ইমোজি ব্যবহারের শরয়ী দৃষ্টিকোণ: একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ

ভূমিকা:
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এই মাধ্যমগুলোতে মনের ভাব প্রকাশের জন্য ইমোজি বা ইমোটিকন এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইমোজির ব্যবহার কতটা জায়েজ, তা নিয়ে মুসলিম সমাজে বিভিন্ন প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা যায়। এই নিবন্ধে কোরআন, হাদিস এবং ইসলামিক স্কলারদের মতামত বিশ্লেষণ করে ইমোজি ব্যবহারের শরয়ী বিধান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। প্রবন্ধের শেষে, এই বিষয়ে তাকওয়া ও পরহেজগারীর গুরুত্বও আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
প্রাণীর চিত্র অঙ্কনের নিষেধাজ্ঞা ও ইমোজি:
ইসলামে প্রাণীর চিত্র অঙ্কন বা ভাস্কর্য নির্মাণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে, মোহাম্মদ (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো প্রাণীর চিত্র অঙ্কন করে, কিয়ামতের দিন তাকে সেগুলোতে প্রাণ দিতে বলা হবে, কিন্তু সে তা করতে পারবে না।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অন্য বর্ণনায় এসেছে: “যারা পৃথিবীতে ছবি তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।” (সহীহ বুখারী)।
এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে কিছু স্কলার মনে করেন যে, ইমোজির ক্ষেত্রেও যদি তা প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ চিত্র বা মানুষের মুখের প্রতিচ্ছবি হয়, তবে তা এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হতে পারে। কারণ, ইমোজি যদিও হাতে আঁকা চিত্র নয়, তবে এটি একটি চিত্রের ডিজিটাল রূপ, যা প্রাণীর আকৃতি ফুটিয়ে তোলে। ইসলামিক স্কলারদের মতে, যে সকল ছবিকে দেখে সহজে চেনা যায় এবং যা থেকে একটি সম্পূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে, তা প্রাণীর চিত্র অঙ্কনের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। ইমোজি যদিও আকারে ছোট, কিন্তু এর মাধ্যমে একটি প্রাণীর বা মানুষের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন প্রকার ইমোজির শরয়ী বিশ্লেষণ:
১. পূর্ণাঙ্গ প্রাণীর ইমোজি:
যেসব ইমোজি প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ আকৃতি প্রকাশ করে, যেমন: বিড়াল, কচ্ছপ, ব্যাঙ, বাঘ, ডাইনোসর, মুরগির ছানা, উট ইত্যাদি, সেগুলো ব্যবহার করা অধিকাংশ স্কলারের মতে হারাম বা মাকরূহ তাহরীমী। কারণ এগুলো সরাসরি হাদিসের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে। এই ধরনের ইমোজি ব্যবহারকারীর জন্য কিয়ামতের দিন কঠিন জবাবদিহিতা থাকবে।
২. মানুষের মুখচ্ছবি বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইমোজি:
মানুষের মুখচ্ছবি (যেমন: হাসির অভিব্যক্তি, কান্নার অভিব্যক্তি) বা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (যেমন: হাত নাড়ানো, মাথা নাড়ানো) সম্বলিত ইমোজি ব্যবহার নিয়েও মতভেদ রয়েছে। একদল স্কলার মনে করেন যে, যেহেতু এগুলো প্রাণীর ছবি, তাই এগুলোও নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। তাদের যুক্তি হলো, যদিও ইমোজিগুলো আকারে ছোট, কিন্তু এগুলো মানুষের মুখের ভাব বা অঙ্গভঙ্গি সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করে, যা প্রাণীর চিত্র অঙ্কনের মূল উদ্দেশ্য পূরণ করে। মোহাম্মদ (ﷺ)-এর নিষেধাজ্ঞা শুধু ত্রিমাত্রিক মূর্তির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোনো চিত্র যা প্রাণীর আকৃতি ধারণ করে, তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
অন্যদল স্কলার মনে করেন যে, যেহেতু ইমোজিগুলো কার্টুনসদৃশ এবং পূর্ণাঙ্গ মানবাকৃতি নয়, তাই এগুলো হয়তো সরাসরি হারাম নয়। তবে, যেহেতু এটি সন্দেহজনক বিষয় এবং তাকওয়া অবলম্বনকারী মুসলিমের জন্য সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়, তাই এগুলো পরিহার করা উত্তম। বিশেষ করে, যে সকল ইমোজি মানুষের মতো (যেমন: দুজন মানুষ, নাচের ভঙ্গিমার মানুষ, দম্পতি, পরিবার, সাইকেল আরোহী, দৌড়বিদ, সান্তা ক্লজ) সেগুলোতে প্রাণ দিতে বলা হবে মর্মে কঠিন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে, তাই এগুলো স্পষ্ট হারাম।
৩. অন্যান্য ধর্মের প্রতীক সম্বলিত ইমোজি:
অন্যান্য ধর্মের প্রতীক (যেমন: হিন্দুদের নমস্কার/প্রার্থনা, পারমাণবিক প্রতীক যা কিছু ক্ষেত্রে নতুন যুগের আধ্যাত্মিকতায় ব্যবহৃত হয়, হিন্দু ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, তাওবাদ, খ্রিস্ট ধর্ম, ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্ট ধর্ম, ইসলাম (তবে এটি মূল ইসলামী প্রতীক নয়, বরং ওসমানী সাম্রাজ্যের প্রতীক), শান্তি প্রতীক (কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে), হানুক্কার মেনোরাহ (ইহুদি ধর্ম), হেক্সাপেন্টাগ্রাম বা ষড়ভুজ তারা (জাদু বা কাব্বালাহ) ইত্যাদি) সম্বলিত ইমোজি ব্যবহার করা সর্বসম্মতভাবে হারাম। কারণ, ইসলামে শিরক ও বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একজন মুসলিমের জন্য অন্য ধর্মের প্রতীকের প্রচার বা ব্যবহার সম্পূর্ণ হারাম। মোহাম্মদ (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (সুনানে আবু দাউদ)।
৪. অশ্লীল বা অনৈসলামিক ইমোজি:
যেসব ইমোজি অশ্লীলতা, মদ্যপান (যেমন: মদের গ্লাস, বিয়ারের মগ), শয়তানের প্রতীক (যেমন: শয়তানের মুখ, শয়তানের অঙ্গভঙ্গি), বা অন্য কোনো হারাম বিষয়ের প্রচার করে, সেগুলো ব্যবহার করাও হারাম। ইসলামে অশ্লীলতা ও হারাম কাজের প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন: “যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আন-নূর ২৪:১৯)।
৫. বাদ্যযন্ত্রের ইমোজি:
ইসলামে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে স্কলারদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও, অধিকাংশ স্কলার এটিকে মাকরূহ বা হারাম বলে গণ্য করেন। তাই বাদ্যযন্ত্রের ইমোজি (যেমন: ট্রাম্পেট, গিটার, ভায়োলিন, মিউজিক নোট, স্যাক্সোফোন) ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
৬. লাভ রিয়্যাক্ট (হৃদয়ের প্রতীক) এবং ক্রিসমাস ট্রি ইমোজি:
শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায রহিমাহুল্লাহ , শায়খ সালেহ আল-উসাইমিন রহিমাহুল্লাহ সহ সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ফতওয়া বোর্ড লাভ (হৃদয়ের প্রতীক) চিহ্নটি ব্যবহার করাকে ‘জায়েজ নয়’ বলে ফতওয়া দিয়েছেন। তাদের মতে, এটি বিজাতীয় সংস্কৃতির অংশ এবং ইসলামের মহব্বত প্রকাশের আলামত নয়। ইসলামী শরীয়তে মহব্বত প্রকাশের আলামত এটা নয়। সুতরাং এই চিহ্ন ব্যবহার করা মোটেই জায়েজ নয়।
ক্রিসমাস ট্রি ইমোজিটিও যেহেতু খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসবের (বড়দিন) প্রতীক, তাই এটি ব্যবহার করাও পরিহার করা উচিত। মোহাম্মদ (ﷺ) বিজাতীয়দের উৎসব বা সংস্কৃতিতে অংশ নিতে নিষেধ করেছেন।
৭. অপ্রাণীর ইমোজি:
যেসব ইমোজি অপ্রাণীর চিত্র, যেমন: গাছ, ফুল, ফল, ঘর, যানবাহন, প্রকৃতি (যেমন: গাছ, ফুল, আপেল, ঘর, গাড়ি, সূর্য) ইত্যাদি, সেগুলো ব্যবহার করা জায়েজ। কারণ এগুলো প্রাণীর চিত্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না।
উপদেশ গ্রহণের মানসিকতা ও তাকওয়া:
আসলে, উপদেশ সবাই গ্রহণ করে না। উপদেশ শুধুমাত্র তারাই গ্রহণ করে যারা আল্লাহকে ভয় করে। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন: “যে ভয় করে সে-ই উপদেশ গ্রহণ করবে।” (সূরা আল-আ’লা, ৮৭:১০)। অন্যত্র তিনি বলেন: “(এই কিতাব তোমার উপর এজন্য নাযিল করিনি যে তুমি কষ্ট পাও), বরং যারা ভয় করে তাদের জন্য উপদেশ হিসেবে।” (সূরা ত্বা-হা ২০:০২-০৩)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, “বুদ্ধিমানরাই উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৯)
যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে তাকওয়া অবলম্বন করতে চায়, তার জন্য এসব ইমোজি ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলারই প্রয়োজন হয় না। সে সকল সন্দেহজনক বিষয় থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে চায়। আলহামদুলিল্লাহ, অনেক মুসলিম আছেন যারা এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং উপলব্ধি করেছেন যে, এই ধরনের ইমোজি ব্যবহার করা উচিত নয় এবং তারা এগুলো ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন। যখন একজন মুমিন আল্লাহর ভয়ে কোনো হারাম বা সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকে, তখন আল্লাহ তার জন্য উত্তম প্রতিদান রাখেন।
উপসংহার:
শায়খ উসাইমিন রহিমাহুল্লাহ এর একটি উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি তিনি বলেছেন: “কোনো মুমিনের উচিত নয় যে, সে এমন কোনো কাজে লিপ্ত হবে যা তাকে হারাম কাজের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে, অথবা যা তার জন্য হারাম হতে পারে।” ইমোজি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য। যদিও কিছু ইমোজি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তাকওয়াপূর্ণ জীবন যাপনকারী ব্যক্তি সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং হারাম বা সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকেন।
ইমোজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা উচিত। প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ চিত্র, মানুষের মুখচ্ছবি, অন্যান্য ধর্মের প্রতীক, অশ্লীল বা হারাম বিষয়ের প্রতীক এবং বিজাতীয় সংস্কৃতির অংশ এমন ইমোজি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা তাকওয়ার পরিচায়ক। যেসব ইমোজি অপ্রাণীর এবং কোনোরূপ শরয়ী নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না, সেগুলো ব্যবহার করা জায়েজ। মুমিনের জন্য সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলা এবং সন্দেহজনক বিষয়গুলো পরিহার করাই উত্তম। আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী জীবন যাপন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবচেয়ে ভালো জানেন।

Hey, look! This is me, Muhammad Kawsar Ahmad Somrat (formerly MKA SOMRAT) | Ṭālib-e-‘ilm | Dā‘ī ilallāh | Phīlānthrōpist | “Sabr + Shukr + Salah = inner Peace” |⟦View Portfolio⟧