তাফসীরের সারসংক্ষেপ (স্ক্রিপ্ট)
১২ মহরমুল হারাম ১৪৪৮ হিজরী
২৮ শে জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সূরা: আল-বাকারা
আয়াত: ২২৯–২৩২, আলোচ্য বিষয়:তালাকের বিধান, তিন তালাকের পরিণতি এবং তাকওয়ার গুরুত্ব
সম্পূর্ণ ক্লাসের অডিও রেকর্ডিং
সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট: আল্লাহ তাআলা বৈবাহিক জীবনকে শান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই তালাককে ইসলাম বৈধ করলেও এটি অত্যন্ত অপছন্দনীয় বিষয়। তালাকের ক্ষেত্রে শরীয়তের নির্ধারিত বিধান মেনে চলা আবশ্যক।
রাসূল ﷺ বলেছেন, তিনটি বিষয় এমন যে, তা মজা করেই বলা হোক বা গুরুত্বের সঙ্গে বলা হোক—উভয় অবস্থায়ই তা কার্যকর হবে। সেগুলো হলো—
১. নিকাহ (বিবাহ)
২. তালাক
৩. ইতাক (গোলাম মুক্ত করা)
অতএব, রাগের মাথায় বা হাসি-ঠাট্টার ছলেও তালাক উচ্চারণ করলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে কার্যকর হতে পারে।
তবে কোনো ব্যক্তি যদি ঘুমন্ত অবস্থায়, উন্মাদ (পাগল) অবস্থায় বা এমন অবস্থায় থাকে যেখানে তার জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে, তাহলে তার তালাক কার্যকর হয় না।
কারণ, রাসূল ﷺ বলেছেন, তিন ব্যক্তির থেকে দায়িত্ব (কলম) উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে—
১।শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত;
২।ঘুমন্ত ব্যক্তি, জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত;
৩।উন্মাদ ব্যক্তি, সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত।
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে,
যদি তৃতীয় তালাক হয়ে যায়, তাহলে সেই স্ত্রী পূর্বের স্বামীর জন্য হালাল থাকবে না, যতক্ষণ না তিনি অন্য একজন স্বামীর সঙ্গে প্রকৃত বৈবাহিক জীবন অতিবাহিত করেন।
পরে যদি দ্বিতীয় স্বামী স্বাভাবিকভাবে তালাক দেন বা মৃত্যুবরণ করেন, তখন ইদ্দত শেষে উভয়ের সম্মতিতে পূর্বের স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহ করা বৈধ হবে।
তাকওয়ার গুরুত্ব:
মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করা অপরিহার্য। তাকওয়া হলো আল্লাহভীতি, তাঁর আদেশ পালন এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকার নাম। আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই সম্মানিত করবেন।
দুনিয়াতে তাকওয়ার কয়েকটি পুরস্কার
১. যত বড় বিপদই আসুক, আল্লাহ তাআলা তা থেকে উত্তরণের পথ করে দেন।
২. এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
৩. গুনাহসমূহ ক্ষমা করে মানুষকে পবিত্র করেন।
৪. মুত্তাকীদের জন্য আল্লাহতালার পুরস্কার /প্রতিদান দ্বিগুণ।
তাকওয়া আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।তাকওয়ার আরেক নাম তৌফিক এটি কেবল নিজের প্রচেষ্টায় অর্জিত হয় না;
বরং আন্তরিক চেষ্টা ও আল্লাহর কাছে দোয়ার মাধ্যমে তিনি বান্দাকে এ নেয়ামত দান করেন। তাই সর্বদা আল্লাহর কাছে তাকওয়া প্রার্থনা করা উচিত।
রাসূল ﷺ-এর তাকওয়া সম্পর্কিত দোয়াসমূহ
১.
اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي أَخْشَاكَ كَأَنِّي أَرَاكَ أَبَدًا حَتَّى أَلْقَاكَ، وَأَسْعِدْنِي بِتَقْوَاكَ، وَلَا تُشْقِنِي بِمَعْصِيَتِكَ
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমার অন্তরে এমন পরিমাণ আপনার ভয় দান করুন, যেন আমি সর্বদা আপনাকে দেখছি। আপনার তাকওয়ার মাধ্যমে আমাকে সৌভাগ্যবান করুন এবং আপনার অবাধ্যতার কারণে আমাকে দুর্ভাগা ও অপমানিত করবেন না।
২.
اللَّهُمَّ أَعِنِّي بِالْعِلْمِ، وَزَيِّنِّي بِالْحِلْمِ، وَأَكْرِمْنِي بِالتَّقْوَى، وَجَمِّلْنِي بِالْعَافِيَةِ
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমাকে ইলমের মাধ্যমে সাহায্য করুন, সহনশীলতা দ্বারা আমাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করুন, তাকওয়ার মাধ্যমে আমাকে সম্মানিত করুন এবং সুস্থতা ও নিরাপত্তার আবরণে আমাকে আবৃত করুন।
৩.
اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট হেদায়েত, তাকওয়া, পবিত্র চরিত্র এবং মানুষের মুখাপেক্ষীহীন (অভাবমুক্ত) জীবন প্রার্থনা করি।
শরীয়তের বিধানকে উপহাস করার পরিণতি:
ইসলামের কোনো বিধান, সুন্নত বা শরীয়তের কোনো নির্দেশ নিয়ে হাসি-ঠাট্টা বা উপহাস করা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। কোনো ব্যক্তি যদি জেনে-শুনে আল্লাহর দ্বীন, তাঁর বিধান বা রাসূল ﷺ-এর সুন্নতকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা উপহাস করে, তবে এটি অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন যে, এ ধরনের উপহাস ঈমানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বীনের প্রতিষ্ঠিত বিষয়কে উপহাস করা কুফরি কাজ। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত শরীয়তের প্রতিটি বিধানের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা এবং কখনোই এগুলো নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা। এসব বিষয় নিয়ে যারা ঠাট্টা বিদ্রুপ করবে তাদের সম্পর্কে ওলামাদের ফতোয়া হল সে জিন্দিক।
শিক্ষা:
১। নিকাহ, তালাক ও গোলাম মুক্তির মতো বিষয় নিয়ে কখনোই হাসি-ঠাট্টা করা উচিত নয়।
২। তালাকের বিধান অত্যন্ত সংবেদনশীল; তাই শরীয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী তা অনুসরণ করতে হবে।
৩। তিন তালাক সম্পূর্ণ হলে পূর্বের দাম্পত্য সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়; এরপর শরীয়তের বিধান অনুযায়ীই পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ায় বিপদ থেকে রক্ষা করেন, অপ্রত্যাশিত রিজিক দান করেন, গুনাহ ক্ষমা করেন এবং আখিরাতে মহান প্রতিদান দান করবেন।
তাকওয়া আল্লাহর এক মহামূল্যবান নেয়ামত। তাই নিয়মিত দোয়া, ইবাদত ও সৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট তাকওয়া প্রার্থনা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।
সংকলন ও পরিমার্জন
আবদুল্লাহ সৈকত
সহকারী অধ্যাপক
খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্মানিত খতিব, কেজির মোড় জামে মাসজিদ, এনায়েতপুর, সিরাজগঞ্জ। উস্তাদের অমূল্য কথা গুলো, জুম্মার বয়ান (খুতবা) এবং তাফসির ক্লাস (দরস) নিয়মিত এইখানে আর্টিকেল আকারে সম্ভব হলে অডিওসহ পাবলিশ করা হয়, ইনশাআল্লাহ। সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্টটি পড়ার সাথে সাথে পুরো অডিও রেকর্ডটি শুনলে সর্বোচ্চ ফায়দা হবে আশা করি, ইনশাআল্লাহ।