মানুষের দুনিয়া এবং আখিরাতের সকল সমস্যা সমাধানের মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা। আল্লাহ তাআ'লা সেই জাত যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন কোন পূর্ব নমুনা ছাড়া। আল্লাহ তাআ'লা সেই সত্তা যিনি আসমান সমূহ সৃষ্টি করেছেন কোন খুটি ছাড়া। আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা এই মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু - পরমাণুর স্রষ্টা। আল্লাহ তাআ'লা মালেক। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন মালিক নাই। আল্লাহ তাআ'লা রাজ্জাক। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন রিজিক দাতা নাই। আল্লাহ তাআ'লা হাফিজ। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন হেফাজতকারী নাই। আল্লাহ তাআ'লা ছাড়া কোন সাহায্যকারী নাই।আল্লাহ তাআ'লার হাতে হায়াত - মউত,আল্লাহ তাআ'লার হাতে সুখ - দু:খ, আল্লাহ তাআ'লার লাভ - লোকসান, ইজ্জত - বেইজ্জত। আল্লাহ তাআ'লার হাতে সম্মান - অসম্মান। আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আার যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। আল্লাহ তাআ'লা যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন আর যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন। Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "আসমান ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই, যা চান তিনি সৃষ্টি করেন। যাকে চান কন্যা-সন্তান দেন, যাকে চান পুত্র সন্তান দেন। "Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "অথবা তাদেরকে দেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই। আর যাকে ইচ্ছে বন্ধ্যা করেন। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বাধিক অবহিত ও ক্ষমতাবান।"(Ash-Shuraa 42: Verse 49-50) ভাই দুস্ত বুজুর্গ আজিজু -- অতীতে যা কিছু ঘটেছে তা একমাত্র আল্লাহ তাআ'লার হুকুমেই ঘটেছে। বর্তমানে যা কিছু ঘটছে তা একমাত্র আল্লাহ তাআ'লার হুকুমেই ঘটছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবে তা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লার হুকুমেই ঘটবে। মানুষের চিন্তা - ভাবনা চেষ্টা মেহনতের দ্বারা কিছুই হয়না যা কিছু হয় একমাত্র আল্লাহ তাআ'লার হুকুমেই হয় এর নামই হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
আল্লাহ তাআ'লার সৃষ্টি সম্পর্কে কুরআনের আয়াত সমূহ :
(১) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "আল্লাহ পানি হতে সমস্ত জীবন সৃষ্টি করেছেন। তাদের কতক পেটের ভরে চলে, কতক দু’পায়ের উপর চলে, আর কতক চার পায়ের উপর চলে। আল্লাহ যা চান তাই সৃষ্টি করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ের উপর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী।"(An-Nur 24: Verse 45)
(২) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said : "যখন ইবরাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি মৃতকে কীরূপে জীবিত করবে আমাকে দেখাও’। আল্লাহ বললেন, ‘তুমি কি বিশ্বাস কর না’? সে আরয করল, ‘নিশ্চয়ই, তবে যাতে আমার অন্তঃকরণ স্বস্তি লাভ করে (এজন্য তা দেখতে চাই)’। আল্লাহ বললেন, তাহলে চারটি পাখী নাও এবং তাদেরকে বশীভূত কর। তারপর ওদের এক এক টুকরো প্রত্যেক পাহাড়ের উপর রেখে দাও, অতঃপর সেগুলোকে ডাক দাও, তোমার নিকট দৌড়ে আসবে। জেনে রেখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" (Al-Baqarah 2: Verse 260)
( ৩) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said : "তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ যদি তোমাদের উপর রাতকে ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করতেন তাহলে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ আছে কি যে তোমাদেরকে আলো এনে দিত? তবুও কি তোমরা কর্ণপাত করবে না?"Allah Subhanahu Wa Ta'ala said:"তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ যদি তোমাদের উপর দিনকে ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করতেন তাহলে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ আছে কি যে তোমাদের জন্য রাত্রি এনে দিত যাতে তোমরা আরাম করতে? তোমরা কি চিন্তা করে দেখবে না?"( Al-Qasas 28: Verse 71-72)
(৪) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said : আমি রাত ও দিনকে করেছি দু’টি নিদর্শন; রাতকে করেছি নিরালোক এবং দিনকে করেছি আলোকময়, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বর্ষ সংখ্যা ও হিসাব স্থির করতে পার; এবং আমি সব কিছু বিশদভাবে বর্ণনা করেছি।(Al-Isra' 17: Verse 12)
(৫) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said: "তোমরা কি পানি সম্পর্কে চিন্তা করে দেখেছ যা তোমরা পান কর?" "তা কি তোমরাই মেঘ থেকে বর্ষণ কর, নাকি তার বষর্ণকারী আমিই? "আমি ইচ্ছে করলে তাকে লবণাক্ত করে দিতে পারি, তাহলে কেন তোমরা শোকর আদায় কর না?" (Al-Waqi'ah 56: Verse 68-70)
চার জন বড় বড় ফেরেস্তার আলোচনা
চার ফেরেশতাগনের নাম ও পরিচয় : কোরআন হাদীসের আলোকে বোঝা যায় চার জন সবচেয়ে বড় ফেরেশতা আছেন। যাদের নাম ভিন্ন এবং কাজও ভিন্ন। তাহারা আল্লাহর হুকুম পালনে বদ্ধপরিকর। কোন ফেরেশতা মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণ করতে পারে না। আল্লাহ্ ছাড়া কেউ কারো কোন কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক নয়। ফেরেশতা, জিন, মানুষ, নবী, ওলী কেউ না। ফেরেশতাগন মানুষের ন্যায় আল্লাহর আরেক সৃষ্টি। তারা দিনরাত ক্লান্ত না হয়ে আল্লাহ্-র পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করেন এবং আল্লাহর অবাধ্য হবার কোনো ক্ষমতা তাদের নেই। ফেরেশতারা নূর তথা আলোর তৈরি। তারা খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করেন না। তারা পবিত্র স্থানে অবস্থান করেন। তারা যেকোনো স্থানে গমনাগমন ও আকৃতি পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখেন।
■ হযরত জিবরাঈল ( আঃ ) এর পরিচিতি
ওহী নাযিল করার দায়িত্ব ছিল হযরত জিবরাঈল (আঃ) এর কাজ। হযরত জিবরাঈল ( আঃ) কে বলা হয় সকল ফেরেশতা গনের সরদার। তিনার নাম তিনবার কুরআন শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে তাকে পবিত্র আত্মা বা রুহুল কুদুস বলা হয়েছে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ এবং সংবাদ আদান-প্রদান যেসব ফেরেশতার দায়িত্ব, জিব্রাইল তাদের প্রধান। বলা হয়, জিব্রাইল-ই আল্লাহর নবীদের বা বাণীবাহকদের কাছে ওহী পৌছিয়ে দিতেন।
■ হযরত ইসরাফিল ( আঃ ) এর পরিচিতি
হযরত ইসরাফীল (আঃ) এর দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ ক্রমে শিঙায় ফুৎকার দেয়া। এবং তিনাকে এই কাজের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আর এই কাজটি করা হবে পৃথিবী ধ্বংসের দিন অর্থাৎ কেয়ামতের দিন। এই দিন সকাল থেকেই যথাক্রমে তিনবার ফু দেওয়া হবে তখনই পুরো পৃথিবীসহ পুরো জগত চন্দ্র সূর্য আকাশ গ্রহ নক্ষত্র সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। তার নাম কুরআন শরীফে নেই কিন্তু হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
■ হযরত মীকাইল ( আঃ ) এর পরিচিতি ।
হযরত মীকাঈল ফেরেশতার কাজ হচ্ছে তিনি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী বৃষ্টি বর্ষণ করান, উদ্ভিদ উৎপাদন, প্রভৃতি কাজে নিয়োজিত। কুরআনে এই ফেরেশতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
■ হযরত আজরাইল ( আঃ ) পরিচিতি
প্রাণীকুলের জান কবজের কাজে নিয়োজিত ফেরেশতা হলো মালাকুল মাওত হযরত আজরাঈল ( আঃ )। কুরআনে মালাক আল-মাউত নামে অভিহিত করা হয়েছে হযরত আজরাইল ( আঃ ) কে।
মানুষ নিয়ে আলোচনা করা :
মহান আল্লাহ পাক রাববুল আলআমিন এই পৃথিবীতে প্রায় ১৮,০০০ মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন ।আর এই সকল সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ট হল মানুষ। মানুষকে আল্লাহ পাক তৈরী করেছেন সুন্দর আকার এবং আকৃতিতে আর তাকে দিয়েছেন চিন্তা করার এবং স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ।এই চিন্তা করার এবং স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আল্লাহ পাক তার আর কোন সৃষ্টিকে দেননি ।আর অসীম এই মহাবিশ্বে অসংখ্য উদাহরন রয়েছে চিন্তাশীল মানুষের জন্য।
মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের জানার ইচ্ছা অসীম।মানুষ এ দুনিয়াতে কোথা থেকে এসেছে বা দুনিয়াতে আসার আগে সে কোথায় কি ভাবে ছিল এবং এ দুনিয়া থেকে যাবার পর বা মরনের পর মানুষ কোথায় যাবে বা মরনের পরেই কি জীবনের শেষ না এর পরেও আরো জীবন আছে এ সম্পর্কে ধর্মের বাইরেও সাধারন মানুষ এবং বিজ্ঞানীদের কৌতুহল অসীম। আর তাই সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং তার জন্ম প্রক্রিয়ার ইতিহাস জানার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচছে।মানব সৃষ্টির রহস্য নিয়ে চিন্তাশীলরা নানা ধরনের ধারনা পোষন করতেন সেই প্রাচীন কাল থেকেই।
আল্লাহ তাআ'লা রিজকদাতা আলোচনা করা:
রিজিক মানে শুধু খাদ্য সামগ্রী নয়, বরং জীবন-উপকরণের সবকিছু। অর্থাৎ সব প্রাণীর জীবন-উপকরণের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা নিজেই গ্রহণ করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের প্রতি দয়ালু, যাকে ইচ্ছা রিজিক দান করেন, তিনি প্রবল পরাক্রমশালী। ( সুরা শুরা: আয়াত ১৯) রিজিক কমবেশি কেন হয়? কেউ পায় কম, কেউবা বেশি। কেউ ধনী হয়, কেউবা গরীব। এর উত্তরও আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে দিয়েছেন ; আল্লাহ তায়ালা যদি তার সব বান্দাকে প্রচুর রিজিক দিতেন, তাহলে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা (রিজিক) সে পরিমাণ অবতীর্ণ করেন। (সুরা শুরা: আয়াত ২৭) অপর আয়াতে এসেছে, তারা কি তোমার পালনকর্তার অনুগ্রহ বণ্টন করে?( না, বরং ) আমিই তাদের মধ্যে রিজিক বণ্টন করি পার্থিব জীবনে এবং তাদের একজনের মর্যাদা অপরজনের ওপরে উন্নত করেছি; যেন তারা একে অন্যকে সেবক রূপে গ্রহণ করতে পারে। (সুরা জুখরুফ: আয়াত ৩২) আরও এরশাদ হয়েছে, তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন;
সুতরাং তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তার রিজিক থেকে আহার কর। আর তার নিকটই তোমাদের পুনরুত্থান। ( সুরা মুলুক : আয়াত ১৫) আল্লাহ তায়ালা বান্দার তাকদিরে যা লিখে রেখেছেন এবং যতোটুকু লিখে রেখেছেন, তা সে ততোটুকু পাবেই। চাই সে অক্ষম হোক বা সক্ষম।
(১) Allah Subhanahu Wa Ta'ala said:
"যমীনে বিচরণশীল এমন কোন জীব নেই যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর নেই, তিনি জানেন তাদের থাকার জায়গা কোথায় আর কোথায় তাদেরকে (মৃত্যুর পর) রাখা হয়, সব কিছুই আছে সুস্পষ্ট লিপিকায়।" (QS. Hud 11: Verse 6)
(২) "তখন তার প্রতিপালক তাকে সন্তুষ্টি সহকারে গ্রহণ করলেন এবং তাকে উত্তমরূপে লালন পালন করলেন এবং যাকারিয়াকে তার তত্ত্বাবধায়ক করলেন। যখনই যাকারিয়া মারইয়ামের কক্ষে প্রবেশ করত, তার কাছে খাদ্য সামগ্রী দেখতে পেত; জিজ্ঞেস করত- হে মারইয়াম! ‘এসব কোত্থেকে তোমার কাছে আসে’? মারইয়াম বলত, ‘ওসব আল্লাহর নিকট হতে (আসে)’। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বেহিসাব রিযক দান করেন।" (Ali 'Imran 3: Verse 37)
(৩) "তোমরা যদি সঠিকভাবে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে, তাহলে তিনি তোমাদের সেভাবে রিজক দিতেন, যেভাবে তিনি পাখিদের রিজক দিয়ে থাকেন—তারা সকালবেলা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বেরিয়ে যায়, আর সন্ধ্যায় ফিরে আসে ভরা-পেটে!" (তিরমিযি, ২৩৪৪) হাদীসটি আমরা অনেকেই জানি। তাওয়াক্কুল নিয়ে বিখ্যাত হাদীস। কিন্তু তারপরও কি আমরা সত্যিকার অর্থে তাওয়াক্কুল করতে পেরেছি? - যখন পছন্দের ভার্সিটিতে চান্স পাই না, আমরা হতাশ হয়ে যাই যখন বয়স হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে হয় না, তখন আমরা হতাশ হয়ে যাই যখন ভাইবা দিলেও চাকরীর ডাক আসে না, তখন আমরা হতাশ হয়ে যাই - যখন অনেক কষ্টে গড়া ব্যবসায় লাভের দেখা মেলে না, তখন আমরা হতাশ হয়ে যাই - যখন অন্যদের বেতন বাড়লেও আমাদের বেতন বাড়ে না, তখন আমরা হতাশ হয়ে যাই আমরা কি আসলেই পেরেছি আল্লাহ তায়ালা র উপর তাওয়াক্কুল করতে ।
(৩) ইবনে সিমাক (রহঃ) এক বাদশাহর নিকট গেলেন। বাদশাহর হাতে পানির গ্লাস ছিল। বাদশাহ তাহার নিকট আবেদন করিল যে, আমাকে কোন নসীহত করুন। ইবনে সিমাক বলিলেন, যদি ইহা বলা হয় যে, এই এক গ্লাস পানি তোমার রাজত্বের বিনিময়ে পাওয়া যাইতে পারে, অন্যথায় পিপাসিতই থাকিতে হইবে ; পানি পাওয়ার অন্য কোন ব্যবস্থা নাই, তবে কি তুমি সমগ্র রাজত্বের বিনিময়ে পানি খরিদ করিতে রাজী হইবে, না পিপাসায় মৃত্যুবরণ করিবে? বাদশাহ বলিল, অবশ্যই রাজী হইয়া যাইব। ইবনে সিমাক (রহঃ) বলিলেন, এই রকম রাজত্বের উপর আনন্দের কি আছে, যাহার সম্পূর্ণটার মূল্য মাত্র এক গ্লাস পানি।
কুর্দ একটি গোত্রের নাম। এই গোত্রে একজন বিখ্যাত ডাকাত ছিল। সে নিজের ঘটনা বর্ণনা করে যে, আমি আমার সাথীদের একদলের সহিত ডাকাতি করিবার জন্য যাইতেছিলাম। রাস্তায় আমরা এক জায়গায় বসিয়াছিলাম। সেখানে আমরা খেজুরের তিনটি গাছ দেখিলাম। তন্মধ্যে দুইটি গাছ খুব ফলে পরিপূর্ণ, আর একটি গাছ একেবারে শুকনা। একটি ছোট্ট পাখি বারবার আসে এবং ফলদার গাছগুলি হইতে তাজা খেজুর ঠোঁটে লইয়া ঐ শুকনা গাছের উপর যায়। আমরা ইহা দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলাম। আমি দশবার ঐ পাখিটিকে খেজুর লইয়া যাইতে দেখিলাম। তখন আমার খেয়াল হইল যে, গাছটিতে চড়িয়া দেখি, পাখিটি এই খেজুরগুলিকে কি করে। সুতরাং আমি গাছের চূড়ায় যাইয়া দেখিলাম, সেখানে একটি অন্ধ সাপ মুখ খুলিয়া পড়িয়া আছে। আর পাখিটি সেই তাজা খেজুর উহার মুখে ঢালিয়া দেয়। ইহা দেখিয়া আমার এমন শিক্ষা হইল যে, আমি কাঁদিতে লাগিলাম। আমি বলিলাম, হে আমার মাওলা! এই সাপ যাহাকে তোমার নবী মারিয়া ফেলিবার হুকুম দিয়াছেন, যখন এই সাপটি অন্ধ হইয়া গিয়াছে, তখন তুমি তাহাকে রিযিক পৌঁছাইবার জন্য একটি পাখীকে নিযুক্ত করিয়া দিয়াছ। আর আমি তোমার বান্দা, তোমার একত্ববাদে বিশ্বাসী, তুমি আমাকে মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনের কাজে লাগাইয়া দিয়াছ। এই কথা বলার পর আমার দিলে এই কথা ঢালা হইল যে, আমার দরজা তওবার জন্য তো খোলা রহিয়াছে। আমি তখনই আমার তলোয়ার ভাঙ্গিয়া ফেলিলাম—যাহা মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনের ব্যাপারে আমার কাজে আসিত এবং আমি আমার মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করিতে করিতে ‘একালাতান একালাতান' (অর্থাৎ ক্ষমা ক্ষমা) বলিয়া চিৎকার করিতে লাগিলাম। তখন গায়েব হইতে আমাকে আওয়াজ দেওয়া হইল—আমি ক্ষমা করিয়া দিলাম, ক্ষমা করিয়া দিলাম। আমি আমার সাথীদের নিকট আসিলাম। তাহারা বলিতে লাগিল, তোমার কি হইয়াছে? বলিলাম, আমি পরিত্যক্ত ছিলাম, এখন সন্ধি করিয়া লইয়াছি। এই বলিয়া আমি সমস্ত ঘটনা তাহাদিগকে শুনাইলাম। তাহারা বলিতে লাগিল, আমরাও সন্ধি করিতেছি। এই বলিয়া সকলেই নিজ নিজ তলোয়ার ভাঙ্গিয়া ফেলিল এবং সমস্ত লুটের মাল ফেলিয়া আমরা এহরাম বাঁধিয়া মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইয়া গেলাম। তিন দিন চলিয়া একটি গ্রামে পৌঁছিলাম। সেখানে একজন অন্ধ বৃদ্ধাকে পাইলাম। সে আমার নাম লইয়া আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করিল যে, তোমাদের মধ্যে এই নামের কোনো কুর্দী ব্যক্তি আছে কি? লোকেরা বলিল, আছে। সে কিছু কাপড় বাহির করিল এবং বলিল, তিনদিন হইয়াছে, আমার ছেলে মারা গিয়াছে। সে এই কাপড়গুলি রাখিয়া গিয়াছে। আমি তিনদিন যাবৎ প্রতিদিন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখিতেছি। তিনি বলিতেছেন, তাহার কাপড়গুলি অমুক কুর্দী ব্যক্তিকে দিয়া দাও। সেই কুর্দী বলেন, আমি সেই কাপড়গুলি লইয়া লইলাম এবং আমরা সকলেই উহা পরিধান করিলাম। (রওজ) এই ঘটনার মধ্যে দুইটি জিনিসই শিক্ষণীয়। এক—অন্ধ সাপের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে রিযিকের ব্যবস্থা এবং হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হইতে কাপড় দান। যখন আল্লাহ তায়ালা কোন ব্যক্তিকে সাহায্য করিতে চাহেন, তখন তাহার জন্য আসবাব ও উপকরণ সৃষ্টি করা কোন মুশকিল নয়। সচ্ছলতা ও অভাবের সমস্ত উপকরণ তিনিই পয়দা করেন। আর সত্যিকার তওবার বরকতে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হইতে কাপড় পাওয়ার সম্মান। স্বয়ং একটি গর্বের বিষয়। এই ঘটনা জলদি মৃত্যুর দ্বারা সচ্ছলতা হাসিল হওয়ার একটি উদাহরণ।
আল্লাহ তাআ'লার নিয়ামতর শুকরিয়া আদায় সম্পর্কে আলোচনা :
নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করা হবে :
অন্য এক হাদীসে আছে, একবার প্রখর রৌদ্রের মধ্যে দুপুরের সময় হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযিঃ) মসজিদে নববীতে তশরীফ আনিলেন। হযরত ওমর (রাযিঃ) খবর পাইয়া নিজ ঘর হইতে তশরীফ আনিলেন| এবং হযরত আবু বকর (রাযিঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই সময় কেন আসা হইল? তিনি বলিলেন, প্রচণ্ড ক্ষুধা বাধ্য করিয়াছে। হযরত ওমর (রাযিঃ) বলিলেন, ঐ পবিত্র সত্তার কসম, যাহার হাতে আমার জান, এ অস্থিরতা আমাকেও বাধ্য করিয়াছে। তাহারা উভয়ে এই অবস্থাতেই ছিলেন এমন সময় হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গৃহ হইতে তশরীফ আনিলেন এবং তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা এ সময় কেন আসিলে? তাহারা আরজ করিলেন, হুযূর ! ক্ষুধার তীব্রতা বাধ্য করিয়াছে। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, এই অবস্থায় বাধ্য হইয়া আমিও আসিয়াছি। এই তিন হযরতই উঠিয়া হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাযিঃ)এর বাড়ীতে গেলেন। তিনি নিজে তো উপস্থিত ছিলেন না, তাহার স্ত্রী অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করিলেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করিলেন, আবু আইয়ুব কোথায়? স্ত্রী আরজ করিলেন, হুযূর! তিনি এখনই আসিতেছেন। এমন সময় আবু আইয়ুব (রাযিঃ) আসিয়া গেলেন এবং দ্রুত খেজুরের একটি ছড়া ছিড়িয়া আনিলেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, পূর্ণ ছড়াটি কেন ছিড়িলে? উহা হইতে পাকা পাকা খেজুরগুলি বাছিয়া কেন লইলে না? তিনি আরজ করিলেন, হযরত ! এই খেয়ালে ছিড়িয়াছি যে, পাকা, আধা কাঁচা, শুকনা ও তাজা সব রকমের খেজুর সামনে থাকিবে—যেরূপ খাইতে ইচ্ছা হয় গ্রহণ করিবেন। তাহারা সবরকমের খেজুর ঐ ছড়া হইতে খাইলেন। ইত্যবসরে হযরত আবু আইয়ুব (রাযিঃ) একটি বকরির বাচ্চা জবেহ করিয়া দ্রুত কিছু অংশ আগুনে ভুনা করিলেন, আর কিছু অংশ পাতিলে রান্না করিলেন এবং তাহাদের সম্মুখে আনিয়া রাখিলেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামান্য গোশত একটি রুটিতে পেঁচাইয়া আবু আইয়ুব (রাযিঃ)কে দিয়া বলিলেন, ইহা ফাতেমাকে দিয়া আস, সেও কয়েক দিন যাবৎ এইরূপ কোন জিনিস খায় নাই। তিনি তাড়াতাড়ি দিয়া আসিলেন। তাঁহারা গোশত-রুটি খাইলেন। তারপর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, (আল্লাহ তায়ালার এত নেয়ামত খাইলাম) গোশত-রুটি, কাঁচা খেজুর, পাকা খেজুর ইহা বলিতে বলিতে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চক্ষু মোবারক অশ্রুতে ভরিয়া আসিল। অতঃপর এরশাদ করিলেন, এইগুলিই ঐ সমস্ত নেয়ামত, যাহা সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হইবে। ইহা শুনিয়া সাহাবায়ে কেরামের নিকট বড় কঠিন মনে হইল (যে, এইরূপ কঠিন ক্ষুধার্ত অবস্থায় এই সমস্ত জিনিসও কি জিজ্ঞাসা করার উপযুক্ত?)। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, নিশ্চয়ই। তবে উহার প্রতিকার এই যে, যখন খাইতে শুরু কর, তখন বিসমিল্লাহর সহিত শুরু কর, আর যখন শেষ কর, তখন এই দোআ পড় অর্থাৎ, সমস্ত প্রশংসা শুধু আল্লাহর জন্য, কেননা তিনি আমাদিগকে (কেবল আপন দয়া ও মেহেরবানীতে) পেট ভরিয়া দান করিয়াছেন ; আমাদের উপর নেয়ামত বর্ষণ করিয়াছেন এবং অনেক বেশী পরিমাণে দান করিয়াছেন। (দুররে মানসূর)
হযরত মূসা (আঃ) এর চাচাতো ভাই এর ঘটনা:
ককুরআনের আয়াত-৩ :
কারুন হযরত মূসা (আঃ) এর চাচাতো ভাই ছিল। তাহার ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ। কুরআন পাকে সুরা কাসাসের অষ্টম রুকু সম্পূর্ণটায় তাহার ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে। ব্যাখ্যাসহ উহার তরজমা এই- কারুন (হজরত) মূসা (আঃ) এর স্মপ্রদায়ভুক্ত ( তাহার চাচাতো ভাই) ছিল । অন্তর সে ( সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে) তাহাদের স্মমুখে অহ্নকার করিতে লাগিল। আর আমি তাহাকে এত অধিক পরিমাণ ধনভাণ্ডার দান ক্রিয়াছিলাম যে, উহার চাবিসমূহ কয়েকজন শক্তিশালী লোকের জন্য অত্যন্ত ভারী বোঝা হইত। ( অর্থাৎ, তাহারা অতি কষ্ট বহন করিত, যখন ভাণ্ডারের চাবিই এত বেশী, তখন, জানা কথা, সম্পদও অনেক বেশী হইবে। সে এই অহংকার তখন করিয়াছিল ) যখন তাহাকে তাহার সম্প্রদায়ের লোকেরা (হযরত মূসা ও অন্যান্যরা উপদেশমূলক ) বলিল, তুমি ( এই ধনসম্পদের কারণে) গর্ব করিও না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা যেই পরিমাণ দান করিয়াছেন, উহাতে আখেরাতের ও অন্বেষণ ক্র এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ (আখেরাতে লইয়া যাইতে) ভুলিও না । আর যেইরুপ আল্লাহ তায়ালা তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন, তদ্রূপ তুমিও (তাহার বান্দাদের প্রতি) অনুগ্রহ কর (আর আল্লাহ তায়ালার নাফরমানী ও ওয়াজিব হকসমূহ নষ্ট করিয়া) দুনিয়াতে ফাসাদ কামনা করিওনা । নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ফাসাদকারীদিগকে পছন্দ করেন না। কারুন (তাহাদের উপদেশ শুনিয়া ) বলিল, এই সমস্ত ধন- সম্পদ আমি নিজের বুদ্ধিমত্তার বলেই পাইয়াছি। ( অর্থাৎ, আমার কাজের দক্ষতা দ্বারা এই সম্পদ সঞ্চয় করিয়াছি। ইহাতে কোন অদৃশ্য অনুগ্রহ বা কাহারও কোন হক নাই। আল্লাহ তায়ালা তাহার এই কথার জওয়াবে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিয়া বলেন,) সে (কারুন) কি ইহা জানে না যে, আল্লাহ তায়ালা তাহার পূর্বে বিগত জাতিসমুহের মধ্য হইতে এমন লোকদের ধবংস করিয়াছেন, যাহারা সম্পদের শক্তিতেও ছিল তাহার অপেক্ষা বহুগুণে প্রবল এবং (জনগোষ্ঠী হিসাবেও ) তাহাদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশী। (ইহা তো দুনিয়াতে হইয়াছে, আর আখেরাতে জাহান্নামের আযাব ভিন্ন রহিয়াছে।) আর পাপীদেরকে তাহাদের পাপকার্য সম্পর্কে (জানিবার উদ্দেশ্যে ) জিজ্ঞাসাও করা হিইবে না ( কেননা, প্রক্যেক ব্যক্তির সম্পূর্ণ অবস্থা আল্লাহ তায়ালা জানেন, তবে নালিশের কারণে জিজ্ঞাসাবাদ করা ভিন্ন কথা।) অতঃপর (কারুন একবার ) আপন জাঁক- জমকের সহিত সম্প্রদায়ের লোকদের সম্মুখে বাহির হইল। (তাহার সম্প্রদায়ের মধ্যে) যাহারা দুনিয়ার প্রতি আগ্রহী ছিল, তাহারা বলিতে লাগিল, আহা! কি উত্তম হইত, আমরাও যদি এই সাজ- সরঞ্জাম প্রাপ্ত হইতাম, যাহা কারুন প্রাপ্ত হইয়াছে । বাস্তবিকই সে (কারুন) বড় ভগ্যবান, । ( তাহারা সম্পদের আকাঙ্ক্ষা ও লোভের কারণ এইরূপ বলিয়াছিল, ইহাতে তাহারা কাফের হইয়া যায় নাই। এখনও অনেক মুসলমান অন্যান্য সম্প্রদায়ের সুনিয়াবী উন্নতি দেখিয়া সর্বদা লোভ করিতে থাকে এবং এই চেষ্টায় রত থাকে , জাহাতে কাহাদের ন্যায় আমাদেরও পার্থিব উন্নতি নসীব হয়।) আর যাহাদেরকে দ্বীনী এলেম (এবং উহার বুঝ) দান করা হিয়াছিল,তাহারা এই লোভীদেরকে ) বলিতে লাগিল, আরে তোমাদের নাশ হউক ( তোমরা এই দুনিয়ার ব্যাপারে কিসের লোভ করিতেছ?) আল্লাহ তায়ালার দেওয়া প্রতিদান ( এই কয়েক দিনের ধন-সম্পদ হইতে লক্ষ লক্ষ গুণ) উত্তম। যাহা এমন লোকেরা পাইবে, যাহারা ঈমান আনিয়াছে এবং নেক কাজ করিয়াছে ( তাহাদের মধ্যেও পূর্ণ মর্যাদার সওয়াব) ঐ সমস্ত লকদেরকেই দেওয়া হইবে , যাহারা ধৈর্যশীল। অতঃপর (যখন আমি কারুনের অবাধ্যতা ও ফাসাদের কারণে) তাহাকে ও তাহার মহলকে জমিনে ধসাইয়া দিলাম, তখন এমন কোন দল হয় নাই যাহারা তাহাকে আল্লাহর আজাব হইতে বাঁচাইতে পারে এবং সে নিজেও কোন বুদ্ধি করিয়া বাঁচিতে পারে না এবং কেহ বাঁচিতে পারে না । কারুনের উপর এই আযাবের অবস্থা দেখিয়া) গতকল্য যাহার মত হইবার আকাঙ্ক্ষা করিতেছিল, তাহারা বলিতে লাগিল , মনে হইতেছে , ( রিযিকের প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতার ভিত্তি সোভাগ্য বা দূর্বাগ্যের উপর নয়, বরং ) আল্লাহ তায়ালা তাহার বান্দাদের মধ্য হইতে যাহাকে ইচ্ছা, রুজির প্রশস্ততা দান করেন , আর যাহার জন্য চাহেন, সংকীর্ণ করিয়া দেন। ( ইহা আমাদের ভুল ছিল যে , উহার প্রশস্ততাকে সোভাগ্য মনে করিতেছিলাম । বাস্তবিকই ) যদি আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানী না হইত, তবে আমাদিগকেও ধসাইয়া দিতেন ( কেননা, আমরাও তো গোনাহগার )। এখন বুঝে আসিয়া গেল যে , কাফেরদের জন্য সফলতা নাই ( যদিও তাহারা এই কয়েক দিনের
জীবনের স্বাদ উপভোগ করিয়া লয় )। ( বয়ানুল কুরআন; কিঞ্চিত পরিবর্তিত) ( কাসাসঃ ৭৬-৮২)
ফায়দাঃ
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, কারুন হযরত মূসা (আঃ) এর সম্প্রদায়ের লোক ছিল। তাহার চাচাতো ভাই ছিল । (দুনিয়াবী) বিদ্যা- বুদ্ধিতে যথেষ্ট উন্নতি করিয়াছিল । হযরত মূসা (আঃ) এর প্রতি হিংসা পোষণ করিত। মূসা (আঃ) তাহাকে বলিলেন , আল্লাহ তায়ালা আমাকে তোমার নিকট হইতে যাকাত উসুল করিতে আদেশ দিয়েছেন। সে যাকাত প্রদান করিতে অস্বীকার করিল এবং লোকদের নিকট বলিতে লাগিল, মূসা যাকাতের নামে তোমাদের সম্পদ আত্নসাৎ করিতে চায়। সে নামাযের হুকুম –আহকাম জারি করিয়াছে, সেইগুলিকে তোমরা সহ্য করিয়াছ । এখন সে তোমাদেরকে যাকাতের হুকুম করিতেছে, তোমরা কি ইহাও সহ্য করিবে ? লোকেরা বলিল, আমরা ইহা সহ্য করিব না । তুমিই কোন বুদ্ধি বলিয়া দাও। সে বলিল , আমি এই বুদ্ধি করিয়াছি যে, কোন চরিত্রহীনা মহিলাকে এই মর্মে রাজি করাইব যে, সে মূসার উপর অপবাদ দিবে যে , তিনি আমার সহিত ব্যভিচার করিতে চান । লোকেরা একটি চরিত্রহীনা মহিলাকে অনেক পুরস্কার দিবে বলিয়া এই বিষয়ে সম্মত করাইল। সে রাজি হওয়ার পর কারুন হযরত মূসা (আঃ) এর নিকট গেলে এবং তাহাকে বলিল , আল্লাহ তায়ালা আপনাকে যেই সমস্ত হুকুম- আহকাম দিয়াছেন, উহা সমস্ত বনী ইসরাইলকে একত্রিত করিয়া সুনাইয়া দিন । হযরত মূসা (আঃ) ইহা পছন্দ করিলেন এবং সমস্ত বানী ইসরাইলকে সমবেত করিলেন । যখন সবাই সমবেত হইল, তখন হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তায়ালার হুকাম- আহকাম বলিতে আরম্ভ করিলেন , আল্লাহ তায়ালা আমাকে এই হুকুম করিয়াছেন যে , তোমরা তাহার আবাদত কর, কাহাকেও তাহার সহিত শরীক করিও না। আত্নীয়-সবুনের সহিত সৎ ব্যবহার কর । এইভাবে আরও অন্যান্য হুকুম শুনাইলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি ইহাও বলিলেন যে, যদি কোন বিবাহিত পুরুষ ব্যভিচার করে তবে তাহাকে পাথর নিক্ষেপ করিয়া হত্যা করা হইবে । লোকেরা বলিল , যদি আপনি নিজে ব্যভিচার করেন ? হযরত মূসা (আঃ) বলিলেন , যদি আমি ব্যভিচার করি তবে আমাকেও পাথর নিক্ষেপ করা হইবে, লোকেরা বলিল, আপনি ব্যাভিচার করিয়াছেন? । হযরত মূসা (আঃ) (অবাক হইয়া ) বলিলেন, আমি! লোকেরা বলিল, জি¦ হাঁ আপনি। এই বলিয়া তাহারা ঐ মেয়েলোকটিকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তুমি হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে কি বল? হযরত মূসা (আঃ) ও তাহাকে কসম দিয়া বলিলেন, তুমি কি বল? মেয়ে লোকটি বলিল, যখন আপনি কসম দিলেন, তখন বলিতে হয় যে, ইহারা আমকে অনেক পুরস্কার দেওয়ার ওয়াদা করিয়াছে, যাহাতে আমি আপনার উপর অপবাদ দেই। আপনি এই অপবাদ হইতে সম্পূর্ণ পবিত্র। ইহা শুনিয়া হযরত মূসা (আঃ) কাঁদিতে কাঁদিতে সেজদায় পরিয়া গেলেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে সেজদার মধ্যেই ওহি আসিল -হে মূসা! কাঁদিবার কি আছে, তোমাকে আমি এই সকল লোকদেরকে শাস্তি দেওয়ার জন্য জমিনের উপর ক্ষমতা দান করিলাম। ইহাদেরকে শাস্তি দেওয়ার জন্য জমিনের উপর ক্ষমতা দান করিলাম । ইহাদের সম্পর্কে তোমার যাহা ইচ্ছা, জমিনকে হুকুম কর। হযরত মূসা (আঃ) সেজদা হইতে মাথা উঠাইয়া জমিনকে হুকুম করিলেন, ইহাদেরকে গিলিয়া ফেল। জমিন তাহাদেরকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত গিলিয়া ফেলিয়াছিল। তখন তাহারা অনুনয়-বিনয় করিয়া হযরত মূসা (আঃ) কে ডাকিতে লাগিল। মূসা (আঃ) পুনরায় হুকুম করিলেন, ইহাদেরকে ধসাইয়া ফেল । এমনকি তাহারা ঘাড় পর্যন্ত ধসিয়া গেল। তখন তাহারা চিৎকার করিয়া হযরত মূসা (আঃ) কে ডাকিতে লাগিল। হযরত মূসা (আঃ) পুনরায় জমিনকে একই হুকুম করিলেন যে, ইহাদেরকে সম্পূর্ণরুপে গিলিয়া ফেল। জমিন তাহাদের সকলকে সম্পূর্ণভাবে গিলিয়া ফেলিল। তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে হযরত মূসা (আঃ) এর নিকট ওহী আসিল, তাহারা তোমাকে ডাকিতেছিল এবং তোমার নিকট অনুনয়-বিনয় করিতেছিল, আমার ইযযতের কসম! যদি তাহারা আমাকে ডাকিত আর আমার নিকট দোয়া করিত, তবে আমি তাহাদের দোয়া কবুল করিয়া লইতাম। অন্য এক হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) হইতে বর্ণিত আছে, উক্ত আয়াতে দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না, ইহার অর্থ এই যে দুনিয়াতে তুমি আখেরাতের জন্য আমল কর। হযরত মুজাহিদ (রহঃ) হইতে বর্ণনা করা হইয়াছে, দুনিয়ার অংশ বলিতে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য বুঝায়, যাহার সওয়াব আখেরাতে পাওয়া যায়। হযরত হাসান (রহঃ) হইতে বর্ণনা করা হইয়াছে, দুনিয়া হইতে নিজের অংশ ভুলিও না অথাৎ, দুনিয়াতে যতটুকু প্রয়োজন উহাকে রাখ । আর যাহা অতিরিক্ত উহা আখেরাতের জন্য পাঠাইয়া দাও। অন্য এক হাদীসে হযরত হাসান (রহঃ) হইতে বর্ণনা করা হইয়াছে, এক বছরের রুজি রাখিয়া দাও । ইহার অতিরিক্ত যাহা হয়, উহা সদকা করিয়া দাও । (দুররে মানসূর) এই সম্পর্কিত কিছু বিবরণ কৃপণতার বর্ণনায় দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের আট নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হইয়াছে।
হযরত আবু হুরইরহ রদিয়াল্লহু আ’নহু (أبىْ هريْرة رضى الله عنْه) নবী করীম সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের এরশাদ বর্ণনা করেন যে, তিনি এরশাদ ফরমাইয়াছেন, আল্লহ তায়া’লা কিয়ামাতের দিন যমীনকে আপন মুষ্টিতে ধারণ করিবেন এবং আসমানকে আপন ডান হাতে পেঁচাইয়া লইবেন, অতঃপর বলিবেন, আমিই বাদশাহ! যমীনের বাদশাহরা কোথায়? (বুখারী)
হেকায়েতা সাহেবা :
আমাদের আইডল হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রাযিঃ) এর শাহাদত।
হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রাযিঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে অত্যন্ত আদর যত্নে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন এবং ধনী ছেলেদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাহার পিতা তাঁহাকে দুইশত দেরহামের কাপড় জোড়া খরিদ করিয়া পরাইতেন। যুবক বয়সের ছিলেন, অত্যন্ত আদর-যত্নে ও মাল—ঐশ্বর্যে লালিত হইতেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগেই পরিবারের লোকজনকে না জানাইয়া মুসলমান হইয়া গেলেন এবং এইভাবেই রহিলেন। কেহ যাইয়া পরিবারের লোকদেরকে জানাইয়া দিলো। তাহারা তাহাকে বাঁধিয়া কয়েদ করিয়া রাখিল। কিছুদিন এইভাবে কাটাইবার পর কোন এক সুযোগে গোপনে পালাইয়া গেলেন এবং হাবশার দিকে হিজরতকারীদের সঙ্গে চলিয়া গেলেন। সেইখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন এবং অত্যন্ত দারিদ্র্যময় জীবন অতিবাহিত করিতে থাকেন। এতই অভাব-অনটনের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করিতেছিলেন যে, একবার হযরত মুসআব (রাযিঃ) হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন তাঁহার পরনে কেবল একটি মাত্র চাদর ছিল তাহাও কয়েক জায়গায় ছিঁড়া। এক জায়গায় কাপড়ের পরিবর্তে চামড়ার তালি লাগানো ছিল, তাঁহার বর্তমান অবস্থা এবং পূর্বের অবস্থার কথা স্মরণ করিয়া নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চক্ষু অশ্রুতে ভরিয়া গেল। উহুদের যুদ্ধে মুহাজিরদের ঝাণ্ডা তাহার হাতে ছিল। যখন মুসলমানরা অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় ছত্রভঙ্গ হইয়া যাইতেছিলেন তখন তিনি অবিচল অবস্থায় দাঁড়াইয়া থাকেন। জনৈক কাফের নিকটে আসিয়া তরবারী দ্বারা তাহার একটি হাত কাটিয়া ফেলে যেন ঝাণ্ডা নিচে পড়িয়া যায় এবং মুসলমানদের প্রকাশ্য পরাজয় হইয়া যায়। তিনি সাথে সাথে অপর হাতে ঝাণ্ডা ধারণ করিলেন। কাফের তাহার অপর হাতটিও কাটিয়া ফেলিল, তখন তিনি উভয় বাহুর সাহায্যে বুকের সহিত ঝাণ্ডা আঁকড়াইয়া ধরিলেন যাহাতে পড়িয়া না যায়। সে কাফের তাহার প্রতি তীর নিক্ষেপ
করিলে তিনি শহীদ হইয়া গেলেন। কিন্তু জীবিত থাকা অবস্থায় ঝাণ্ডাটিমমাটিতে পড়িতে দেন নাই। অতঃপর ঝাণ্ডা মাটিতে পড়িয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে অপর একজন তাহা উঠাইয়া লইল। দাফনের সময় তাহার নিকট একটি মাত্র চাদর ছিল। উহা দ্বারা সম্পূর্ণনশরীর ঢাকা যাইতেছিল না। মাথা ঢাকিতে গেলে পা খুলিয়া যাইত আরনপা ঢাকিতে গেলে মাথা খুলিয়া যাইত। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, চাদর দ্বারা মাথা ঢাকিয়া দাও আর পায়ের দিকে ইযখির পাতা দ্বারা ঢাকিয়া দাও। (কুররাতুল উয়ূন, ইসাবাহ্)
ফায়দা ঃ ইহা হইল ঐ ব্যক্তির জীবনের শেষ সময়। যিনি অত্যন্ত আদর-যত্নে ও আরাম-আয়েশে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। দুইশত দেরহাম মূল্যের কাপড় জোড়া পরিধান করিতেন আর আজ কাফনের জন্য একটি পূর্ণ চাদরও তাহার মিলিতেছে না। আর অপর দিকে হিম্মত ও সাহসের অবস্থা এই যে, জীবন থাকা অবস্থায় ঝাণ্ডা হাত হইতে পড়িতে দেন নাই। উভয় হাত কাটা যাওয়ার পরও ঝাণ্ডা ছাড়িলেন না। অত্যন্ত আদর-যত্নে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন কিন্তু ঈমান তাহাদের মধ্যে এতই দৃঢ়ভাবে স্থান করিয়া লইত যে, এই ঈমান তাহাদিগকে টাকা পয়সা আরাম-আয়েশ হইতে সরাইয়া নিজের মধ্যে মগ্ন করিয়া নিত।
সালমান ফারেসী (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী :
আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালমান আল-ফারেসী (রাঃ) নিজে তাঁর কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমি একজন পারসিক ছিলাম। আমার জন্মস্থান ছিল ইস্পাহানের অন্তর্ভুক্ত ‘জাই’ নামক গ্রাম। পিতা ছিলেন গ্রামের সর্দার। আর আমি তাঁর নিকট ছিলাম আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়। আমার প্রতি তাঁর ভালবাসা এরূপ ছিল যে, তিনি সবসময় আমাকে বাড়িতে আবদ্ধ করে রাখতেন। অর্থাৎ (পূজার) আগুনের তত্ত্বাবধায়ক করে রাখতেন। যেমন কোন বাঁদীকে আটকিয়ে রাখা হয় (তেমন আমাকে আবদ্ধ করে রাখতেন)। এতে করে আমি অগ্নিপূজায় খুবই মনোযোগী হ’লাম এবং এক পর্যায়ে আগুনের এমন খাদেম বনে গেলাম যে, মুহূর্তের জন্যও আগুন নিভতে দিতাম না। সেই সাথে আমার পিতার ছিল অঢেল ভূসম্পত্তি।
তিনি একদিন তাঁর একটি গৃহ নির্মাণে ব্যস্ত হ’লেন এবং আমাকে বললেন, হে বৎস! আমি বর্তমানে আমার খামারে একটি গৃহ নির্মাণ করছি। তুমি যাও এবং তা দেখাশুনা কর। সেখানে তিনি যা করতে চান সে বিষয়ে আমাকে নির্দেশনা দিলেন। অতঃপর আমি তার খামারের দিকে রওয়ানা হ’লাম। পথিমধ্যে আমি খৃষ্টানদের কোন এক গির্জার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। যেখানে তারা ছালাত আদায় করছিল। আমি তাদের আওয়ায শুনতে পেলাম। মূলতঃ পিতা আমাকে গৃহবন্দী করে রাখার কারণে মানুষের চাল-চরিত্র সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। তাই যখন তাদের আওয়ায শুনতে পেলাম, তখন তাদের কর্মকান্ড দেখার জন্য আমি তাদের নিকট গেলাম। অতঃপর আমি যখন তাদের ছালাত দেখলাম তখন আমার ভাল লাগল। ফলে আমি তাদের কর্মকান্ডের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমাদের ধর্মের চেয়ে এ ধর্মই উত্তম। আল্লাহর কসম! আমি পিতার খামারে যাওয়া বাদ দিয়ে এখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করব। আমি তাদের (খৃষ্টানদের) জিজ্ঞেস করলাম, এ ধর্মের উৎপত্তি কোথায়? তারা বলল, সিরিয়ায়। তিনি বলেন, এরপর আমি আমার বাবার নিকট ফিরে এলাম। ইতিমধ্যে তিনি আমাকে খোঁজার জন্য লোক পাঠিয়েছিলেন এবং আমার কারণে তিনি সব কাজ থেকে বিরত ছিলেন। আমি আসার সাথে সাথে তিনি বলেন, হে বৎস! তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে যে দায়িত্ব দেওয়ার সেটা কি দেইনি? আমি বললাম, হে আববা! আমি কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, যারা গির্জায় ছালাত আদায় করছিল। তাদের ধর্মাচরণ আমার খুবই ভাল লেগেছে। আল্লাহর কসম! আমি সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাদের নিকট অবস্থান করেছি। তিনি বললেন, হে বৎস! ঐ ধর্মের মধ্যে কোন মঙ্গল নেই। তোমার ও তোমার বাপ-দাদার ধর্ম তার চেয়ে অধিক উত্তম। আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম! কখনও তা নয়। ঐ ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
তিনি বলেন, অতঃপর তিনি আমাকে ভয় দেখালেন এবং পায়ে বেড়ি পরিয়ে আমাকে বাড়িতেই বন্দী করে রাখলেন। আমি খৃষ্টানদের নিকট সংবাদ পাঠালাম যে, যখন তোমাদের নিকট শামের খৃষ্টান ব্যবসায়ী কাফেলা আসবে তখন তোমরা আমাকে জানাবে। তিনি বলেন, (কিছুদিন পর) তাদের নিকট শামের এক খৃষ্টান ব্যবসায়ী কাফেলা আসে। অতঃপর তারা আমাকে সংবাদ প্রদান করে। আমি তাদের বললাম, যখন তারা তাদের প্রয়োজনাদি সেরে ফেলবে এবং দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করবে, তখন আমাকে জানাবে। তিনি বলেন, যখন তারা তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করল তখন আমাকে সংবাদ দিল। অতঃপর আমি আমার পা থেকে বেড়ি খুলে ফেললাম এবং তাদের সাথে সিরিয়ার পথে যাত্রা করলাম।
সিরিয়া পৌঁছার পর আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের মধ্যে এ ধর্মের ব্যাপারে সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি কে? তারা বলল, গির্জার পাদ্রী। তিনি বলেন, অতঃপর আমি পাদ্রীর নিকট গেলাম এবং বললাম, আমি এ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। অতএব আমি আপনার সাহচর্য লাভ করে গির্জাতেই আপনার খিদমত করতে চাই, আপনার নিকট শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই এবং আপনার সাথে ছালাত আদায় করতে চাই। অতঃপর তিনি (পাদ্রী) আমাকে গির্জাতে প্রবেশ করতে বললে আমি তার সাথে গির্জায় প্রবেশ করলাম। তিনি বলেন, তিনি অসৎ লোক ছিলেন। মানুষজনকে তিনি ছাদাক্বা দেয়ার জন্য আদেশ করতেন এবং খুবই উৎসাহিত করতেন। কিন্তু যখন লোকজন তার নিকট (ছাদাকার) দ্রব্যাদি জমা দিত, তখন তিনি মিসকীনদের কিছুই না দিয়ে তা নিজের জন্য জমা করে রাখতেন। এভাবে তিনি স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে সাতটি কলস পূর্ণ করেন। তিনি বলেন, আমি যখন এরূপ কার্যকলাপ দেখলাম তখন তার প্রতি ভীষণ ক্রুদ্ধ হ’লাম। (এর কিছুদিন পর) তিনি মারা গেলেন। খৃষ্টানগণ তাকে দাফন করার জন্য সমবেত হল। আমি তাদের বললাম, এ ব্যক্তিটি অসৎ ছিল। তোমাদের সে ছাদাক্বাহ করার আদেশ দিত ও উৎসাহিত করত বটে, কিন্তু যখন তোমরা তাকে সম্পদ দিতে তখন সে তা নিজের জন্য সঞ্চয় করে রাখত এবং মিসকীনদের তা থেকে কিছুই দিত না। তারা বলল, এ ব্যাপারে তোমার কি জানা আছে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি তোমাদের তার সম্পদ সম্পর্কে অবহিত করব। তারা বলল, আমাদের তা জানিয়ে দাও। তিনি বলেন, আমি তাদের ঐ লোকটির (সম্পদ গচ্ছিত রাখার) স্থান দেখালাম। তারা সেখান থেকে স্বর্ণ-রৌপ্যপূর্ণ সাতটি কলস বের করল। তিনি বলেন, তারা তা দেখে বলল, আল্লাহর কসম! আমরা তাকে কখনও দাফন করব না। এরপর তারা তাকে শূলে চড়াল এবং তার উপর পাথর নিক্ষেপ করল। এরপর এক ব্যক্তিকে তার স্থলাভিষিক্ত করল।
তিনি (ইবনু আববাস) বলেন, সালমান (রাঃ) বলেন, আমি এমন কোন ব্যক্তি দেখিনি যে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করে সে এ ব্যক্তির চেয়ে উত্তম। পৃথিবীর মধ্যে আমি এরূপ দুনিয়াত্যাগী, আখিরাতের ব্যাপারে অধিক আগ্রহী এবং দিন-রাত ইবাদতকারী আর কাউকে দেখিনি। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে আমি অন্তর থেকে তার চেয়ে বেশী আর কাউকে ভালবাসিনি। তার নিকট দীর্ঘদিন অবস্থান করেছিলাম। এরপর যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল তখন আমি তাকে বললাম, হে অমুক! আমি আপনার সাথে ছিলাম এবং আপনাকে যেভাবে অন্তর থেকে ভালবেসেছিলাম ইতিপূর্বে আর কাউকে তেমন ভালবাসিনি। আর আপনার নিকট আল্লাহর যে আদেশ পৌঁছেছে তা আপনি প্রত্যক্ষ করছেন। এখন কার প্রতি আপনি আমাকে সোপর্দ করছেন এবং আমাকে কি আদেশ করছেন? তিনি বললেন, হে বৎস! আল্লাহর কসম! এখন আমি আমার পথের উপর কাউকে দেখিনা। মানুষজন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ধর্ম পরিবর্তন করেছে। তারা তাদের অনুসৃত ধর্মাচরণের অধিকাংশই ত্যাগ করেছে। তবে মুছেলে (ইরাকের একটি শহর) এক ব্যক্তি আছে। সে অমুক। সে আমার পথে আছে। তুমি তার সাথে মিলিত হও। তিনি বলেন, অতঃপর যখন তিনি মৃত্যুবরণ করলেন এবং তাকে দাফন করা হল, তখন আমি মুছেলের ব্যক্তিটির নিকট গেলাম। আমি তাকে বললাম, হে জনাব! অমুক ব্যক্তি আমাকে তার মৃত্যুর সময় অছিয়ত করেছে যে, আমি যেন আপনার সান্নিধ্যে থাকি এবং তিনি আমাকে বলেছেন, আপনি তার পথের উপর আছেন। উত্তরে পাদ্রী বললেন, ঠিক আছে তুমি আমার নিকট অবস্থান কর। আমি তার নিকট অবস্থান করতে লাগলাম। আমি তাকে তার বন্ধুর পথে উত্তম মানুষ হিসাবে পেলাম। তবে কিছুদিন পরে সেও মৃত্যুবরণ করল। যখন তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসল তখন আমি তাকে বললাম, হে গুরু! অমুক ব্যক্তি আমাকে আপনার নিকট আসার জন্য অছিয়ত করেছিলেন এবং আপনার সান্নিধ্য লাভের জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহর পক্ষ হতে আপনার উপর যা উপস্থিত হয়েছে তা আপনি দেখছেন (অর্থাৎ আপনার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে)। এখন আপনি কার নিকট যাওয়ার জন্য আমাকে অছিয়ত করছেন? আর আমাকে কি করার আদেশ দিচ্ছেন?
তিনি বললেন, হে বৎস! আল্লাহর কসম! আমার জানা মতে নাছীবীনের একজন ব্যক্তি আছে। যে আমাদের ধর্মের উপর অটল আছে। সে অমুক। তুমি তার সাথে মিলিত হও। তিনি বলেন, অতঃপর যখন সে মারা গেল এবং তাকে দাফন করা হ’ল, তখন আমি নাছীবীনের লোকটির সাথে মিলিত হ’লাম এবং আমার বিষয়ে ও আমার সাথী যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে তা বললাম। সে বলল, তুমি আমার কাছে অবস্থান কর। অতঃপর আমি তার নিকট অবস্থান করলাম এবং তাকে তার সাথীদ্বয়ের মত (সৎ) পেলাম। আমি একজন ভাল লোকের সাথে অবস্থান করলাম। আল্লাহর কসম! কিছুদিন যেতে না যেতেই তার মৃত্যুর ঘণ্টা বেজে গেল।
যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল তখন আমি তাকে বললাম, হে অমুক! অমুক ব্যক্তি আমাকে অমুক ব্যক্তির কাছে যাওয়ার অছিয়ত করেছিল। অতঃপর অমুক ব্যক্তি আমাকে আপনার কাছে আসার অছিয়ত করেন। এখন আপনি আমাকে কার বিষয়ে অছিয়ত করছেন এবং কি করার নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন, হে বৎস! আল্লাহর কসম! একজন ব্যক্তি ব্যতীত আমি আর কাউকে আমাদের সঠিক পথে দেখছি না, যার নিকট যাওয়ার জন্য তোমাকে আদেশ দিব। (ঐ ব্যক্তিটি হল) আম্মুরিয়্যাহ-এর বাসিন্দা। সে হুবহু আমাদের পথেই রয়েছে। তুমি চাইলে তার নিকট যেতে পার। তিনি বলেন, অতঃপর যখন সে মারা গেল এবং দাফন-কাফন করা হ’ল, তখন আমি আম্মুরিয়্যাহ-এর ব্যক্তিটির নিকট গেলাম এবং আমার বৃত্তান্ত তাকে অবহিত করলাম। তিনি বললেন, তুমি আমার নিকট অবস্থান কর।
অতঃপর আমি তার নিকট অবস্থান করলাম। সে তার বন্ধুদের আদর্শ ও ধর্মের উপর ছিল। তিনি (সালমান ফারেসী) বলেন, আমি কিছু উপার্জনও করেছিলাম। এক পর্যায়ে কিছু গাভী ও বকরীর মালিক হয়ে গেলাম। অতঃপর তার উপর আল্লাহর হুকুম আসল (অর্থাৎ মৃত্যু ঘনিয়ে এল)। যখন তার মৃত্যু উপস্থিত হ’ল তখন আমি তাকে বললাম, হে গুরু! আমি (প্রথমে) অমুকের নিকট ছিলাম। অতঃপর তিনি অমুক ব্যক্তির ব্যাপারে অছিয়ত করেন। অতঃপর অমুক ব্যক্তি আবার অমুকের নিকট (যাওয়ার জন্য) অছিয়ত করেন। অতঃপর অমুক ব্যক্তি আবার আমাকে আপনার নিকট আসার জন্য অছিয়ত করেন। এখন আপনি কার নিকট যাওয়ার জন্য আমাকে অছিয়ত করছেন? আর আপনি আমাকে কি আদেশ করছেন? তিনি বললেন, হে বৎস! আমার জানা মতে এখন আর এমন কোন ব্যক্তি নেই যে আমাদের ধর্মে রয়েছে এবং যার নিকট যাওয়ার জন্য তোমাকে আদেশ করব। তবে শেষ নবী আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মে প্রেরিত হবেন। আরব ভূমিতে তিনি আত্মপ্রকাশ করবেন। আর তিনি এমন ভূমির দিকে হিজরত করবেন যা পাথরময় হবে এবং সেখানে খেজুর বৃক্ষ থাকবে। তাঁর কিছু স্পষ্ট নিদর্শন থাকবে। তিনি হাদিয়া গ্রহণ করবেন, তবে ছাদাক্বাহ ভক্ষণ করবেন না। তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যভাগে নবুঅতের সিলমোহর থাকবে। যদি তোমার ঐ দেশে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে তবে তুমি যাও। তিনি বলেন, অতঃপর তিনি মৃত্যুবরণ করলেন এবং তাকে দাফন-কাফন করা হ’ল।
আল্লাহ তা‘আলা যতদিন চান ততদিন আমি আম্মুরিয়্যাহতে অবস্থান করলাম। অতঃপর আমার নিকট দিয়ে কালব গোত্রের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা যাচ্ছিল। আমি তাদের বললাম, তোমরা আমাকে আরবে নিয়ে চল। (বিনিময়ে) আমি তোমাদের এই গাভী ও বকরীগুলো প্রদান করব। তারা বলল, ঠিক আছে। অতঃপর আমি তাদের সেগুলো দিয়ে দিলাম আর তারা আমাকে নিয়ে চলল। যখন তারা আমাকে নিয়ে ‘ওয়াদী আল-কুরা’য় (একটি স্থানের নাম) নিয়ে আসল, তখন তারা আমার প্রতি অত্যাচার করল এবং দাস হিসাবে এক ইহুদী ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করে দিল। ফলে আমি তার নিকট অবস্থান করে খেজুর গাছ দেখাশুনা করতে লাগলাম এবং ভাবলাম, আমার বন্ধু আমাকে যে ভূমির কথা বলেছিলেন, তা মনে হয় এটিই হবে। আমার মনে এমন চিন্তা-চেতনাই চেপে ছিল। আমি তার নিকট অবস্থানকালে বনী কুরায়যার বাসিন্দা তার (মনিবের) চাচাত ভাই মদীনা হ’তে আসল। অতঃপর সে আমাকে তার নিকট থেকে ক্রয় করে মদীনায় নিয়ে আসল। আল্লাহর কসম! মদীনা শহর দেখা মাত্রই আমার বন্ধুর বর্ণনা মতো আমি উহাকে চিনে ফেললাম। আমি এখানে অবস্থান করতে লাগলাম। (একদিন) আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি মক্কাতে যতদিন থাকার থাকলেন। আমি গোলামী জীবনে ব্যস্ত থাকায় তাঁর কোন খবর পেলাম না। অতঃপর তিনি মদীনায় হিজরত করলেন। আল্লাহর কসম! আমি আমার মালিকের খেজুর গাছের মাথায় কাজ করছিলাম। আর আমার মনিব বসেছিল। ইত্যবসরে তাঁর চাচাত ভাই এল এবং তার নিকট এসে থামল। অতঃপর সে বলল, হে অমুক! আল্লাহ বনী কায়লাহদের ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! তারা কুবাতে মক্কা থেকে আজকে আগত এক ব্যক্তির নিকট সমবেত হয়েছে। তারা তাকে নবী বলে ধারণা করছে। তিনি বলেন, একথা শুনে আমার মধ্যে কম্পন শুরু হয়ে গেল। এক পর্যায়ে আমি ধারণা করলাম যে, আমি আমার মনিবের উপর পড়ে যাব। অতঃপর আমি খেজুর গাছ থেকে নেমে আসলাম এবং তাঁর চাচাত ভাইকে বলতে লাগলাম, তুমি কি বলছিলে? তুমি কি বলছিলে? তিনি বললেন, আমার মনিব চটে গেলেন এবং আমাকে খুব জোরে আঘাত করলেন এবং বললেন, এ ব্যাপারে তোমার কি হয়েছে? তুমি তোমার কাজে যাও। তিনি বলেন, আমি বললাম, কিছুই না। আমি শুধু সে যা বলেছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হ’তে চাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমার নিকট কিছু সম্পদ ছিল যা আমি সঞ্চয় করে রেখেছিলাম। যখন সন্ধ্যা হল তখন আমি তা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট গেলাম। তিনি কুবাতে ছিলেন। আমি তাঁর নিকট গিয়ে বললাম, আমার নিকট খবর পৌঁছেছে যে, আপনি একজন সৎ ব্যক্তি। আর আপনার সাথে আপনার দরিদ্র সাথীরা রয়েছেন। আর এগুলো আমার নিকট ছাদাক্বাহ করার জন্য রয়েছে। আমি এগুলোর ব্যাপারে আপনাদেরকে অধিক হক্বদার বলে মনে করি।
তিনি বলেন, আমি এগুলো তাঁর নিকট হাযির করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর সাথীদের বললেন, তোমরা খাও। আর তিনি হাত সংযত করলেন এবং কিছুই খেলেন না। তিনি (সালমান ফারেসী) বলেন, আমি মনে মনে বললাম, এটি প্রথম আলামত। অতঃপর আমি তাঁর নিকট থেকে চলে আসলাম এবং আরোও কিছু দ্রব্য সঞ্চয় করলাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় চলে আসলেন। এরপর আমি তাঁর নিকট গেলাম এবং বললাম, আমি আপনাকে ছাদাক্বার সম্পদ খেতে দেখিনি আর এগুলো আপনার জন্য হাদিয়া। যার দ্বারা আমি আপনার মেহমানদারী করলাম। তিনি বলেন, এবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এগুলো থেকে খেলেন এবং ছাহাবীদের আদেশ করলে তাঁরাও তাঁর সাথে আহার করলেন। তিনি বলেন, আমি মনে মনে বললাম, এই দু’টি হল (নবুঅতের) আলামত। অতঃপর ‘বাকীউল গারকাদে’ আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট আসলাম। তখন তিনি তাঁর এক ছাহাবীর জানাযার পিছন পিছন যাচ্ছিলেন। তাঁর পরিধানে দু’টি চাদর ছিল। তিনি তাঁর সাথীদের সাথে বসেছিলেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। অতঃপর আমি তাঁর পিঠের দিকে ঘুরে দেখতে লাগলাম। যেন আমার বন্ধুর বর্ণনা মোতাবেক ঐ মোহরটি দেখতে পাই। যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে দেখলেন যে আমি তাঁর পিছনে ঘুরছি, তখন তিনি বুঝতে পারলেন- আমি কোন কিছু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছি, যা আমার নিকট বর্ণনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অতঃপর তিনি পিঠ থেকে চাদর সরিয়ে ফেললেন। আমি মোহর দেখতে পেলাম এবং তাঁকে চিনতে পারলাম (যে ইনিই নবী)। আমি তাঁর উপর ঝুঁকে পড়লাম এবং তাকে চুমু দিয়ে কাঁদতে লাগলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, এদিকে এসো। আমি ঘুরে এলাম এবং তাঁর নিকট আমার সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলাম। যেমন তোমার নিকট বর্ণনা করছি হে ইবনে আববাস! তিনি বলেন, এ ঘটনা ছাহাবীদেরও শ্রবণ করাতে রাসূল (ছাঃ) পসন্দ করলেন। অতঃপর সালমান গোলামীতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন যার দরুন বদর ও ওহোদ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেননি।
তিনি বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, হে সালমান! তুমি (তোমার মালিকের সাথে দাসত্বমুক্তির ব্যাপারে) চুক্তি কর। আমি তার সাথে তিনশত ছোট খেজুর গাছের চারা ফলদায়ক হওয়া পর্যন্ত গর্তে পানি দেওয়া এবং চল্লিশ উকিয়া আদায় করার উপর চুক্তি করলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীদেরকে বলেন, তোমরা তোমাদের ভাইকে সাহায্য করো। তারা আমাকে খেজুর গাছ (চারা) দিয়ে সাহায্য করল। এক ব্যক্তি ত্রিশটি চারা দিলেন, আরেকজন বিশটি। অপরজন পনেরটি, আরেকজন দশটি চারা দিলেন। অর্থাৎ প্রত্যেকেই তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী আমাকে সাহায্য করলেন। এক পর্যায়ে আমার তিন’শ চারা হয়ে গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, হে সালমান! তুমি যাও এবং এগুলো রোপণ করার জন্য গর্ত খনন কর। যখন শেষ করবে তখন আমার নিকট আসবে। আমি নিজ হাতে তা রোপণ করব। অতঃপর আমি গর্ত খনন করলাম। আর একাজে তাঁর ছাহাবীগণ আমাকে সাহায্য করলেন। যখন আমি কাজ শেষ করলাম তখন তাঁর নিকট গিয়ে তাঁকে সংবাদ দিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমার সাথে বাগানের দিকে চললেন। আমরা তাঁকে গাছের চারা দেয়া শুরু করলাম আর তিনি নিজ হাতে তা রোপণ করতে লাগলেন। ঐ সত্তার কসম! যাঁর হাতে সালমানের প্রাণ! ঐ চারাগুলোর একটিও মারা যায়নি। আমি গাছের চুক্তি আদায় করেছি। এখন আমার উকিয়ার অর্থের চুক্তিটি বাকী ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট কোন যুদ্ধের গণীমত হতে মুরগীর ডিমের ন্যায় স্বর্ণের এক টুকরা আসলে তিনি বলেন, সালমান তার মুকাতাবের (মনিবের) ব্যাপারে কি করেছে? (অর্থাৎ সে মাল আদায় করেছে, না করেনি?) তিনি বলেন, আমাকে ডাকা হ’ল। অতঃপর তিনি বললেন, সালমান এটি নাও এবং তোমার যে ঋণ আছে তা আদায় কর।
অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার উপর যে ঋণ আছে এটা কিভাবে তার বরাবর হবে? তিনি বললেন, এটা নাও। কারণ আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারাই তোমার ঋণ আদায় করে দিবেন। তিনি বলেন, আমি তা নিলাম এবং তাদের জন্য ওযন করলাম। ঐ সত্তার শপথ যাঁর হাতে সালমানের প্রাণ! তা চল্লিশ উকিয়া হ’ল। আমি তাদের হক্ব পূর্ণভাবে আদায় করলাম এবং মুক্তি লাভ করলাম। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে খন্দক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম। তারপর তাঁর সাথে আর কোন যুদ্ধেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি(আহমাদ হা/২৩৭৮৮, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৮৯৪)।
শিক্ষণীয় বিষয় :
১. সত্যের সন্ধানে সালমান ফারেসী (রাঃ)-এর এরূপ ত্যাগ হকের পথে চলার জন্য আমাদেরকে কিরূপ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে তা বুঝিয়ে দেয়। ২. সৎ মানুষের সাহচর্য হকের উপর টিকে থাকার জন্য একান্ত যরূরী। ৩. সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে, মানুষের জীবনে বিপদ আসবেই। সেজন্য যে কোন বিপদগ্রস্ত মানুষকে সম্মিলিতভাবে সাহায্য করতে হবে। ৪. স্বভাবগতভাবে মানুষ ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু পিতা-মাতা বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে বিধর্মীতে পরিণত করে। ৫. স্রেফ যিদের বশবর্তী হয়ে আহলে কিতাবরা (ইহুদী-খৃষ্টান) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নবুঅতকে অস্বীকার করেছিল। অথচ তিনি ছিলেন সত্য নবী। ৬. আল্লাহভীরু মনীষীদের জীবনী অধ্যয়ন করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। ৭. সকল বিপদে স্রেফ আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে হবে।
হযরত সালমান ফারসী (রাযিঃ) সংক্ষিপ্ত আলোচনা :
এর অনেক ফযীলত হাদীস শরীফে বর্ণিত হইয়াছে। আর হওয়াও চাই, কারণ তিনি সত্য দ্বীনের তালাশে অনেক কষ্ট সহ্য করিয়াছেন। বহু দেশ ভ্রমণ করিয়াছেন। তিনি দীর্ঘ জীবন লাভ করিয়াছিলেন। তাহার বয়স আড়াইশত বৎসর হওয়ার ব্যাপারে কোন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির দ্বিমত নাই। কেহ কেহ সাড়ে তিনশত বৎসরও বলিয়াছেন। আবার কেহ আরও বেশী বলিয়াছেন। এমনকি কেহ বলিয়াছেন, তিনি হযরত ঈসা (আঃ) এর যুগও পাইয়াছিলেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত ঈসা (আঃ) এর যমানার মধ্যে ছয়শত বৎসরের ব্যবধান ছিল। তিনি পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহ হইতে শেষ নবী হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত হওয়ার বিষয় জানিয়াছিলেন। তিনি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তালাশে বাহির হইলেন। পাদ্রীদের এবং ঐ যামানার পণ্ডিতদের নিকট হইতে সন্ধান লইতে থাকিলেন। তাহারা তাহাকে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতিসত্বর জন্মগ্রহণ করার সুসংবাদ ও তাহার পরিচয় বলিয়া দিতে থাকিল। তিনি পারস্যের শাহজাদাদের মধ্যে একজন ছিলেন। শেষ নবীর সন্ধানে বিভিন্ন দেশে ঘুরিয়া ফিরিতেছিলেন। জনৈক ব্যক্তি তাহাকে বন্দী করিয়া গোলাম বানাইয়া বিক্রয় করিয়া দিল। অতঃপর তিনি এইভাবে বার বার বিক্রয় হইতেছিলেন। তিনি নিজেই বলেন-- বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে, আমাকে দশজনেরও অধিক মনিব খরিদ করিয়াছে এবং বিক্রয় করিয়াছে। সর্বশেষে মদীনা শরীফের একজন ইহুদী তাহাকে খরিদ করিয়াছে। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করিয়া মদীনায় পৌঁছিয়াছিলেন। খবর পাইয়া তিনি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হইলেন। যে সমস্ত আলামত বলা হইয়াছিল, উহা যাচাই করিলেন এবং পরীক্ষা করিলেন। অতঃপর মুসলমান হইয়া গেলেন এবং ইহুদী মনিবকে ফিদিয়া দিয়া (অর্থাৎ, বিনিময় প্রদান করিয়া) মুক্তি লাভ করিলেন।
এক সাহাবী (রাযিঃ)এর মেহমানের খাতিরে বাতি নিভাইয়া ফেলা:
একজন সাহাবী হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হইয়া ক্ষুধা ও পেরেশানীর অবস্থা জানাইলেন। হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সকল ঘরে কাহাকেও পাঠাইলেন। কোন ঘরেই কিছু পাওয়া গেল না। তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, কেহ আছে কি? যে এক রাত্রির জন্য এই ব্যক্তির মেহমানদারী কবুল করিবে? এক আনসারী সাহাবী বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি মেহমানদারী করিব। তাহাকে ঘরে লইয়া গেলেন এবং আপন স্ত্রীকে বলিলেন, এই ব্যক্তি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেহমান। যতদূর সম্ভব তাহার মেহমানদারীতে কোনপ্রকার ত্রুটি করিবে না এবং কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। স্ত্রী বলিলেন, আল্লাহর কসম, বাচ্চাদের উপযোগী সামান্য খাবার ব্যতীত ঘরে আর কিছুই নাই। সাহাবী বলিলেন, বাচ্চাদেরকে ভুলাইয়া ঘুম পাড়াইয়া দাও তাহারা ঘুমাইয়া যাইবে তখন খানা লইয়া মেহমানের সহিত বসিয়া যাইব আর তুমি বাতি এবং যখন ঠিক করার বাহানায় উঠিয়া উহা নিভাইয়া দিবে। সুতরাং স্ত্রী তাহাই করিল। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে এবং বাচ্চারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত্রি কাটাইল। এই প্রেক্ষিতেই আয়াত নাযিল হইল— আয়াতের... এই তরজমা—“আর তাহারা অন্যকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় যদিও তাহারা ক্ষুধার্ত থাকে।
রোযাদারের জন্য বাতি নিভাইয়া দেওয়া :
এক সাহাবী রোযার পর রোযা রাখিতেন। ইফতার করার জন্য খাওয়ার কোন কিছু জুটিত না। হযরত ছাবেত নামক এক আনসারী সাহাবী বুঝিতে পারিয়া স্ত্রীকে বলিলেন, আমি রাত্রে একজন মেহমান। লইয়া আসিব। যখন খাওয়া আরম্ভ করিব তখন তুমি বাতি ঠিক করার ভান করিয়া নিভাইয়া দিবে। যতক্ষণ মেহমানের পেট না ভরিয়া যাইবে। ততক্ষণ আমরা খাইব না। সুতরাং তাহারা এইরূপই করিলেন। মেহমানের সহিত শরীক রহিলেন, যেন খানা খাইতেছেন। সকালে হযরত ছাবেত (রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে হাজির হইলে তিনি বলিলেন, রাত্রে মেহমানের সহিত তোমরা যে আচরণ করিয়াছ তাহা আল্লাহ তায়ালার কাছে অত্যন্ত পছন্দ হইয়াছে। (দুররে মানসূর)
পাহাড়ের গুহায় আটকে পড়া তিন যূবক :
একবার তিনজন লোক পথ চলছিল, এমন সময় তারা বৃষ্টিতে আক্রান্ত হ’ল। অতঃপর তারা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ পাহাড় হ’তে এক খন্ড পাথর পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তারা একে অপরকে বলল, নিজেদের কৃত কিছু সৎকাজের কথা চিন্তা করে বের কর, যা আললাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমরা করেছ এবং তার মাধ্যমে আললাহর নিকট দো‘আ কর। তাহ’লে হয়ত আল্লাহ্ তোমাদের উপর হ’তে পাথরটি সরিয়ে দিবেন।
তাদের একজন বলতে লাগল, হে আল্লাহ্! আমার আববা-আম্মা খুব বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট সন্তানও ছিল। আমি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য পশু পালন করতাম। সন্ধ্যায় যখন আমি বাড়ি ফিরতাম তখন দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তান্দের আগে আমার আববা-আম্মাকে পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে দেরী হয় এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে আসতে পারলাম না। এসে দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি দুধ দোহন করলাম, যেমন প্রতিদিন দোহন করি। তারপর আমি তাঁদের শিয়রে (দুধ নিয়ে) দাঁড়িয়ে রইলাম। তাদেরকে জাগানো আমি পছন্দ করিনি এবং তাদের আগে আমার বাচ্চাদেরকে পান করানোও সঙ্গত মনে করিনি। অথচ বাচ্চাগুলো দুধের জন্য আমার পায়ের কাছে পড়ে কান্নাকাটি করছিল। এভাবে ভোর হয়ে গেল। হে আল্লাহ্! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এ কাজটি করে থাকি তবে আপনি আমাদের হ’তে পাথরটা খানিক সরিয়ে দিন, যাতে আমরা আসমানটা দেখতে পাই। তখন আল্লাহ পাথরটাকে একটু সরিয়ে দিলেন এবং তারা আসমান দেখতে পেল।
দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। পুরুষরা যেমন মহিলাদেরকে ভালবাসে,আমি তাকে তার চেয়েও অধিক ভালবাসতাম। একদিন আমি তার কাছে চেয়ে বসলাম (অর্থাৎ খারাপ কাজ করতে চাইলাম)। কিন্তু তা সে অস্বীকার করল যে পর্যন্ত না আমি তার জন্য একশ’ দিনার নিয়ে আসি। পরে চেষ্টা করে আমি তা যোগাড় করলাম (এবং তার কাছে এলাম)। যখন আমি তার দু’পায়ের মাঝে বসলাম (অর্থাৎ সম্ভোগ করতে তৈরী হলাম) তখন সে বলল, হে আললাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর। অন্যায়ভাবে মোহর (পর্দা) ছিঁড়ে দিয়ো না। (অর্থাৎ আমার সতীত্ব নষ্ট করো না)। তখন আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। হে আল্লাহ! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে আপনি আমাদের জন্য পাথরটা সরিয়ে দিন। তখন পাথরটা কিছুটা সরে গেল।
তৃতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্! আমি এক ‘ফারাক’ চাউলের বিনিময়ে একজন শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলাম। যখন সে তার কাজ শেষ করল আমাকে বলল, আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি তাকে তার পাওনা দিতে গেলে সে তা নিল না। আমি তা দিয়ে কৃষি কাজ করতে লাগলাম এবং এর দ্বারা অনেক গরু ও তার রাখাল জমা করলাম। বেশ কিছু দিন পর সে আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় কর (আমার মজুরী দাও)। আমি বললাম, এই সব গরু ও রাখাল নিয়ে নাও। সে বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার সাথে ঠাট্টা কর না। আমি বললাম, আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, ঐগুলো নিয়ে নাও। তখন সে তা নিয়ে গেল। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, যদি আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে পাথরের বাকীটুকু সরিয়ে দিন। তখন আল্লাহ পাথরটাকে সরিয়ে দিলেন। (আব্দুললাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/২৩৩৩, ‘চাষাবাদ’ অধ্যায়, অনুচেছদ-১৩; মুসলিম হা/২৭৪৩, মিশকাত হা/৪৯৩৮)।
কুষ্ঠরোগী , অন্ধ ও টেকোর কাহিনী :
বনী ইসরাঈলের মাঝে তিনজন ব্যক্তি ছিল- কুষ্ঠরোগী টেকো ও অন্ধ।মহান আল্লাহ্ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন এবং তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। অতঃপর কুষ্ঠরোগীর কাছে এসে তিনি বললেন,‘তোমার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস কোনটি?সে বলল, ‘সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা মানুষ আমাকে ঘৃণা করে’। ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলালেন। এতে তার রোগ দূর হ’ল এবং তাকে সুন্দর বর্ণ ও সু্নদর চামড়া দান করা হ’ল। অতঃপর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার নিকট কোন্ সম্পদ সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয়? সে বলল, উট অথবা গরু’। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে,কুষ্ঠরোগী বা টেকো দু’জনের একজন বলেছিল উট আর অপরজন বলেছিল গরু। তাকে তখন দশ মাসের গর্ভবতী একটি উটনী দেয়া হ’ল। ফেরেশতা বললেন, ‘আল্লাহ এতে তোমায় বরকত দিন’।
তারপর তিনি টেকো ব্যক্তির কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস কোনটি? সে বলল, ‘সুন্দর চুল এবং এই টাক হ’তে মুক্তি, লোকেরা যার কারণে আমাকে ঘৃণা করে’। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তার মাথায় হাত বুলালেন। এতে তার টাক ভাল হয়ে গেল এবং তাকে সুন্দর চুল দান করা হ’ল। এরপর ফেরেশতা বললেন, ‘কোন মাল তোমার নিকট অধিক প্রিয়’? সে বলল, গরু। বর্ণনাকারী বলেন,তখন তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দেয়া হ’ল। ফেরেশতা বললেন, আল্লাহ এতে তোমাকে বরকত দিন।
তারপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার অধিক পছন্দের জিনিস কোনটি’? সে বলল, ‘আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিন, আমি যাতে মানুষকে দেখতে পারি’। ফেরেশতা তার চোখ স্পর্শ করলেন। এতে তার চোখের দৃষ্টি আল্লাহ ফিরিয়ে দিলেন। এরপর ফেরেশতা প্রশ্ন করলেন,‘কোন মাল তোমার নিকট অধিক প্রিয়’? সে বলল, ছাগল। তাকে তখন এমন ছাগী দেয়া হ’ল, যা অধিক সংখ্যক বাচ্চা দেয়।
তারপর উট, গাভী ও ছাগলের বাচচা হ’ল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল। তারপর ফেরেশতা কুষ্ঠরোগীর কাছে তাঁর প্রথম রূপ ধারণ করে এসে বললেন, ‘আমি একজন মিসকীন। সফরে আমার সবকিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহ ব্যতীত কেউ নেই, যার সাহায্যে আমি আমার গন্তব্যে পৌছাতে পারি, তারপর তোমার সহায়তায়। যে আল্লাহ তোমাকে সুন্দর বর্ণ, সুন্দর ত্বক ও সম্পদ দিয়েছেন, সে আল্লাহর নামে তোমার নিকট আমি একটা উট চাচিছ, যার সাহায্যে আমি গন্তব্যে পৌছাতে পারি’। সে বলল,‘(আমার উপর) অনেকের অধিকার রয়েছে’। ফেরেশতা বললেন,‘তোমাকে বোধ হয় আমি চিনি। তুমি কি কুষ্ঠরোগী ছিলে না? লোকেরা তোমাকে কি ঘৃণা করত না? তুমি না নিঃস্ব ছিলে? অতঃপর আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন’। সে বলল, ‘এই সম্পদ তো আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষ থেকে পেয়েছি’। তিনি বললেন, ‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও, তাহ’লে তোমাকে যেন আল্লাহ আগের মতো করে দেন’।
এরপর তিনি টেকো ব্যক্তির কাছে তাঁর প্রথম রূপ ধারণ করে এসে প্রথম লোকটিকে যা বলেছিলেন তা বললেন এবং সেও একই উত্তর দিল,যা পূর্বের লোকটি দিয়েছিল। ফেরেশতা একেও বললেন,‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহ যেন তোমাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন’। এরপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে তাঁর আগের রূপ ধারণ করে এসে বললেন, ‘আমি একজন মিসকীন মুসাফির। আমার সবকিছু সফরে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন গন্তব্যে পৌঁছাতে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন উপায় নেই, তারপর তোমার সহায়তায়। সেই আল্লাহর নামে তোমার কাছে একটি ছাগল সাহায্য চাচিছ, যিনি তোমাকে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন’। এ ছাগলটি দিয়ে আমি বাড়ি পৌছাতে পারব। লোকটি বলল, ‘আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ্ আমার দৃষ্টিশক্তি ফেরত দিয়েছেন। আমি দরিদ্র ছিলাম, আল্লাহই আমাকে ধনী করেছেন। কাজেই তোমার যত ইচছা মাল তুমি নিয়ে যাও। আল্লাহর শপথ! মহান আল্লাহর ওয়াস্তে আজ তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্য আমি আজ তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না’। ফেরেশতা বললেন, ‘তোমার সম্পদ তোমার কাছেই রাখ। তোমাদেরকে শুধুমাত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। তোমার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট এবং তোমার অপর দু’জন সাথীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন’।[আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/৩৪৬৪ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচেছদ-৫১; মুসলিম হা/২৯৬৪, মিশকাত হা/১৮৭৮ ‘যাকাত’ অধ্যায়, অনুচেছদ-৫]
শিক্ষা :
সর্বদা আল্লাহর নে’মতের শোকর-গুযার হতে হবে।