জুম্মার বয়ান/খুতবা, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, আলোচ্য বিষয়: সিরাত ও নবী করিম (ﷺ)-এর রহমাতুল্লিল আলামিন হওয়া এবং তাঁর সুন্নাহর শিক্ষা সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

Estimated reading time: 4 minutes
Article views: 10

উস্তাদ: মুফতি আব্দুল ওয়াদুদ হাফিজাহুল্লাহ, সম্মানিত খতিব, কেজির মোড় জামে মাসজিদ, এনায়েতপুর, সিরাজগঞ্জ।
সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট: মোহাম্মদ কাউছার আহমাদ সম্রাট
জুম্মার বয়ান/খুতবা, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, আলোচ্য বিষয়: সিরাত ও নবী করিম (ﷺ)-এর রহমাতুল্লিল আলামিন হওয়া এবং তাঁর সুন্নাহর শিক্ষা সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

নিচে পুরো খুতবার অডিও দেওয়া হলো, সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্টটি পড়ার সাথে সাথে পুরো অডিও রেকর্ডটি শুনলে সর্বোচ্চ ফায়দা হবে আশা করি, ইনশাআল্লাহ।

সম্পূর্ণ খুতবার অডিও রেকর্ডিং

﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ﴾ অর্থ: “আর আমি আপনাকে তো কেবল বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া , ২১:১০৭)

বিগত কয়েক জুম্মা যাবৎ আপনারা নবিজী রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের ওপর আলোচনা শুনে আসতেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজকে সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭ আয়াতের ওপর কিছু আলোচনা, ইনশাল্লাহ।

নবী করিম (ﷺ)-এর আগমন এবং তাঁর রহমত সমগ্র সৃষ্টির জন্য

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, ﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ﴾ অর্থ: “আর আমি আপনাকে তো কেবল বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া , ২১:১০৭)। রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনিও হাদিসের মধ্যে এই কথার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন। এই যে রহমত, শুধু কি মানুষের ওপর রহমত? শুধু কি জিন্ জাতের ওপর রহমত? শুধু কি ইনসানের ওপর রহমত?

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আসমান এবং জমিনের মধ্যে যত সৃষ্টি আছে, সমস্ত সৃষ্টির ওপরে নবীকে রহমত বানিয়ে পাঠিয়েছেন। নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের প্রত্যেকটা নফল আমলের ওপর, কথার ওপর এবং সবকিছুই ছিল রহমত। নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম চার রাকাত ওয়ালা নামাজ তিন রাকাত করে পড়ে সাহাবীদের শুনিয়ে দিয়েছেন। সাহাবীরা খুব চিন্তা করেছেন যে, আজকে কি কোনো যোহরের নামাজ চারের জায়গায় দুই রাকাত হয়ে গেল? নবীকে জিজ্ঞেস করছেন যে, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আজকের থেকে কি চার রাকাত ওয়ালা নামাজ দুই রাকাত হয়ে গেল? তো নবী বললেন যে, না, চার রাকাত ওয়ালা নামাজ দুই রাকাত হয়নি, বরং আমি ভুলে গিয়েছি। لَا نَنْسَى (লা নাসিউ), আমি ভুলে যাইনি বরং আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন ভুলে দেওয়া হয়েছে? কারণ আমার ভুলে যাওয়ার কারণের মধ্যেও রহমত বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সেটে কিভাবে? আমি যে ভুলে গিয়েছি, এটা মানুষ যদি নামাজের মধ্যে ভুলে যায়, তো ভুলকৃত নামাজ তার সংশোধনের রাস্তা কি? এই বিধান আমরা পেতাম এখনো দেয়নি। আমাকে ভুলিয়ে দিয়ে ভুলের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সেজদায়ে সাহু বিধান দিয়ে দিয়েছেন।

আর আমি আপনাকে তো কেবল বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া , ২১:১০৭)। তো নবীর ভুলে যাওয়াটা আমাদের জন্য রহমত, কারণ রহমত হচ্ছে। নবীর ঘুম আমাদের জন্য রহমত। এই যুদ্ধের ময়দান থেকে নবী ফিরেছিলেন। সময়টা ছিল রাতের শেষ প্রহর। সাহাবীরা ক্লান্ত হয়ে গেছে চলতে চলতে। তো নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম হযরত বেলাল রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু কে মাসজিদে পাহাড়াদার নিযুক্ত করে ঘুমিয়ে পড়লেন। বেলাল রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুও ছিল ক্লান্ত, তিনিও ঘুমিয়ে গিয়েছেন। এত পরিমাণ ঘুমিয়ে গিয়েছেন যে, পূর্ব দিগন্তের সূর্য উদিত হয়ে তাঁদের চোখে মুখে সূর্যের আলো পড়েছে তখন ঘুম ভেঙেছে। তো নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম সাহাবীদেরকে বললেন যে, যেখান থেকে শয়তান আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেখান থেকে তোমরা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করো। নবিজি সাহাবিদের নিয়ে একটু দূরে সরে গেলেন এবং সেখানে গিয়ে হযরত বেলালকে আযান দিতে বললেন। বেলাল আযান দিলেন, ইকামত হলো, এবং নবিজি জামাতের সাথে ফজরের কাজা নামাজ আদায় করলেন।

নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম বলেন, আমার এই ঘুমিয়ে যাওয়াটাও আমার উম্মতের জন্য রহমত। কারণ হলো আমার উম্মত যদি ঘুমিয়ে যায়, আর নামাজ পড়তে না পারে, তাহলে তারা কিভাবে নামাজ পড়বে, সেটার বিধান শেখানোর জন্য আল্লাহ তাআলা আমাকে ঘুম পাড়িয়েছেন। যাতে করে আমার উম্মত শিক্ষা লাভ করে।

রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, “আমার আগমনকে কেন্দ্র করে কি তোমাররাও রহমতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছো?” জিবরাইল আমিন বললেন যে, “ইয়া রসুলুল্লাহ, আপনি ফেরেশতাদের জন্যও রহমত।” আপনি আসার আগে, আল্লাহ পাকের ফয়সালাগুলো আমরা শুনতে পেতাম। ফোনের এলাকায় কি হচ্ছে? ফোনের এলাকায় আজাব কি হচ্ছে? ফোনের এলাকায় গজব আসছে? কিন্তু যেদিন পৃথিবীতে আপনি আগমন করেছেন, ওই দিন থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা যখন আসমানে যেতাম, তখন আমরা ভয় পেতে থাকতাম, আতঙ্কিত অবস্থায় থাকতাম যে, না জানি কোনো ফয়সালা আমাদের ওপরে নেমে আসে। এখন জানি না। এজন্য আতঙ্কিত অবস্থায় থাকতাম যে, আমাদের ভেতরে কোনো ফয়সালা নেমে আসে কি না।

আপনার মাধ্যমে আমাদের কাছে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ পাক স্বীকৃতি দিয়েছেন, পবিত্র কোরআনের সুরা আত-তাকভিরের ১৯ থেকে ২১ নম্বর আয়াতে ফেরেশতা হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের সুমহান মর্যাদা ও বিশ্বস্ততার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। আয়াতগুলো হলো—﴿إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ ۝ ذِي قُوَّةٍ عِندَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ ۝ مُطَاعٍ ثَمَّ أَمِينٍ﴾অর্থ: “এ কুরআন নিশ্চয়ই সম্মানিত রসূলের (অর্থাৎ জিবরাঈলের) আনীত বাণী। যিনি শক্তিধর, আরশের মালিকের কাছে মর্যাদাবানের অধিকারী, সেখানে তিনি মান্য ও বিশ্বস্ত।” [সুরা আত-তাকভির, ৮১:১৯-২১]

গাছপালা, পশুপাখি এবং সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমত

নবীজি রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রহমত কেবল মানুষ বা জ্বিনের জন্যই নয়, বরং পশুপাখি, গাছপালা এবং সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমতস্বরূপ ছিল।

অতীতে সাহাবায়ে কেরাম যখন কোথাও সফরে যেতেন, গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন, তখন নবীজির রহমতের বরকতে সবকিছু প্রশান্ত থাকত। কোনো মানুষ যদি রাস্তাঘাটে গাছপালা কাটে বা বিনা কারণে ডালপালা ভেঙে ফেলে, অথবা কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেয়, তবে তা ইসলাম সমর্থন করে না। নবী করিম (ﷺ) পশুপাখির প্রতিও দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন।

নেপালের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আকস্মিক বন্যা

আপনারা মিডিয়ায় দেখেছেন যে, নেপালে এবং সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) ও ভূমিধসের কারণে কী পরিমাণ devastation বা ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়েছে। হিমবাহ গলে গিয়ে এবং পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তের মধ্যে নদীমাতৃক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছে এবং বহু প্রাণহানি ঘটেছে।

এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলো আমাদের জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা। মানুষ যতই আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি করুক না কেন, আল্লাহর মহাশক্তির সামনে মানুষ সম্পূর্ণ অসহায়। নেপালের এই মর্মান্তিক দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে হবে এবং মহান আল্লাহর দরবারে তওবা করে ফিরে আসতে হবে।

গাছ লাগানো, পরিবেশ রক্ষা ও ইসলাম

ইসলামে পরিবেশ রক্ষা ও গাছ লাগানোর ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, নবীজি রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা অনুযায়ী গাছপালা সংরক্ষণ করা এবং বেশি করে গাছ লাগানো একটি অত্যন্ত বরকতপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ। রাস্তাঘাটে গাছ লাগানো, পরিবেশ সবুজ রাখা এবং বিনা কারণে গাছপালা বা ডালপালা কেটে নষ্ট না করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ইসলামে রয়েছে। মানুষ বা পশুপাখির উপকারের জন্য গাছ লাগানো সদকায়ে জারিয়ার সমতুল্য।

জামানার পরিবর্তন ও কোরআনি বিধান

আজকে সমাজে নানা রকমের আইন ও শাসন ব্যবস্থা দেখা যায়। কিন্তু ইসলামের মূল বিধান হলো কোরআন ও সুন্নাহ। বর্তমান যুগের মানুষ শান্তি পাওয়ার জন্য নানা জায়গায় দৌড়াচ্ছে, অথচ শান্তি রয়েছে কেবল আল্লাহর বিধানের মধ্যে।

অতীতে সাহাবায়ে কেরাম যখন কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন, তখন তাঁরা নবীজির সুন্নাহ ও কোরআনের দিকে ফিরে আসতেন। আজকের দিনেও যদি আমরা কোরআনের ছায়াতলে ফিরে আসি, তবে সমাজের সব অশান্তি দূর হয়ে যাবে। নবীজি শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রে নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে রহমত স্বরূপ এসেছিলেন। আজকে আমরা অনেকেই মনে করি, নবী শুধু আখিরাতের মুক্তির উসিলা। না! নবী দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় জাহানের জন্য রহমত। দুনিয়াতে আমরা কীভাবে চলব, কীভাবে খাবো, কীভাবে কথা বলব, কীভাবে সমাজ পরিচালনা করব—সবকিছুর শিক্ষা নবী দিয়ে গেছেন। এমনকি রাস্তাঘাটে চলাচলের আদব কী হবে, সেটাও নবী শিখিয়ে গেছেন। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা সদকা। সুবহানাল্লাহ। একটা ইটের টুকরা বা কাঁটা রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলা সদকা। নবীজি বলেছেন, “তোমরা রাস্তা পরিষ্কার রাখো। চলাচলের রাস্তা কষ্টমুক্ত রাখো।” আজকে আমরা রাস্তাঘাট নোংরা করি, পলিথিন ফেলি, ময়লা-আবর্জনা ফেলি। নবীজি এগুলো নিষেধ করে গেছেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যেন আমাদের সকলকে কোরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জন করার এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করেন। আমিন। وَآخِرُ دَعْوَاهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top