তাফসীরের সারসংক্ষেপ, সূরা বাকারা, ২:২২৮-২২৯, আলোচ্য বিষয় : তালাকের সংখ্যা, স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান, মোহর এবং “খুলা”

Copied!

তাফসীরের সারসংক্ষেপ
তারিখ : ৫ মহররামুল হারাম ১৪৪৮ হিজরী
২১শে জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ


সূরা আল-বাকারা :
ٱلطَّلَـٰقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌۢ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌۢ بِإِحْسَـٰنٍ ۗ وَلَا يَحِلُّ لَكُمْ أَن تَأْخُذُوا۟ مِمَّآ ءَاتَيْتُمُوهُنَّ شَيْـًٔا إِلَّآ أَن يَخَافَآ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ ٱللَّهِ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ ٱللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا ٱفْتَدَتْ بِهِۦ ۗ تِلْكَ حُدُودُ ٱللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ
আয়াত ২২৯

সম্পূর্ণ ক্লাসের অডিও রেকর্ডিংস (Audio will be upload soon, insha’Allah)

সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট: আলোচ্য বিষয় : তালাকের সংখ্যা, স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান, মোহর এবং “খুলা”

আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারার ২২৯ নং আয়াতে দাম্পত্য জীবনে তালাকের বিধান, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার এবং বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও উত্তম আচরণের নির্দেশ প্রদান করেছেন।

সংক্ষেপে বিষয়গুলো নিম্নরূপ—
১. তালাকের সংখ্যা দুইবার পর্যন্ত প্রত্যাবর্তনযোগ্য
শরীয়ত অনুযায়ী স্বামী দুইবার পর্যন্ত তালাক দেওয়ার পর স্ত্রীকে ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
উভয় পক্ষ যদি সংসার টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী হয় এবং আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করার আশা থাকে, তাহলে পুনরায় একত্রে বসবাস করতে পারবে।
এই পর্যায়ে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সদাচরণ ও কল্যাণকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

২. তৃতীয় তালাকের পর আর প্রত্যাবর্তনের সুযোগ নেই

তৃতীয় তালাক দেওয়ার পর স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়।
তখন আগের স্বামী তাকে আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো ব্যক্তিকে বৈধভাবে বিয়ে করে এবং পরবর্তীতে স্বাভাবিক কারণে সেই বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়।

৩. স্ত্রীকে রাখলে সদ্ভাবে রাখতে হবে, আর বিচ্ছেদ হলে ইহসানের সঙ্গে বিদায় দিতে হবে

আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হলো—
স্ত্রীকে যদি রাখা হয়, তবে সুন্দর ব্যবহার ও সদাচরণের মাধ্যমে রাখতে হবে।
আর বিচ্ছেদ ঘটলে তাকে সম্মান ও ইহসানের সঙ্গে বিদায় দিতে হবে।
বিচ্ছেদের সময় প্রতিহিংসা, নির্যাতন বা অন্যায় আচরণ ইসলাম সমর্থন করে না।

৪. মোহর ফিরিয়ে নেওয়া বৈধ নয়
স্বামী যদি স্ত্রীর মোহর আদায় করে থাকে, তাহলে তালাকের পরে তা ফেরত নেওয়া তার জন্য বৈধ নয়।
স্ত্রীকে দেওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে খুলা (খোলা) সংঘটিত হলে স্ত্রী কিছু সম্পদের বিনিময়ে বিচ্ছেদ গ্রহণ করতে পারে।

৫. মোহরের পরিমাণ
ফিকহের হানাফি মতানুসারে মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ দশ দিরহাম।
মোহরের সর্বোচ্চ কোনো সীমা নির্ধারিত নেই।
স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী মোহর নির্ধারণ করাই সুন্নত ও উত্তম।

মোহর নির্ধারিত থাকলে তালাকের বিধান

ক) একাকীত্ব (খালওয়াত) বা দাম্পত্য মিলনের পর তালাক
যদি বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রী নির্জনে একত্রিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে এবং এরপর তালাক ঘটে, তাহলে স্ত্রী পূর্ণ মোহর পাওয়ার অধিকারী হবে।

খ) একাকীত্বের পূর্বে তালাক
যদি নির্জনে একত্রিত হওয়ার পূর্বেই তালাক দেওয়া হয়, তাহলে নির্ধারিত মোহরের অর্ধেক প্রদান করতে হবে।

মোহর নির্ধারিত না থাকলে

ক) একাকীত্বের পর তালাক
যদি মোহর নির্ধারণ করা না হয়ে থাকে এবং একাকীত্বের পর তালাক দেওয়া হয়, তাহলে স্ত্রী মহরে মিসল পাওয়ার অধিকারী হবে।

মহরে মিসল বলতে ওই নারীর সমপর্যায়ের আত্মীয়—যেমন বোন, চাচাতো বোন, মামাতো বোন বা খালাতো বোনদের প্রচলিত মোহরের সমপরিমাণ মোহরকে বোঝায়।

খ) একাকীত্বের পূর্বে তালাক
যদি মোহর নির্ধারিত না থাকে এবং একাকীত্বের আগেই তালাক দেওয়া হয়, তাহলে স্ত্রী মুতা’আ (মোতা) পাবে।

মুতা’আ বলতে স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে উপহার বা প্রয়োজনীয় পোশাক-পরিচ্ছদ প্রদান করাকে বোঝায়।

৬. খুলা (খোলা) বা স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ প্রার্থনা

সাধারণভাবে তালাকের অধিকার স্বামীর হাতে ন্যস্ত।
তবে স্ত্রী যদি স্বামীর সঙ্গে সংসার চালিয়ে যেতে অসমর্থ হয় এবং বিচ্ছেদ কামনা করে, তাহলে সে স্বামীকে কিছু সম্পদ বা মোহরের অংশ ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে।
এই প্রক্রিয়াকে শরীয়তের পরিভাষায় খুলা (খোলা) বলা হয়।

শিক্ষণীয় বিষয়
ইসলাম তালাককে অপছন্দনীয় হলেও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বৈধ ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
দাম্পত্য জীবন রক্ষা করাই ইসলামের মূল লক্ষ্য; তাই দুই তালাক পর্যন্ত পুনর্মিলনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও অন্যায়, প্রতিশোধ ও নির্যাতনের পরিবর্তে ন্যায়, সদাচরণ ও ইহসানের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
স্বামী-স্ত্রী উভয়ের অধিকার সংরক্ষণ এবং পারস্পরিক মর্যাদা বজায় রাখাই এ আয়াতসমূহের অন্যতম প্রধান শিক্ষা।

সংকলন ও পরিমার্জন
আবদুল্লাহ সৈকত
সহকারী অধ্যাপক
খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *