জুম্মার বয়ান/খুতবা, ৩০ সফর ১৪৪৮ হিজরি, আলোচ্য বিষয়: নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আগমন: জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে হেদায়েতের আলোয় এক মহাবিপ্লব

Estimated reading time: 6 minutes
Article views: 55

নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আগমন: জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে হেদায়েতের আলোয় এক মহাবিপ্লব

নিচে পুরো খুতবার অডিও দেওয়া হলো, সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্টটি পড়ার সাথে সাথে পুরো অডিও রেকর্ডটি শুনলে সর্বোচ্চ ফায়দা হবে আশা করি, ইনশাআল্লাহ।

সম্পূর্ণ খুতবার অডিও রেকর্ডিং

সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট:

ভূমিকা:

الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه، ونعوذ بالله من شرور
أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له ومن يضلله فلا هادي له، ونشهد
أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، ونشهد أن سيدنا ونبينا وشفيعنا وحبيبنا
وطبيبنا وطبيب قلوبنا ومولانا محمداً عبده ورسوله، صلى الله تعالى عليه وعلى آله
وأصحابه وبارك وسلم تسليماً كثيراً كثيراً. أما بعد: فاعوذ بالله من الشيطان
الرجيم، بسم الله الرحمن الرحيم:

﴿لَقَدۡ جَآءَكُمۡ رَسُولٞ مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ عَزِيزٌ عَلَيۡهِ مَا عَنِتُّمۡ
حَرِيصٌ عَلَيۡكُم بِالۡمُؤۡمِنِينَ رَءُوفٞ رَّحِيمٞ﴾

বাংলা অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল এসেছেন; তোমাদের যে কোনো কষ্ট তাঁর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত দয়াবান ও পরম করুণাময়।” (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২৮)

صدق الله مولانا العظيم، وصدق رسوله النبي الكريم، ونحن على ذلك من الشاهدين
والشاكرين، والحمد لله رب العالمين. سبحانك لا علم لنا إلا ما علمتنا، إنك أنت
العليم الحكيم.

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা
আমাদের জুমার নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে আগেভাগে আসার তৌফিক দান করেছেন। সুস্থ
রেখেছেন, ঈমানের সাথে রেখেছেন—সেজন্য সবাই অন্তর থেকে শুকরিয়া আদায় করি, আলহামদুলিল্লাহ।

আজ সফর মাসের ৩০ তারিখ। আগামীকাল পহেলা রবিউল আউয়াল। রবিউল আউয়াল মাস নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের পৃথিবীতে আগমনের মাস। আবার এই মাসেই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। মুমিন যখন নবীর সীরাত শোনে, নবীর কথা শোনে, তখন তার ঈমান জাগ্রত হয়। ঠিক
যেমন একটি অনাবাদী জমিতে খরা লেগে যখন মাটি চৌচির হয়ে যায়, তখন আসমান থেকে বৃষ্টি
বর্ষিত হলে সেই জমি যেমন আবার সবুজ ও সতেজ হয়ে ওঠে, তেমনি মুমিন যখন নবীর সীরাতের
কথা শোনে, তার অন্তরের ভেতর এক নতুন প্রেরণা সৃষ্টি হয়।

নবী আগমনের আবশ্যকতা: কিতাবুল্লাহ ও রিজালুল্লাহ

মানুষ যেন তার স্রষ্টাকে, তার রবকে চিনতে পারে, সেজন্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানবজাতির জন্য দুটি জিনিস দিয়েছেন। একটি হলো ‘কিতাবুল্লাহ’ (আল্লাহর কিতাব), আর দ্বিতীয়টি হলো
‘রিজালুল্লাহ’ (আল্লাহর পাঠানো পয়গম্বর বা মানুষ)। প্রত্যেক যুগে মানুষকে আল্লাহকে চেনানোর জন্য একদিকে যেমন কিতাব এসেছে, তেমনি সেই কিতাবকে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন।

এভাবে পর্যায়ক্রমে হযরত আদম আলাইহিস সালাম, হযরত শীষ আলাইহিস সালাম, হযরত নূহ আলাইহিস সালাম, হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম, হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম, হযরত মুসা আলাইহিস সালাম, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-সহ অসংখ্য নবী ও রাসূল
পৃথিবীতে এসেছেন। কিন্তু হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-কে আসমানে তুলে নেওয়ার পর থেকে নবী
মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এক দীর্ঘ সময় পৃথিবীতে কোনো নবীর আগমন
ঘটেনি। এই দীর্ঘ সময়কাল ছিল ঘোর অন্ধকারের সময়। নবীর আগমন না ঘটলে মানুষের অবস্থা
কেমন হয়, তারা তাদের স্রষ্টাকে ভুলে কতটা বর্বর হয়ে উঠতে পারে—সেটি তৎকালীন পৃথিবীর
ইতিহাসের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নবী (ﷺ)-এর আগমনের পূর্বে সমাজ ও রাষ্ট্রের অবস্থা কেমন ছিল এবং কেন একজন নবীর
প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল, সেই বর্বরতার রূপরেখা আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব, ইনশাআল্লাহ।

মূর্তিপূজা ও শিরকের বিস্তার

জাহেলিয়াতের যুগের প্রথম ও প্রধানতম বর্বরতা ছিল মূর্তিপূজা ও শিরক। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম
পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে মানুষ হেদায়েতের পথ ভুলে বিপথগামী হতে থাকে।
আমর বিন লুহাই (Amr bin Luhay) নামক এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম আরবে মূর্তিপূজার প্রচলন
করে। সে সিরিয়া (শাম) সফরে গিয়ে দেখল সেখানে ‘কওমে আমালেক’ মূর্তিপূজা করছে। সে
তাদের কাছে গিয়ে বলল, “আমরা মক্কার মানুষ তো কোনো খোদাকে দেখি না, তোমাদের কাছে যদি
কোনো খোদা থাকে তবে আমাদের একটি দাও।” তারা তাকে ‘হুবাল’ নামক একটি মূর্তি দিল। সে
সেটি নিয়ে মক্কায় ফিরে এল এবং মক্কার মানুষের মধ্যে মূর্তিপূজার সূচনা করল।

মূর্তিপূজা করতে করতে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, আল্লাহ পাক যে ঘরটি শুধুমাত্র
তাঁর ইবাদতের জন্য তৈরি করেছিলেন—সেই বাইতুল্লাহর ভেতরেও তারা ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন
করেছিল। তারা বিশ্বাস করত এই মূর্তিগুলোই তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। তারা এতটাই অন্ধ বিশ্বাসী হয়ে গিয়েছিল যে, বাইতুল্লাহ তওয়াফ করার সময় তাদের মনে হতো এই পোশাক পড়ে তারা গুনাহ করেছে, নাফরমানি করেছে, তাই এই পোশাক পড়ে আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করা
সম্ভব নয়। তারা কি করত? তারা উলঙ্গ হয়ে উলঙ্গ অবস্থায় বাইতুল্লাহ তওয়াফ করত। চিন্তা
করুন, জাহেলিয়াত কোন স্তরে পৌঁছেছিল!

এই অবস্থায় নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম পৃথিবীতে আগমন করলেন এবং ঘোষণা করলেন,
“আমি মানুষকে মানুষের বানানো রবের গোলামি থেকে মুক্ত করে মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর গোলামির দিকে নিয়ে আসার জন্য এসেছি।” তিনি তেরোটি বছর মেহনত করে এই মূর্তিপূজার অবসান ঘটালেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি হযরত ওসমান ইবনে তালহা রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর কাছ থেকে চাবি নিয়ে কাবা ঘরের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং সকল মূর্তি ভেঙে কাবার ভেতরটা জমজমের পবিত্র পানি দিয়ে পরিষ্কার করলেন। সেদিন তিনি ঘোষণা করলেন:

﴿وَقُلۡ جَآءَ ٱلۡحَقُّ وَزَهَقَ ٱلۡبَٰطِلُۚ إِنَّ ٱلۡبَٰطِلَ كَانَ زَهُوقٗا﴾

অর্থ: “আর আপনি বলুন, ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়’।” (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮১)

কন্যা সন্তান হত্যা ও সামাজিক নিষ্ঠুরতা

জাহেলিয়াতের যুগের দ্বিতীয় বড় বর্বরতা ছিল কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া। তৎকালীন আরবদের কাছে কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করা ছিল অপমানজনক ও লজ্জার বিষয়। তারা মনে করত, আমার মেয়ে বড় হয়ে অন্য পুরুষের কাছে থাকবে, এটি তাদের বংশীয় মর্যাদায় আঘাত করে। তাই তারা কন্যা সন্তান হওয়া মাত্রই তাকে হত্যা করে ফেলত।

কয়েকজন সাহাবীর জাহেলিয়াতের জীবনের কিছু মর্মান্তিক বর্ণনা দেখুন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর পিতা কুহাফা মূর্তিপূজারি ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর যখন প্রসব বেদনা শুরু হতো, তখন তাকে মূর্তির ঘরে নিয়ে যাওয়া হতো এই বিশ্বাসে যে, সেখানে গেলে কষ্ট কম হবে।

একজন সাহাবী নবী (ﷺ)-এর দরবারে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার আটটি কলিজার
টুকরা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত মাটি চাপা দিয়েছি।” নবী (ﷺ) তাকে বললেন, “জাহেলিয়াতের
যুগে যা করেছ, সেজন্য আটটি গোলাম আজাদ করে দাও।” কিয়ামতের দিন যখন এই ছোট বাচ্চাদের
বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে:

﴿وَإِذَا ٱلۡمَوۡءُۥدَةُ سُئِلَتۡ * بِأَيِّ ذَنۢبٖ قُتِلَتۡ﴾

অর্থ: “এবং যখন জীবন্ত কবরস্থ কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে—কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” (সূরা আত-তাকভীর, আয়াত: ৮-৯)

একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা বর্ণনা দেখুন। একজন সাহাবী কাঁদতে কাঁদতে নবী (ﷺ)-এর কাছে নিজের একটি অপরাধের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার স্ত্রী যখন গর্ভবতী, তখন আমি সফরে গিয়েছিলাম। কয়েক বছর পর ফিরে এসে দেখি আমার ঘরে একটি সুন্দরী মেয়ে। আমি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, এই মেয়েটি কার? স্ত্রী বলল, পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর। কিন্তু মেয়েটি যখন আমাকে আব্বু বলে ডাকল, তখন আমি বুঝতে পারলাম এটি আমারই মেয়ে। আমি পরদিন মেয়েটিকে সাজিয়ে গুছিয়ে বললাম, চলো বেড়াতে যাই। মরুভূমিতে নিয়ে গিয়ে আমি একটি গর্ত খুঁড়তে লাগলাম। মেয়েটি বুঝতে পারেনি তার বাবা তার জন্য কবর খুঁড়ছে। সে হাসিমুখে আমাকে গর্ত খুঁড়তে সাহায্য করছিল। এরপর
আমি তাকে গর্তের ভেতর নামিয়ে তার ওপর মাটি চাপা দিতে লাগলাম। মেয়েটি চিৎকার করে
কাঁদছিল আর বলছিল—আব্বু, তুমি আমার সাথে একি করছ! এক পর্যায়ে কবরের মাটি খুঁড়ে সে
আমার গায়ের ধুলোবালি ঝেড়ে দিচ্ছিল আর আব্বু আব্বু বলে ডাকছিল।”

এই কাহিনী শোনার পর নবী (ﷺ)-এর চক্ষু দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ছিল। তিনি এতটাই
ব্যথিত হলেন যে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, তুমি এ কাজ করতে পারলে? এইসবই ছিল জাহেলিয়াতের নিষ্ঠুরতা।

বর্তমান সময়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে শুধু
মেয়ে বাচ্চা হওয়ার কারণে গর্ভেই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে এমন সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ। অর্থাৎ জাহেলিয়াতের সেই বর্বরতা আজও ভিন্ন রূপে টিকে আছে।

অর্থনৈতিক শোষণ: সুদ (Riba)

তৎকালীন সমাজে সুদের কারবার ছিল ব্যাপক। মানুষ একে অপরের রক্ত চুষে খেত। নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম পৃথিবীতে আগমন করে ঘোষণা করলেন:

﴿وَأَحَلَّ ٱللَّهُ ٱلۡبَيۡعَ وَحَرَّمَ ٱلرِّبَوٰاْ﴾

অর্থ: “অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৭৫)

নবী (ﷺ) তাঁর বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, জাহেলিয়াতের সকল সুদের কারবার আমি
আমার পদতলে পিষ্ট করলাম। সর্বপ্রথম আমার চাচা আব্বাসের পাওনা সুদ আমি মাফ করে দিলাম। এর মাধ্যমে তিনি এক শোষণমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন।

মদ ও নেশার দাপট

জাহেলিয়াতের যুগে মদ পান ছিল অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। তাদের মেহমানদারির মেন্যুতে মদ
না থাকলে সেটা অসম্পূর্ণ মনে করা হতো। হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর মতো বড় সাহাবীও এক সময় এর সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি একবার এক মজলিসে উপস্থিত ছিলেন যেখানে
মদ্যপান চলছিল। সেখানে ঝগড়া লেগে উটের হাড় দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করা হয়েছিল। এরপরই আল্লাহ তাআলা চূড়ান্তভাবে মদ হারাম ঘোষণা করে আয়াত নাজিল করেন।

হযরত উমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর পরিবর্তন: একটি অনন্য উদাহরণ

হযরত উমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর চরিত্রের পরিবর্তনই ইসলামের বিপ্লব বোঝার জন্য যথেষ্ট।
জাহেলিয়াতের যুগে তিনি এতটাই কঠোর ছিলেন যে মানুষ ভয় পেত। তিনি নিজেই বলেছিলেন,
জাহেলিয়াতের যুগে আমি একসাথে দশটি মেয়ে বাচ্চাকে জীবন্ত মাটি চাপা দিয়েছি, এক গ্লাস
পানিরও প্রয়োজন মনে করিনি। সেই উমর যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তাঁর অন্তর নবীর পরশে
এতটাই নরম হয়ে গেল যে, পরবর্তীতে তিনি যখন খলিফা হলেন, তিনি বলতেন—ফোরাত নদীর কূলে
যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তবে তার জন্য কিয়ামতের দিন আমাকে আল্লাহর কাছে
জবাবদিহি করতে হবে। এই দরদ, এই ভালোবাসা নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর উম্মতের হৃদয়ে রোপণ
করেছিলে

বাদশা নাজ্জাশীর দরবারে হযরত জাফর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর ভাষণ

ইসলামের প্রথম যুগে যখন কাফেরদের অত্যাচারে মুসলমানরা অতিষ্ঠ হয়ে আবিসিনিয়ায়
(হাবশা) হিজরত করলেন, তখন মক্কার কাফেররা সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়ে সম্রাট নাজ্জাশীর
কাছে নালিশ করল যে, এরা পলায়নকারী এবং এদের আমাদের হাতে তুলে দিন। তখন নাজ্জাশী
মুসলমানদের ডাকলেন এবং হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন:

أَيُّهَا الْمَلِكُ، كُنَّا قَوْمًا أَهْلَ جَاهِلِيَّةٍ، نَعْبُدُ الْأَصْنَامَ، وَنَأْكُلُ الْمَيْتَةَ، وَنَأْتِي الْفَوَاحِشَ، وَنَقْطَعُ الْأَرْحَامَ، وَنُسِيءُ الْجِوَارَ، وَيَأْكُلُ الْقَوِيُّ مِنَّا الضَّعِيفَ، فَكُنَّا عَلَى ذَلِكَ حَتَّى بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْنَا رَسُولًا مِنَّا.

অর্থ: “হে সম্রাট! আমরা ছিলাম জাহিলিয়াতের যুগের একটি জাতি। আমরা মূর্তিপূজা করতাম, মৃত প্রাণীর গোশত খেতাম, অশ্লীল কাজ করতাম, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতাম এবং আমাদের মধ্যকার শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বলকে গ্রাস করত। আমরা এই অবস্থার ওপরই ছিলাম, অবশেষে আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে আমাদের কাছে একজন রাসূল পাঠালেন।”

হযরত জাফর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর এই সত্যনিষ্ঠ ভাষণ শুনে নাজ্জাশী মুসলমানদের আশ্রয় দিলেন এবং কাফেরদের প্রতিনিধিরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল।

উপসংহার

নবী (ﷺ)-এর আগমনে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসা।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এরশাদ করেন:

﴿الٓرۚ كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ إِلَيۡكَ لِتُخۡرِجَ ٱلنَّاسَ مِنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى
ٱلنُّورِ﴾

অর্থ: “আলিফ-লাম-র; এটি এমন এক কিতাব যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে তাদের রবের নির্দেশক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন।” (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ১)

আগামীকাল পহেলা রবিউল আউয়াল। আসুন, আমরা আমাদের জীবনে নবীর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরি।
সমাজ থেকে জাহেলিয়াতের সকল অন্ধকার দূর করে ইসলামের সুমহান আলোয় নিজেদের আলোকিত
করি।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন। ওয়ামা তাওফিকি
ইল্লা বিল্লাহ।

ওয়া আখিরু দাওয়াহুম আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

তথ্যসূত্র (References)

কুরআন মাজীদ:

  • সূরা আত-তাওবাহ: ১২৮
  • সূরা আল-ইসরা: ৮১
  • সূরা আত-তাকভীর: ৮-৯
  • সূরা আল-ইসরা: ৮১
  • সূরা ইব্রাহিম: ১
  • সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৫

হাদীস ও সীরাত:

  • মূর্তিপূজা: সীরাতে ইবনে হিশাম (আমর বিন লুহাই এর কাহিনী)।
  • মক্কা বিজয় ও মূর্তি ধ্বংস: সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং ৪২৮৭।
  • সুদ হারাম: বিদায় হজের ভাষণ (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮)।
  • নাজাশির দরবারে ভাষণ: মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৭৪০।
  • মদ হারাম: সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৪৮।

─ সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট by মোহাম্মদ কাউছার আহমাদ সম্রাট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top