা দান করিলাম । ইহাদের সম্পর্কে তোমার যাহা ইচ্ছা, জমিনকে হুকুম কর। হযরত মূসা (আঃ) সেজদা হইতে মাথা উঠাইয়া জমিনকে হুকুম করিলেন, ইহাদেরকে গিলিয়া ফেল। জমিন তাহাদেরকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত গিলিয়া ফেলিয়াছিল। তখন তাহারা অনুনয়-বিনয় করিয়া হযরত মূসা (আঃ) কে ডাকিতে লাগিল। মূসা (আঃ) পুনরায় হুকুম করিলেন, ইহাদেরকে ধসাইয়া ফেল । এমনকি তাহারা ঘাড় পর্যন্ত ধসিয়া গেল। তখন তাহারা চিৎকার করিয়া হযরত মূসা (আঃ) কে ডাকিতে লাগিল। হযরত মূসা (আঃ) পুনরায় জমিনকে একই হুকুম করিলেন যে, ইহাদেরকে সম্পূর্ণরুপে গিলিয়া ফেল। জমিন তাহাদের সকলকে সম্পূর্ণভাবে গিলিয়া ফেলিল। তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে হযরত মূসা (আঃ) এর নিকট ওহী আসিল, তাহারা তোমাকে ডাকিতেছিল এবং তোমার নিকট অনুনয়-বিনয় করিতেছিল, আমার ইযযতের কসম! যদি তাহারা আমাকে ডাকিত আর আমার নিকট দোয়া করিত, তবে আমি তাহাদের দোয়া কবুল করিয়া লইতাম। অন্য এক হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) হইতে বর্ণিত আছে, উক্ত আয়াতে দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না, ইহার অর্থ এই যে দুনিয়াতে তুমি আখেরাতের জন্য আমল কর। হযরত মুজাহিদ (রহঃ) হইতে বর্ণনা করা হইয়াছে, দুনিয়ার অংশ বলিতে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য বুঝায়, যাহার সওয়াব আখেরাতে পাওয়া যায়। হযরত হাসান (রহঃ) হইতে বর্ণনা করা হইয়াছে, দুনিয়া হইতে নিজের অংশ ভুলিও না অথাৎ, দুনিয়াতে যতটুকু প্রয়োজন উহাকে রাখ । আর যাহা অতিরিক্ত উহা আখেরাতের জন্য পাঠাইয়া দাও। অন্য এক হাদীসে হযরত হাসান (রহঃ) হইতে বর্ণনা করা হইয়াছে, এক বছরের রুজি রাখিয়া দাও । ইহার অতিরিক্ত যাহা হয়, উহা সদকা করিয়া দাও । (দুররে মানসূর) এই সম্পর্কিত কিছু বিবরণ কৃপণতার বর্ণনায় দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের আট নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হইয়াছে।

হযরত আবু হুরইরহ রদিয়াল্লহু আ’নহু (أبىْ هريْرة رضى الله عنْه) নবী করীম সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের এরশাদ বর্ণনা করেন যে, তিনি এরশাদ ফরমাইয়াছেন, আল্লহ তায়া’লা কিয়ামাতের দিন যমীনকে আপন মুষ্টিতে ধারণ করিবেন এবং আসমানকে আপন ডান হাতে পেঁচাইয়া লইবেন, অতঃপর বলিবেন, আমিই বাদশাহ! যমীনের বাদশাহরা কোথায়? (বুখারী)

হেকায়েতা সাহেবা :

আমাদের আইডল হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রাযিঃ) এর শাহাদত।

হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রাযিঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে অত্যন্ত আদর যত্নে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন এবং ধনী ছেলেদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাহার পিতা তাঁহাকে দুইশত দেরহামের কাপড় জোড়া খরিদ করিয়া পরাইতেন। যুবক বয়সের ছিলেন, অত্যন্ত আদর-যত্নে ও মাল—ঐশ্বর্যে লালিত হইতেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগেই পরিবারের লোকজনকে না জানাইয়া মুসলমান হইয়া গেলেন এবং এইভাবেই রহিলেন। কেহ যাইয়া পরিবারের লোকদেরকে জানাইয়া দিলো। তাহারা তাহাকে বাঁধিয়া কয়েদ করিয়া রাখিল। কিছুদিন এইভাবে কাটাইবার পর কোন এক সুযোগে গোপনে পালাইয়া গেলেন এবং হাবশার দিকে হিজরতকারীদের সঙ্গে চলিয়া গেলেন। সেইখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন এবং অত্যন্ত দারিদ্র্যময় জীবন অতিবাহিত করিতে থাকেন। এতই অভাব-অনটনের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করিতেছিলেন যে, একবার হযরত মুসআব (রাযিঃ) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন তাঁহার পরনে কেবল একটি মাত্র চাদর ছিল তাহাও কয়েক জায়গায় ছিঁড়া। এক জায়গায় কাপড়ের পরিবর্তে চামড়ার তালি লাগানো ছিল, তাঁহার বর্তমান অবস্থা এবং পূর্বের অবস্থার কথা স্মরণ করিয়া নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চক্ষু অশ্রুতে ভরিয়া গেল। উহুদের যুদ্ধে মুহাজিরদের ঝাণ্ডা তাহার হাতে ছিল। যখন মুসলমানরা অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় ছত্রভঙ্গ হইয়া যাইতেছিলেন তখন তিনি অবিচল অবস্থায় দাঁড়াইয়া থাকেন। জনৈক কাফের নিকটে আসিয়া তরবারী দ্বারা তাহার একটি হাত কাটিয়া ফেলে যেন ঝাণ্ডা নিচে পড়িয়া যায় এবং মুসলমানদের প্রকাশ্য পরাজয় হইয়া যায়। তিনি সাথে সাথে অপর হাতে ঝাণ্ডা ধারণ করিলেন। কাফের তাহার অপর হাতটিও কাটিয়া ফেলিল, তখন তিনি উভয় বাহুর সাহায্যে বুকের সহিত ঝাণ্ডা আঁকড়াইয়া ধরিলেন যাহাতে পড়িয়া না যায়। সে কাফের তাহার প্রতি তীর নিক্ষেপ করিলে তিনি শহীদ হইয়া গেলেন। কিন্তু জীবিত থাকা অবস্থায় ঝাণ্ডাটিমমাটিতে পড়িতে দেন নাই। অতঃপর ঝাণ্ডা মাটিতে পড়িয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে অপর একজন তাহা উঠাইয়া লইল। দাফনের সময় তাহার নিকট একটি মাত্র চাদর ছিল। উহা দ্বারা সম্পূর্ণনশরীর ঢাকা যাইতেছিল না। মাথা ঢাকিতে গেলে পা খুলিয়া যাইত আরনপা ঢাকিতে গেলে মাথা খুলিয়া যাইত। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, চাদর দ্বারা মাথা ঢাকিয়া দাও আর পায়ের দিকে ইযখির পাতা দ্বারা ঢাকিয়া দাও। (কুররাতুল উয়ূন, ইসাবাহ্)

ফায়দা ঃ ইহা হইল ঐ ব্যক্তির জীবনের শেষ সময়। যিনি অত্যন্ত আদর-যত্নে ও আরাম-আয়েশে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। দুইশত দেরহাম মূল্যের কাপড় জোড়া পরিধান করিতেন আর আজ কাফনের জন্য একটি পূর্ণ চাদরও তাহার মিলিতেছে না। আর অপর দিকে হিম্মত ও সাহসের অবস্থা এই যে, জীবন থাকা অবস্থায় ঝাণ্ডা হাত হইতে পড়িতে দেন নাই। উভয় হাত কাটা যাওয়ার পরও ঝাণ্ডা ছাড়িলেন না। অত্যন্ত আদর-যত্নে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন কিন্তু ঈমান তাহাদের মধ্যে এতই দৃঢ়ভাবে স্থান করিয়া লইত যে, এই ঈমান তাহাদিগকে টাকা পয়সা আরাম-আয়েশ হইতে সরাইয়া নিজের মধ্যে মগ্ন করিয়া নিত।

সালমান ফারেসী (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী :

আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালমান আল-ফারেসী (রাঃ) নিজে তাঁর কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমি একজন পারসিক ছিলাম। আমার জন্মস্থান ছিল ইস্পাহানের অন্তর্ভুক্ত ‘জাই’ নামক গ্রাম। পিতা ছিলেন গ্রামের সর্দার। আর আমি তাঁর নিকট ছিলাম আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়। আমার প্রতি তাঁর ভালবাসা এরূপ ছিল যে, তিনি সবসময় আমাকে বাড়িতে আবদ্ধ করে রাখতেন। অর্থাৎ (পূজার) আগুনের তত্ত্বাবধায়ক করে রাখতেন। যেমন কোন বাঁদীকে আটকিয়ে রাখা হয় (তেমন আমাকে আবদ্ধ করে রাখতেন)। এতে করে আমি অগ্নিপূজায় খুবই মনোযোগী হ’লাম এবং এক পর্যায়ে আগুনের এমন খাদেম বনে গেলাম যে, মুহূর্তের জন্যও আগুন নিভতে দিতাম না। সেই সাথে আমার পিতার ছিল অঢেল ভূসম্পত্তি।

তিনি একদিন তাঁর একটি গৃহ নির্মাণে ব্যস্ত হ’লেন এবং আমাকে বললেন, হে বৎস! আমি বর্তমানে আমার খামারে একটি গৃহ নির্মাণ করছি। তুমি যাও এবং তা দেখাশুনা কর। সেখানে তিনি যা করতে চান সে বিষয়ে আমাকে নির্দেশনা দিলেন। অতঃপর আমি তার খামারের দিকে রওয়ানা হ’লাম। পথিমধ্যে আমি খৃষ্টানদের কোন এক গির্জার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। যেখানে তারা ছালাত আদায় করছিল। আমি তাদের আওয়ায শুনতে পেলাম। মূলতঃ পিতা আমাকে গৃহবন্দী করে রাখার কারণে মানুষের চাল-চরিত্র সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। তাই যখন তাদের আওয়ায শুনতে পেলাম, তখন তাদের কর্মকান্ড দেখার জন্য আমি তাদের নিকট গেলাম। অতঃপর আমি যখন তাদের ছালাত দেখলাম তখন আমার ভাল লাগল। ফলে আমি তাদের কর্মকান্ডের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমাদের ধর্মের চেয়ে এ ধর্মই উত্তম। আল্লাহর কসম! আমি পিতার খামারে যাওয়া বাদ দিয়ে এখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করব। আমি তাদের (খৃষ্টানদের) জিজ্ঞেস করলাম, এ ধর্মের উৎপত্তি কোথায়? তারা বলল, সিরিয়ায়। তিনি বলেন, এরপর আমি আমার বাবার নিকট ফিরে এলাম। ইতিমধ্যে তিনি আমাকে খোঁজার জন্য লোক পাঠিয়েছিলেন এবং আমার কারণে তিনি সব কাজ থেকে বিরত ছিলেন। আমি আসার সাথে সাথে তিনি বলেন, হে বৎস! তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে যে দায়িত্ব দেওয়ার সেটা কি দেইনি? আমি বললাম, হে আববা! আমি কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, যারা গির্জায় ছালাত আদায় করছিল। তাদের ধর্মাচরণ আমার খুবই ভাল লেগেছে। আল্লাহর কসম! আমি সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাদের নিকট অবস্থান করেছি। তিনি বললেন, হে বৎস! ঐ ধর্মের মধ্যে কোন মঙ্গল নেই। তোমার ও তোমার বাপ-দাদার ধর্ম তার চেয়ে অধিক উত্তম। আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম! কখনও তা নয়। ঐ ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

তিনি বলেন, অতঃপর তিনি আমাকে ভয় দেখালেন এবং পায়ে বেড়ি পরিয়ে আমাকে বাড়িতেই বন্দী করে রাখলেন। আমি খৃষ্টানদের নিকট সংবাদ পাঠালাম যে, যখন তোমাদের নিকট শামের খৃষ্টান ব্যবসায়ী কাফেলা আসবে তখন তোমরা আমাকে জানাবে। তিনি বলেন, (কিছুদিন পর) তাদের নিকট শামের এক খৃষ্টান ব্যবসায়ী কাফেলা আসে। অতঃপর তারা আমাকে সংবাদ প্রদান করে। আমি তাদের বললাম, যখন তারা তাদের প্রয়োজনাদি সেরে ফেলবে এবং দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করবে, তখন আমাকে জানাবে। তিনি বলেন, যখন তারা তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করল তখন আমাকে সংবাদ দিল। অতঃপর আমি আমার পা থেকে বেড়ি খুলে ফেললাম এবং তাদের সাথে সিরিয়ার পথে যাত্রা করলাম।

সিরিয়া পৌঁছার পর আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের মধ্যে এ ধর্মের ব্যাপারে সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি কে? তারা বলল, গির্জার পাদ্রী। তিনি বলেন, অতঃপর আমি পাদ্রীর নিকট গেলাম এবং বললাম, আমি এ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। অতএব আমি আপনার সাহচর্য লাভ করে গির্জাতেই আপনার খিদমত করতে চাই, আপনার নিকট শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই এবং আপনার সাথে ছালাত আদায় করতে চাই। অতঃপর তিনি (পাদ্রী) আমাকে গির্জাতে প্রবেশ করতে বললে আমি তার সাথে গির্জায় প্রবেশ করলাম। তিনি বলেন, তিনি অসৎ লোক ছিলেন। মানুষজনকে তিনি ছাদাক্বা দেয়ার জন্য আদেশ করতেন এবং খুবই উৎসাহিত করতেন। কিন্তু যখন লোকজন তার নিকট (ছাদাকার) দ্রব্যাদি জমা দিত, তখন তিনি মিসকীনদের কিছুই না দিয়ে তা নিজের জন্য জমা করে রাখতেন। এভাবে তিনি স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে সাতটি কলস পূর্ণ করেন। তিনি বলেন, আমি যখন এরূপ কার্যকলাপ দেখলাম তখন তার প্রতি ভীষণ ক্রুদ্ধ হ’লাম। (এর কিছুদিন পর) তিনি মারা গেলেন। খৃষ্টানগণ তাকে দাফন করার জন্য সমবেত হল। আমি তাদের বললাম, এ ব্যক্তিটি অসৎ ছিল। তোমাদের সে ছাদাক্বাহ করার আদেশ দিত ও উৎসাহিত করত বটে, কিন্তু যখন তোমরা তাকে সম্পদ দিতে তখন সে তা নিজের জন্য সঞ্চয় করে রাখত এবং মিসকীনদের তা থেকে কিছুই দিত না। তারা বলল, এ ব্যাপারে তোমার কি জানা আছে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি তোমাদের তার সম্পদ সম্পর্কে অবহিত করব। তারা বলল, আমাদের তা জানিয়ে দাও। তিনি বলেন, আমি তাদের ঐ লোকটির (সম্পদ গচ্ছিত রাখার) স্থান দেখালাম। তারা সেখান থেকে স্বর্ণ-রৌপ্যপূর্ণ সাতটি কলস বের করল। তিনি বলেন, তারা তা দেখে বলল, আল্লাহর কসম! আমরা তাকে কখনও দাফন করব না। এরপর তারা তাকে শূলে চড়াল এবং তার উপর পাথর নিক্ষেপ করল। এরপর এক ব্যক্তিকে তার স্থলাভিষিক্ত করল।

তিনি (ইবনু আববাস) বলেন, সালমান (রাঃ) বলেন, আমি এমন কোন ব্যক্তি দেখিনি যে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করে সে এ ব্যক্তির চেয়ে উত্তম। পৃথিবীর মধ্যে আমি এরূপ দুনিয়াত্যাগী, আখিরাতের ব্যাপারে অধিক আগ্রহী এবং দিন-রাত ইবাদতকারী আর কাউকে দেখিনি। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে আমি অন্তর থেকে তার চেয়ে বেশী আর কাউকে ভালবাসিনি। তার নিকট দীর্ঘদিন অবস্থান করেছিলাম। এরপর যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল তখন আমি তাকে বললাম, হে অমুক! আমি আপনার সাথে ছিলাম এবং আপনাকে যেভাবে অন্তর থেকে ভালবেসেছিলাম ইতিপূর্বে আর কাউকে তেমন ভালবাসিনি। আর আপনার নিকট আল্লাহর যে আদেশ পৌঁছেছে তা আপনি প্রত্যক্ষ করছেন। এখন কার প্রতি আপনি আমাকে সোপর্দ করছেন এবং আমাকে কি আদেশ করছেন? তিনি বললেন, হে বৎস! আল্লাহর কসম! এখন আমি আমার পথের উপর কাউকে দেখিনা। মানুষজন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ধর্ম পরিবর্তন করেছে। তারা তাদের অনুসৃত ধর্মাচরণের অধিকাংশই ত্যাগ করেছে। তবে মুছেলে (ইরাকের একটি শহর) এক ব্যক্তি আছে। সে অমুক। সে আমার পথে আছে। তুমি তার সাথে মিলিত হও। তিনি বলেন, অতঃপর যখন তিনি মৃত্যুবরণ করলেন এবং তাকে দাফন করা হল, তখন আমি মুছেলের ব্যক্তিটির নিকট গেলাম। আমি তাকে বললাম, হে জনাব! অমুক ব্যক্তি আমাকে তার মৃত্যুর সময় অছিয়ত করেছে যে, আমি যেন আপনার সান্নিধ্যে থাকি এবং তিনি আমাকে বলেছেন, আপনি তার পথের উপর আছেন। উত্তরে পাদ্রী বললেন, ঠিক আছে তুমি আমার নিকট অবস্থান কর। আমি তার নিকট অবস্থান করতে লাগলাম। আমি তাকে তার বন্ধুর পথে উত্তম মানুষ হিসাবে পেলাম। তবে কিছুদিন পরে সেও মৃত্যুবরণ করল। যখন তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসল তখন আমি তাকে বললাম, হে গুরু! অমুক ব্যক্তি আমাকে আপনার নিকট আসার জন্য অছিয়ত করেছিলেন এবং আপনার সান্নিধ্য লাভের জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহর পক্ষ হতে আপনার উপর যা উপস্থিত হয়েছে তা আপনি দেখছেন (অর্থাৎ আপনার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে)। এখন আপনি কার নিকট যাওয়ার জন্য আমাকে অছিয়ত করছেন? আর আমাকে কি করার আদেশ দিচ্ছেন?

তিনি বললেন, হে বৎস! আল্লাহর কসম! আমার জানা মতে নাছীবীনের একজন ব্যক্তি আছে। যে আমাদের ধর্মের উপর অটল আছে। সে অমুক। তুমি তার সাথে মিলিত হও। তিনি বলেন, অতঃপর যখন সে মারা গেল এবং তাকে দাফন করা হ’ল, তখন আমি নাছীবীনের লোকটির সাথে মিলিত হ’লাম এবং আমার বিষয়ে ও আমার সাথী যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে তা বললাম। সে বলল, তুমি আমার কাছে অবস্থান কর। অতঃপর আমি তার নিকট অবস্থান করলাম এবং তাকে তার সাথীদ্বয়ের মত (সৎ) পেলাম। আমি একজন ভাল লোকের সাথে অবস্থান করলাম। আল্লাহর কসম! কিছুদিন যেতে না যেতেই তার মৃত্যুর ঘণ্টা বেজে গেল।

যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল তখন আমি তাকে বললাম, হে অমুক! অমুক ব্যক্তি আমাকে অমুক ব্যক্তির কাছে যাওয়ার অছিয়ত করেছিল। অতঃপর অমুক ব্যক্তি আমাকে আপনার কাছে আসার অছিয়ত করেন। এখন আপনি আমাকে কার বিষয়ে অছিয়ত করছেন এবং কি করার নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন, হে বৎস! আল্লাহর কসম! একজন ব্যক্তি ব্যতীত আমি আর কাউকে আমাদের সঠিক পথে দেখছি না, যার নিকট যাওয়ার জন্য তোমাকে আদেশ দিব। (ঐ ব্যক্তিটি হল) আম্মুরিয়্যাহ-এর বাসিন্দা। সে হুবহু আমাদের পথেই রয়েছে। তুমি চাইলে তার নিকট যেতে পার। তিনি বলেন, অতঃপর যখন সে মারা গেল এবং দাফন-কাফন করা হ’ল, তখন আমি আম্মুরিয়্যাহ-এর ব্যক্তিটির নিকট গেলাম এবং আমার বৃত্তান্ত তাকে অবহিত করলাম। তিনি বললেন, তুমি আমার নিকট অবস্থান কর।

অতঃপর আমি তার নিকট অবস্থান করলাম। সে তার বন্ধুদের আদর্শ ও ধর্মের উপর ছিল। তিনি (সালমান ফারেসী) বলেন, আমি কিছু উপার্জনও করেছিলাম। এক পর্যায়ে কিছু গাভী ও বকরীর মালিক হয়ে গেলাম। অতঃপর তার উপর আল্লাহর হুকুম আসল (অর্থাৎ মৃত্যু ঘনিয়ে এল)। যখন তার মৃত্যু উপস্থিত হ’ল তখন আমি তাকে বললাম, হে গুরু! আমি (প্রথমে) অমুকের নিকট ছিলাম। অতঃপর তিনি অমুক ব্যক্তির ব্যাপারে অছিয়ত করেন। অতঃপর অমুক ব্যক্তি আবার অমুকের নিকট (যাওয়ার জন্য) অছিয়ত করেন। অতঃপর অমুক ব্যক্তি আবার আমাকে আপনার নিকট আসার জন্য অছিয়ত করেন। এখন আপনি কার নিকট যাওয়ার জন্য আমাকে অছিয়ত করছেন? আর আপনি আমাকে কি আদেশ করছেন? তিনি বললেন, হে বৎস! আমার জানা মতে এখন আর এমন কোন ব্যক্তি নেই যে আমাদের ধর্মে রয়েছে এবং যার নিকট যাওয়ার জন্য তোমাকে আদেশ করব। তবে শেষ নবী আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মে প্রেরিত হবেন। আরব ভূমিতে তিনি আত্মপ্রকাশ করবেন। আর তিনি এমন ভূমির দিকে হিজরত করবেন যা পাথরময় হবে এবং সেখানে খেজুর বৃক্ষ থাকবে। তাঁর কিছু স্পষ্ট নিদর্শন থাকবে। তিনি হাদিয়া গ্রহণ করবেন, তবে ছাদাক্বাহ ভক্ষণ করবেন না। তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যভাগে নবুঅতের সিলমোহর থাকবে। যদি তোমার ঐ দেশে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে তবে তুমি যাও। তিনি বলেন, অতঃপর তিনি মৃত্যুবরণ করলেন এবং তাকে দাফন-কাফন করা হ’ল।

আল্লাহ তা‘আলা যতদিন চান ততদিন আমি আম্মুরিয়্যাহতে অবস্থান করলাম। অতঃপর আমার নিকট দিয়ে কালব গোত্রের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা যাচ্ছিল। আমি তাদের বললাম, তোমরা আমাকে আরবে নিয়ে চল। (বিনিময়ে) আমি তোমাদের এই গাভী ও বকরীগুলো প্রদান করব। তারা বলল, ঠিক আছে। অতঃপর আমি তাদের সেগুলো দিয়ে দিলাম আর তারা আমাকে নিয়ে চলল। যখন তারা আমাকে নিয়ে ‘ওয়াদী আল-কুরা’য় (একটি স্থানের নাম) নিয়ে আসল, তখন তারা আমার প্রতি অত্যাচার করল এবং দাস হিসাবে এক ইহুদী ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করে দিল। ফলে আমি তার নিকট অবস্থান করে খেজুর গাছ দেখাশুনা করতে লাগলাম এবং ভাবলাম, আমার বন্ধু আমাকে যে ভূমির কথা বলেছিলেন, তা মনে হয় এটিই হবে। আমার মনে এমন চিন্তা-চেতনাই চেপে ছিল। আমি তার নিকট অবস্থানকালে বনী কুরায়যার বাসিন্দা তার (মনিবের) চাচাত ভাই মদীনা হ’তে আসল। অতঃপর সে আমাকে তার নিকট থেকে ক্রয় করে মদীনায় নিয়ে আসল। আল্লাহর কসম! মদীনা শহর দেখা মাত্রই আমার বন্ধুর বর্ণনা মতো আমি উহাকে চিনে ফেললাম। আমি এখানে অবস্থান করতে লাগলাম। (একদিন) আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি মক্কাতে যতদিন থাকার থাকলেন। আমি গোলামী জীবনে ব্যস্ত থাকায় তাঁর কোন খবর পেলাম না। অতঃপর তিনি মদীনায় হিজরত করলেন। আল্লাহর কসম! আমি আমার মালিকের খেজুর গাছের মাথায় কাজ করছিলাম। আর আমার মনিব বসেছিল। ইত্যবসরে তাঁর চাচাত ভাই এল এবং তার নিকট এসে থামল। অতঃপর সে বলল, হে অমুক! আল্লাহ বনী কায়লাহদের ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! তারা কুবাতে মক্কা থেকে আজকে আগত এক ব্যক্তির নিকট সমবেত হয়েছে। তারা তাকে নবী বলে ধারণা করছে। তিনি বলেন, একথা শুনে আমার মধ্যে কম্পন শুরু হয়ে গেল। এক পর্যায়ে আমি ধারণা করলাম যে, আমি আমার মনিবের উপর পড়ে যাব। অতঃপর আমি খেজুর গাছ থেকে নেমে আসলাম এবং তাঁর চাচাত ভাইকে বলতে লাগলাম, তুমি কি বলছিলে? তুমি কি বলছিলে? তিনি বললেন, আমার মনিব চটে গেলেন এবং আমাকে খুব জোরে আঘাত করলেন এবং বললেন, এ ব্যাপারে তোমার কি হয়েছে? তুমি তোমার কাজে যাও। তিনি বলেন, আমি বললাম, কিছুই না। আমি শুধু সে যা বলেছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হ’তে চাচ্ছি।

তিনি বলেন, আমার নিকট কিছু সম্পদ ছিল যা আমি সঞ্চয় করে রেখেছিলাম। যখন সন্ধ্যা হল তখন আমি তা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট গেলাম। তিনি কুবাতে ছিলেন। আমি তাঁর নিকট গিয়ে বললাম, আমার নিকট খবর পৌঁছেছে যে, আপনি একজন সৎ ব্যক্তি। আর আপনার সাথে আপনার দরিদ্র সাথীরা রয়েছেন। আর এগুলো আমার নিকট ছাদাক্বাহ করার জন্য রয়েছে। আমি এগুলোর ব্যাপারে আপনাদেরকে অধিক হক্বদার বলে মনে করি।

তিনি বলেন, আমি এগুলো তাঁর নিকট হাযির করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর সাথীদের বললেন, তোমরা খাও। আর তিনি হাত সংযত করলেন এবং কিছুই খেলেন না। তিনি (সালমান ফারেসী) বলেন, আমি মনে মনে বললাম, এটি প্রথম আলামত। অতঃপর আমি তাঁর নিকট থেকে চলে আসলাম এবং আরোও কিছু দ্রব্য সঞ্চয় করলাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় চলে আসলেন। এরপর আমি তাঁর নিকট গেলাম এবং বললাম, আমি আপনাকে ছাদাক্বার সম্পদ খেতে দেখিনি আর এগুলো আপনার জন্য হাদিয়া। যার দ্বারা আমি আপনার মেহমানদারী করলাম। তিনি বলেন, এবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এগুলো থেকে খেলেন এবং ছাহাবীদের আদেশ করলে তাঁরাও তাঁর সাথে আহার করলেন। তিনি বলেন, আমি মনে মনে বললাম, এই দু’টি হল (নবুঅতের) আলামত। অতঃপর ‘বাকীউল গারকাদে’ আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট আসলাম। তখন তিনি তাঁর এক ছাহাবীর জানাযার পিছন পিছন যাচ্ছিলেন। তাঁর পরিধানে দু’টি চাদর ছিল। তিনি তাঁর সাথীদের সাথে বসেছিলেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। অতঃপর আমি তাঁর পিঠের দিকে ঘুরে দেখতে লাগলাম। যেন আমার বন্ধুর বর্ণনা মোতাবেক ঐ মোহরটি দেখতে পাই। যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে দেখলেন যে আমি তাঁর পিছনে ঘুরছি, তখন তিনি বুঝতে পারলেন- আমি কোন কিছু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছি, যা আমার নিকট বর্ণনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অতঃপর তিনি পিঠ থেকে চাদর সরিয়ে ফেললেন। আমি মোহর দেখতে পেলাম এবং তাঁকে চিনতে পারলাম (যে ইনিই নবী)। আমি তাঁর উপর ঝুঁকে পড়লাম এবং তাকে চুমু দিয়ে কাঁদতে লাগলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, এদিকে এসো। আমি ঘুরে এলাম এবং তাঁর নিকট আমার সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলাম। যেমন তোমার নিকট বর্ণনা করছি হে ইবনে আববাস! তিনি বলেন, এ ঘটনা ছাহাবীদেরও শ্রবণ করাতে রাসূল (ছাঃ) পসন্দ করলেন। অতঃপর সালমান গোলামীতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন যার দরুন বদর ও ওহোদ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেননি।

তিনি বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, হে সালমান! তুমি (তোমার মালিকের সাথে দাসত্বমুক্তির ব্যাপারে) চুক্তি কর। আমি তার সাথে তিনশত ছোট খেজুর গাছের চারা ফলদায়ক হওয়া পর্যন্ত গর্তে পানি দেওয়া এবং চল্লিশ উকিয়া আদায় করার উপর চুক্তি করলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীদেরকে বলেন, তোমরা তোমাদের ভাইকে সাহায্য করো। তারা আমাকে খেজুর গাছ (চারা) দিয়ে সাহায্য করল। এক ব্যক্তি ত্রিশটি চারা দিলেন, আরেকজন বিশটি। অপরজন পনেরটি, আরেকজন দশটি চারা দিলেন। অর্থাৎ প্রত্যেকেই তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী আমাকে সাহায্য করলেন। এক পর্যায়ে আমার তিন’শ চারা হয়ে গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, হে সালমান! তুমি যাও এবং এগুলো রোপণ করার জন্য গর্ত খনন কর। যখন শেষ করবে তখন আমার নিকট আসবে। আমি নিজ হাতে তা রোপণ করব। অতঃপর আমি গর্ত খনন করলাম। আর একাজে তাঁর ছাহাবীগণ আমাকে সাহায্য করলেন। যখন আমি কাজ শেষ করলাম তখন তাঁর নিকট গিয়ে তাঁকে সংবাদ দিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমার সাথে বাগানের দিকে চললেন। আমরা তাঁকে গাছের চারা দেয়া শুরু করলাম আর তিনি নিজ হাতে তা রোপণ করতে লাগলেন। ঐ সত্তার কসম! যাঁর হাতে সালমানের প্রাণ! ঐ চারাগুলোর একটিও মারা যায়নি। আমি গাছের চুক্তি আদায় করেছি। এখন আমার উকিয়ার অর্থের চুক্তিটি বাকী ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট কোন যুদ্ধের গণীমত হতে মুরগীর ডিমের ন্যায় স্বর্ণের এক টুকরা আসলে তিনি বলেন, সালমান তার মুকাতাবের (মনিবের) ব্যাপারে কি করেছে? (অর্থাৎ সে মাল আদায় করেছে, না করেনি?) তিনি বলেন, আমাকে ডাকা হ’ল। অতঃপর তিনি বললেন, সালমান এটি নাও এবং তোমার যে ঋণ আছে তা আদায় কর।

অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার উপর যে ঋণ আছে এটা কিভাবে তার বরাবর হবে? তিনি বললেন, এটা নাও। কারণ আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারাই তোমার ঋণ আদায় করে দিবেন। তিনি বলেন, আমি তা নিলাম এবং তাদের জন্য ওযন করলাম। ঐ সত্তার শপথ যাঁর হাতে সালমানের প্রাণ! তা চল্লিশ উকিয়া হ’ল। আমি তাদের হক্ব পূর্ণভাবে আদায় করলাম এবং মুক্তি লাভ করলাম। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে খন্দক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম। তারপর তাঁর সাথে আর কোন যুদ্ধেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি(আহমাদ হা/২৩৭৮৮, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৮৯৪)।

শিক্ষণীয় বিষয় :

১. সত্যের সন্ধানে সালমান ফারেসী (রাঃ)-এর এরূপ ত্যাগ হকের পথে চলার জন্য আমাদেরকে কিরূপ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে তা বুঝিয়ে দেয়। ২. সৎ মানুষের সাহচর্য হকের উপর টিকে থাকার জন্য একান্ত যরূরী। ৩. সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে, মানুষের জীবনে বিপদ আসবেই। সেজন্য যে কোন বিপদগ্রস্ত মানুষকে সম্মিলিতভাবে সাহায্য করতে হবে। ৪. স্বভাবগতভাবে মানুষ ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু পিতা-মাতা বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে বিধর্মীতে পরিণত করে। ৫. স্রেফ যিদের বশবর্তী হয়ে আহলে কিতাবরা (ইহুদী-খৃষ্টান) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নবুঅতকে অস্বীকার করেছিল। অথচ তিনি ছিলেন সত্য নবী। ৬. আল্লাহভীরু মনীষীদের জীবনী অধ্যয়ন করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। ৭. সকল বিপদে স্রেফ আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে হবে।

হযরত সালমান ফারসী (রাযিঃ) সংক্ষিপ্ত আলোচনা :

এর অনেক ফযীলত হাদীস শরীফে বর্ণিত হইয়াছে। আর হওয়াও চাই, কারণ তিনি সত্য দ্বীনের তালাশে অনেক কষ্ট সহ্য করিয়াছেন। বহু দেশ ভ্রমণ করিয়াছেন। তিনি দীর্ঘ জীবন লাভ করিয়াছিলেন। তাহার বয়স আড়াইশত বৎসর হওয়ার ব্যাপারে কোন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির দ্বিমত নাই। কেহ কেহ সাড়ে তিনশত বৎসরও বলিয়াছেন। আবার কেহ আরও বেশী বলিয়াছেন। এমনকি কেহ বলিয়াছেন, তিনি হযরত ঈসা (আঃ) এর যুগও পাইয়াছিলেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত ঈসা (আঃ) এর যমানার মধ্যে ছয়শত বৎসরের ব্যবধান ছিল। তিনি পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহ হইতে শেষ নবী হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত হওয়ার বিষয় জানিয়াছিলেন। তিনি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তালাশে বাহির হইলেন। পাদ্রীদের এবং ঐ যামানার পণ্ডিতদের নিকট হইতে সন্ধান লইতে থাকিলেন। তাহারা তাহাকে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতিসত্বর জন্মগ্রহণ করার সুসংবাদ ও তাহার পরিচয় বলিয়া দিতে থাকিল। তিনি পারস্যের শাহজাদাদের মধ্যে একজন ছিলেন। শেষ নবীর সন্ধানে বিভিন্ন দেশে ঘুরিয়া ফিরিতেছিলেন। জনৈক ব্যক্তি তাহাকে বন্দী করিয়া গোলাম বানাইয়া বিক্রয় করিয়া দিল। অতঃপর তিনি এইভাবে বার বার বিক্রয় হইতেছিলেন। তিনি নিজেই বলেন-- বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে, আমাকে দশজনেরও অধিক মনিব খরিদ করিয়াছে এবং বিক্রয় করিয়াছে। সর্বশেষে মদীনা শরীফের একজন ইহুদী তাহাকে খরিদ করিয়াছে। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করিয়া মদীনায় পৌঁছিয়াছিলেন। খবর পাইয়া তিনি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হইলেন। যে সমস্ত আলামত বলা হইয়াছিল, উহা যাচাই করিলেন এবং পরীক্ষা করিলেন। অতঃপর মুসলমান হইয়া গেলেন এবং ইহুদী মনিবকে ফিদিয়া দিয়া (অর্থাৎ, বিনিময় প্রদান করিয়া) মুক্তি লাভ করিলেন।

এক সাহাবী (রাযিঃ)এর মেহমানের খাতিরে বাতি নিভাইয়া ফেলা:

একজন সাহাবী হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হইয়া ক্ষুধা ও পেরেশানীর অবস্থা জানাইলেন। হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সকল ঘরে কাহাকেও পাঠাইলেন। কোন ঘরেই কিছু পাওয়া গেল না। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, কেহ আছে কি? যে এক রাত্রির জন্য এই ব্যক্তির মেহমানদারী কবুল করিবে? এক আনসারী সাহাবী বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি মেহমানদারী করিব। তাহাকে ঘরে লইয়া গেলেন এবং আপন স্ত্রীকে বলিলেন, এই ব্যক্তি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেহমান। যতদূর সম্ভব তাহার মেহমানদারীতে কোনপ্রকার ত্রুটি করিবে না এবং কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। স্ত্রী বলিলেন, আল্লাহর কসম, বাচ্চাদের উপযোগী সামান্য খাবার ব্যতীত ঘরে আর কিছুই নাই। সাহাবী বলিলেন, বাচ্চাদেরকে ভুলাইয়া ঘুম পাড়াইয়া দাও তাহারা ঘুমাইয়া যাইবে তখন খানা লইয়া মেহমানের সহিত বসিয়া যাইব আর তুমি বাতি এবং যখন ঠিক করার বাহানায় উঠিয়া উহা নিভাইয়া দিবে। সুতরাং স্ত্রী তাহাই করিল। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে এবং বাচ্চারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত্রি কাটাইল। এই প্রেক্ষিতেই আয়াত নাযিল হইল— আয়াতের... এই তরজমা—“আর তাহারা অন্যকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় যদিও তাহারা ক্ষুধার্ত থাকে।

রোযাদারের জন্য বাতি নিভাইয়া দেওয়া :

এক সাহাবী রোযার পর রোযা রাখিতেন। ইফতার করার জন্য খাওয়ার কোন কিছু জুটিত না। হযরত ছাবেত নামক এক আনসারী সাহাবী বুঝিতে পারিয়া স্ত্রীকে বলিলেন, আমি রাত্রে একজন মেহমান। লইয়া আসিব। যখন খাওয়া আরম্ভ করিব তখন তুমি বাতি ঠিক করার ভান করিয়া নিভাইয়া দিবে। যতক্ষণ মেহমানের পেট না ভরিয়া যাইবে। ততক্ষণ আমরা খাইব না। সুতরাং তাহারা এইরূপই করিলেন। মেহমানের সহিত শরীক রহিলেন, যেন খানা খাইতেছেন। সকালে হযরত ছাবেত (রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে হাজির হইলে তিনি বলিলেন, রাত্রে মেহমানের সহিত তোমরা যে আচরণ করিয়াছ তাহা আল্লাহ তায়ালার কাছে অত্যন্ত পছন্দ হইয়াছে। (দুররে মানসূর)

পাহাড়ের গুহায় আটকে পড়া তিন যূবক :

একবার তিনজন লোক পথ চলছিল, এমন সময় তারা বৃষ্টিতে আক্রান্ত হ’ল। অতঃপর তারা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ পাহাড় হ’তে এক খন্ড পাথর পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তারা একে অপরকে বলল, নিজেদের কৃত কিছু সৎকাজের কথা চিন্তা করে বের কর, যা আললাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমরা করেছ এবং তার মাধ্যমে আললাহর নিকট দো‘আ কর। তাহ’লে হয়ত আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর হ’তে পাথরটি সরিয়ে দিবেন। তাদের একজন বলতে লাগল, হে আল্লাহ্‌! আমার আববা-আম্মা খুব বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট সন্তানও ছিল। আমি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য পশু পালন করতাম। সন্ধ্যায় যখন আমি বাড়ি ফিরতাম তখন দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তান্দের আগে আমার আববা-আম্মাকে পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে দেরী হয় এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে আসতে পারলাম না। এসে দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি দুধ দোহন করলাম, যেমন প্রতিদিন দোহন করি। তারপর আমি তাঁদের শিয়রে (দুধ নিয়ে) দাঁড়িয়ে রইলাম। তাদেরকে জাগানো আমি পছন্দ করিনি এবং তাদের আগে আমার বাচ্চাদেরকে পান করানোও সঙ্গত মনে করিনি। অথচ বাচ্চাগুলো দুধের জন্য আমার পায়ের কাছে পড়ে কান্নাকাটি করছিল। এভাবে ভোর হয়ে গেল। হে আল্লাহ্‌! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এ কাজটি করে থাকি তবে আপনি আমাদের হ’তে পাথরটা খানিক সরিয়ে দিন, যাতে আমরা আসমানটা দেখতে পাই। তখন আল্লাহ পাথরটাকে একটু সরিয়ে দিলেন এবং তারা আসমান দেখতে পেল।

দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্‌! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। পুরুষরা যেমন মহিলাদেরকে ভালবাসে,আমি তাকে তার চেয়েও অধিক ভালবাসতাম। একদিন আমি তার কাছে চেয়ে বসলাম (অর্থাৎ খারাপ কাজ করতে চাইলাম)। কিন্তু তা সে অস্বীকার করল যে পর্যন্ত না আমি তার জন্য একশ’ দিনার নিয়ে আসি। পরে চেষ্টা করে আমি তা যোগাড় করলাম (এবং তার কাছে এলাম)। যখন আমি তার দু’পায়ের মাঝে বসলাম (অর্থাৎ সম্ভোগ করতে তৈরী হলাম) তখন সে বলল, হে আললাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর। অন্যায়ভাবে মোহর (পর্দা) ছিঁড়ে দিয়ো না। (অর্থাৎ আমার সতীত্ব নষ্ট করো না)। তখন আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। হে আল্লাহ! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে আপনি আমাদের জন্য পাথরটা সরিয়ে দিন। তখন পাথরটা কিছুটা সরে গেল।

তৃতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্‌! আমি এক ‘ফারাক’ চাউলের বিনিময়ে একজন শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলাম। যখন সে তার কাজ শেষ করল আমাকে বলল, আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি তাকে তার পাওনা দিতে গেলে সে তা নিল না। আমি তা দিয়ে কৃষি কাজ করতে লাগলাম এবং এর দ্বারা অনেক গরু ও তার রাখাল জমা করলাম। বেশ কিছু দিন পর সে আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় কর (আমার মজুরী দাও)। আমি বললাম, এই সব গরু ও রাখাল নিয়ে নাও। সে বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার সাথে ঠাট্টা কর না। আমি বললাম, আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, ঐগুলো নিয়ে নাও। তখন সে তা নিয়ে গেল। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, যদি আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে পাথরের বাকীটুকু সরিয়ে দিন। তখন আল্লাহ পাথরটাকে সরিয়ে দিলেন। (আব্দুললাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/২৩৩৩, ‘চাষাবাদ’ অধ্যায়, অনুচেছদ-১৩; মুসলিম হা/২৭৪৩, মিশকাত হা/৪৯৩৮)।

কুষ্ঠরোগী , অন্ধ ও টেকোর কাহিনী :

বনী ইসরাঈলের মাঝে তিনজন ব্যক্তি ছিল- কুষ্ঠরোগী টেকো ও অন্ধ।মহান আল্লাহ্‌ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন এবং তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। অতঃপর কুষ্ঠরোগীর কাছে এসে তিনি বললেন,‘তোমার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস কোনটি?সে বলল, ‘সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা মানুষ আমাকে ঘৃণা করে’। ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলালেন। এতে তার রোগ দূর হ’ল এবং তাকে সুন্দর বর্ণ ও সু্নদর চামড়া দান করা হ’ল। অতঃপর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার নিকট কোন্ সম্পদ সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয়? সে বলল, উট অথবা গরু’। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে,কুষ্ঠরোগী বা টেকো দু’জনের একজন বলেছিল উট আর অপরজন বলেছিল গরু। তাকে তখন দশ মাসের গর্ভবতী একটি উটনী দেয়া হ’ল। ফেরেশতা বললেন, ‘আল্লাহ এতে তোমায় বরকত দিন’। তারপর তিনি টেকো ব্যক্তির কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস কোনটি? সে বলল, ‘সুন্দর চুল এবং এই টাক হ’তে মুক্তি, লোকেরা যার কারণে আমাকে ঘৃণা করে’। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তার মাথায় হাত বুলালেন। এতে তার টাক ভাল হয়ে গেল এবং তাকে সুন্দর চুল দান করা হ’ল। এরপর ফেরেশতা বললেন, ‘কোন মাল তোমার নিকট অধিক প্রিয়’? সে বলল, গরু। বর্ণনাকারী বলেন,তখন তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দেয়া হ’ল। ফেরেশতা বললেন, আল্লাহ এতে তোমাকে বরকত দিন।

তারপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার অধিক পছন্দের জিনিস কোনটি’? সে বলল, ‘আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিন, আমি যাতে মানুষকে দেখতে পারি’। ফেরেশতা তার চোখ স্পর্শ করলেন। এতে তার চোখের দৃষ্টি আল্লাহ ফিরিয়ে দিলেন। এরপর ফেরেশতা প্রশ্ন করলেন,‘কোন মাল তোমার নিকট অধিক প্রিয়’? সে বলল, ছাগল। তাকে তখন এমন ছাগী দেয়া হ’ল, যা অধিক সংখ্যক বাচ্চা দেয়।

তারপর উট, গাভী ও ছাগলের বাচচা হ’ল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল। তারপর ফেরেশতা কুষ্ঠরোগীর কাছে তাঁর প্রথম রূপ ধারণ করে এসে বললেন, ‘আমি একজন মিসকীন। সফরে আমার সবকিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহ ব্যতীত কেউ নেই, যার সাহায্যে আমি আমার গন্তব্যে পৌছাতে পারি, তারপর তোমার সহায়তায়। যে আল্লাহ তোমাকে সুন্দর বর্ণ, সুন্দর ত্বক ও সম্পদ দিয়েছেন, সে আল্লাহর নামে তোমার নিকট আমি একটা উট চাচিছ, যার সাহায্যে আমি গন্তব্যে পৌছাতে পারি’। সে বলল,‘(আমার উপর) অনেকের অধিকার রয়েছে’। ফেরেশতা বললেন,‘তোমাকে বোধ হয় আমি চিনি। তুমি কি কুষ্ঠরোগী ছিলে না? লোকেরা তোমাকে কি ঘৃণা করত না? তুমি না নিঃস্ব ছিলে? অতঃপর আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন’। সে বলল, ‘এই সম্পদ তো আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষ থেকে পেয়েছি’। তিনি বললেন, ‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও, তাহ’লে তোমাকে যেন আল্লাহ আগের মতো করে দেন’।

এরপর তিনি টেকো ব্যক্তির কাছে তাঁর প্রথম রূপ ধারণ করে এসে প্রথম লোকটিকে যা বলেছিলেন তা বললেন এবং সেও একই উত্তর দিল,যা পূর্বের লোকটি দিয়েছিল। ফেরেশতা একেও বললেন,‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহ যেন তোমাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন’। এরপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে তাঁর আগের রূপ ধারণ করে এসে বললেন, ‘আমি একজন মিসকীন মুসাফির। আমার সবকিছু সফরে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন গন্তব্যে পৌঁছাতে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন উপায় নেই, তারপর তোমার সহায়তায়। সেই আল্লাহর নামে তোমার কাছে একটি ছাগল সাহায্য চাচিছ, যিনি তোমাকে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন’। এ ছাগলটি দিয়ে আমি বাড়ি পৌছাতে পারব। লোকটি বলল, ‘আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ্‌ আমার দৃষ্টিশক্তি ফেরত দিয়েছেন। আমি দরিদ্র ছিলাম, আল্লাহই আমাকে ধনী করেছেন। কাজেই তোমার যত ইচছা মাল তুমি নিয়ে যাও। আল্লাহর শপথ! মহান আল্লাহর ওয়াস্তে আজ তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্য আমি আজ তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না’। ফেরেশতা বললেন, ‘তোমার সম্পদ তোমার কাছেই রাখ। তোমাদেরকে শুধুমাত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। তোমার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট এবং তোমার অপর দু’জন সাথীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন’।[আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/৩৪৬৪ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচেছদ-৫১; মুসলিম হা/২৯৬৪, মিশকাত হা/১৮৭৮ ‘যাকাত’ অধ্যায়, অনুচেছদ-৫]

শিক্ষা :

সর্বদা আল্লাহর নে’মতের শোকর-গুযার হতে হবে।

মাশুয়ারার করার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা

by Md. Sojol Mia, CoU

মানুষ সৃষ্টির আগে আল্লাহ কেন ফেরেশতাদের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন? মানুষ সৃষ্টির আগে মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের কাছে পরামর্শ চেয়েছেন। অথচ আল্লাহর জন্য এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু কী উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ এমনটি করেছিলেন? পরামর্শ চাওয়ার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? সৃষ্টিজগতের সব ব্যাপারে সবাই মহান আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী। কোনো সৃষ্টির কাছে মহান আল্লাহ মুখাপেক্ষী নন। তারপরও মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির আগে ফেরেশতাদের সঙ্গে পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কেন? এ পরামর্শ গ্রহণের মধ্যে নিহিত রয়েছে অনেক বড় হেকমত ও শিক্ষা। যাতে মানুষও যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরস্পরে কল্যাণের জন্য পরামর্শ গ্রহণ করে। মানুষ সৃষ্টির আগে মহান আল্লাহ এ বিষয়টি শিক্ষা দেওয়ার জন্যই ফেরেশতাদের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। যা কোরআনে এভাবে ওঠে এসেছে- ‘আর (স্মরণ কর) যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন, ‘আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করবো।’ তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকেও সৃষ্টি করবেন; যারা সেখানে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? অথচ আমরাইতো আপনার গুণগান করছি এবং আপনারই পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকি।’ তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তা জানি যা তোমরা জান না।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ৩০) পরামর্শ গ্রহণে আল্লাহর হেকমত ফেরেশতাসহ জগতের সব সৃষ্টিই তার আয়ত্বাধীন। এমন কোনো বিষয় নেই; যা তাঁর আওতার বাইরে কিংবা কারো কাছে কোনো ব্যাপারে তিনি মুখাপেক্ষী। বরং জগতের সবকিছু তার মুখাপেক্ষী। এরপরও ফেরেশতাদের কাছে পরামর্শ গ্রহণ ছিল মানুষের জন্য অনেক বড় শিক্ষা। মূলত ফেরেশতাদের সঙ্গে পরামর্শ গ্রহণ উদ্দেশ্য ছিল না এবং এর কোনো আবশ্যকতাও নাই। কিন্তু তারপরও ‘একটি সৃষ্টি নিয়ে পরামর্শ গ্রহণ’ বিষয়টিকে রূপ দেওয়া হয়েছে। যাতে করে মানুষ যে কোনো কাজ করার আগে পরস্পরের মধ্যে পরামর্শরীতি ও তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করতে পারে। যেমন- ‘কোরআনুল কারিমের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কাজে ও ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন কোরআনের অহির ধারক ও বাহক। যেখানে তাঁর কথা ও কাজের ব্যাপারে কোরআনের ঘোষণা ছিল এমন- ‘আর সে মনগড়া কথাও বলে না। তাতো কেবল অহি, যা তার প্রতি অহিরূপে প্রেরণ করা হয়। তাকে শিক্ষা দান করেছেন প্ৰচণ্ড শক্তিশালী। প্রজ্ঞার অধিকারী। এরপর সে স্থির হয়েছিল।’ (সুরা নজম : আয়াত ৩-৬) তাঁর কাজ-কর্ম এবং প্রত্যেক অধ্যায় ও দিক অহির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দেওয়া হতো। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে সব বান্দার জীবনে পরামর্শ গ্রহণের রীতির প্রচলন ও শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকেও পরামর্শ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন। মুমিন মুসলমানের উচিত, যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে একে অপরের সঙ্গে পরামর্শ গ্রহণ করা। যে পরামর্শের ফলে কল্যাণ বয়ে আসবে। এটি ছিল উম্মাতে মুসলিমার জন্য পরামর্শ গ্রহণের শিক্ষা ও তাগিদ। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে এ আয়াত থেকে পরামর্শ গ্রহণের শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। কোরআনের পরামর্শ গ্রহণ করে সাওয়াব ও বরকত লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

পরামর্শ করার গুরুত্ব ও নিয়ম – মাশওয়ারা কি?

পরামর্শ করার গুরুত্ব ও নিয়ম:

মাশওয়ারা বা পরামর্শের গুরুত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন যেমন মানুষ সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের সাথে পরামর্শ বা মাসোয়ারা করেছিলেন তাবলীগের ভাষায় মাশওয়ারা কাকে বলে এবং কিভাবে করতে হয় এর গুরুত্ব সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো।

মাশওয়ারার গুরুত্বঃ

আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, অর্থঃ আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন। এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন তখন আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করুন। আল্লাহ তাওয়াক্কুল কারীদের ভালো বাসেন। যদি আল্লাহ তোমাদের সহায়তা করেন, তাহলে কেউ তোমাদের উপর পরাক্রান্ত হতে পারবেনা। আর যদি তিনি সাহায্য না করেন, তবে এমন কে আছে, যে তোমাদের সাহায়্য করতে পারে? আর আল্লাহর উপরই মুসলমানগণের ভরসা করা উচিত। (সূরা আলে ইমরান-১৫৯-১৬০) অন্য আয়াতে এরশাদ করেন, অর্থ:- এবং তারা পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে। (সূরা আশ-শুরা ৩৮)

হযরত সুলাইমান আ. যখন রাণী বিলক্বীসকে চিঠি দিয়েছিলেন, তখন সে পরিষদবর্গদের সাথে পরামর্শ করেছিল। হতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা এই পরামর্শের কারণে তাকে হেফাজত করেছিলেন এবং হেদায়েত দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, অর্থঃ- সেই নারী বলল, হে পরিষদবর্গ! আমার সমস্যায় তোদের অভিমত দাও। আমি কোন ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনা তোমাদের পরামর্শ ব্যতীত। তারা বলল, আমরা তো শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই, কী আদেশ করবেন তাহা আপরি ভেবে দেখুন। সুরা নাম্ল. ৩২-৩৩ অন্য দিকে ফির‘আওন পরামর্শ ছাড়ায় সিদ্ধান্ত নিলো, সে বলল, আমি যা বুঝি, আমি তোমাদেরকে তাই বলিতেছি। আমি তোমাদেরকে কেবল সৎপথই দেখিয়ে থাকি। (সুরা:- আল-মু‘মিন.২৯)

মাশওয়ারার বিষয় বস্তু তিনটি:-

১. জামাতের প্রত্যেকটি সাথী কিভাবে ইমানওয়ালা, আমলওয়ালা, মুখলেছ, মুজাহিদ ও দ্বীনের দায়ী বনতে পারে, বা প্রত্যেক সাথী কিভাবে জ্ঞানী-গুণী, কর্মট, মুখলেছ, মুজাহিদ ও দ্বীনের দায়ী বনতে পারে সে ব্যাপারে চিন্তা ফিকির করা।

২. কিভাবে মেহনত করলে এই মহল্লার প্রত্যেকটি ঘর থেকে একএক জন বালেগ পুরুষ বারীবারী করে নগদ আল্লাহর রাস্তায় বের হতে পারে, বা একটি নগদ জামাত আল্লাহর রাস্তায় বের হতে পারে এ ব্যাপারে চিন্তা ফিকির করা।

৩. এই মসজিদে যদি পাঁচ কাজ চালু না থাকে তাহলে চালু করা, আর যদি চালু থাকে তাহলে মজবুত করা, আর যদি মজবুত থাকে তাহলে তা থেকে ফায়দা উঠানোর চিন্তা ফিকির করা। উক্ত তিনটি বিষয় কিভাবে বাস্তায়ন হয় এ ব্যাপারে আমীর সাহেব সকল সাথীর থেকে খেয়াল নিবে এবং সকল সাথীর মুখ খোলাবে।

মাশওয়ারার আদব:

লোক কম হলে গোলাকারে বসবে, আর বেশী হলে মজমা আকারে বসবে। একজন আমীর নিযুক্ত করবে, চলতি জামাতে তো আমীর নিযুক্তই আছে। আমীর আকেল, বালেগ ও পুরুষ হওয়া। আমীর সাহেবের ডান দিক থেকে খেয়াল বা রায় নেওয়া। দ্বীনের ফায়দার দিকে লক্ষ রেখে খেয়াল দেওয়া। নিজের রায় নিজে পেশ করা। অন্যের রায় না কাটা। নিজের রায়ের উপর ইসরার বা পিড়াপিড়ি না করা, অন্যের রায়কে ছোট মনে না করা, মাশওয়ারার পূর্বে মাশওয়ারা না করা, এবং পরে সমালোচনা না করা। মাশওয়ারার সময় কোন ইনফেরাদী আমল না করা, আমীর সাহেব সকল সাথীর থেকে রায় বা কিছু সাথীর রায় নিয়েও ফায়সালা দিতে পারেন, আবার কাহারও থেকে রায় না নিয়েও ফায়সালা দিতে পারেন, আমীর সাহেব যা ফায়সালা দেন তার উপর জমে যাওয়া। মাশওয়ারার সময় চিল্লা-চিল্লি না করা, বরং আখলাকের পরিচয় দেওয়া।

মাশওয়ারার লাভ:

আল্লাহর হুকুম ও নবীর সুন্নাত জিন্দা হয়, জোড়-মিল ও মহব্বত হয়, খায়ের ও বরকত হয়, ক্ষতি থেকে হেফাজত হয়, আল্লাহর রহমত থাকে, আল্লাহ তায়ালার ফায়সালাকৃত আযাব উঠিয়ে নেন ও লজ্জিত হতে হয়না। মাশওয়ারার পর প্রয়োজন থাকলে খেদমতের সাথীরা খেদমতে চলে যাবে, আর দুই-তিন জন সাথী খুছূছী গাশ্তে যাবে, আর বাকী সাথীরা তা‘লীমে বসে যাবে বা যা ফায়সালা হয় তা করবে।

তালীমের নিয়ম কানুন : - ১

by Md. Sojol Mia, CoU

তালিম কী? তালিম মসজিদে নববীর বিশেষ আমল,, তালীম ২ প্রকার:ক) কোরানের তালিম খ) হাদিসের তালিম, তালিমের বিষয়বস্তু ৪ টিঃ ১)তালিমের উদ্দেশ্য, ২)তালিমের বসার আদব ৩) তালিম শুনার আদব ৪) তালিমের লাভ, ১) তালিমের উদ্দেশ্য ঃ আল্লাহতালার ওয়াদা ও ওয়াদিও একিন দিলে পয়দা করা। দিলে জ্ঞান ও এলেমের তলব পয়দা করা। ২) তালিমে বসার আদবঃ ওযু করে বসা,সুগন্দি লাগিয়ে বসা,গায়ে গায়ে লেগে বসা,সুন্নাত তরিকায় বসা, দিলকে খালী করে বসা, ৩) তালীম শুনার আদব : মুতাকাল্লিমের দিকে তাকিয়ে শুনা, দিলের কানে শুনা, আমলের নিয়তে শুনা, অন্যের নিকট পৌঁছানোর নিয়তে শুনা, আল্লাহ পাকের নাম আসলে আল্লাজাল্লাশানুহু বলা, আমাদের প্রিয় নবীর নাম শুনলে সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলা,নবীগন ও ফেরেশতাদের নাম আসলে আলাইহিস সালাম বলা পুরুষ সাহাবাগনের নাম শুনলে রাদিআল্লাহু তায়’লা আনহু বলা, মহিলা সাহাবীগনের নাম আসলে রাদিআল্লাহু তায়’লা আনহা বলা,একের অধিক নাম আসলে পুরুষের বেলায় আনহুম আর মেয়েদের বেলায় আনহুমা বলা, তাবেঈন/তাবে - তাবেঈনদের/ পীর বুজুর্গদের নাম আসলে রাহ মাতুল্লাহি আলাইহি বলা, আর জীবিত পীর বুজুর্গদের নাম আসলে দামার্ত বারাকাতুহু বলা, তালীম শুনার আদব - দিলকে খালী করে শুনা, মুতাকাল্লিমের দিকে তাকিয়ে শুনা, দিলের কানে শুনা, আমলের নিয়তে শুনা, অন্যের নিকট পৌঁছানোর নিয়তে শুনা, আল্লাহ পাকের নাম আসলে আল্লাজাল্লাশানুহু বলা, আমাদের প্রিয় নবীর নাম শুনলে সাল্লেল্লা হুআলাইয়ে সাল্লাম বলা, পুরুষ সাহাবাগনের নাম শুনলে রাদিআল্লাহু তায়’লা আনহু বলা, মহিলা সাহাবীগনের নাম আসলে রাদিআল্লাহু তায়’লা আনহা বলা, তিন বা ততোধিক নাম আসলে পুরুষের বেলায় আনহুম আর মেয়েদের বেলায় আনহুমা বলা, তাবেঈন/তাবে - তাবেঈনদের/পীর বজর্গদের নাম আসলে রাহ মাতল্লাহি আলাইয়ে বলা, আর জীবিত পীর বুজুর্গদের নাম আসলে দামার্ত বারাকাতুহু বলা, নবীগন ও ফেরেশতাদের নাম আসলে আলাইহিস সালাম বলা। ৪) তালিমের লাভ : ১) মুৰ্খতা, অজ্ঞতা, জেহালিয়াত দুর হয় ২) আমলের শক পয়দা হয়, ৩) আমলের সাথে এলেমের সম্পর্ক নাজিল হয়, ৪) খারাপ আমলের প্রতি ঘৃনা হয়, ৫) ছকিনা অবতীর্ণ হয়, ৬) ওহীর বরকত পাওয়া যায়, ৭) ফেরেশতারা উক্ত স্থান বেষ্টন করিয়া থাকে, ৮) আল্লাহ পাক ফেরেশতাদের মজলিশে আলোচনা করেন তালীম করার নিয়ম/ যখন যেই মৌসুম তখন সেই কিতাব পড়া,যেমন, রমজানে ফাজায়েলে রমজান থেকে হজে ফাজায়েলে হজ থেকে ইত্যাদি,এভাবে সব দিক দিয়ে খেয়াল রাখা উচিত,,

তালীমের নিয়ম কানুন : - ২

by Md. Sojol Mia, CoU

তালিমের আদব :-

মাওলানা ইলিয়াস রহ. বলেছেন, আমাদের এখানে তকরিরের চেয়ে তালিমের গুরুত্ব বেশি। কারণ তালিম হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা। আল্লাহ যত বড় তার কথা তত বড়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যত সম্মানীত তার হাদীসও তত সম্মানীত।

তালিমের উদ্দেশ্য :-

ফাজায়েলে তালিমের উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের ওয়াদা আর অঈদ-এর একিন দীলে পয়দা করা। আল্লাহ তায়ালা উনার হুকুম পুরো করার উপর যেসব ওয়াদা করেছেন মানুষ ঐ সমস্ত ওয়াদার একিন দীলে হাসিল করে। ঐ ওয়াদার একিন দীলের মধ্যে নিয়ে আল্লাহর হুকুমকে পুরো করে।আল্লাহ তায়ালা যে সমস্ত কাজ নিষেধ করেছেন,তা করলে সাজা বা শাস্তির কথা বলেছেন।আল্লাহ তায়ালার সাজা-শাস্তির ভয় অন্তরে নিয়ে উনার নিষেধ করা কাজ থেকে বিরত থাকা।

তালিমের ফাজায়েল :-

১. তালিম মসজিদে নব্বীর আমল। ২. তালিমের মজলিশ এত দামি মজলিশ যে, এই মজলিশকে নিয়ে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন। ৩. এই তালিমের মজলিশে যে সমস্তনভাই, বোন বসেন তাদের নাম নিয়েনআল্লাহ পাক ফেরেশতাদের সাথেন আলোচনা করেন। ৪. তালিমের মজলিশকে ফেরেশতারা ঘিরে ফেলে।আল্লাহ পাকের রহমত নাযিল হয়,সকিনা অবতীর্ণ হয়। ৫. যেদিন সারা জাহানের লোক নাফসি, নাফসি করতে থাকবে,মা বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো ভুলে যাবে সেদিন তালিমের মজলিশে বসনেওয়ালা বান্দা-বান্দি মেশকের টিলায় বসে বসে আরাম করতে থাকবে। ৬. আমরা জমিনবাসীরা আকাশেরনতারাগুলোকে যেমন উজ্জ্বল দেখি, আসমানবাসীরাও তালিমের মজলিশকে ঐরকম উজ্জ্বল দেখে। ৭. তালিমের মজলিশে যে ব্যক্তি বসে তার জন্য দুই এলান। ১.আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। ২.তার গুনাহগুলোকে নেকি দ্বারা বদল করে দেন। ৮. তালিমের মজলিশে যতবেশি মুজাহাদার সাথে বসব, তত বেশি আজমতের সাথে তালিম শুনব,ততবেশি দীলের মধ্যে নূর পয়দা হবে। ৯. তালিমের মজলিশে হেদায়েত আছে। হযরত উমর (রাঃ) তালিম দ্বারা হেদায়েত পেয়েছেন। কত শক্ত দীলের মানুষ তালিম দ্বারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন? শুধু তিনি নন। তালিমের দ্বারা হাজারো মানুষ দ্বীন পেয়েছে। ১০. তালিমের দ্বারা যখন মেয়ে লোকের দীলে নূর পয়দা হবে তখন তাদের দুনিয়ার কথা বলতে মন চাইবে না।

শোনার আদব :-

১. দীলের কানে শুনি।অর্থাৎ কিতাব যখন পড়বে তখন পুরো ধ্যানের সাথে, তাওয়াজ্জুর সাথে শুনি,জবানে চুপ থাকি।এর দ্বারা হেদায়েত আসবে। ২. নিজে আমল করার নিয়তে শুনি। ৩. অন্যের কাছে পৌছানোর নিয়তে শুনি।অর্থাৎ দাওয়াতের নিয়তে শুনি। ৪. কিতাব পড়নেওয়ালীর মুখের দিকে তাকিয়ে শুনি।কিতাব পড়নেওয়ালার মুখের দিকে তাকিয়ে শুনলে আল্লাহ তায়ালা তাকে চোখ দিয়ে দেখিয়ে দেবেন, কান দিয়ে শুনিয়ে দেবেন,মুখ দিয়ে বলিয়ে দেবেন। ঘরে তালিমের পরিবেশ কায়েম করার জন্য জরুরি চারটি কথা - ১. ঘরের পুরুষ তালিমে শরীক থাকা। পুরুষরা অনেক তাকাজায় থাকে, সারাদিন পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত থাকে।তা সত্ত্বেও কোরবানির সহীত ঘরের তালিমে শরীক থাকা চাই। ১. ২০ মিনিট কিতাব তালিম হবে। একদিন মুন্তাখাব হাদীস থেকে। একদিন ফাজায়েলে আমল থেকে ও ফাজায়েলে সাদাকাত থেকে। ৩. ১০ মিনিট ছয় নম্বরের মুজাকারা হবে। ছয় নম্বর মেয়ে, ভাই,বাবা, মা সবাই মিলে মুজাকারা করব। সবাই যেন দাওয়াত দিতে পারে।সবাই বলতে পারে,এজন্য সবাইকে শিখাই।ছয় নম্বরের পর একে অন্যেকে তাশকিল করা। ৪.আগামীকালের মাশোয়ারা করে নেয়া।যে,আগামীকাল কিতাব কে পড়বে ছয় নম্বর কে বলবে?আজকের মাশোয়ারা হয়ে গেল।সারাদিন প্রস্তুতির সময় পাবে।ছেলের বউ হোক, মেয়ে হোক,যে হোক,যার আমল থাকুক। এই তালিমে দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাকেও বসানো। ঘুমিয়ে গেছে তাকেও বসানো।মা তাকে কোলে নিয়ে তালিমে বসব।তার কান দিয়ে হাদীসের নূর আল্লাহ পাক তার দীলের মধ্যে বসিয়ে দিবে।ফলে সে বড় হলে আল্লাহকে মানলেওয়ালা হবে। কিতাব-" মাস্তুরাতের কাজ" (মুহাম্মদ ইকরাম হোসেন) ঘরের তালিমের বিষয় তো বোঝা গেল। আর ইজতেমায়ী তালিম নিয়ে আমি আরেকটু পরিষ্কার করে বলতে চাই।অনেক বোন আছেন যারা এলাকার সাপ্তাহিক তালিমে যেতে চান, কিন্তু কোথায়,কিভাবে? সেটা না জানার কারণে এই তালিমে শরীক হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রথমে আসি, ইজতেমায়ী তালিম কি? ইজতেমায়ী তালিম হচ্ছে, কাকরাইল মসজিদ থেকে অনুমোদনকৃত একটি তালিম পয়েন্ট। যেখানে প্রতি সপ্তাহে নির্ধারিত একটি দিনে,এলাকার বোনেরা এই মজলিসে অংশগ্রহণ করেন।এখানে কিতাব (মুন্তাখাব হাদীস,ফাজায়েলে আমল,ফাজায়েলে সাদাকাত) থেকে হাদীস পড়া হয়,ইসলামের ছয় ছিফত নিয়ে আলোচনা হয়, মোজাকারা হয়,আমল আখলাখ ভাল করার তরগীব করা হয়, মাস্তুরাতের জামাত বের করার তাশকিল করা হয়। ইজতেমায়ী তালিমের ঠিকানা কিভাবে পাবেন? প্রায় সব এলাকায় ইজতেমায়ী তালিম পয়েন্ট আছে। আপনার নিকটস্থ মসজিদে আপনার মাহরাম পুরুষকে পাঠিয়ে সহজেই জেনে নিতে পারবেন যে,আপনার এলাকার কোথায় ইজতেমায়ী তালিম হয়। পরিবারের সকল মাস্তুরাতকে নিয়েই তালিমে যাওয়ার চেষ্টা করুন আর নিয়মিত যাওয়া আসা করুন।আর মাহরামের সাথে তিন দিনের মাস্তুরাত জামাতে বের হয়ে যান ইনশাআল্লাহ!!

মসজিদভিত্তিক পাঁচটি কাজ

by Md. Sojol Mia, CoU

দাওয়াত ও তাবলীগ এর যুগান্তকারী পদক্ষেপ :

বর্তমান পৃথিবীতে দ্বীনের যত মেহনত চলছে, তার মধ্যে দাওয়াত ও তাবলীগ নিঃসন্দেহে সর্বাধিক সফল মেহনত। এই বরকতপূর্ণ মেহনত আজ দুনিয়ার সব জায়গায় পৌঁছে গেছে। পৃথিবীর সব দেশে এবং সব এলাকায় একই নিয়মে চলছে তাবলীগের কাজ। এ কাজের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নবী-রাসুলগণ ও সাহাবাদের কর্মপদ্ধতি হুবহু অনুসরণ করা। বর্তমান পৃথিবীতে দ্বীনের যত মেহনত চলছে, তার মধ্যে দাওয়াত ও তাবলীগ নিঃসন্দেহে সর্বাধিক সফল মেহনত। এই বরকতপূর্ণ মেহনত আজ দুনিয়ার সব জায়গায় পৌঁছে গেছে। পৃথিবীর সব দেশে এবং সব এলাকায় একই নিয়মে চলছে তাবলিগের কাজ। এ কাজের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নবী-রাসুলগণ ও সাহাবাদের কর্মপদ্ধতি হুবহু অনুসরণ করা। তাই তাবলীগের কাজে আধুনিক যুগের মানবরচিত চিন্তা-চেতনা ও কর্মপদ্ধতির কোনো স্থান নেই। দাওয়াতে তাবলীগের সব কাজ সুন্নাতে রাসুল মোতাবেক করা হয়। হুজুর [সা.] যেভাবে নামাজ পড়েছেন, যেভাবে খেয়েছেন, যেভাবে ঘুমিয়েছেন, যেভাবে মানুষকে ইসলামের পথে দাওয়াত দিয়েছেন-তার সবই অনুসরণ করা হয় তাবলীগের কাজে। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদের মাঝে কিভাবে পুরোপুরি ইসলাম আসে, সে ব্যাপারেও রয়েছে সুন্দর নিয়ম। নিজে আল্লাহর হুকুম ও নবীর তরিকা অনুযায়ী জীবন যাপনের পাশাপাশি নিজের পরিবারের সদস্যরা, পাড়া-প্রতিবেশী এবং আশপাশের সবাই যেন দ্বীনদার ও আল্লাহওয়ালা হয়ে যায়। দাওয়াতে তাবলিগের এটাই প্রধান লক্ষ্য।

তাবলীগের বিভিন্নমুখী দ্বীনি কাজের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মসজিদের পাঁচ কাজ। এই পাঁচ কাজ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, এর দ্বারা একটা সমাজ পরিবর্তিত হতে পারে। সমাজের খারাপ মানুষগুলো ভালো হয়ে যেতে পারে। বেনামাজি লোকেরা নামাজি হয়ে যেতে পারে। যা গোটা মুসলিম জাতির জন্য এক সুখময় ও কাঙ্ক্ষিত বিষয়। এখন আমরা জেনে নিই যে কোন কোন কাজকে পাঁচ কাজ বলা হয়।

পাঁচ কাজ হলো :-

১. প্রতিদিন মাশওয়ারা বা পরামর্শ করা। ২. প্রতিদিন মসজিদে ও ঘরে তালিম করা। ৩. দৈনিক আড়াই ঘণ্টা ফিকির করা [মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করার উদ্দেশ্যে আড়াই ঘণ্টা সময় ব্যয় করা। ৪. প্রতি সপ্তাহে নিজ মহল্লায় ও অন্য মহল্লায় গাশ্ত করা। অর্থাৎ আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করার লক্ষ্যে ঘুরাফিরা করা। ৫. প্রতি মাসে আল্লাহর রাস্তায় তিনদিন সময় লাগানো।

১. মাশওয়ারা :

মসজিদে প্রতিদিন কোনো এক নামাজের পর মাশওয়ারা বা পরামর্শ করা। এলাকার তাবলীগের সব সাথীকে নিয়ে পরামর্শ করা হয়। পরামর্শে সাধারণ মানুষও অংশ নিতে পারে। এর দ্বারা এলাকার সব মানুষকে কিভাবে নামাজি বানানো যায় এবং পুরুষদের মসজিদমুখী করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এরপর সেই পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করা হয়। গতকাল যারা মসজিদে এসেছিল, তারা আজ এসেছে কি না, সে বিষয়েও খোঁজখবর রাখা হয়। যদি কেউ না এসে থাকে, তাহলে কেন এলো না, তা জানার চেষ্টা করা হয়। সে যদি কোনো কষ্টে থাকে, তাহলে তার কষ্ট দূর করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়। শারীরিক অসুস্থতা থাকলে তার সেবাযত্নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তা ছাড়া গতকালের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে কি না বা কতটা অগ্রগতি হলো, তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করা হয়। বলা যায়, তাবলিগের কাজে মাশওয়ারাই হলো মূল চালিকাশক্তি। নিয়মিত পরামর্শের সুন্নাত তরিকা অনুসরণ করার বরকতে এই মেহনত আল্লাহপাক কবুল করেছেন। এ কাজ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাবলিগের পরামর্শে দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ থাকে না। ব্যক্তিগত কোনো প্রভাব থাকে না। সবাই দ্বীনের স্বার্থে খেয়াল দেয় এবং পরামর্শের আমির সবার মতামত শুনে ফায়সালা দেন। ফায়সালা দেওয়ার পর তার ওপর অটল থেকে কাজ করা হয়।

২. রোজানা তালিম :

প্রতিদিন কোনো এক নামাজের পর মসজিদে তালিম করা। মসজিদের মুসল্লিদের নিয়ে এই তালিম করা হয়। তালিমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনি প্রেরণা সৃষ্টি হয়। তালিম করা হয় ‘ফাজায়েলে আমাল’ নামের বিশ্বনন্দিত গ্রন্থ থেকে। এই গ্রন্থে দ্বীনের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেওয়া, নামাজ, ইলম বা জ্ঞানার্জন করা, জিকির, কোরআন পাঠের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং সাহাবাদের বিভিন্ন ঘটনা সুন্দরভাবে আলোচিত হয়েছে। তাই এই কিতাব থেকে তালিম করার কারণে মানুষের মধ্যে এসব বিষয়ের প্রতি প্রকৃত জ্ঞান ও আমলের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। যা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য একান্ত জরুরি। এ ছাড়াও ফাজায়েলে সাদাকাত, হায়াতুস সাহাবা, মুনতাখাব হাদিস নামের বিশ্বখ্যাত কিতাব থেকেও তালিম করা হয়। পৃথিবীর বিজ্ঞ আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে এসব কিতাব মানুষের জীবন পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাবলিগী মেহনতে মসজিদে তালিমের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিশেষভাবে নারী ও শিশুদের মধ্যে ইসলামী জ্ঞান ও আমলের স্পৃহা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রতিদিন ঘরে তালিমের ব্যবস্থা করার প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই প্রত্যেক তাবলিগে সময় লাগানো ব্যক্তি নিজ নিজ ঘরে তালিম করে থাকে। ঘরে তালিম করার মধ্যে বহুমুখী উপকারিতা নিহিত রয়েছে। আমাদের সমাজের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা হলো নারী। নারীদের অন্ধকারে রেখে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই পরিবারের মধ্যে শিশু ও নারীরা যেন ভালো পথে পরিচালিত হয়, সেজন্য ঘরে তালিমের গুরুত্ব অপরিসীম। যা আমাদের সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার ও সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা দূর করতে এবং সমাজ পরিবর্তন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মনে রাখতে হবে, আজ যে সন্তান ঘরে বেড়ে উঠছে, তারাই একদিন বড় হবে। দেশ ও দশের জন্য কাজ করবে। সমাজে কল্যাণ বয়ে আনবে। তাই আজ যদি তালিমের মাধ্যমে তাদের অন্তরে ইমানের বীজ বপন করা হয়, আমলের বৃক্ষ রোপণ করা হয়, তাহলে তাদের কর্মজীবনেও এর প্রভাব পড়বে। তারা সততার সঙ্গে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হবে। সৎপথে নিজে চলতে এবং অন্যকে চালাতে প্রস্তুত থাকবে। মুসলমানদের সুখে-দুঃখে সব সময় তারা পাশে থাকবে। তখনই সম্ভব আমাদের দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করা। তাই ঘরে তালিমের গুরুত্ব অপরিসীম।

৩. ২১/২ ঘন্টা ফিকির :

দৈনিক আড়াই ঘণ্টা ফিকির করা। অর্থাৎ তাবলিগের প্রত্যেক সাথী তার দিনের ২৪ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে আড়াই ঘণ্টা সময় মানুষকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দেয়ার জন্য ব্যয় করবে। আড়াই ঘণ্টার এই মেহনতে সমাজের সব মানুষের মধ্যে দ্বীনি দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। তাই পাঁচ কাজের মধ্যে দৈনিক আড়াই ঘণ্টা ফিকির অন্যতম।

৪. উমুমী গাশত :

সপ্তাহে একদিন নিজ মহল্লার মসজিদে গাশ্ত করা এবং অন্য একদিন পাশের মহল্লার মসজিদে গাশ্ত করা। গাশ্ত অর্থ মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বানের উদ্দেশ্যে কিছু সময় ঘুরাফেরা করা। গাশ্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এর উছিলায় সাধারণ মানুষের কাছে দ্বীনি দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া হয়। নিজ মহল্লার মসজিদে এই আমল চালু থাকলে নিজ এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে আল্লাহর পথে আসতে থাকে। যারা নামাজ পড়ত না, তারা নামাজে আসা শুরু করে। আর অন্য মহল্লায় গাশ্ত করার দ্বারা আশপাশের এলাকায়ও দ্বীনি পরিবেশ কায়েম হতে শুরু করে। সেখানে যারা তাবলিগের কাজে নিয়োজিত আছেন, তাদের মধ্যেও নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রেরণা সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া এর মাধ্যমে উভয় মহল্লার সাথিরা পরামর্শের ভিত্তিতে কাজের মধ্যে গতি আনতে পারে। বর্তমান যুগের জন্য এ পদ্ধতি খুবই ফলপ্রসূ একটি আমল।

৫.মাসে ৩ দিন :

মাসে তিনদিন সময় লাগানো। প্রতি মাসে যদি কেউ যদি তিনদিন সময় লাগায়, তাহলে দ্বীনের ওপর অটল থাকা তার জন্য সহজ হয়। সময় লাগালে দেখা যায়, তার মধ্যে তাবলিগের কাজের গুরুত্ব আসে। আমলের মধ্যে এখলাস সৃষ্টি হয়। হৃদয়ে আল্লাহর ভয় আসে। তা ছাড়া সহিহ-শুদ্ধভাবে নামাজ পড়ার যাবতীয় নিয়মাবলি শিখা যায়। সুন্নত তরিকা অনুযায়ী খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো অজু-গোসলসহ সব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা লাভ হয়। মোটকথা, একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর হুকুম ও নবীর তরিকা প্রতিষ্ঠা করার যাবতীয় নিয়মাবলি তাবলীগ জামাতে শিখানো হয়। তাই আমাদের উচিত তাবলীগের এই নীরব বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। মুফতি মুহাম্মদ আল আমিন লেখক : খতিব, বাইতুর রহমত জামে মসজিদ, গাজীপুরা, টঙ্গী।

উমুমী গাশ্ত কাকে বলে? দাওয়াত ও তাবলীগ কি?

দাওয়াত অর্থ আহবান করা তাবলীগ অর্থ প্রচার। দাওয়াত ও তাবলীগ অর্থ আহ্বান করা ও প্রচার করা। তাবলীগের কাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো উমুমী গাশ্ত এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উল্লেখ করা হলো।

উমুমী গাশ্ত কাকে বলে:

পরামর্শ করে উমূমী গাশ্তের দিন ও সময় নির্দিষ্ট করা। যে সময় মহল্লায় লোক জন বেশী পাওয়া যায় এমন সময় কোন এক ওয়াক্ত ফরজ নামায সামনে রাখা, যাতে গাশ্তের পর লোকেরা পরবর্তী নামাযের জন্য আসে এবং নামাযের পর ঈমান ও আমলের মেহনত সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যায়। শুধু আসরের পর হওয়া জরুরী নয়। গাশ্তের আগে পরামর্শ করা যে, কে এ‘লান দিবে, কে গাশ্তের আদব বলবে, কে ঈমান ও এক্বীনের কথা বলবে, কে জিকির করবে, কে এস্তেকবালে থাকবে, কে নামাযের পর কথা বলবে ইত্যাদি।

গাশ্তের এ‘লান যে নামাযে ইমাম সাহেব সালামের পর-পর দোয়া করে সেই নামাযের দোয়ার পর এ‘লান হবে । আর যে নামাযের পর ইমাম সাহেব সালামের সাথে সাথে দোয়া করে না সেই নামাযের সালামের পর পর এ‘লান হবে।

এ‘লান :

যিনি এ‘লান দিবেন তিনি আগের থেকে নামাযের প্রস্তুতি নিয়ে সামনের কাতারে মাঝের দিকে থাকবে, অতপর এ‘লানের সময় দাঁড়িয়ে মুসুল্লীদের দিকে মুখ করে বলবে, “ইন্শায়াল্লাহ দোয়ার পর বা বাকী নামাযের পর মহল্লায় দাওয়াতের আমল হবে, মসজিদে ঈমান ও এক্বীনের কথা হবে, আমরা সবাই বসবো বহুত ফায়দা হবে”

গাশ্তের আদব :

এখানে কয়েকটি বিষয় আলোচনা করতে হবে, যেমনঃ- দ্বীনের আহমিয়াত বা গুরুত্ব, দাওয়াতের জরুরত বা প্রয়োজনীয়তা দাওয়াতের ফযিলত ও দাওয়াতের তরতীব। উক্ত চারটি বিষয় সংক্ষেপে এভাবে বলা যায় আহমিয়াত, জরুরত, ফযীলত ও তরতীব।

আল্লাহ তা‘য়ালা সমস্ত জিন ও ইনসানের দুনিয়া ও আখেরাতের সুখ-শান্তি ও সফলতা রেখেছেন একমাত্র দ্বীন মানার মধ্যে। দ্বীন আল্লাহ তা‘য়ালার নিকট অতি প্রিয়, আর দ্বীন হলো, আল্লাহ তা‘য়ালার হুকুম এবং নবী (স.) এর তরীকা, এই দ্বীন প্রত্যেকটি মানুষের জন্য এমন জরুরী যেমন মাছের জন্য পানি এবং শরীরের জন্য মাথা। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাচতে পারেনা, শান্তি পেতে পারে না, তেমনি কোন মানুষ দ্বীন ছাড়া শান্তি পেতে পারেনা।

আর এই দ্বীন বাকি থাকবে দাওয়াতের দ্বারা, সুতরাং দাওয়াত থাকবে তো দ্বীন থাকবে আর দ্বীন থাকবে তো দুনিয়া থাকবে। আর যখন দাওয়াত থাকবে না তো দ্বীন থাকবে না আর দ্বীন না থাকলে দুনিয়াও থাকবে না। এই দ্বীন প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে কিভাবে এসে যায়, এজন্য যুগে-যুগে নবী-রসূলগণ এসে মানুষের ময়দানে মেহনত করেছেন। আর এই মেহনত করতে গিয়ে সকল নবী-রসূল কম-বেশী কষ্ট-মুজাহাদা করেছেন, তাদেরকে (নাউযুবিল্লাহ) মিথ্যাবাদী, যাদুকর, বুকা ইত্যাদি বলা হয়েছে। যারা নবী-রসূলের কথা মেনেছে ,আল্লাহ তা‘য়ালা তাদেরকে দুনিয়াতেও কামিয়াব করেছেন, এবং আখেরাতেও কামিয়াব করবেন। আর যারা তাদের কথা মানেনি, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে দুনিয়াতেও নাকাম ও ধ্বংস করেছেন এবং আখেরাতেও তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। নবী-রসূলগণ এসে যখন মানুষের ময়দানে দাওয়াত দেওয়া শুরু করতেন তখন মানুষের মধ্যে আস্তে-আস্তে দ্বীন আসা শুরু হতো, পুনরায় যখন এক নবীর ইন্তেকালের পর অন্য নবী আসা পর্যন্ত দাওয়াত বন্ধ থাকত, তখন দাওয়াত বন্ধ থাকার কারণে মানুষের মধ্য থেকে দ্বীন বিদায় নেওয়া শুরু করতো।

যেমনঃ- হযরত ঈসা (আ.) কে আল্লাহ তায়ালা উঠিয়ে নেওয়ার পর আমাদের নবী (স.) তাশরীফ আনার আগ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বছর এই দাওয়াতের কাজ বন্ধ ছিলো, ফলে ঐ যুগ আয়্যামে জাহিলিয়াতে পরিণত হয়েছিলো। তারা এত খারাপ হয়েছিলো যে, তাদের ঘরে কন্যা সন্তন হলে তারা তাকে জীবিত কবর বা দাফন করে দিতো।

যেমনঃ- আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, অর্থঃ- আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সু-সংবাদ দেওয়া হতো তখন তার চেহারা কালো হয়ে যেতো এবং সে রাগান্মিত হয়ে যেতো। এবং পবিত্র কাবা ঘরে ৩৬০টি মূর্তি প্রবেশ করিয়ে ছিলো, এবং পবিত্র কাবা ঘর বেবস্ত্রবস্থায় তওয়াফ করতো। একজনের ঘাটের পানি যদি অন্য জনের উট পান করতো বা একজনের গাছের পাখির বাসার ডিম যদি অন্য কেউ কোন ভাবে ভেঙে ফেলতো তবে এনিয়ে যুগ-যুগ ধরে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেত। যদি বাবা প্রতিশোধ নিতে না পারতো তাহলে মৃত্যুর পূর্বে ছেলেদেরকে অসিয়ত করে যেত যে আমি তো এর প্রতিশোধ নিতে পারলাম না তোমরা এর প্রতিশোধ নিও। এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেও। মারা-মারী, কাটা-কাটি তাদের স্বভাবে পরিণিত হয়েছিলো, এগুলো না করলে যেন তাদের ভাতই হজম হতো না। অতপর যখন আমাদের নবী (স.) এসে তাদের মধ্যে দাওয়াতের মেহনত শুরু করলেন, তখন ঐ মানুষই সোনার মানুষে পরিণিত হয়ে গেলো। এবং এতভালো হলেন যে, তাদের মত ভালো মানুষ আর দুনিয়াতে আসবে না ।

যেমনঃ- আল্লাহ তা‘য়ালা এরশাদ ফরমান, অর্থঃ- আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি এবং তারাও আল্লাহর প্রতি রাযী-খুশি হয়েছেন। সূরা- বায়্যিনা-৮, মুজাদালা-২২ আমাদের নবী (স.) ও এই দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, এবং এই দ্বীনের জন্য অনেক কষ্ট মুজাহাদা করেছন। তিনি এরশাদ ফরমান -আল্লাহর দ্বীনের জন্য আমাকে যত কষ্ট দেওয়া হয়েছে এমন কষ্ট আর কাহাকেও দাওয়া হয়নি, এবং আমাকে যত ভয় দেখানো হয়েছে এমন ভয়ও কাহাকে দেখানো হয়নি। আর যেহেতু আমাদের নবীর পর কোন নবী আসবেন না, যেমন এরশাদে বারী তা‘য়ালা, অর্থঃ- মুহাম্মাদ (স.) তোমাদের কাহারো পিতা নন বরং আল্লাহর রসূল এবং শেষ নবী। (সূরা আহযাব-৪০) এবং নবী (স.) এরশাদ ফরমান ঃ- অর্থঃ- আমিই শেষ নবী আমার পর আর কোন নবী আসবেন না। এজন্য এ দাওয়াতের জিম্মাদারী এই উম্মাতে মুহাম্মাদীকে দেওয়া হয়েছে।

যেমন: আল্লাহ তা‘য়ালা ফরমান অর্থঃ- আপনি বলে দিন, এটাই আমার রাস্তা যে, আমি পূর্ণ বিশ্বাসের সহিত আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই, এবং যারা আমার অনুসারী তারাও (আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়) সূরা ইউসুফ-১০৮ অন্য আয়াতে এসেছে, অর্থঃ-ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কাহার হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করে এবং সৎ কাজ করে এবং বলে যে আমি মুসলমানদের মধ্য হতে একজন। সূরা হা-মীম-৩৩ এবং অসংখ্য হাদীসেও এই জিম্মাদারী সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে।

যেমন: ১.অর্থঃ- হুযুর (স.) এরশাদ ফরমান, তোমরা আমার পক্ষ থেকে পৌছিয়ে দাও, যদিও একটি আয়াত হয়। ২. অর্থঃ- হুযুর (স.) এরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যারা উপস্থিত আছে তারা যেন অনুপস্থিতদের নিকট পৌছিয়ে দেয়। ৩. অর্থঃ- হুযুর (স.) এরশাদ করেন, যদি কোন গোত্রে কোন ব্যক্তি কোন গুণাহ করে আর ঐ গোত্রের লোকদের ঐ ব্যক্তিকে গুণাহ থেকে বাধা দেওয়ার শক্তি থাকা সত্যেও তাকে উক্ত গুণাহ থেকে বাধা না দেয় তাহলে মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর আযাব পাঠিয়ে দিবেন। এবং এই জিম্মাদারীর জন্য আল্লাহ তা‘য়ালা এই উম্মতকে অনেক ফযিলতও দিয়েছেন। যেমন, আল্লাহ তা‘য়ালা কুরআনে কারীমে এই উম্মতকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন অর্থঃ- তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত মানুষের কল্যাণের জন্য তোমাদের বাহির করা হয়েছে, তোমরা সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে। এবং আল্লাহ তা‘য়ালার উপর ঈমান আনিবে। ( সূরা আলে ইমরান-১১০) অন্য আয়াতে আছে, অর্থঃ- আর ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কাহার হতে পারে যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে এবং নেক আমল করে এবং বলে যে আমি মুসলমানদের মধ্যে একজন। সূরা হা-মীম, এক হাদীসে আছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (স.) কে আমি একথা বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর রাস্তায় কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকা ক্বদরের রাত্রে হাজারে আসওয়াদের সামনে এবাদত করার চেয়েও উত্তম কাজ। (ইবনে হাব্বান) অন্য হাদিসে এসেছে, হযরত সোহায়েল (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (স.) কে আমি একথা বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের কাহারো কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকা তার পরিবার- পরিজনের মধ্যে অবস্থান করে সারা জীবন নেক আমল করার চেয়েও উত্তম। (মোস্তাদরাকে হাকিম) অন্য হাদীসে আছে, হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (স.) এরশাদ ফরমান আল্লাহর রাস্তায় এক সকাল অথবা এক বিকাল এই দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম। (নাসাঈ) এক হাদীসে আছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (স.) এরশাদ ফরমান আল্লাহর রাস্তার ধুলা-বালি এবং দোযখের ধোয়া কোন বান্দার পেটে কখনো একত্র হবে না (নাসাঈ)

তরতীব :

লাভ বলার পর বলবে, এত লাভের কাজ করতে আমরা সবাই রাযী আছি না? অতপর বলবে প্রত্যেক কাজের জন্য একটি নিয়ম ও তরতীব আছে, তো এ দাওয়াতের কাজেরও একটি তরতীব আছে। আর তা হলো, একটি জামাতের দুটি অংশ হবে, এক অংশ মসজিদের ভেতরে আমল করবে, অপর অংশ মসজিদের বাহিরে। মসজিদের ভেতরে যে অংশ থাকবে, তার মধ্যে একজন ঈমান ও এক্বীনের কথা বলবে।

যেমনঃ- আল্লাহ তা‘য়ালার একত্ববাদের, তাঁর কুদরতের, তাঁর সিফাতের কথা বলবে। এবং নবী-রসূলদের ঘটনাবলী ও আখেরাতের কথা বলবে। একজন জিকিরে থাকবে। অর্থ্যাৎ জিকির, কুরআন তেলওয়াত ও দোয়া, কান্না-কাটির মধ্যে থাকবে। একজন এস্তেকবালে থাকবে। অর্থ্যাৎ জামাত গাশতে যাওয়ার পর মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে যদি কোন লোক মসজিদে আসে তাহলে তাকে অজু করিয়ে নামায পড়িয়ে ঈমান ও এক্বীনের হালকায় বসিয়ে দিবে। এবং বাকী সময় জিকিরে-ফিকিরে থাকবে। আর কিছু লোক ঈমান ও এক্বীনের কথা শুনবে। আর মসজিদের বাহিরে যে অংশ যাবে তার মধ্যে একজন রাহবার, একজন মুতাকাল্লিম, কয়েক জন মামূর ও একজন জিম্মাদার হবে। রাহবার এলাকার হলে ভালো হয় । কেননা আমরা অন্য যায়গার মানুষ এই এলাকার রাস্তা-ঘাট ও লোকজনের অবস্থা সম্পর্কে জানি না। এবং রাহবারের অনেক লাভও রয়েছে।

যেমন- এক হাদীসে এসেছে, অর্থঃ- কোন নেক কাজের শুধু রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া স্বয়ং ঐ কাজকরনেওয়ালার মতই নেকী। তো এত লাভের কাজ করতে এলাকার কে রাযী আছি? কেউ রাযী হলে এবার তার জিম্মাদারী বুঝিয়ে দেওয়া যে, রাহবার ভায়ের কাজ হলো, জামাতকে রাস্তা দেখিয়ে কোন মুসলমান ভায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে তার সাথে সালাম মুছাফাহা করে একথা বলবে যে, আল্লাহর ঘর থেকে আল্লাহর মেহমানরা আল্লাহ এবং আল্লাহর রসূলের কথা নিয়ে এসেছে, কি বলে একটু শুনি। এবং তার কিছু গুণাবলীও বলবে। যেমনঃ- ইনি আমাদের এলাকার একজন হাজী সাহেব, বড় ব্যবসায়িক, সমাজ সেবক ইত্যাদি। এবং তাকে মুতাকাল্লিম ভায়ের হাতে তুলে দিবে। এবং কোন বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করবে না। বরং এক এক করে তিনবার পর্যন্ত সালাম দিতে থাকবে যদি স্বাক্ষাত হয় তাহলে মুতাকাল্লিম ভাই তাকে নরম ভাষায়, মিষ্টি সুরে, মহব্বতের সাথে, নিজেকে ছোট ও তাকে বড় মনে করে তিন কথা যেমনঃ- তওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত এর উপর সংক্ষিপ্ত ভাবে দাওয়াত দিয়ে নগদ মসজিদে আনার জন্য চেষ্টা করবে। যদি রাযী হয় তাহলে একজন মামূরসহ তাকে মসজিদে পাঠিয়ে দিবে। আর যদি কোন কারণবসতঃ নগদ না আসে তাহলে তাকে দায়ী বানিয়ে হার উপর রেখে আসবে যে, ঠিক আছে আপনি আরো লোক-জন নিয়ে অমুক সময় মসজিদে আসবেন। আর যদি বাড়ীর লোকের সাথে স্বাক্ষাত না হয়, তাহলে একথা বলে আসা যে, আমরা মসজিদ থেকে আসছিলাম অমুকে আসলে মসজিদে পাঠিয়ে দিবেন।

উমূমী গাশ্তের দাওয়াতঃ-

যাকে দাওয়াত দিবে তার হালাত বা অবস্থানুযায়ী বিভিন্ন ধরনের দাওয়াত হতে পারে। যেমনঃ- সালাম মুসাফাহার পর সালাম-মুছাফাহার লাভ বলবে, অতপর বলবে, আল্লাহ তা‘য়ালার শুকরিয়া যে, আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে মুসলমান বানিয়েছেন, আমরা একটি অনেক দামি কালিমা পেয়েছি। অর্থঃ- আল্লাহ ছাড়া কোন মাবূদ নেই হযরত মুহাম্মাদ (স.) আল্লাহর রসূল। (এই কালিমা নিজে একটু পড়ে তাকে পড়ার সুযোগ দিবে, যাতে সে কালেমাটি পাঠ করে।)

এই কালেমা যখন আমরা পড়েছি তখন আল্লাহ তা‘য়ালার অন্যান্য হুকুম মানা আমাদের জন্য জরুরী হয়ে গিয়েছে। সুতরাং আমরা যদি আল্লাহর হুকুম মানি এবং নবী (স.) এর তরীকানুযায়ী চলি তাহলে আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে দুনিয়াতেও সুখ-শান্তি ও কামিয়াবী দান করবেন এবং আখেরাতেও চির সুখ-শান্তি ও কামিয়াবী দান করবেন। এই সুখ-শান্তি ও কামিয়াবী আমার, আপনার এবং সমস্ত উম্মতের মধ্যে কি ভাবে এসে যায় এজন্য এক যবরদস্ত মেহনত করার প্রয়োজন, মেহনত ছাড়া কোন কিছুই অর্জন হয় না, এই মেহনত সম্পর্কে মসজিদে বহুত জরুরী কথা হচ্ছে, আমরা তো আপনাকে নগদ নেওয়ার জন্য এসেছি, কি বলেন, যাওয়া যায় না?

মোট কথা তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতকে সামনে রেখে যে ভাবেই হোক দাওয়াত দেওয়া। মামূরদের কাজ হলো, তারা জিকির করতে থাকবে, কোন কথাবার্তা বলবে না, কোন দিক তাকাবে না বরং নীচের দিকে তাকিয়ে চলবে। আর যেহেতু তাদের কাজ জিকির করা এজন্য তারা কাউকে সালাম দিবেও না এবং সালামের উত্তরও দিবে না বরং একেবারে চুপ-চাপ থাকবে। যখন মুতাকাল্লিম ভাই দাওয়াত দেয় তখন জিকির বন্ধ করে দাওয়াত শুনবে এবং মনে করবে যে, এ দাওয়াত আমাকেই দেওয়া হচ্ছে। যাকে দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে তাকে সাথীগণ একেবারে ঘিরে দাঁড়াবে না বরং তাকে এক পাশে রেখে দাঁড়াবে। কেননা এতে সে ভয় পেতে পারে। এমন কথা না বলা যার দ্বারা তার মানহানী, অসম্মানী বা লজ্জার কারণ হয়। সে একজন মুসলমান হিসেবে তার মর্যাদার দিকে লক্ষ রেখে দাওয়াত দিবে। আর জিম্মাদারের কাজ হলো জামাতকে পরিচালনা করা জামাতের মধ্যে যদি কোন বে-উসূলী হয় তাহলে সংশোধন করে দেওয়া। এবং তিনি যদি চান তাহলে কোন বে-উসূলী হলে জামাত ফিরিয়েও আনতে পারেন, আবার সংশোধন করে সামনেও চালাতে পারেন। রাহবার, মুতাকাল্লিম এবং জিম্মাদার এই তিন জন কথা বলবে, কিন্তু মামূর কোন কথাই বলবে না। পুরা জামাত নীচের দিকে তাকিয়ে নযরের হেফাজত করে চলবে। নাজায়েয জিনিস তো দূরের কথা, কোন দুনিয়াবী জায়েয জিনিসও দেখবে না। কেননা যেদিকে চোখ যায় সে দিকে মন ও ফিকির চলে যায়। কোন ভায়ের গেট বা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে না বরং এক পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে। রাস্তার ডান দিক দিয়ে চলবে। এবং রাস্তায় চলার অন্যান্য আদবের প্রতিও লক্ষ রাখবে।

মহল্লা লম্বা হলে প্রথমে জামাত শেষ মাথায় গিেেয় দাওয়াত দিতে দিতে মসজিদের দিকে আসবে। আর যদি মহল্লা গোলাকার হয় তাহলে ডান দিক দিয়ে শুরু করে বাম দিক দিয়ে মসজিদের দিকে আসবে। বা অবস্থানুযায়ী দাওয়াত দিবে। এমন সময় দাওয়াত শেষ করা যে, মসজিদে এসে জরুরত থেকে ফারেগ হয়ে পরবর্তী নামায তাকবীরে উলার সাথে আদায় করা যায়। গাশ্তের আদব বলার পর যারা দাওয়াতে যাবে তারা মসজিদের বাহিরে গিয়ে মুতাকাল্লিম, জিম্মাদার এবং কোন দিকে দাওয়াতের আমল হবে তা নির্দিষ্ট করবে। দাওয়াত শেষ হলে মসজিদের একটু দূরে এসে রাহবার ভাই জিম্মাদার সাহেবকে বলবে, দাওয়াত তো আজকের মত এখানেই শেষ, তখন জিম্মাদার সাহেব বলবে ভাই! দাওয়াত তো ইন্শায়াল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত চলবে। যে ভাবে দাওয়াত দেওয়ার কথা ছিল আমরা সেভাবে দিতে পারি নেই, অনেক কমতি হয়েছে, এজন্য আমরা জিকির পরিবর্তন করে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে পড়তে মসজিদের দিকে যায়। অতপর সবাই এসে প্রথমে ঈমান ও এক্বীনের কথায় বসবে। অতপর যদি কোন জরুরত থাকে সেখান থেকে যাবে। ঈমান ও এক্বীনের মজলিসে এসে কেউ সালাম দিবে না, বরং চুপ-চাপ বসে যাবে। আর যেহেতু উমূমী গাশ্তের জামাত বেশী দূরে যেতে পারেনা এজন্য মহল্লা বড় হলে দুই-তিন জনের একটি খুছূছী জামাত বানিয়ে ঐ সময় পাঠানো, যাতে উভয় জামাতের দাওয়াতের দ্বারা মেহনত পুরা হয়।

সফরের নিয়ম ও আদব আল্লাহর পথে দাওয়াত

by Md. Sojol Mia, CoU

সফরঃ-

রওয়ানেগী হেদায়েত (যা সফরে যাওয়ার পূর্বে বলা হয়) শুনে মুছাফাহা করার পর যখন রোখের পার্চা বা কাগজ হাতে আসবে তখন থেকে সফরের কার্যক্রম শুরু হবে, সর্ব প্রথম সফরে বের হওয়ার নিয়ত ঠিক করা। আর নিয়ত হলোঃ- ১. আল্লাহকে রাযী-খুশী করা, ২. দ্বীন শিখা, ৩. দ্বীনের উপর চলতে শিখা, ৪. দ্বীনের মেহনত শিখা, ৫. নগদ জামাত বের করা। অতপর আমীর সাহেব সকল সাথীকে নিয়ে বসে সংক্ষিপ্ত ভাবে পরিচয় নিবে যেমনঃ- নাম, পেশা, জেলা, পূর্বে কত সময় লাগিয়েছে ইত্যাদি। অতপর সকল সাথীকে জামাত নাম্বার ও রোকের ঠিকানা জানিয়ে দিবে এবং প্রয়োজনে ছোট কোন কাগজে লিখে প্রত্যেক সাথীকে দিবে যাতে কোন সাথী রাস্তায় হাড়িয়ে গেলেও আপন রোখে পৌছতে পারে অতপর সাথীদের সাথে মাশওয়ারা করবে যে,আমাদের এজ্তেমায়ী সামানা যেমনঃ- হান্ডি-পাতিল চুলা ইত্যাদি ভাড়া করতে এত টাকা এবং ফাজায়েলে আমল ইত্যাদি। কিতাব কিনতে এত টাকা এবং আমাদের রোখে পৌছতে এত টাকা লাগবে, সুতরাং কত টাকা করে উঠানো যেতে পারে? প্রয়োজন পরিমান টাকা উঠিয়ে এমন দুইজন সাথীর নিকট রাখবে যাদেরক জামাতের অন্যান্য সাথীগণ চিনে। একক কোন ব্যক্তির নিকট টাকা রাখবে না এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা উঠাবে না এবং একজনের টাকা অন্যজনের নিকট জমাও রাখবে না। অতপর জামাতের আমীর সাহেব সাথীদেরকে জাননেওয়ালা এবং নাজাননেওয়ালা, যুবক-বৃদ্ধ, ও নতুন-পুরাতনের প্রতিলক্ষ রেখে দুই দুই জন করে জোড়া বানিয়ে দিবে। এবং দুইজন সাথীকে বাস, ট্রেন ইত্যাদি ঠিক করার জন্য নির্দিষ্ট করে দিবে যাতে অন্যান্য সাথীদের পেরেশানি না হতে হয়। অতপর যত দূরত সম্ভব কাকরাইল মসজিদ থেকে বের হয়ে যাবে।মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় মসজিদ থেকে বের হওয়ার আমল পুরা করবে। যেমনঃ- বিসমিল্লাহ, দরূদ শরীফ, ও দোয়া পড়ে বাম পা আগে বের করে বাম পার জুতার উপর রাখবে। এগুলো একত্রে এভাবে পড়বে। অতপর সফর শুরু করার দোয়া পড়বে। যেমনঃ- ষ্টেশনে গিয়ে কোন মসজিদ বা কোন নিরাপদ স্থানে সামানাপত্র রেখে সাথীরা তা‘লীম শুরু করবে আর নির্দিষ্ট সাথীরা বাস ইত্যাদি ঠিক করবে। টিকেট ক্রয়ের সময় বাসওয়ালাদের সাথে একথা বলে নিবে যে, নামাযের সময় হলে নামাযের জন্য বাস থামাতে হবে, বাসের মধ্যে গান-বাজনা বাজাতে পারবে না, টি,ভি ইত্যাদি চালাতে পারবে না। বাসে উঠার সময় বিস্মিল্লাহ বলে ডান পা দিয়ে উঠবে এবং সিটে বসে আলহামদুলিল্লাহ বলবে অতপর এই দোয়া পড়বে। অতপর তিনবার আলহামদুলিল্লাহ ও তিনবার আল্লাহু আকবার বলবে, তারপর এই দোয়া পড়বে,- তারপর একটু মুচকি হাসবে। দাওয়াত, তা‘লীম, নামায ও জিকির এই চার আমলের সাথে সফর করবে। সফরাবস্থায় কোন অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া কোন কিছু খাবে না। কেননা মুমিন অন্যকে ধোকা দিবেনা এবং নিজেও ধোকা খাবেনা। রাস্তায় চলার সময় রাস্তার আদবের প্রতি লক্ষ রাখিবে। যেমনঃ- ১. বড় রাস্তার ডান দিক দিয়ে চলা। ২. সালামে-কালামে চলা। ৩. জিকিরে-ফিকিরে চলা। ৪. সালামের উত্তর দেওয়া। ৫. নযরের হেফাজত করা। ৬. শিখতে-শিখাতে চলা। ৭. রাস্তায় কোন কষ্ট দায়ক জিনিস থাকলে তা সরিয়ে দেওয়া বা পিছনের সাথীকে বলে দেওয়া। ৮. সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা।

দলীল:

অর্থ:- হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাঃ বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, তোমরা রাস্তার উপর বসিও না সাহাবাগণ আরজ করলেন ইয়া রসূলাল্লাহ! আমাদের জন্য রাস্তার উপর না বসে উপায় নেই। আমরা সেখানে বসে কথাবার্তা বলে থাকি। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন, যদি বসতেই হয় তবে রাস্তার হকসমূহ আদায় করবে। সাহাবাগণ আরজ করলেন ইয়া রসূলুল্লাহ! রাস্তার হকসমূহ কি? তিনি এরশাদ করলেন, দৃষ্টি অবনত রাখা, কষ্টদায়ক জিনিস থাকলে রাস্তা হতে সরিয়ে দেওয়া, সালামের উত্তর দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা, ও অসৎকাজের নিষেধ করা।

সফরাবস্থায় সচ্ছল বা ভাল অবস্থায় থাকার আমলঃ-

সফরাবস্থায় সচ্ছল থাকার জন্য পাঁচ সূরা ছয় বিস্মিল্লাহর সাথে বেশীবেশী পাঠ করা। অর্থাৎ সূরা কাফিরুন, সূরা নাছর, সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক ও সুরা নাস বিস্মিল্লাহসহ একবার একবার করে পাঠ করা এবং সূরা নাস শেষে একবার বিস্মিল্লাহ পাঠ করা।

দলীল:

একদিন নবী করীম স. হযরত জুবায়ের ইব্নে মুনঈম রা. কে বললেন, হে জুবায়ের! তুমি কি চাও যে, সফরাবস্থায় তুমি তোমার সাথীদের মধ্যে সবার চেয়ে বেশী সচ্ছল থাকবে? হযরত জুবায়ের রা. বললেন, হে আল্লাহর রসূল! স. আমার আব্বা-আম্মা আপনার উপর কোরবান হোক অবশ্যই আমি তা চাই। তখন নবী করীম স. তাকে বললেন তাহলে তুমি এ নিয়মে পাঁচটি সূরা ( সফরাবস্থায় ) পড়তে থাকবে যে, প্রথমে সম্পূর্ণ বিস্মিল্লাহ পড়বে অতপর সূরা কাফিরুন পড়বে তারপর বিস্মিল্লাহসহ সুরা নাছর অতপর বিস্মিল্লাহসহ সুরা এখলাছ পড়বে এরপর বিস্মিল্লাহসহ সুরা ফালাক অতপর বিস্মিল্লাহসহ সুরা নাস পড়বে। এবং সব শেষে পূনরায় একবার বিস্মিল্লাহ পড়বে। হযরত জুবায়ের রা. বলেন আমি অনেক সম্পদশালী ছিলাম কিন্ত যখন সফরে যেতাম তখন সবার চেয়ে দুরাবস্থায় ও অভাবগ্রস্থ হয়ে পরতাম আর যখন নবী করীম স. আমাকে উল্লেখিত নিয়মে সুরাসমূহ পড়তে বললেন এবং আমি ঐ নিয়মে পড়তে শুরু করলাম তখন থেকে আমি পূর্ণ সফরের মধ্যে ফিরে আসা পর্যন্ত আমার সাথীদের মধ্যে সবার চেয়ে বেশী ভাল ও সচ্ছলাবস্থায় থাকতাম।

মনজিল করার নিয়ম : আল্লাহর পথে দাওয়াত

by Md. Sojol Mia, CoU

মনজিল করার নিয়ম: যে মসজিদে আমাদের রোখ থাকবে সে মসজিদের মহল্লার শুরুতে মন্জিল করবে মসজিদের সামনে গিয়ে নয়। মন্জিল করার নিয়ম হলো, মসজিদের মহল্লার শুরুতে রাস্তার এক পাশে খালি যায়গায় সব সামানা রেখে তার চতুর পাশে সকল সাথী গোল হয়ে দাঁড়াবে। অতপর মন্জিলের দোয়া পড়বে, দোয়া এই এবং এই দোয়া পড়বে। অতপর এই দোয়া পাঠ করবে- হযরত খাওলা বিনতে হাকীম রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোথাও অবতররণ করে এই দু‘য়া পড়বে সে ঐ স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত তাকে কোন কিছু ক্ষতি করবে না। অতপর একজন মন্জিল করার উদ্দেশ্য ইত্যাদি বলবে, যেমনঃ- মন্জিলের উদ্দেশ্য হলো, আমরা রাস্তায় আসতে বিভিন্ন জিনিস দেখার কারণে আমাদের দিল ও ফিকির বিভিন্ন দিকে চলে গিয়েছে সুতরাং এখন আমরা পুনরায় আমাদের ফিকিরকে এক করি যে, আমরা যে তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে এই মহল্লায় এসেছি তা কিভাবে বাস্তবায়ন হয়। তিনটি উদ্দেশ্য হলো, ১. আমরা এমন ভাবে মেহনত করবো যাতে করে আমাদের প্রত্যেকটি সাথী জ্ঞানি-গুণি, কর্মট, মুখলেছ ও দ্বীনের দায়ী বনতে পারে বা ইমানওয়ালা আমলওয়ালা, মুখলেছ ও দ্বীনের দায়ী বনতে পারে। ২.আমরা এমন ভাবে মেহনত করবো যাতে এই এলাকার প্রত্যেকটি ঘর থেকে একএক জন বালেগ পুরুষ বারীবারী করে অর্থাৎ একের পরএক আল্লাহর রাস্তায় বের হতে পারে। অথবা এই এলাকা থেকে নগদ জামাত আল্লাহর রাস্তায় বের করা যায়। এবং এই এলাকার প্রত্যেকটি বাড়ীর প্রত্যেকটি মানুষের নিকট দাওয়াত পৌছানো যায়। ৩. এই মহল্লার মসজিদে যদি পাঁচ কাজ চালু না থাকে তাহলে চালু করা আর যদি চালু থাকে তাহলে জরদার বা মজবুত করা আর যদি মজবুত থাকে তাহলে তা থেকে ফায়দা নেওয়া বা উপকৃত হওয়া। এবং মসজিদের আদব আলোচানা করা যে, আমরা মসজিদে প্রবেশের সময় বাম পায়ের জুতা খুলে বাম পায়ের উপর রাখবো অতপর ডান পায়ের জুতা খুলে ডান পায়ে বিস্মিল্লাহ , দরূদ শরীফ ও দোয়া পড়ে মসজিদে প্রবেশ করবো এবং ই‘তেকাফের নিয়ত করবো। অতপর দোয়া করা এবং দোয়ার মধ্যে বিশেষ ভাবে একথা উল্লেখ করা যে, হে আল্লাহ! তুমি এই এলাকার ভালায়ী আমাদেরকে দান করুন এবং অকল্যাণ হতে আমাদেরকে হেফাজত করুন, এবং আমাদের ভালায়ী তাদের মধ্যে দান করুন ও আমাদের অকল্যাণ হতে তাদেরকে হেফাজত করুন, এবং এলাকা বাসির অন্তরে আমাদের প্রতি মহব্বত এবংআমাদের অন্তরে এলাকা বাসির প্রতি মহব্বত পয়দা করে দেন এবং আল্লাহ তায়ালার সাহায্য চাওয়া। কেননা আল্লাহ তায়ালার সাহায্য না থাকলে আমরা কিছুই করতে পারবো না। দোয়ার মধ্যে আশে পাশে থাকা এলাকা বাসিদেরকেও শরীক করার চেষ্টা করবে। দোয়ার পর বিনয়ের সহিত নিচের দিকে তাকিয়ে পূর্বে বর্ণিত তিনটি বিষয়ের ফিকির নিয়ে মসজিদের দিকে যাবে । অতপর মসজিদের সুন্নাত আদায় করে মসজিদে প্রবেশ করবে। মসজিদ অপরিস্কার থাকলে পরিস্কার করে সামানাগুলো মসজিদের এক পাশে গুছিয়ে রেখে যদি মাকরূহ ওয়াক্ত না হয় তাহলে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায পড়বে। অতপর জলদি জলদি মাশওয়ারায় বসে যাবে। পূর্বের মসজিদ থেকে জরুরত সেরে অজুয়াবস্থায় পরের মসজিদে আসার চেষ্টা করবে। যেন নতুন মসজিদে এসেই জরুরতে না যাওয়া লাগে, যা দেখতে খারাপ দেখা যায়।

হেদায়েতি বয়ান; মাওলানা আব্দুল মতিন

by Md. Sojol Mia, CoU

আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে আমরা এ ইজতেমায় আসতে পেরেছি। আল্লাহর রাস্তায় আসতে পেরেছি। কেউ যখন আল্লাহর রাস্তায় বের হয়, তখন তার জান, মান, ইজ্জতের দাম আল্লাহর কাছে বেড়ে যায়। বাড়ি থাকাকালীন একজন মানুষের জানমালের যে দাম, তা থেকে অনেকগুণ বেড়ে যায় আল্লাহর রাস্তায় এলে। হাদিস শরিফে এসেছে, একদিন আল্লাহর রাস্তায় লাগানো, বাড়িতে বসে হাজার দিন ইবাদত করা থেকে উত্তম। একদিনে যদি হাজার দিন হয়, তাহলে যে চিল্লা লাগায় তার মূল্য কতো? আর যে তিন চিল্লা বা সাল লাগায় তার দাম কতো? আল্লাহর রাস্তায় এক টাকা খরচ করলে সাত লক্ষ টাকা খরচের সাওয়াব। এক রাকাত নামাজে ঊনপঞ্চাশ কোটি রাকাত নামাজের সাওয়াব পাওয়া যায়। আমরা আল্লাহর রাস্তায় গিয়ে জামাতের ইহতেমাম করবো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তাকবিরে উলার সঙ্গে পড়বো। এমনিভাবে সবসময় এসব বিষয়ে যত্নশীল হবো। এর পাশাপাশি আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার পর আমরা বেশি বেশি নফল পড়বো, বেশি বেশি তাসবিহ পড়বো। আল্লাহর রাস্তায় বের হলে একটু হবে। কিন্তু এর ফলে আল্লাহ অনেক নেকি দান করবেন। বলা হয়েছে যে আল্লাহার রাস্তায় ঘুমও ইবাদত। কিন্তু তাবলিগের সাথী ভাইয়েরা তো শুধু ঘুমান না। ঘুমান তো অল্প সময়। বাকি সবই তো দীনের কাজ করেন। গাস্ত করেন, তালিম করেন, জিকির করেন। পাশের ভাইকে একরাম করেন। একটু ভেবে দেখেন, ঘুমালেই যদি নেকি হয়, তাহলে এসব গুরুত্বপূর্ণ আমল করলে কতো নেকি? এরপর আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়তকে সহিহ করতে হবে। অনেকেই এ নিয়তে তাবলিগে সময় লাগাতে আসে, এখানে সময় লাগলে আল্লাহ আমার রোগ দূর করে দিবেন। কিংবা বাড়িতে বসে আছি, অবসর সময় নষ্ট না করে একটা চিল্লা লাগিয়ে আসি, একটু ভ্রমণও হবে, আবার চিল্লাও লাগানো হবে। আবার অনেকে বিপদ থেকে রক্ষা পেতে চিল্লা লাগাই। দেখেন ভাই, আপনি যদি এসব নিয়তে আল্লাহর রাস্তায় বের হন, তাহলে আল্লাহ আপনার এসব আশা পূরণ করতেও পারেন, নাও করতে পারেন। কিন্তু আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিন্দু পরিমাণও সাওয়াব পাবেন না। আমরা যে জন্য নামাজ পড়ি, সে জন্যই আল্লাহর পথে বের হতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর রাজি খুশির জন্য। নিয়তে যদি আমাদের সমস্যা থাকে তাহলে কোনও কিছুই আমাদের কাজে আসবে না। আমরা আল্লাহর রাস্তায় গিয়ে তিনকাজ করবো, ১. দীন শিখবো। ২. দীনের ওপর চলবো, ৩. দীনের মেহনত করবো। মেহনত না করলে হবে না। শুধু জানলেই হবে না। যেমন আমরা সবাই জানি, নামাজ ফরজ । অনেকেই আদায় করি না। তাই দীন শিখে তার ওপর মেহনত করবো। দোস্ত, আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে আমরা প্রথমেই ছয় নাম্বার শিখবো। ছয় নাম্বারই পুরো দীন নয়। তবে এই ছয় নাম্বারের একটা আছর আছে। আগুণের আছর যেমন পোড়ানো, পানির আছর যেমন ভেজানো, তেমন ছয় নাম্বারেরও আছর হলো মানুষকে দীনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া।

ছয় নাম্বার হলো, কালিমা, নামাজ, ইলম ও জিকির, তাসহিহে নিয়ত, দাওয়াত ও তাবলিগ। আমরা সবাই মুসলমান। সবাই কালেমা পারি । তাহলে কালিমার মেহনত কেন? এর কারণ হলো ভাই, ঈমান শেখার শেষ নেই। মউত পর্যন্ত ইমান শিখলেও শেষ হবে না। তবে কালিমা শেখার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে, এক. উচ্চারণ শুদ্ধ করা। দুই. অর্থ জানা। তিন. এর বিশ্বাস অন্তরে গাঁথা। প্রত্যেক জামাতের আমিরের দায়িত্ব হলো তার সাথীদের কালিমা শেখানোর ক্ষেত্রে যত্নশীল হওয়া। কালিমার বিশ্বাস অন্তরে গাঁথা মানে হলো, দুনিয়ার যা কিছু আছে সবকিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। এ সবই মাখলুক। মাখলুক কিছুই করতে পারে না খালেক ছাড়া , খালেক সব করতে পারেন মাখলুক ছাড়া। কোরআন শরিফে মাত্র পাঁচশ আয়াত হলো করণীয় বিষয়ের আলোচনা। এছাড়া বাকি সব আয়াতে খালেক কে? তার পরিচয় ও তার সৃষ্টির সমাহারের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সৃষ্টির কোনো ক্ষমতা নেই। আগুন আল্লাহর হুকুম ছাড়া চাইলেই কিছু জ্বালিয়ে দিতে পারে না। হযরত ইবরাহিম আ. কে ৪০ থেকে ৫০ দিন আগুনে ফেলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর হুকুম হয়নি, তাই আগুন তাকে জ্বালাতে পারেনি। লোহা ইচ্ছে করলেই কাটতে পারে না। হযরত ইসমাইল আ.কে জবাই করার জন্য ধারালো ছুরি দিয়ে ইবরাহিম আ. চেষ্টা করেছেন । কিন্তু বিন্দু পরিমাণও কাটেনি। কেননা সেখানে আল্লাহর হুকুম ছিল না। তেমনিভাবে পানির ক্ষমতা নেই ভেজানোর । হযরত মুসা আ. যখন নীলনদে নেমে ছিলেন, তখন পানি তাকে ভেজাতে পারেনি। কেননা তাকে ভেজানোর হুকুম দেওয়া হয়নি। ভাই এভাবে সবকিছুই আল্লাহর আদেশে চলে। তার হুকুম ছাড়া কেউ একচুলও নড়তে পারে না। দুনিয়ার কিছুই আমাদের হাজত পুরো করতে পারে না। ব্যবসা, চাকরি, দোকান, কিছুই না। হাজত আল্লাহ পুরো করেন। তার প্রিয় হাবিবের দেখানো তরিকাই নাজাতের তরিকা। কেয়ামতের দিন যার লেবাস আচার আচরণ নবীর সঙ্গে মিলে যাবে তাকে বিনা হিসেবে জান্নাত দেওয়া হবে। তাই ভাই লেবাস পোশাকের অনেক দাম । সুন্নতি লেবাস পড়তে হবে। যে যার লেবাস ধরে তার ওই ব্যক্তির সঙ্গে হাশর হবে। আল্লাহর রাস্তায় তিন মেহনত করতে হবে। এক. দাওয়াত । দুই. হালকা বানিয়ে দাওয়াত। তিন. ইমানের ভিখারি হয়ে দাওয়াত। সাত জমিন সাত আসমান এক পাল্লায় আর কালিমা এক পাল্লায় রাখলে কালিমা ভাড়ি হয়ে যাবে। এরপর নামাজ। নামাজ শিখতে হবে। আর তা হতে হবে নবী ওয়ালা নামাজ। নামাজের দাওয়াত দিতে হবে। কেউ নামাজ ছাড়লে কাজা হলেও পড়িয়ে নিবো।এরফলে তার কত বড় উপকার জানেন, তাকে দুই কোটি ৮৮লক্ষ বছরের শাস্তি থেকে বাচিয়ে দিলেন। নামাজের জাহেরি বাতেনি উভয় দিক ঠিক করতে হবে। জাহিরি দিক হলো, কুরআন নামাজে পড়ার মতো করে শুদ্ধ করা ফরজ।এছাড়া অন্যান্য আহকাম যেমন, আত্তাহিয়াতু, তাসবিহ ঠিক করতে হবে। আর বাতেনি দিক হলো, আমি আল্লাহ কে দেখছি, এই ধ্যানে নামাজ পড়া। নামাজে তিন জিনিস আমাদের ধ্যানে থাকতে হবে, এখন আমি আল্লাহর সামনে দাড়াচ্ছি। আল্লাহকে আমার সবকিছু শোনাচ্ছি। যা ভাবি সব আল্লাহ দেখছেন। নামাজের পর দোয়া করবো। শুকরিয়া আদায় করবো। কেননা আল্লাহর দয়ায় তা আমরা আদায় করতে পেরেছি। নামাজ দৌলত । কেউ দিনে পাঁচবার গোসল করলে যেমন তার গায়ে  কোনো ময়লা থাকতে পারে না। তেমনি কেউ দিনে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে তার মনেও কোনো গোনাহ থাকে না। এরপর হলো ইলম। ইলম ছাড়া নবীর তরিকা জানতে পারবো না। তিনভাবে ইলম শিখবো। এক. ইলিমের দাওয়াত। তাহতে পারে গাস্তের মাধ্যমে। তালিম যতক্ষন গাস্ত তক্ষণ চলবে। দুই. মশক্ এর মাধ্যমে। ফাজায়েল আমরা ফাজায়েলে আমল থেকে শিখবো। মাসায়েল, আলেম কিংবা যে পুরাতন সাথীরা আলেমদের থেকে মাসালা শিখেছে, তাদের থেকে শিখবো। মশক্ হিসেবে কোরআন পড়তে পারি। কোরআনহলো সর্বোত্তম জিকির। এটা দুনিয়া থেকে না শিখে গেলে কী জবাব দেবো? ভাই চিল্লাতে গিয়ে যদি আলিফ বা শেখা অবস্থায় মারা যাই, তাহলে কেয়ামাতের দিন আল্লাহ আমাদের কুরআন পারনে ওয়ালাদের সঙ্গে উঠাবেন। তিন. দোয়া করা। যেন আল্লাহ মেহেরবানী করে ইলম দান করেন। এটা একশ ভাগ মেনে চলতে পারলে, আল্লাহ ইলেম দিবেনই । ইলেম শিখতে এসে কেউ যদি মারা যায় সে শহিদ। এরপর জিকির। এটা আল্লাহর ধ্যান বাড়ানোর জন্য। তিন কাজের মাধ্যমে জিকিরের প্রসার ঘটানো।  এক. জিকিরের দাওয়াত।  দুই. মশক্।  তিন. দোয়ার মশক এর মাধ্যমে । এরপর একরামুর মুসলিমীন।এর ক্ষেত্রেও তিনকাজ  এক. সবাইকে মায়ার নজরে দেখা। সে খারাপ হোক আর ভালো। কেননা , কেউ যদি খারাপও হয় তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে , সাত আসমান, সাত জমিন থেকে বেশি। দুই. একরামুল মুসলিমিনের দাওয়াত দেওয়া ।  তিন. সবার মাঝে মায়ামমতা ফিরে আসার জন্য দোয়া করা। এরপর সহিহ নিয়ত। ভাই, ইমান আমল ইখলাস ছাড়া কবুল হবে না। কেউ ফতোয়া দিতে পারবে না যে কার ইখলাস ঠিক আছে। এটা একমাত্র আল্লাহ জানেন।  এর জন্যও তিন কাজ। এক. এর দাওয়াত দিতে হবে। দুই. এর মশক্ করতে হবে। তিন. এ বিষয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। ভাই সহিহ নিয়তে একটা খেজুর আল্লাহর রাস্তায় দান করলে , পাহাড় সমান দানের চেয়েও বেশি সাওয়াব হয় । এরপর ভাই, আমাদের নবী শেষ নবী তারপরে আর কোনও নবী আসবে না। তাই নবী চলে যাওয়ার পর আল্লাহর সে নবী ওয়ালা কাজ আমাদেরই করতে হবে। আমরা নবীর নায়েব। এ দীন আমাদের কাছে আমানত। তাই এ আমানতের বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম তিন লাইনে তাদের জান মাল লাগিয়েছেন। এক. আল্লাহর কলিমা উচু করার জন্য।  দুই. গরিবদের পিছনে। তিন. নিজ পরিবারের জন্য।

ভাই , আমাদরে জান মাল কোথায় খরচ করেছি বা করবো তা শেখার জন্য আল্লাহর রাস্তায় বের হতে হবে। ভাই কেউ এ রাস্তায় বের হয়ে কখনও আমির হওয়ার লিপ্সায় বসে থাকবো না। সাহাবায়ে কেরাম তিন জিনিস থেকে দূরে থাকতেন ইমামত, ইমারত , আমানত। তবে যদি কারও কাছে এ দায়িত্ব এসে পরে , তাহলে যথাযথভাবে তা আদায় করতে হবে। কোনো সাথীকে আলাদা নজরে দেখা যাবে না।সবাইকে সমান নজরে দেখতে হবে। ভাই এছাড়া এপথে গিয়ে সর্বদা আমল আখলাকে থাকতে হবে। এবং সব তালিম, আমল ঠিকভাবে আদায় করতে হবে। আল্লাহ আমাদের এবিষয়গুলো মেনে চলার তাওফিক দিন। (আমিন)

❝Allah Subhanahu Wa Ta'ala knows best❞