জুমুয়ার বয়ান, ০৯ সফর ১৪৪৮ হিজরি : মুফতি আব্দুল ওয়াদুদ সাহেব হাফিজাহুল্লাহ, বিষয়: ওয়াদা পূরণ — মুমিনের পরিচয়, মুনাফিকের বিপরীত বৈশিষ্ট্য

Copied!

জুমুয়ার বয়ান, ০৯ সফর ১৪৪৮ হিজরি, ২৪/০৭/২০২৬ খ্রিস্টাব্দ স্থানঃ কেজির মোড় জামে মাসজিদ, এনায়েতপুর, সিরাজগঞ্জ ।খতিব: মুফতি আব্দুল ওয়াদুদ সাহেব হাফিজাহুল্লাহ

বিষয়: ওয়াদা পূরণ — মুমিনের পরিচয়, মুনাফিকের বিপরীত বৈশিষ্ট্য

মূল হাদিস: আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— آيَةُ
الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا
اؤْتُمِنَ خَانَ

অর্থ: “মুনাফিকের আলামত তিনটি: ১। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ২। যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করে এবং ৩। যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন সে খিয়ানত করে।” সূত্র: সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে— «وَإِنْ صَلَّى وَصَامَ وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ» অর্থ: “যদিও সে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে।”

আবার অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে— «وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ» অর্থ: “আর যখন
ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয় তখন সীমালঙ্ঘন করে (গালিগালাজ ও অশালীন আচরণ করে)।”

গত সপ্তাহে মিথ্যা বলা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এ সপ্তাহে আলোচনার বিষয় ছিল ওয়াদা পূরণ।

মুনাফিক দুই প্রকার।

১. মুনাফিকে হাকিকি যারা অন্তরে কুফর লালন করে কিন্তুবাহ্যিকভাবে নিজেদের মুসলিম পরিচয় দেয়। ইসলামের প্রথম যুগে এ ধরনের মুনাফিক ছিল।

২. মুনাফিকে আমলী (সুরতী) যাদের ঈমান রয়েছে, কিন্তু কাজের মধ্যে মুনাফিকদের কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়—যেমন ওয়াদা ভঙ্গ, মিথ্যা বলা, আমানতের খিয়ানত ইত্যাদি। বর্তমান যুগে এ ধরনের মুনাফিতি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে দেখা যায়।

আজকের বাস্তবতা: আজ অনেক মুসলমান নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, দাড়ি-টুপি—সবকিছু পালন করেন; কিন্তু ওয়াদা রক্ষা করার ক্ষেত্রে অবহেলা করেন। অথচ ইসলামে ওয়াদা পালন ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

হযরত আয়েশা (রা.)-এর বাগদান অর্থাৎ বিবাহ প্রস্তাবের ঘটনাঃ

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে বিবাহের পূর্বে হযরত আয়েশা (রা.)-এর বাগদান অর্থাৎ বিবাহ প্রস্তাব মুতইমের ছেলে জুবাইরের সাথে হয়েছিল। পরবর্তীতে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে প্রস্তাব গেল হযরত আয়েশা (রাঃ) আম্মা বলছিলেন আয়েশার (রাঃ) বিবাহের ওয়াদা তো মুতইমের ছেলে জুবাইরের সাথে হয়েছে। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম, তিনি তো, خیر الورا আসমানের নিচে জমিনের উপরে শ্রেষ্ঠ মানব। তাদের সাথে তো ওয়াদা হয়ে গেছে, এই বলে তাদের কাছে শুনতে গিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করায় জুবাইরের পরিবার আশঙ্কা করল যে আয়েশা (রা.)-এর প্রভাবে তাদের ছেলেও ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। তাই তারাই সেই বাগদান বাতিল করে দেয়।

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়—একবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম সেটিকে কতটা গুরুত্ব দিতেন।

বদর যুদ্ধে ওয়াদা রক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত:

বদর ছিল ইসলামের প্রথম এবং সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন, আর কুরাইশ বাহিনী ছিল
প্রায় এক হাজার। এই সময় হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) ও তাঁর পিতা মদিনায় আসার
পথে কুরাইশদের হাতে আটক হন। কুরাইশরা তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেয় যে তারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন না।

তারা মদিনায় এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সব ঘটনা জানালে তিনি বলেন— “তোমরা ফিরে যাও। আমরা তাদের সঙ্গে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করব না। আমরা আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা করি।” — সহিহ মুসলিম।

যুদ্ধে সৈন্যের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও রাসূল ﷺ ওয়াদা ভঙ্গ করেননি। এখান থেকেই
ওয়াদার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا
أَمَانَةَ لَهُ، وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ

অর্থ: “যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই, তার (পূর্ণাঙ্গ) ঈমান নেই; আর যে ব্যক্তি
অঙ্গীকার (ওয়াদা/চুক্তি) রক্ষা করে না, তার (পূর্ণাঙ্গ) দ্বীন নেই।” সূত্র: মুসনাদ আহমদ, শু‘আবুল ঈমান, ইমাম বায়হাকী।

চাকরি ও দায়িত্বও এক ধরনের অঙ্গীকার : কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি গ্রহণ করা মানে
নির্ধারিত সময় ও দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করা। ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বে অবহেলা
করা, সময় নষ্ট করা বা চুক্তি ভঙ্গ করা ইসলামী দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।

রাষ্ট্রের বৈধ আইন মানাও ইসলামের শিক্ষা:

যে রাষ্ট্রে একজন মুসলমান নিরাপদে বসবাস করে, সে রাষ্ট্রের শরীয়তবিরোধী নয় এমন আইন মেনে চলা তার দায়িত্ব। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রাফিক আইন অমান্য করা, সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করা বা নাগরিক দায়িত্ব অবহেলা করাও এক ধরনের অঙ্গীকার ভঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে ইহরাম ছাড়া মাতাফে (তাওয়াফের জায়গা) প্রবেশ করে। কিন্তু সৌদি প্রশাসন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে ইহরাম ছাড়া কেহ মাতাফের মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না, এ নিয়ম জারি করেন। একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো শরীয়তের বিধান এবং বৈধ প্রশাসনিক নিয়ম উভয়ই মেনে চলা। বৈধ চুক্তি বা অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে তা লঙ্ঘন করা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াদা
বা চুক্তি ভঙ্গের অন্তর্ভুক্ত এবং এটি একজন মুমিনের চরিত্রের পরিপন্থী।”

অমুসলিমদের সঙ্গেও চুক্তি রক্ষা:

ইসলামী রাষ্ট্রে যারা জিজিয়া দিয়ে বসবাস করত, তাদের জান-মাল ও ধর্মীয় স্বাধীনতা
রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল। ইসলাম কখনো চুক্তিভঙ্গকে সমর্থন করে না।

হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ও রোমানদের সঙ্গে চুক্তির ঘটনা : হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর
সময় রোমানদের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি
সৈন্যদের সীমান্তের কাছে অবস্থান নিতে বলেন, যাতে চুক্তি পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই
মুসলমান সৈন্যরা আক্রমণ করতে পারেন। ঠিক সূর্য অস্তমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আক্রমণ শুরু করে দিলেন, বস্তির পর বস্তি নগরীর পর নগরী মুসলমানদের হাতে বিজিত হওয়া শুরু করল, গনিমতের মাল তাদের হাতে আসা শুরু করল।

এ সময় সাহাবী আমর ইবনু আবাসা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দ্রুত অশ্বারোহী অবস্থায় মদিনা থেকে ঘটনাস্থলে এসে উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন— «الله أكبر، الله أكبر، وَفَاءٌ لَا
غَدْرَ، وَفَاءٌ لَا غَدْرَ» “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, বিশ্বাসঘাতকতা নয়; প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, বিশ্বাসঘাতকতা নয়।”

এরপর তিনি হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে মুয়াবিয়া! আপনি কি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সেই বাণী শোনেননি?” «مَنْ كَانَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ قَوْمٍ
عَهْدٌ، فَلَا يَحُلَّنَّهُ وَلَا يَشُدَّنَّهُ حَتَّى يَنْقَضِيَ أَجَلُهُ، أَوْ
يَنْبِذَ إِلَيْهِمْ عَلَى سَوَاءٍ»

অর্থ: “যে ব্যক্তির কোনো জাতির সঙ্গে চুক্তি রয়েছে, সে যেন চুক্তির মেয়াদ শেষ
হওয়ার আগে তা ভঙ্গ না করে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতিও না নেয়;
বরং মেয়াদ শেষ হলে অথবা সমভাবে তাদেরকে চুক্তি সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েই তবে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”

এ হাদিস শুনে হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাহিনীকে ফিরিয়ে নেওয়ার
নির্দেশ দেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করেন।

চুক্তি রক্ষা ও অমুসলিমদের অধিকার সংরক্ষণঃ

১৬ হিজরিতে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খেলাফতকালে বায়তুল মাকদিস ও শাম অঞ্চল ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় শামের প্রধান সেনাপতি ছিলেন হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)। বিজয়ের পর অমুসলিম অধিবাসীদের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী তারা জিজিয়া প্রদান করবে আর ইসলামী রাষ্ট্র তাদের জান, মাল, ইজ্জত, উপাসনালয় ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

কিন্তু কিছুদিন পর রোমান বাহিনীর বিশাল আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিলে মুসলিম বাহিনীকে সাময়িকভাবে কিছু এলাকা থেকে সরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। তখন হযরত আবু উবাইদাহ (রা.) উপলব্ধি করলেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তি অনুযায়ী অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি নির্দেশ দিলেন, তাদের কাছ থেকে যে জিজিয়া
গ্রহণ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ফিরিয়ে দেওয়া হোক। জিজিয়ার অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে
তিনি বললেন, “আমরা তোমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। এখন যেহেতু
সাময়িকভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম, তাই তোমাদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ আমাদের জন্য হালাল নয়।”

মুসলিম শাসকদের এই ন্যায়পরায়ণতা ও চুক্তির প্রতি অবিচল আনুগত্য দেখে অমুসলিম অধিবাসীরা গভীরভাবে মুগ্ধ হয়ে বলেন, “আল্লাহ তোমাদের আবার আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনুন। রোমানরা কখনো আমাদের সঙ্গে এমন ন্যায়বিচার করেনি।”

এ ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে চুক্তি রক্ষা, আমানতদারিতা এবং ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইসলাম শুধু চুক্তি করার শিক্ষা দেয় না; বরং সেই চুক্তির প্রতিটি শর্ত
নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করারও শিক্ষা দেয়।

আমাদের জন্য শিক্ষা :

সর্বাবস্থায় ওয়াদা পূরণ করতে হবে। মিথ্যা, ওয়াদা ভঙ্গ ও আমানতের খিয়ানত মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য। মুসলমানের চরিত্রের মূল সৌন্দর্য সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা। অমুসলিমদের সঙ্গেও চুক্তি রক্ষা করা ইসলামের নির্দেশ। চাকরি, ব্যবসা, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওয়াদা পালন ঈমানের দাবি। ইসলামের সৌন্দর্য কেবল ইবাদতে নয়, বরং চরিত্র, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও প্রতিশ্রুতি
রক্ষার মধ্যেও প্রকাশ পায়।

─ খতিব: মুফতি আব্দুল ওয়াদুদ সাহেব হাফিজাহুল্লাহ, অত্র মাসজিদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *