তাফসির, সুরা বাকারা, ২:২৪৪-২৪৬, জীবন ও সম্পদের সওদা: জান্নাত লাভের অমোঘ সূত্র এবং কর্জে হাসানা

Copied!

জীবন ও সম্পদের সওদা: জান্নাত লাভের অমোঘ সূত্র এবং কর্জে হাসানা, সূরা আল-বাকারার ২৪৩-২৪৫ আয়াতের দর্পণে এক আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ

নিচে পুরো খুতবার অডিও দেওয়া হলো, সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্টটি পড়ার সাথে সাথে পুরো অডিও রেকর্ডটি শুনলে সর্বোচ্চ ফায়দা হবে আশা করি, ইনশাআল্লাহ।

সম্পূর্ণ ক্লাসের অডিও রেকর্ডিং

সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট: মানুষের ইহকালীন শান্তি এবং পরকালীন মুক্তির মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে দুটি আমানতের সঠিক ব্যবহারের ওপর—একটি তার ‘জীবন’ (জান) এবং অন্যটি তার ‘সম্পদ’ (মাল)। এই জান ও মাল যেমন মানুষকে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, তেমনি এগুলোর অপব্যবহার মানুষকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত করতে পারে। সূরা আল-বাকারার ২৪৩ থেকে ২৪৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাইলের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে মৃত্যুভয়, জিহাদ এবং আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয়ের এক অনন্য দর্শন পেশ করেছেন।

১. কোরআনের ঐশী আহ্বান

মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের সূরা আল-বাকারার এই তিনটি আয়াত মুমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী বার্তা বহন করে:

۞ أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ خَرَجُوا۟ مِن دِيَـٰرِهِمْ وَهُمْ أُلُوفٌ حَذَرَ ٱلْمَوْتِ فَقَالَ لَهُمُ ٱللَّهُ مُوتُوا۟ ثُمَّ أَحْيَـٰهُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَذُو فَضْلٍ عَلَى ٱلنَّاسِ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ ٢٤٣ (আয়াত ২৪৩) “তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, মৃত্যুর বিভীষিকাকে এড়ানোর জন্য যারা নিজেদের গৃহ হতে বহির্গত হয়েছিল? অথচ তারা ছিল বহু সহস্র; তখন আল্লাহ তাদেরকে বললেনঃ তোমরা মর; পুনরায় তিনি তাদেরকে জীবন দান করলেন; নিশ্চয়ই মানবগণের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনা।”
وَقَـٰتِلُوا۟ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱعْلَمُوٓا۟ أَنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌۭ (আয়াত ২৪৪) “তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর এবং জেনে রেখ যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ হচ্ছেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।”

مَّن ذَا ٱلَّذِى يُقْرِضُ ٱللَّهَ قَرْضًا حَسَنًۭا فَيُضَـٰعِفَهُۥ لَهُۥٓ أَضْعَافًۭا كَثِيرَةًۭ ۚ وَٱللَّهُ يَقْبِضُ وَيَبْصُۜطُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ٢٤٥ (আয়াত ২৪৫) “কে সে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণদান করে? অনন্তর তিনি তাকে দ্বিগুণ, বহুগুণ বর্ধিত করেন এবং আল্লাহই (মানুষের আর্থিক অবস্থাকে) কৃচ্ছ বা স্বচ্ছল করে থাকেন এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।”

এই আয়াতগুলোর মূল সুর হলো—মানুষের মৃত্যু নির্ধারিত এবং রিজিক আল্লাহর হাতে; সুতরাং কোনো কিছুর ভয়েই আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

২. আখেরী উম্মাহর ব্যাধি: দুনিয়ার মহব্বত ও মৃত্যুভয়, ‘ওয়াহান’

রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আখেরী যামানার মুসলিম উম্মাহর একটি কঠিন সংকটের কথা হাদীসে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এমন এক সময় আসবে যখন কাফের শক্তিগুলো মুসলমানদের ওপর এভাবে হামলে পড়বে, যেমন ক্ষুধার্ত মানুষ দস্তরখানের খাবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি তখন সংখ্যায় কম হবো?” রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, “না, তোমরা সংখ্যায় অনেক হবে, কিন্তু সমুদ্রের ফেনার মতো তেজহীন হবে।” এর কারণ হিসেবে তিনি ‘ওয়াহান’ (الوهن) নামক একটি রোগের কথা বলেন। সাহাবীরা যখন জানতে চাইলেন ওয়াহান কী, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ “দুনিয়ার মহব্বত এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা।” (আবু দাউদ: ৪২৯৭)

অর্থাৎ যখন মানুষ জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত হবে এবং সম্পদের মায়ায় আল্লাহর পথ ছেড়ে দেবে, তখনই তারা লাঞ্ছিত হবে। এই দুই কারণেই আজ মুসলমানরা সত্যের পথে জান ও মাল কোরবানি করতে ভয় পায়।

৩. জান্নাতের বিনিময়ে জীবন ও সম্পদের ক্রয়-বিক্রয়

মুমিনের জীবন ও সম্পদ আসলে তার নিজের নয়, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। সূরা আত-তাওবাহ-র ১১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ
لَهُمُ الْجَنَّةَ “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে
নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে।”

জান্নাত পেতে হলে এই সওদা বা লেনদেন সম্পন্ন করতে হবে। জান্নাতের প্রতিটি বাড়ি
মানুষের জন্য বরাদ্দ আছে, কিন্তু তার মূল্য পরিশোধ করতে হবে জীবন ও সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে।

৪. মৃত্যুভয় ও বনী ইসরাইলের সেই জনপদ

সূরা বাকারার ২৪৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ একটি ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। বনী ইসরাইলের একটি জনপদে যখন মহামারি (তাউন) ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ মৃত্যুর ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা ভেবেছিল শহর ত্যাগ করলেই বুঝি মৃত্যু
থেকে বাঁচা যাবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের অহংকার চূর্ণ করার জন্য একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা জনপদের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে এক বিকট চিৎকার দিলেন। সেই এক চিৎকারে ৩০ হাজার মানুষ ও তাদের গবাদিপশু মুহূর্তেই প্রাণ হারালো।

তাদের দেহগুলো পচে হাড়গোড়ে পরিণত হয়েছিল। দীর্ঘকাল পর সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় হযরত হিজকিল আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। আল্লাহ তায়ালা তাদের হাড়গুলোকে জোড়া লাগিয়ে পুনরায় জীবিত করলেন। জীবিত হওয়ার পর তারা শুকরিয়া স্বরূপ যে বাক্যটি উচ্চারণ করেছিল, তা হলো:

سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র,আপনারই প্রশংসা, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।”

মহামারি নিয়ে ইসলামের বিধান ও হযরত উমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু: এই আয়াতের শিক্ষার প্রতিফলন ঘটে হযরত উমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর একটি সিদ্ধান্তে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, যে বস্তিতে মহামারি ছড়িয়ে পড়বে সেখান থেকে অন্যত্র চলে যাওয়া নিষেধ এবং যারা বাইরে থাকবে তারাও ওই নগরীতে প্রবেশ করবে না। হযরত উমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর খেলাফতকালে যখন সিরিয়ায় (শাম দেশে) মহামারি দেখা দিল, সে সময় তিনি মদিনা থেকে শামের উদ্দেশ্যে সফরে ছিলেন। রাস্তার মধ্যে মহামারির খবর পেয়ে তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন। এমতাবস্থায় হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তিনি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস শুনিয়ে বলেন— “যেখানে মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে, সেখান থেকে কেউ পালিয়ে যাবে না এবং যারা বাইরে আছে তারা ওই এলাকায় প্রবেশ করবে না।” এই অকাট্য বিধান শুনে হযরত উমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সফর স্থগিত করে মদিনায় ফিরে আসলেন। এটিই প্রমাণ করে যে, মৃত্যু থেকে পলায়ন নয়, বরং আল্লাহর ফয়সালা মেনে নেওয়াই মুমিনের কাজ।

এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো জায়গা নেই। যেখানেই থাকা হোক না কেন, নির্ধারিত সময়ে মৃত্যু আসবেই।

৫. জিহাদ এবং তাকদীরের বিধান

আয়াত ২৪৪-এ আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন— وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ (আল্লাহর পথে
লড়াই করো)। অনেকে মনে করে জিহাদে গেলে বুঝি মৃত্যু তাড়াতাড়ি আসবে। কিন্তু আল্লাহ দেখাচ্ছেন, যারা মৃত্যুর ভয়ে পালিয়েছিল তারা ঘরেই মারা গেছে।

তাকদীর দুই প্রকার—
তাকদীরে মুবরাম (অকাট্য) এবং তাকদীরে মুয়াল্লাক (ঝুলন্ত)। মৃত্যু একটি
নির্ধারিত বিষয়, যা কোনোভাবেই বিলম্বিত হয় না।

হুজুর এখানে তাবুক যুদ্ধের উদাহরণ টেনেছেন। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এই কঠিন যুদ্ধের ডাক দিলেন, তখন তিনজন সাহাবী— কাব ইবনে মালেক, হেলাল ইবনে উমাইয়া এবং মুরারা ইবনে রবী রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুম— অলসতাবশত ঘরে থেকে গিয়েছিলেন। তারা মুনাফিক ছিলেন না, কিন্তু এই অবহেলার কারণে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে ৫০ দিন কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এমনকি তাদের স্ত্রীদেরও আলাদা থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। জিহাদের ডাক আসলে ঘরে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

৬. করজে হাসানা: আল্লাহর রাজকীয় প্রস্তাব

আয়াত ২৪৫-এ আল্লাহ সম্পদের বিনিয়োগ নিয়ে কথা বলেছেন— مَّن ذَا الَّذِي يُقْرِضُ
اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا (কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে?)। মহাবিশ্বের মালিক
হয়েও কেন তিনি ঋণ চান? মুফাসসিরীনগণ বলেন, এটি বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা ও সান্ত্বনা। যেমন বাবা তার ছোট শিশুকে নিয়ে বাজারে গেলে শিশুটি যখন বাজারের ব্যাগ ধরতে চায়, বাবা ব্যাগটি শিশুর হাতে দিয়ে নিজেও ধরে রাখেন এবং সবাইকে বলেন “আমার ছেলে বাজার করে আনছে।” এতে শিশুটি আনন্দ পায়। ঠিক তেমনি, সব সম্পদের মালিক আল্লাহ
হওয়া সত্ত্বেও তিনি যখন বান্দার কাছে ঋণ চান, তখন বান্দা সম্মানিত বোধ করে।

করযে হাসানার আরেকটি সূক্ষ্ম হিকমত হলো—ঋণ হিসেবে যা দেওয়া হয়, মূলত সেটিই হুবহু ফেরত পাওয়া যায়। অর্থাৎ যে সম্পদ, যে পরিমাণে এবং যে অবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়, তা যেন আল্লাহ তা‘আলা নিজ দায়িত্বে সংরক্ষণ করে রাখেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ যেন তাঁর বান্দাকে আশ্বস্ত করে বলেন, “তুমি আমার পথে যা দেবে, আমি তা তোমার জন্য সংরক্ষণ করে রাখব এবং যথাসময়ে তা তোমাকে ফিরিয়ে দেব। শুধু তাই নয়, আমি আমার শান ও মহিমার উপযোগী করে তাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রতিদান দেব।”

এ কারণেই আল্লাহ তাআলা ‘সদকা’ বা ‘দান’ শব্দের পরিবর্তে ‘কর্জে হাসানা’ (উত্তম ঋণ) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কারণ, ঋণের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই হলো—তা ফেরত দেওয়া হয়। আর যখন ঋণগ্রহীতা স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামীন, তখন সেই প্রতিদান শুধু সমপরিমাণেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তাঁর অসীম অনুগ্রহে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে বান্দার নিকট ফিরে আসে।

আবু দাহদাহ রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর অনন্য দান: এই আয়াত শুনে হযরত আবু দাহদাহ রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু নবীজিকে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দুটি খেজুর বাগান আছে। একটি বাগান আমি কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহকে করজে হাসানা দিয়ে দিলাম।” সেই বাগানে ৬০০ খেজুর গাছ ছিল। তিনি দৌড়ে বাগানে
গিয়ে তার স্ত্রীকে ডাক দিয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি বের হও, আমি এই বাগান জান্নাতের বিনিময়ে আল্লাহকে ঋণ দিয়ে দিয়েছি।”

৭. ঋণের মহিমা ও সামাজিক শিক্ষা

হুজুর উল্লেখ করেন যে, মেরাজকালীন রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

الصَّدَقَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا وَالْقَرْضُ بِثَمَانِيَةَ عَشَرَ “সাদাকাহ বা দানের সওয়াব ১০ গুণ, কিন্তু ঋণ দেওয়ার সওয়াব ১৮ গুণ।”

হুজুর এখানে সমাজের এক রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেন যে, আমরা ‘কাক’ (কাউয়া)-এর মতো কৃতজ্ঞতাহীন হয়ে গেছি। কাউয়া খাওয়ার পর যেমন ঠোঁট মুছে ফেলে, আমরাও উপকার পাওয়ার পর কৃতজ্ঞতা জানাই না। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللَّهَ“যে মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।”

৭. রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ইহুদি পাওনাদারের কাহিনী


আজকাল মানুষ কর্জ নিলে দিতে চায় না। অথচ রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে ব্যক্তি তার ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে উত্তম আচরণ করেন। ‘খাইরুকুম খাইরুকুম মিন কাজায়া’— তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে ব্যক্তি ঋণের ব্যাপারে উত্তম।

এজন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইহুদি থেকে কিছু ধার নিয়েছিলেন। সময় আসার আগেই ইহুদি ঐ ধার চেয়ে বসলেন। এমনকি বকাঝকা করলেন। হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু উত্তেজিত হয়ে তাকে তিনি বকাঝকা করলেন।

আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— ‘ওমর, তুমি তাকে বকাঝকা করলে কেন? তার অধিকার আছে চাওয়ার। যদিও সময় আসার আগেই চেয়ে ফেলছে।’

তো হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণ তো দিলেনই দিলেনই, বরঞ্চ হযরত ওমরকে বললেন যে— ২০ ছা খেজুর অর্থাৎ ৭০ কেজি, প্রায় ৭০ কেজি খেজুর বেশি দিয়ে দিলেন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এটা ঋণের ব্যাপারে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।”

৯. অলৌকিক প্রতিদান: লোকমার বদলে লোকমা

হুজুর আলোচনার শেষে একটি হৃদয়স্পর্শী কাহিনী শোনান। বনী ইসরাইলের এক মহিলা লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে এক ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে নিজের একমাত্র রুটিটি দান করে দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর একটি নেকড়ে এসে তার কোলের শিশুটিকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। মহিলাটি যখন
হাহাকার করছিলেন, তখন আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করলেন। ফেরেশতা বললেন, “মা! আপনার সেই দান করা রুটির লোকমাটি যেমন আল্লাহর কাছে পৌঁছেছিল, আল্লাহ
তার বদলে বাঘের মুখ থেকে আপনার কলিজার লোকমাটিকে (সন্তান) ফিরিয়ে দিলেন।”

সারকথা: আল্লাহ তায়ালা সম্পদ সংকুচিত করেন এবং প্রশস্ত করেন— وَاللَّهُ يَقْبِضُ
وَيَبْسُطُ। তাঁর পথে জীবন ও সম্পদ ব্যয় করলে তা কখনো হারায় না, বরং বহুগুণ হয়ে ফিরে আসে। সবশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে— وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (তোমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাবে)। মৃত্যু অনিবার্য, তাই সম্পদ ও জীবন আল্লাহর পথেই উৎসর্গ করা
বুদ্ধিমানের কাজ।

রেফারেন্সসমূহ:

  • সূরা আল-বাকারাহ: ২৪৩-২৪৫
  • সূরা আত-তাওবাহ: ১১১ (জীবন ও সম্পদের লেনদেন)
  • সুনানে আবু দাউদ: ৪২৯৭ (ওয়াহান-এর হাদীস)
  • সূরা আল-মাউন (তুচ্ছ সাহায্য অস্বীকারকারীদের পরিণতি)
  • তাফসীরে ফাতহুল বারী (জিহাদ ও শাহাদাতের ঘটনা)

─ সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট এবং পরিমার্জনে, মোহাম্মদ কাউছার আহমাদ সম্রাট, KYA-21, খাঁজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *