আলোচ্য বিষয়: সন্তানের দুধপান, রযাআত (দুগ্ধ-সম্পর্ক), পিতা-মাতার দায়িত্ব এবং হুরমত নিয়ে আলোচনা। সূরা: আল-বাকারা আয়াত, ২:২৩৩

Copied!

২০ মুহররমুল হারাম ১৪৪৮ হিজরি
৫ ই জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সূরা: আল-বাকারা
আয়াত: ২৩৩
আলোচ্য বিষয়: সন্তানের দুধপান, রযাআত (দুগ্ধ-সম্পর্ক), পিতা-মাতার দায়িত্ব, এবং পিতা-মাতার দায়িত্ব এবং হুরমত নিয়ে আলোচনা।

সম্পূর্ণ ক্লাসের অডিও রেকর্ডিংস (Audio will be upload soon, insha’Allah)

আরবি আয়াত:
وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ ۖ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ ۚ وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُۥ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ لَا تُكَلَّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا ۚ لَا تُضَارَّ وَالِدَةٌۢ بِوَلَدِهَا وَلَا مَوْلُودٌ لَّهُۥ بِوَلَدِهِۦ ۚ وَعَلَى الْوَارِثِ مِثْلُ ذَٰلِكَ ۗ فَإِنْ أَرَادَا فِصَالًا عَنْ تَرَاضٍۢ مِّنْهُمَا وَتَشَاوُرٍۢ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا ۗ وَإِنْ أَرَدتُّمْ أَن تَسْتَرْضِعُوا أَوْلَادَكُمْ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِذَا سَلَّمْتُم مَّآ ءَاتَيْتُم بِالْمَعْرُوفِ ۗ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
বাংলা অর্থ: মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে—এটি তাদের জন্য, যারা দুধপানকাল পূর্ণ করতে চায়। সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মায়ের খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা। কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেওয়া হয় না। সন্তানের কারণে মাকে বা পিতাকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। উত্তরাধিকারীর উপরও অনুরূপ দায়িত্ব বর্তায়। যদি পিতা-মাতা পারস্পরিক সম্মতি ও পরামর্শের মাধ্যমে দুই বছরের আগেই দুধ ছাড়াতে চান, তবে এতে কোনো গুনাহ নেই। আর যদি তোমরা অন্য কোনো মহিলার দ্বারা সন্তানকে দুধ পান করাতে চাও, তবে যথাযথ পারিশ্রমিক প্রদান করলে তাতেও কোনো গুনাহ নেই। আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা সবই দেখেন।

সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট: এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা সন্তানের দুধপান, পিতা-মাতার দায়িত্ব, রযাআতের বিধান এবং পারিবারিক জীবনে পারস্পরিক সহানুভূতি ও ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

দুধপানের নির্ধারিত সময়:

কুরআনে পূর্ণ দুধপানের সময় দুই বছর উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর শিশুকে ধীরে ধীরে দুধ ছাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজনে আড়াই বছর (৩০ মাস) পর্যন্ত দুধ পান করানো বৈধ।

আড়াই বছরের পরে দুধ পান করালে রযাআতের (দুগ্ধ-সম্পর্ক) বিধান প্রতিষ্ঠিত হয় না, এবং এ সময়ের পরে দুধ পান করানো সকল ফিকহের মতে সর্বসম্মতিক্রমে হারাম।

১।(মুদ্দাতুর রযাআত)
এর অর্থ হলো—যে সময়ের মধ্যে শিশুকে দুধ পান করালে শরীয়তের দৃষ্টিতে দুগ্ধ-সম্পর্ক (রযাআত) প্রতিষ্ঠিত হয়। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী এই সময়সীমা আড়াই বছর পর্যন্ত।

২।(হুরমাতে রযাআত)
কোনো শিশু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো নারীর দুধ পান করলে সেই নারীর সঙ্গে এবং তার নির্দিষ্ট আত্মীয়দের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক চিরতরে হারাম হয়ে যায়।
উদাহরণ:
যদি শিশু কোনো মহিলার দুধ পান করে, তাহলে—
সেই মহিলা তার দুধ-মা হয়ে যাবেন।
দুধ-মায়ের মেয়ে হবে দুধ-বোন।
দুধ-মায়ের অন্যান্য সন্তান হবে দুধ-ভাই বা দুধ-বোন।
তাদের মধ্যে বিবাহ বৈধ হবে না।

হুরমত (বিবাহ হারাম হওয়া) তিন প্রকার

ক. حرمة بالنسب (বংশগত হুরমত)
রক্তের সম্পর্কের কারণে বিবাহ হারাম হয়। যেমন—
মা
বোন
খালা
ফুফু
দাদি-নানি
ভাতিজি
ভাগ্নি ইত্যাদি।

খ. حرمة الرضاعة (দুগ্ধ-সম্পর্কজনিত হুরমত)
দুধ পান করার কারণে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। যেমন—
দুধ-মা
দুধ-বোন
দুধ-মায়ের কন্যা
দুধ-ভাইয়ের কন্যা প্রভৃতি।

হাদীসের মূলনীতি:
“যেসব সম্পর্ক বংশের কারণে হারাম হয়, সেসব সম্পর্ক দুধপানের কারণেও হারাম হয়ে যায়।”

গ. حرمة المصاهرة (বৈবাহিক সূত্রে হুরমত)

এটি প্রধানত চারটি কারণে প্রতিষ্ঠিত হয়—
১. নিকাহ — যেমন স্ত্রীর মা (শাশুড়ি) চিরতরে হারাম।
২. অবৈধ যৌনসম্পর্ক (অপকর্ম)।
৩. শাহওয়াতের সাথে স্পর্শ।
৪. শাহওয়াতের সাথে দৃষ্টি।

সন্তানের দুধপানের ব্যয়ভার:

স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে সংসার করলেও সন্তানের জন্য মায়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পিতার উপর বর্তায়।
যদি তালাক হয়ে যায় এবং মা সন্তানকে দুধ পান করান, তবুও পিতাকেই মায়ের খাদ্য, পোশাক ও প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করতে হবে।
এটি পিতার শরয়ী দায়িত্ব (ওয়াজিব)।

নফকার (ভরণ-পোষণ) মান কেমন হবে?

শরীয়তের নির্দেশ হলো—”بالمعروف”, অর্থাৎ সমাজে প্রচলিত ও ন্যায়সঙ্গত রীতি অনুযায়ী।

১।পিতা ধনী হলে উন্নত মানের খাদ্য, পোশাক ও প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করবেন।

২।পিতা দরিদ্র হলে তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবেন।আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।

৩।পিতা-মাতার আর্থিক অবস্থার মধ্যে পার্থক্য হলে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

তবে ফাতহুল কাদীর (আল-হিদায়ার অন্যতম প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাগ্রন্থ)-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুধপানকালীন নফকার পরিমাণ নির্ধারণে পিতার আর্থিক অবস্থাকেই ভিত্তি ধরা হবে।

এই আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়-

সন্তান প্রতিপালন উভয় পিতা-মাতার যৌথ দায়িত্ব।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম।
ইসলাম পারিবারিক জীবনে ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা দেয়।
দুধপানের মাধ্যমে বৈধ ও অবৈধ বৈবাহিক সম্পর্কের বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়, তাই এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে কারও ওপর অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়; প্রত্যেকের সামর্থ্য বিবেচনা করা হবে।
সকল বিষয়ে আল্লাহভীতি অবলম্বন করতে হবে এবং মনে রাখতে হবে, মানুষের প্রতিটি কাজ আল্লাহ তা’আলা সর্বদা অবলোকন করছেন।

সংকলন ও পরিমার্জন
আবদুল্লাহ সৈকত
সহকারী অধ্যাপক
খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *