১৪ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮ জিলহজ্জ ১৪৪৭ হিজরী
তাফসীরের সারসংক্ষেপ
সূরা আল-বাকারা
আয়াত : ২২৬-২২৭
সম্পূর্ণ ক্লাসের অডিও রেকর্ডিংস
সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট:
لِّلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِن نِّسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ ۖ فَإِن فَاءُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ٢٢٦ وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ٢٢٧
অর্থ :
যারা নিজেদের স্ত্রীদের নিকট গমন না করার শপথ করে, তাদের জন্য অপেক্ষার সময় চার মাস। অতঃপর তারা যদি (সম্পর্কে) ফিরে আসে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যদি তারা তালাকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
(সূরা আল-বাকারা : ২২৬-২২৭)
আলোচ্য বিষয় : ইলা (الإيلاء) এবং তালাক
◈ ইলা (الإيلاء) কী?
কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহর নামে শপথ করে যে, সে তার স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করবে না, তবে শরীয়তের পরিভাষায় একে ইলা বলা হয়।
ইসলাম এ অবস্থার জন্য সর্বোচ্চ চার মাস সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।
যদি স্বামী চার মাস পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই স্ত্রীর কাছে ফিরে আসে এবং বৈবাহিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে, তাহলে সংসার পূর্বের ন্যায় বহাল থাকবে।
তবে শপথ ভঙ্গ করার কারণে তাকে কাফফারা আদায় করতে হবে।
আর যদি চার মাস অতিক্রম হয়ে যায় এবং সে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের দিকে না আসে, তাহলে অধিকাংশ ফকীহের মতে তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। পরবর্তীতে পুনরায় একত্রে বসবাস করতে চাইলে নতুন করে বিবাহ (নিকাহ) সম্পন্ন করতে হবে।
শপথ ভঙ্গের কাফফারা
আল্লাহ তাআলা শপথ ভঙ্গের জন্য যে কাফফারা নির্ধারণ করেছেন তা হলো—
১. দশজন দরিদ্র ব্যক্তিকে দুই বেলা পেট ভরে খাবার খাওয়ানো, অথবা
২. দশজন মিসকিনকে পরিধানযোগ্য কাপড় প্রদান করা, অথবা
৩. একজন দাস-দাসী মুক্ত করে দেওয়া।
আর যদি এগুলোর কোনোটিই করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে ধারাবাহিকভাবে তিনটি রোজা রাখতে হবে।
ইসলামী শরীয়তে তালাকের ধরন
১. তালাকে সরীহ (الطلاق الصريح)
যে তালাকে স্পষ্টভাবে ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ করা হয়, তাকে তালাকে সরীহ বলা হয়।
যেমন—
“আমি তোমাকে তালাক দিলাম।”
এ ধরনের কথায় নিয়ত থাকুক বা না থাকুক, তালাক সংঘটিত হয়ে যায়।
২. তালাকে কিনায়া (الطلاق الكناية)
যে তালাকে সরাসরি ‘তালাক’ শব্দ ব্যবহার না করে অন্য ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বিচ্ছেদের কথা বলা হয়, তাকে তালাকে কিনায়া বলা হয়।
যেমন—
“তুমি তোমার পথ বেছে নাও।”
“তুমি তোমার বাবার বাড়ি চলে যাও।”
এ ধরনের কথার সঙ্গে যদি তালাকের নিয়ত থাকে, তবে তালাক সংঘটিত হবে; আর নিয়ত না থাকলে তালাক কার্যকর হবে না।
তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত
তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত পালন করা ফরজ।
যদি নারী ঋতুবতী হন, তাহলে তার ইদ্দতের সময়সীমা হবে তিন হায়েজ (তিন মাসিক চক্র)।
আর যদি তিনি গর্ভবতী হন, তবে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত ইদ্দত চলবে।
ইদ্দতকালীন সময়ে অন্য কোনো পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ নয়।
তালাকের প্রধান তিন প্রকার
১. তালাকে রাজঈ (الطلاق الرجعي)
প্রথম বা দ্বিতীয় তালাকের পর ইদ্দত চলাকালীন স্বামী নতুন বিবাহ ছাড়াই স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ করতে পারে। এটিকে তালাকে রাজঈ বলা হয়।
২. তালাকে বায়েন (الطلاق البائن)
যে তালাকের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পুনরায় সংসার করতে চাইলে নতুন করে নিকাহ ও মোহর নির্ধারণ করতে হয়, তাকে তালাকে বায়েন বলা হয়।
৩. তালাকে মুগাল্লাযা (الطلاق المغلظة)
তিন তালাক পূর্ণ হয়ে গেলে তাকে তালাকে মুগাল্লাযা বা চূড়ান্ত তালাক বলা হয়। এ অবস্থায় স্ত্রী অন্যত্র বৈধভাবে বিবাহ করে, স্বাভাবিকভাবে সেই বিবাহ শেষ হওয়ার পর ইদ্দত অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত পূর্বের স্বামীর জন্য তাকে পুনরায় বিবাহ করা বৈধ হয় না।
শিক্ষা ও উপদেশ:
এই আয়াতসমূহের মাধ্যমে ইসলাম পারিবারিক জীবনে ধৈর্য, সংযম এবং বিচক্ষণতার শিক্ষা দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদের পরিবর্তে পুনর্মিলনের সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে একটি পরিবার অযথা ভেঙে না যায়। একই সঙ্গে তালাকের মতো গুরুতর বিষয়কে হালকাভাবে গ্রহণ না করে আল্লাহভীতি ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের পারিবারিক জীবনকে শান্তি, সৌহার্দ্য ও তাকওয়ার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
সংকলনে
আব্দুল্লাহ সৈকত
সহকারি অধ্যাপক
খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়
বি: দ্র: সারসংক্ষেপ প্রদানে বিলম্ব হওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করতেছি। একই সাথে সকলের নিকট দোয়াপ্রার্থী, আগামী সপ্তাহ থেকে অতি দ্রুত তাফসীরে সারসংক্ষেপ আপনাদের নিকট প্রকাশ করতে পারি।
Leave a Reply