
নিচে পুরো ক্লাস/দরসের অডিও দেওয়া হলো, সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্টটি পড়ার সাথে সাথে পুরো অডিও রেকর্ডটি শুনলে সর্বোচ্চ ফায়দা হবে আশা করি, ইনশাআল্লাহ।
সম্পূর্ণ ক্লাসের অডিও রেকর্ডিং
সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট:
ভূমিকা:
আলোচনার শুরুতে সূরা বাকারার ২৪৬ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়েছে। এখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বনী ইসরাঈলের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যা হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর ইন্তেকালের পরবর্তী সময়ের। এই ঘটনার মাধ্যমে মুমিনদের জন্য ধৈর্য, বীরত্ব এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকার গভীর শিক্ষা রয়েছে।
১. বনী ইসরাঈলের সংকট ও একজন বাদশাহর আবেদন:
হযরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন বনী ইসরাঈলকে ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করলেন, তার অনেক
বছর পরের কথা। আমালেকা সম্প্রদায় বনী ইসরাঈলদের ওপর চড়াও হয় এবং বায়তুল মুকাদ্দাস
দখল করে নেয়। বনী ইসরাঈলরা তখন পর্যুদস্ত। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর ইন্তেকালের পর আল্লাহ তাআলা হযরত ইউশা ইবনে নূন আলাইহিস সালাম-কে নবী করেন। তার ইন্তেকালের পর
প্রায় তিনশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা হযরত শামবীল আলাইহিস সালাম-কে নবী
হিসেবে পাঠালেন।
বনী ইসরাঈলরা তাদের নবীর কাছে গিয়ে আবেদন করল, “আমাদের জন্য একজন বাদশাহ নিযুক্ত
করে দিন, যার নেতৃত্বে আমরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করব।” তারা আমালেকাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল। কিন্তু হযরত শামবীল আলাইহিস সালাম তাদের স্বভাব জানতেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “এমন কি হতে পারে যে, তোমাদের ওপর যুদ্ধ ফরজ করা হলো আর তোমরা যুদ্ধ করলে
না?”
বনী ইসরাঈলরা উত্তর দিল, “আমাদের কী হয়েছে যে আমরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করব না? অথচ আমাদের নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।” অর্থাৎ তারা যুদ্ধের জন্য খুব সংকল্পবদ্ধ দেখাল। কিন্তু
ইতিহাসের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
[সম্পাদকীয় নোট: হুজুর এখানে আমালেকা সম্প্রদায়ের বায়তুল মুকাদ্দাস দখলের কথা উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিকভাবে বায়তুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিন অঞ্চলে বনী ইসরাঈল ও বিভিন্ন মুশরিক গোত্র যেমন আমালেকাইটদের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাত ছিল।]
২. তালুতের নেতৃত্ব ও বনী ইসরাঈলের হীনম্মন্যতা:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের দোয়া কবুল করলেন এবং হযরত শামবীল আলাইহিস
সালাম-এর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, আল্লাহ তাআলা ‘তালুত’-কে তোমাদের বাদশাহ নিযুক্ত করেছেন।
তালুত কোনো রাজবংশের লোক ছিলেন না, এমনকি তিনি খুব ধনীও ছিলেন না। তিনি ছিলেন সাধারণ একজন মানুষ। বনী ইসরাঈলরা তখনই আপত্তি তুলল। তারা বলল, “তার রাজত্ব আমাদের
ওপর কীভাবে হতে পারে? রাজত্বের হকদার তো আমরাই বেশি। কারণ তার তো পর্যাপ্ত ধন-সম্পদও নেই।”
তখন নবী শামবীল আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর দিলেন: ﴿قَالَ إِنَّ
ٱللَّهَ ٱصۡطَفَىٰهُ عَلَيۡكُمۡ وَزَادَهُۥ بَسۡطَةٗ فِي ٱلۡعِلۡمِ وَٱلۡجِسۡمِۖ
وَٱللَّهُ يُؤۡتِي مُلۡكَهُۥ مَن يَشَآءُۚ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ﴾ অর্থ:
“নবী বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে তোমাদের ওপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে জ্ঞানে ও দেহে
প্রাচুর্য দান করেছেন। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নিজের রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।” (সূরা বাকারা: ২৪৭)
এখানে নেতৃত্বের জন্য দুটি বড় গুণ বলা হয়েছে—‘ইলম’ (জ্ঞান) এবং ‘জিসম’ (শারীরিক সক্ষমতা ও বীরত্ব)। আভিজাত্য বা কাড়ি কাড়ি টাকা নেতৃত্বের মূল মাপকাঠি নয়।
৩. অন্তরের প্রশস্ততা ও আদব: একটি আধ্যাত্মিক শিক্ষা:
হুজুর এখানে তালুতের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার আলোচনার প্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও গল্প বর্ণনা করেন। মুফতি শফী রহমাতুল্লাহি
আলাইহি-এর একটি ঘটনা তিনি উল্লেখ করেন। মুফতি শফী রহমাতুল্লাহি আলাইহি নবী আলাইহিস সালাম-কে স্বপ্নে দেখার খুব বেশি খাহেশ (আকাঙ্ক্ষা) করতেন না। কেন করতেন না? কারণ একজন মুমিন যদি সারা জীবন নবীকে স্বপ্নে নাও দেখে, তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে সে খারাপ কিছু নয়। কিন্তু নবীকে স্বপ্নে দেখার পর যদি স্বপ্নে কোনো বেয়াদবি হয়ে যায় বা কোনো ভুল অবস্থায় তাঁকে দেখা হয়, তবে সেটা ঈমানের জন্য আশঙ্কার কারণ হতে পারে।
হুজুর এখানে কওমি মাদ্রাসায় পড়ানো ‘শরহুল আকায়েদ’ কিতাবের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘নিবরাস’-এর বরাত দিয়ে বলেন, যদি কেউ নবী আলাইহিস সালাম-কে মৃত অবস্থায় দেখে (নাউযুবিল্লাহ), তবে বুঝতে হবে তার ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে। তাই সাহাবীদের আদব ও
মহব্বতের গভীরতা ছিল অন্য স্তরের।
সাহাবীদের আদবের কয়েকটি উদাহরণ:
একবার মসজিদে নববীতে নবী আলাইহিস সালাম দেখলেন একজন সাহাবী ঘুমাচ্ছেন। তিনি হযরত আলী রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-কে বললেন, “আলী, ওনাকে
জাগিয়ে দাও, নামাজের ওয়াক্ত হয়েছে।” আলী রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন,
“ইয়া রাসূলাল্লাহ, মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকার হক তো আপনারই বেশি, আমাকে কেন বললেন?” নবীজি ﷺ বললেন, “সে তো ঘুমাচ্ছে। তার রুহ তো এখন শরীরের বাইরে। হতে পারে আমি জাগালে ঘুমের ঘোরে সে এমন কিছু বলে ফেলবে যা কুফরি হয়ে যাবে। আর নবীকে কুফরি কথা বলা মানে ঈমান হারানো। কিন্তু সে যদি তোমাকে কিছু বলে, তবে সেটা কুফরি হবে না।”
সুবহানাল্লাহ! নবীজি ﷺ সাহাবীদের ঈমান রক্ষায় কতটা সচেতন ছিলেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর জীবনের ঈমানদীপ্ত সবক ও অনন্য আদব:
হুজুর বনী ইসরাঈলের এই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মুমিনদের চরিত্র গঠনের জন্য উম্মতের
শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর জীবনের কয়েকটি
অবিস্মরণীয় ঘটনা ও তাঁর অনন্য শিষ্টাচার (আদব) বর্ণনা করেছেন।
১. পরকালের জবাবদিহিতার ভয় ও বিনয়: আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর অন্তরে
আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া ছিল পর্বতসম। তিনি মাঝে মাঝে নিজের জিহ্বা টেনে বের করে বলতেন, “হে জিহ্বা! না জানি তোমার কারণে আমার পরকালে কী বিপদ হয়ে যায়!” এমনকি তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, “হায় আফসোস! আমি যদি একটি চড়ুই পাখি হয়ে যেতাম! তবে স্বাধীনতার সাথে উড়ে বেড়াতাম, খাইতাম-দাইতাম, আর মউতের পর আমার কোনো হিসাব হতো না।” এটি ছিল আল্লাহর প্রতি তাঁর গভীর খুশুখুজু ও বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ।
২. গুহার তিন রাতের মর্যাদা ও হযরত উমরের রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর আরজি: সিদ্দীক-এ-আকবরের মাকাম বা মর্যাদা সাহাবীদের কাছে কেমন ছিল, তা হযরত উমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর একটি আরজি থেকে বোঝা যায়। তিনি একবার আরজি পেশ করেছিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার সারা জীবনের সব আমল আবু বকরকে দিয়ে দিলাম, বিনিময়ে হিজরতের সময় গুহায় আপনার সাথে কাটানো তাঁর সেই তিন রাতের আমলটুকু আমাকে দিয়ে দিতে বলেন।” উমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু মনে করতেন, নবীজির বিপদের সময়ে আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর সেই সঙ্গদানের মর্যাদা তাঁর সারা জীবনের ইবাদতের চেয়েও বহুগুণ বেশি।
৩. তাবুকের যুদ্ধে দানের অনন্য শিষ্টাচার: গাজওয়ায়ে তাবুকের সময় আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাঁর ঘরের সবকিছু নিয়ে হাজির হলেন। তিনি নবীজি ﷺ-এর সামনে এসে আদবের এক চরম উচ্চতা প্রদর্শন করে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার যা কিছু সম্পদ
আছে, সবকিছুর মালিক আজ আপনাকে বানিয়ে দিলাম।” নবীজি ﷺ কৌতূহলী হয়ে কারণ জিজ্ঞাসা
করলে তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! হাদিসে আছে—উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম। আমি যদি আপনাকে দান হিসেবে দিতাম, তবে আমার হাত উপরে থাকত। আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর অন্তর এটি সহ্য করতে পারে না যে নবীজির হাতের উপরে আবু বকরের হাত থাকবে। তাই আমি আপনাকে মালিক বানিয়ে দিয়েছি, এখন আপনি আপনার নিজের মাল আপনার হাত দিয়ে বুঝে নিন।” এটি ছিল নবপ্রেমের এক বিরল দৃষ্টান্ত।
৪. নীরবতার আদব ও আসমানি সাহায্য: একবার এক ব্যক্তি নবীজি ﷺ-এর সামনে হযরত আবু বকর
রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-কে খুব গালিগালাজ করছিল। আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে সব সহ্য করছিলেন। নবীজি ﷺ পাশে বসে মুচকি হাসছিলেন। কিন্তু অনেকক্ষণ পর যখন আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু একটি উত্তর দিলেন, অমনি নবীজি ﷺ সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন। আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু অবাক হয়ে নবীজিকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, “আবু বকর! যতক্ষণ তুমি চুপ ছিলে, ততক্ষণ আসমান থেকে একজন ফেরেশতা তোমার পক্ষ হয়ে জবাব দিচ্ছিল। কিন্তু যখন
তুমি নিজে জবাব দেওয়া শুরু করলে, তখন ফেরেশতা চলে গেল আর সেখানে শয়তান আসল। আর যেখানে শয়তান থাকে, সেখানে আমি নবী থাকতে পারি না।” এই ঘটনাটি মুমিনদের শেখায় যে অন্যায়ের প্রতিবাদে ধৈর্য ও নীরবতা অনেক সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে অদৃশ্য সাহায্যের কারণ হয়।
শুধু ইবাদত নয়, বরং নবীর প্রতি আদব ও ভালোবাসা এবং নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণই হলো প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ছিলেন সেই গুণের সর্বোচ্চ অধিকারী।
৪. আল-তাবুত বা সিন্দুকের নিদর্শন:
বনী ইসরাঈলরা যখন তালুতকে বাদশাহ মানতে গড়িমসি করছিল, তখন নবী শামবীল আলাইহিস সালাম তাদের আরেকটি নিদর্শন দেখালেন। সেটি ছিল ‘তাবুত’ বা পবিত্র সিন্দুক।
﴿وَقَالَ لَهُمۡ نَبِيُّهُمۡ إِنَّ ءَايَةَ مُلۡكِهِۦٓ أَن يَأۡتِيَكُمُ
ٱلتَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِّن رَّبِّكُمۡ وَبَقِيَّةٌ مِّمَّا تَرَكَ ءَالُ
مُوسَىٰ وَءَالُ هَٰرُونَ تَحۡمِلُهُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُۚ﴾ অর্থ: “তাদের নবী
তাদের বললেন, তার রাজত্বের চিহ্ন হলো এই যে, তোমাদের কাছে সেই সিন্দুকটি ফিরে আসবে,
যাতে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে হৃদয়ের প্রশান্তি রয়েছে এবং তাতে মুসা ও হারুনের পরিবারবর্গের পরিত্যক্ত কিছু তবাররুকাত রয়েছে; ফেরেশতারা তা বহন করে নিয়ে আসবে।”
(সূরা বাকারা: ২৪৮)
এই সিন্দুকে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর লাঠি, তাওরাতের পাণ্ডুলিপি, এবং হারুন আলাইহিস সালাম-এর পোশাক ইত্যাদি তবাররুকাত ছিল। আমালেকা গোত্র এটি ছিনিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সিন্দুকটি তাদের কাছে যাওয়ার পর তাদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হতে শুরু করল। মহামারি আর দুর্যোগে তারা অতিষ্ঠ হয়ে সিন্দুকটি একটি গরুর গাড়িতে করে শহরের বাইরে
ফেলে দিয়ে এল। আর সেখান থেকে ফেরেশতারা সেটি বহন করে সরাসরি তালুতের সামনে নিয়ে আসলেন। এটি দেখে বনী ইসরাঈলরা তালুতকে বাদশাহ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হলো।
৫. নহরের (নদীর) পরীক্ষা ও ধৈর্যশীলদের পরিচয়:
তালুত যখন সৈন্যসামন্ত নিয়ে যুদ্ধের জন্য বের হলেন, তখন তিনি ঘোষণা করলেন যে আল্লাহ
তোমাদের একটি নদীর মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন।
﴿فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوتُ بِٱلۡجُنُودِ قَالَ إِنَّ ٱللَّهَ مُبۡتَلِيكُم
بِنَهَرٍ فَمَن شَرِبَ مِنۡهُ فَلَيۡسَ مِنِّي وَمَن لَّمۡ يَطۡعَمۡهُ فَإِنَّهُۥ
مِنِّيٓ إِلَّا مَنِ ٱغۡتَرَفَ غُرۡفَةَۢ بِيَدِهِۦۚ﴾ অর্থ: “অতঃপর তালুত যখন সৈন্যবাহিনী নিয়ে বের হলেন, তখন বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের একটি নদী দ্বারা
পরীক্ষা করবেন। সুতরাং যে সেই নদীর পানি পান করবে সে আমার দলভুক্ত নয়, আর যে তা পান করবে না সে আমার দলভুক্ত; তবে কেউ তার হাত দিয়ে এক আঁজলা পরিমাণ পান করলে তা ভিন্ন কথা।” (সূরা বাকারা: ২৪৯)
সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরম। সৈন্যরা পিপাসায় কাতর ছিল। কিন্তু অধিকাংশ সৈন্যই তৃপ্তি ভরে পানি পান করে ফেলল। ফলে তারা অলস ও দুর্বল হয়ে পড়ল। মাত্র অল্প কিছু মানুষ (বলা হয় ৩১৩ জন সাহাবীর সংখ্যার সমান) যারা কেবল এক আঁজলা পানি পান করেছিল বা একদমই করেনি, তারাই তালুতের সাথে অটল থাকল।
হুজুর এখানে বলেন, দুনিয়াতে সবর বা ধৈর্য ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া সম্ভব নয়। যারা নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, আল্লাহ তাদেরই বিজয়ী করেন।
৬. দাউদ আলাইহিস সালাম কর্তৃক জালুত হত্যা ও বিজয়:
সৈন্যরা যখন জালুতের বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হলো, তখন অল্পসংখ্যক মুমিনরা আল্লাহর
কাছে দোয়া করল: ﴿رَبَّنَآ أَفۡرِغۡ عَلَيۡنَا صَبۡرٗا وَثَبِّتۡ
أَقۡدَامَنَا وَٱنصُرۡنَا عَلَى ٱلۡقَوۡمِ ٱلۡكَٰفِرِينَ﴾ অর্থ: “হে আমাদের
রব! আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন, আমাদের পা স্থির রাখুন এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন।” (সূরা বাকারা, ২:২৫০)
জালুত ছিল এক বিশালদেহী এবং শক্তিশালী কাফের বাদশাহ। সে আস্ফালন করছিল যুদ্ধের জন্য। তখন হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম (যিনি তখনও নবী হননি, ছোট বালক ছিলেন) সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করে একটি পাথর ছুড়লেন যা সরাসরি জালুতের কপালে গিয়ে বিদ্ধ হলো এবং সে মারা গেল।
﴿فَهَزَمُوهُم بِإِذۡنِ ٱللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُۥدُ جَالُوتَ وَءَاتَىٰهُ
ٱللَّهُ ٱلۡمُلۡك وَٱلۡحِكۡمَةَ﴾ অর্থ: “অতঃপর তারা আল্লাহর হুকুমে তাদের পরাজিত করল এবং দাউদ জালুতকে হত্যা করল। আর আল্লাহ তাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান
করলেন।” (সূরা বাকারা, ২:২৫১)
৭. আল্লাহ তাআলার বিশেষ নেজাম ও হযরত উসমান রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর সবর:
হুজুর আলোচনার শেষ দিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি তুলে ধরেন। আল্লাহ তাআলা
বলেন: ﴿وَلَوۡلَا دَفۡعُ ٱللَّهِ ٱلنَّاسَ بَعۡضَهُم بِبَعۡضٖ لَّفَسَدَتِ
ٱلۡأَرۡضُ﴾ অর্থ: “আর আল্লাহ যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত।” (সূরা বাকারা, ২:২৫১)
অর্থাৎ জালেমদের দমানোর জন্য আল্লাহ সবসময় শক্তিশালী কাউকে দাঁড় করিয়ে দেন। এটি
আল্লাহর দুনিয়া পরিচালনার পদ্ধতি।
হুজুর এখানে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এবং হযরত উসমান
রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর সবরের উদাহরণ দেন।
হযরত উসমান রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর শাহাদাতের ঘটনা: যখন বিদ্রোহীরা হযরত উসমান রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর বাড়ি অবরোধ করল, তখন সাহাবীরা তলোয়ার নিয়ে লড়াই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উসমান রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন, “না, আমি নবীজি ﷺ-কে স্বপ্নে দেখেছি। তিনি
আমাকে বলেছেন, উসমান তোমার সামনে দুটি পথ—হয় লড়াই করো অথবা সবর করো। যদি সবর করো
তবে আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে জান্নাতে ইফতার করবে।”
সুবহানাল্লাহ! উসমান রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সবরের পথ বেছে নিলেন। আসরের পর তিনি
কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন, এমন সময় বিদ্রোহীরা ঘরে ঢুকে তাকে শহীদ করল। তার পবিত্র
রক্ত কোরআনের ‘ফাসাইয়াকফী কাহুমুল্লাহ’ (فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ) আয়াতের ওপর পড়ল। (যাচাইকৃত তথ্য: এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রসিদ্ধ এবং অনেক ঐতিহাসিক গ্রন্থে এটি বর্ণিতহয়েছে। বর্তমানেও তুরস্কের তোপকাপি প্রাসাদে সংরক্ষিত প্রাচীন কোরআন পাণ্ডুলিপিতেরক্তের দাগ দেখা যায়।)
হুজুর উপসংহারে বলেন, সবরের ফল সবসময় মিষ্টি হয়। জালেম চিরকাল টিকে থাকে না। আল্লাহ
ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
উপসংহার:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের এই আলোচনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তৌফিক দান
করুন। বনী ইসরাঈলের এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে—বিজয় সংখ্যার ওপর নয়, বরং আল্লাহর ওপর
ভরসা এবং ধৈর্যের ওপর নির্ভর করে। জালেমকে প্রতিহত করা আল্লাহর একটি প্রাকৃতিক নিয়ম। আল্লাহ আমাদের ঈমানের ওপর অবিচল থাকার তৌফিক দিন। আমীন।
রেফারেন্সসমূহ (References):
কোরআনের রেফারেন্স:
- সূরা বাকারা, আয়াত: ২৪৬-২৫১।
হাদিসের রেফারেন্স:
- সাহাবীদের সংখ্যা ও তালুতের সৈন্যদের সংখ্যা সম্পর্কে তথ্য: সহীহ আল-বুখারি,
হাদিস নং ৩৯৫১।
তাফসীর ও ইতিহাস:
- তাফসীরে মাআরিফুল কোরআন (মুফতি শফী রহমতুল্লাহি আলাইহি)।
- তাফসীরে ইবনে কাসীর (সূরা বাকারা)।
- আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইবনে কাসীর রহমতুল্লাহি আলাইহি)।
✎ᝰ সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট by মোহাম্মদ কাউছার আহমাদ সম্রাট

সম্মানিত খতিব, কেজির মোড় জামে মাসজিদ, এনায়েতপুর, সিরাজগঞ্জ। উস্তাদের অমূল্য কথা গুলো, জুম্মার বয়ান (খুতবা) এবং তাফসির ক্লাস (দরস) নিয়মিত এইখানে আর্টিকেল আকারে সম্ভব হলে অডিওসহ পাবলিশ করা হয়, ইনশাআল্লাহ। সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্টটি পড়ার সাথে সাথে পুরো অডিও রেকর্ডটি শুনলে সর্বোচ্চ ফায়দা হবে আশা করি, ইনশাআল্লাহ।