তাফসির, সূরা বাকারা, ২:২৩৯-২৪১, আলোচ্য বিষয়: সালাতুল খউফ অর্থাৎ ভয়-ভীতির সময় সালাত। এর পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট আলোচনা

Estimated reading time: 3 minutes
Article views: 3

সুরা বাকারার ২৩৯, ৪০, ৪১, ৪২ নম্বর আয়াতের তাফসির, ইসলামী শরীয়তের নতুন একটা অধ্যায় নিয়ে সুরা বাকারার ২৩৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক কথা বলতেছেন। সেটা হলো صلاةالخوف (সালাতুল খাউফ)। সালাতুল খাউফ মানে হলো ভয়-ভীতির সময় মানুষ কীভাবে নামাজ পড়বে, ওটার বিধান দিতেছেন।

নিচে পুরো ক্লাসের অডিও দেওয়া হলো, সংক্ষিপ্ত তাফসির নোটটি পড়ার সাথে সাথে পুরো অডিও রেকর্ডটি শুনলে সর্বোচ্চ ফায়দা হবে আশা করি, ইনশাআল্লাহ।

সম্পূর্ণ ক্লাসের অডিও রেকর্ডিং

সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট:

ভূমিকা ও তিলাওয়াত (Intro & Recitation)

الحمد لله والصلاة لأهلها، أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم، بسم الله الرحمن
الرحيم:

فَإِنْ خِفْتُمْ فَرِجَالًا أَوْ رُكْبَانًا ۖ فَإِذَا أَمِنتُمْ فَاذْكُرُوا
اللَّهَ كَمَا عَلَّمَكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ (٢٣٩) وَالَّذِينَ
يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا وَصِيَّةً لِّأَزْوَاجِهِم مَّتَاعًا
إِلَى الْحَوْلِ غَيْرَ إِخْرَاجٍ ۚ فَإِنْ خَرَجْنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِي
مَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ مِن مَّعْرُوفٍ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (٢٤٠)
وَلِلْمُطَلَّقَاتِ مَتَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ ۖ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ (٢٤١)
كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ (٢٤٢)

صدق الله مولانا العظيم، وصدق رسوله النبي الكريم ونحن على ذلك من الشاهدين
والشاكرين والحمد لله رب العالمين. سبحانك لا علم لنا إلا ما علمتنا إنك أنت العليم
الحكيم।

মূল আলোচনা (Core Discussion)

আল্লাহ পাক বলেন, فَإِنْ خِفْتُمْ—যদি তোমরা ভীতি-সন্ত্রস্ত হও, فَرِجَالًا—তাহলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়বে, أَوْ رُكْبَانًا—অথবা সওয়ারি অবস্থায় নামাজ পড়বে।
فَإِذَا أَمِنتُمْ—আর যখন তোমরা নিরাপদ হয়ে যাবে, فَاذْكُرُوا اللَّهَ—আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করবে, كَمَا عَلَّمَكُم—যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিখিয়েছেন, مَا لَمْ
تَكُونُوا تَعْلَمُونَ—যে বিষয়ে তোমরা অবগত ছিলে না।

একটা আয়াতের ব্যাখ্যা আরেকটা আয়াত করে। একটা আয়াতের তাফসীর আরেকটা হাদীস করে। এই আয়াতের তাফসীর করতেছে সুরা নিসার ১০২ নম্বর আয়াত:

وَإِذَا كُنتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلَاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ مِّنْهُم
مَّعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ…

আল্লাহ পাক বলেন, এক গ্রুপ আপনার সাথে দাঁড়াবে (যুদ্ধের ময়দানে নামাজের পদ্ধতি)। তারা তাদের অস্ত্র সাথে রাখবে। যখন সেজদা করে ফেলবে (এক রাকাত হয়ে যাবে), তখন এই গ্রুপটা চলে যাবে শত্রুর মোকাবিলায়। আর দ্বিতীয় গ্রুপ যারা ছিল না, তারা আসবে আপনার সাথে ইক্তাদা করবে। যখন এটা ভয় হবে যে শত্রুরা অতর্কিত বা আচানক হামলা করবে।

প্রেক্ষাপট (Context): এই আয়াতের প্রেক্ষাপট হলো ذات الرقاع (জাতুর রাকা)। নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের জীবনে যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তার মধ্যে একটি ছিল জাতুর রাকা। সেখানে সাহাবায়ে কেরাম যখন জোহরের নামাজ আদায় করতেছিলেন, তখন কাফের
শিবিরের মধ্য থেকে একজনে বলে যে মুসলমানরা যখন নামাজে দাঁড়ায় তারা পুরা দুনিয়াকে ভুলে যায়। ওই সময়টা তাদের অতর্কিত হামলা করার একটা সুবর্ণ সুযোগ। জোহরের নামাজ চলে যাচ্ছে, এই সুযোগটা আমরা হাতছাড়া করলাম কেন? তাদের মধ্যে একজন ছিল পারদর্শী, সে
বলতেছে একটু পরে আরেকটা নামাজ আসবে (আসর), ওই সময় আমরা হামলা করব। আসরের নামাজ আসতে
না আসতেই জিবরাঈল আমীন আয়াত নিয়ে হাজির হয়ে গেলেন।

নামাজের পরিভাষা (Terminology of Prayer)

নামাজে মুসল্লি তিন ধরনের হয়ে থাকে: ১. مدرك (মুদরিক): ইসলামের পরিভাষায় যে শুরুথেকে শেষ পর্যন্ত নামাজে উপস্থিত থাকে। ২. مسبوق (মাসবুক): যিনি শুরুতে ছিলেন না,পরে আসছেন। ৩. لاحق (লাহিক): যিনি শুরুতে ছিল, পরে ছিলেন না কোনো কারণে (অজু নষ্টবা অন্য কারণে)।

সালাতুল খাউফের ক্ষেত্রে প্রথম গ্রুপটি হবে ‘লাহিক’ এবং দ্বিতীয় গ্রুপটি হবে ‘মাসবুক’।

সালাতুল খাউফ থেকে শিক্ষা (Lessons from Salatul Khauf)

আল্লাহ পাক সালাতুল খাউফ দিয়ে আমাদেরকে অনেকগুলো শিক্ষা দিয়েছেন:

১. নামাজের গুরুত্ব (Importance of Salah):

যত অবস্থা, যত পরিস্থিতি আসুক, নামাজের কোনো ছাড় নাই। তুমুল যুদ্ধ চলতেছে, তবুও নামাজ পড়তে হবে। হাদীসে আসছে:

أول ما يحاسب به العبد يوم القيامة الصلاة (কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার কাছ
থেকে নামাজের হিসাব নেওয়া হবে)। الصلاة عماد الدين، فمن أقامها فقد أقام الدين ومن
هدمها فقد هدم الدين (নামাজ দ্বীনের স্তম্ভ। যে এটাকে রক্ষা করল সে দ্বীন রক্ষা
করল, আর যে এটাকে ভেঙে ফেলল সে দ্বীনকে ভেঙে ফেলল)।

২. জামাতের গুরুত্ব (Importance of Jama’at):

একেকাও তো পড়তে বলতে পারতেন, কিন্তু
আল্লাহ জামাতের কথা বলছেন। জামাত হানাফী মাজহাবে সুন্নতে মুয়াক্কাদা, কিন্তু এর
গুরুত্ব ওয়াজিবের মতো। জামে মসজিদে নামাজ পড়লে ৫০০ রাকাতের সওয়াব মিলে। হারামে পড়লে ১ লক্ষ, মসজিদে নববীতে ৫০ হাজার, বাইতুল মাকদিসে ১ হাজার। এই সম্পর্কিত বিস্তারিত তাফসির দেখুন সূরা বাকারা, ২:২৩৮

৩. এবাদত ও আত্মরক্ষার ভারসাম্য (Balance of Worship & Defense):

একদিকে নামাজ, অন্যদিকে নিজের আত্মরক্ষা। ইসলামের মধ্যে বৈরাগ্যবাদ নাই।

لا رهبانية في الإسلام (ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদ নেই)। নিজের বিবি-বাচ্চাকে রক্ষা করতে গিয়ে কেউ জীবন দিলেও সে শহীদ। হাদীসে নবীজি বলেন: من قتل دون ماله فهو شهيد،
ومن قتل دون دينه فهو شهيد، ومن قتل دون دمه فهو شهيد، ومن قتل دون أهله فهو شهيد
(যে তার সম্পদ, দ্বীন, জীবন বা পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায়, সে শহীদ)।

৪. আনুগত্য শিক্ষা (Lesson of Obedience):

কমান্ড মানা। যেমন এক গ্রুপ নবীর পেছনে
নামাজ ছেড়ে আল্লাহর হুকুম পালন করতে গিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে গেল। সাহাবায়ে কেরামের জীবনে কিবলা পরিবর্তনের সময়ও এই আনুগত্য দেখা গেছে। নবীজি ঘুরে গেছেন, সাহাবারাও সাথে সাথে ঘুরে গেছেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তৌফিক দান করুন। আমীন।

─ সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট এবং পরিমার্জনে, মোহাম্মদ কাউছার আহমাদ সম্রাট, KYA-21, খাঁজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top