তাফসির, সূরা বাকারা, ২:২৫৬-২৫৭; আলোচ্য বিষয়: দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই এবং আল্লাহ্ মুমিনদের অভিভাবক

Estimated reading time: 13 minutes
Article views: 97

উস্তাদ: মুফতি আব্দুল ওয়াদুদ হাফিজাহুল্লাহ, সম্মানিত খতিব, কেজির মোড় জামে মাসজিদ, এনায়েতপুর, সিরাজগঞ্জ। সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্ট: আব্দুল্লাহ সৈকত স্যার ও মোহাম্মদ কাউছার আহমাদ সম্রাট। তাফসির, সুরা বাকারা, ২:২৫৬-২৫৭; আলোচ্য বিষয়: দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই এবং আল্লাহ্ মুমিনদের অভিভাবক।

নিচে পুরো ক্লাস/দরসের অডিও দেওয়া হলো, সংক্ষিপ্ত স্ক্রিপ্টটি পড়ার সাথে সাথে পুরো অডিও রেকর্ডটি শুনলে সর্বোচ্চ ফায়দা হবে আশা করি, ইনশাআল্লাহ।

সম্পূর্ণ ক্লাসের অডিও রেকর্ডিং

তাফসির, সুরা বাকারা, ২:২৫৬-২৫৭; আলোচ্য বিষয়: দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই এবং আল্লাহ্ মুমিনদের অভিভাবক।

«لَآ إِكْرَاهَ فِى ٱلدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشْدُ مِنَ ٱلْغَىِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِٱلطَّـٰغُوتِ وَيُؤْمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسْتَمْسَكَ بِٱلْعُرْوَةِ ٱلْوُثْقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَا ۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ٢٥٦»

দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি কিংবা বাধ্যবাধকতা নেই। নিশ্চয়ই সৎপথ ভ্রান্তপথ থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। অতএব যে তাগুতকে অবিশ্বাস করে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সে দৃঢ়তর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরলো যা কখনও ছিন্ন হবার নয় এবং আল্লাহ শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। (Al-Baqarah, 2:256)

«ٱللَّهُ وَلِىُّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ يُخْرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَـٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ ۖ وَٱلَّذِينَ كَفَرُوٓا۟ أَوْلِيَآؤُهُمُ ٱلطَّـٰغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ ٱلنُّورِ إِلَى ٱلظُّلُمَـٰتِ ۗ أُو۟لَـٰٓئِكَ أَصْحَـٰبُ ٱلنَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَـٰلِدُونَ ٢٥٧»

আল্লাহই হচ্ছেন মু’মিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে নিয়ে যান; আর যারা অবিশ্বাস করেছে তাগুত তাদের পৃষ্ঠপোষক, সে তাদেরকে আলো হতে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, ওখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। (Al-Baqarah, 2:257)

Table of Contents

দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই—তাগুত কী এবং কাকে বলা হয়?

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, «لَآ إِكْرَاهَ فِى ٱلدِّينِ» (দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই)। এই আয়াতটা নাজিল হয়েছে একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে। হযরত হোসাইন আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দুই ছেলে খ্রিষ্টান হইয়া গিয়েছিলো। তারা নাজরানের খ্রিষ্টানদের সাথে চলে যেতে চাইছিলো। তিনি যখন তাদের আটকাতে চাইলেন, তখন আল্লাহপাক এই আয়াত নাজিল করলেন— «إِكْرَاهَ فِى ٱلدِّينِ» (দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই)। তাহলে জবরদস্তি নেই, তো জিহাদ কেন? জিহাদ ইসলাম গ্রহণ করানোর জন্য না। জবরদস্তি নেই, এটা ঠিক। কিন্তু ইসলামের পথে যে বাধা, সেই বাধা অপসারণ করার নামই জিহাদ। যখন মানুষ সত্য জানতে পারবে না, তখন সেই বাধা দূর করা হয়। ইসলামে জিহাদ ও যুদ্ধ ফেতনা-ফাসাদ বন্ধ করার লক্ষ্যে করা হয়। কেননা, ফাসাদ আল্লাহর পছন্দনীয় নয়, অথচ কাফেররা ফাসাদের চিন্তাতেই ব্যক্ত থাকে। তাই আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, «وَيَسْعَوْنَ فِى ٱلْأَرْضِ فَسَادًۭا ۚ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلْمُفْسِدِينَ ٦٤» অর্থ “তারা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়, কিন্তু আল্লাহ তা’আলা ফাসাদকারীদেরকে পছন্দ করেন না”। (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৬৪)। এজন্য আল্লাহ তা’আলা জিহাদ এবং কেতালের মাধ্যমে এসব লোকের সৃষ্ট যাবতীয় অনাচার দূর করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামের এ কার্যপদ্ধতিতে বোঝা যায় যে, যে জিহাদ ও যুদ্ধের দ্বারা মানুষকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করে না, বরং এর দ্বারা দুনিয়া থেকে অন্যায় অনাচার দূর করে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আদেশ দিয়েছে।

তাগুত কাকে বলা হয়? তাগুত— একটি পরিচিত শব্দ। কিন্তু তাগুত কাকে বলা হয়। তাগুত হলো শয়তান। শয়তানের ধরন রয়েছে— «مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ» অর্থ: “জিন ও মানুষের মধ্য থেকে।” (সূরা আন নাস, ১১৪:৬)

শয়তান দুই ধরনের—মানুষের মধ্য থেকে শয়তান এবং জিনের মধ্য থেকে শয়তান। অর্থাৎ, তাগুত মানুষের মধ্য থেকেও হতে পারে, জিনদের মধ্য থেকেও হতে পারে। তাগুত ওই শক্তিকে বলা হয়, যেই শক্তি হুকুম করে, বান্দাকে হুকুম করে, মাখলুককে হুকুম করে, মাখলুকের আনুগত্য করতে। বুঝাইতে পারলাম? তাগুত হলো এমন একটি শক্তি, যে বান্দাকে, মাখলুককে হুকুম করে মাখলুকের আনুগত্য করতে। তাগুত হলো এমন শক্তি, যে ইবাদতের হুকুম করে। মাখলুককে হুকুম করে— মাখলুকের ইবাদত করতে। যদি কেউ বলে, “আমাকে সেজদা করেন”, অথবা তার শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এমন হয় যে, “আমার উপাসনা করো, আমাকে সেজদা করো”—তাহলে সেটি তাগুতের অন্তর্ভুক্ত। অথবা এমন যদি হয় যে, কোনো মাখলুকের আনুগত্য করতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার হুকুমের পরোয়া করা হয় না, সেটিও তাগুত।

এ ধরনের তাগূত অনেক রয়েছে। কিন্তু কিতাবুত তাওহীদে প্রসিদ্ধ তাগূত ওলামায়ে কেরাম পাঁচ প্রকার উল্লেখ করেছেন:

  • শয়তান, সে হচ্ছে সকল প্রকার তাগূতের সর্দার। যেহেতু সে আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর ইবাদাত থেকে বিরত রেখে তার ইবাদাতের দিকে আহ্বান করতে থাকে, সেহেতু সে বড় তাগূত।
  • যে গায়েব বা অদৃশ্যের জ্ঞান রয়েছে বলে দাবী করে বা অদৃশ্যের সংবাদ মানুষের সামনে পেশ করে থাকে। যেমন, গণক, জ্যোতিষী প্রমূখ।
  • যে আল্লাহর বিধানে বিচার ফয়সালা না করে মানব রচিত বিধানে বিচার-ফয়সালা করাকে আল্লাহর বিধানের সমপর্যায়ের অথবা আল্লাহর বিধানের চেয়ে উত্তম মনে করে থাকে। অথবা আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তন করে বা মানুষের জন্য হালাল-হারামের বিধান প্রবর্তন করাকে নিজের জন্য বৈধ মনে করে।
  • যার ইবাদাত করা হয় আর সে তাতে সন্তুষ্ট।
  • যে মানুষদেরকে নিজের ইবাদাতের দিকে আহ্বান করে থাকে।

উপরোক্ত আলোচনায় পাঁচ প্রকার তাগূতের পরিচয় তুলে ধরা হলেও তাগূত আরও অনেক রয়েছে।

«فَمَن يَكْفُرْ بِٱلطَّـٰغُوتِ» (যেই সমস্ত মানুষ তাগুতের শক্তিকে অস্বীকার করবে) এবং «وَيُؤْمِنۢ بِٱللَّهِ» (আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।) তাগুতকে অস্বীকার করা আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনাটা কেমন? কি রকম একটা শক্তি? «فَقَدِ ٱسْتَمْسَكَ بِٱلْعُرْوَةِ ٱلْوُثْقَىٰ» (সে যেন একটা মজবুত শক্তিশালী একটা হাতল ধরল।) সুবহানাল্লাহ। «لَا ٱنفِصَامَ لَهَا» (ওই হাতল কখনোই ভাঙবে না।)

সাহাবীদের পারস্পরিক ভালোবাসা, ইবাদত ও চেহারায় সিজদার ছাপ

তামিম গোত্রের একজন সাহাবী একটা মসজিদে গেলেন। তিনি যখন মসজিদে প্রবেশ করলেন, তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন—«وَهُوَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ» অর্থ: “তিনি জান্নাতের অধিবাসী।” মানুষ যখন তাঁকে জান্নাতি বলে উল্লেখ করল, তখন তিনি সাহাবীকে খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করলেন। তাঁর চেহারায় ইবাদতের ছাপ ছিল। সাহাবীদের একটি আলামত হলো, তাঁদের চেহারায় কী থাকবে? সিজদার চিহ্ন থাকবে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আল-ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেন— «مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَٰلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ» অর্থ: “মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। আর তাঁর সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর দয়ালু। তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদারত দেখবে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের চেহারায় সিজদার প্রভাবের চিহ্ন রয়েছে। তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত এমনই, আর ইনজিলেও তাদের দৃষ্টান্ত এমনই।” (সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:২৯)

এখানে সাহাবীদের আলামত বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁরা পরস্পরের প্রতি দয়ালু ছিলেন। তাঁরা পরস্পরের প্রতি হামদর্দ ছিলেন। “হামদর্দ বলতে একজন আরেকজনের দুঃখ-বেদনায় ব্যথিত হওয়াকে বোঝায়।

তবে সাহাবীদের এটি বিশেষ গুণ ছিল।— «أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ» অর্থ: “তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর দয়ালু।” কাফিরদের ব্যাপারে সাহাবীদের প্রত্যেকেই যেন বাঘ ছিলেন। (অর্থাৎ, সাহাবীরা সত্য ও ন্যায়ের ব্যাপারে দৃঢ় ছিলেন।) কোনো আপস ছিল না। কিন্তু নিজেদের মধ্যে তাঁরা পরস্পরের প্রতি দয়ালু ও হামদর্দ ছিলেন। এরপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন— «تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا» অর্থ: “তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদারত দেখবে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে।” হে নবী! আপনি যদি রাত্রিবেলায় তাঁদের দেখেন, তাহলে হয়তো কাউকে রুকুতে পাবেন, কাউকে সিজদায় পাবেন। কেউ কেউ মোনাজাতে হাত তুলে আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে কাঁদছেন। তাঁরা রব্বে কারিমের সন্তুষ্টি তালাশ করছেন।

আয়াতের পরের অংশ— «سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ» অর্থ: “তাদের চেহারায় সিজদার প্রভাবের চিহ্ন রয়েছে।” আপনি তাঁদের চেহারা দেখলে সিজদার ছাপ দেখতে পাবেন। (তাঁদের চেহারায় সিজদার প্রভাব বলতে শুধু কপালের বাহ্যিক দাগ বোঝানো হয় না; বরং তাঁদের ইবাদত, বিনয়, খুশু ও নেক আমলের প্রভাবও এর অন্তর্ভুক্ত।)

অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন— «ذَٰلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ»অর্থ: “তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত এমনই, আর ইনজিলেও তাদের দৃষ্টান্ত এমনই। সাহাবীদের উদাহরণ আল্লাহ তাওরাতে দিয়েছেন, ইনজিলেও দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!

আজিব ভাই, রাত বড় হয়ে যাচ্ছে। রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শীতের মৌসুমকে তিনি ইবাদতের বসন্তকাল বলেছেন। আসলে কি ওটা বসন্তকাল? না। শীতকে আল্লাহর নবী বসন্তকাল বলেছেন। কারণ, রাত অনেক লম্বা হয়। শীতকালে রাত দীর্ঘ হওয়ায় অনেকের জন্য তাহাজ্জুদ ও নফল ইবাদতের সুযোগ তৈরি হয়। তবে শরীরের প্রয়োজনীয় ঘুম ও ফরজ ইবাদতের প্রতি যত্নবান থাকাও জরুরি। এজন্য শেষ রাতে উঠে একটু বিনীতভাবে কাঁদতে থাকা চাই, ইনশাআল্লাহ সাহাবীদের বিশেষ একটি গুণ ছিল—আপনি তাঁদের দেখলে কী অবস্থায় দেখবেন? তাঁরা রুকু ও সিজদায় থাকবেন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি তালাশ করবেন। তাঁদের চেহারায় সিজদার ছাপ থাকবে। আল্লাহ আমাদের কবুল করেন। আমিন।

আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্বপ্ন ও ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণের সুসংবাদ

যে ঘটনায় ছিলাম, তো সাহাবীকে দেখে তারা কি বলে? তাঁর চেহারায় ইবাদতের ছাপ ছিল। তিনি খুব দ্রুত দুই রাকাত নামাজ পড়ে বের হয়ে গেলেন। তিনি তাঁর পিছু ধরলেন। এরপর তাঁকে বললেন, আপনি যখন মাসজিদে প্রবেশ করলেন, তখন মানুষ বলছিল, “ওয়া হুয়া মিন আহলিল জান্নাহ”—তিনি জান্নাতের অধিবাসী। কেন তাঁরা এই কথা বললেন? আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, “এইগুলা বলতে হয় না। কিন্তু তোমাকে একটা কথা আমি শোনাই। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত থাকা অবস্থায় আমি একটি স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্নটি ছিল এমন—একটি বড়, সবুজ-শ্যামল মাঠ। সেই মাঠের মধ্যে লোহার একটি স্তম্ভ, যা নিচ থেকে একেবারে আসমান পর্যন্ত উঠে গেছে। স্তম্ভটির উপরে একটি কড়া বা হাতল ছিল, যা ধরে ওঠা যায়। তাঁকে কেউ একজন বলল, “তুমি ওপরে ওঠো। এটাকে ধরো।” আমি খুব মজবুত করে ধরলাম। তখন আওয়াজ এলো, “আরও শক্ত করে ধরো।” আমি আরও শক্ত করে ধরলাম। এই অবস্থায় আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে স্বপ্নের কথা বললাম। তখন নবী আমাকে বললেন, “হে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম!” (সাহাবী কে ছিলেন? আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। তিনি ইহুদি ধর্মের বড় আলেম ছিলেন, তাওরাতের বড় আলেম ছিলেন। তাঁর ব্যাপারে কুরআনে কারীমের প্রায় বিশ থেকে বাইশটি আয়াত নাজিল হয়েছে শুধু তাঁর প্রশংসা করার জন্য। সুবহানাল্লাহ!)

আল্লাহর নবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে বললেন, তুমি যে মাঠটি দেখেছো, সেটি হলো ইসলামের পরিসর। ইসলামের একটি গণ্ডি। আর যে বড় শক্তিশালী স্তম্ভটি দেখেছ, যা আসমান পর্যন্ত উঠে গেছে, সেটি হলো ইসলামের স্তম্ভ। আর উপরে যে কড়াটি দেখেছো, হাতল ধরার মতো একটি কড়া—ইসলামের সেই কড়া বা হাতল তুমি এমনভাবে ধরেছ যে, সেটি কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না, কখনো ভাঙবে না। এরপর নবী বললেন— «يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ سَلَامٍ، عَلَى الْإِسْلَامِ تَمُوتُ» অর্থ: “হে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম, তোমার মৃত্যু হবে ইসলামের ওপর।”” নবী যখন তাঁকে এই কথা বলে দিলেন, তখন মানুষ তাঁকে জান্নাতের অধিবাসী বলার কারণ হয়তো এটাই ছিল। আল্লাহর নবী তাঁর জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

মদীনায় রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে সালামের ইসলাম গ্রহণ

মদীনায় আসার পর রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে মানুষ দলে দলে আসছিলো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, তিনবার তাঁর কানে আওয়াজ এলো— «قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» অর্থ: “রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন।” তিনবার আওয়াজ এলো—রসূলুল্লাহ এসেছেন, রসূলুল্লাহ এসেছেন, রসূলুল্লাহ এসেছেন। তখন মানুষ দলে দলে নবীকে দেখতে যাচ্ছিলো। আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও মানুষের সঙ্গে রওনা হয়ে গেলেন। তিনি নবীর চেহারা যখন প্রথম দেখলেন, তখনই চিনে ফেললেন। তাঁর অন্তরের গভীর থেকে সাক্ষ্য এলো— «أَنَّ وَجْهَهُ لَيْسَ بِوَجْهِ كَذَّابٍ» অর্থ: “নিশ্চয়ই এটি কোনো মিথ্যুকের চেহারা নয়।” তিনি নবীর কাছে এগিয়ে গেলেন। সর্বপ্রথম নবীর মুখ থেকে যে কথাগুলো শুনতে পেলেন, সেগুলো ছিল—

«يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصِلُوا الْأَرْحَامَ، وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ، تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلَامٍ»

অর্থ: “হে মানবজাতি! তোমরা বেশি বেশি সালাম প্রচার করো, মানুষকে খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন রাতে নামাজ পড়ো। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”

রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কথাগুলো বললেন—

  • মানুষকে বেশি করে সালাম দিতে হবে।
  • মানুষকে খাবার খাওয়াতে হবে।
  • আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
  • মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন উঠে নামাজ পড়তে হবে।
  • তাহলে কিয়ামতের দিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে।

এই কথাগুলো শোনার পর আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু নবীর দিকে হাত এগিয়ে দিলেন। নবীও তাঁর দিকে হাত এগিয়ে দিলেন। তিনি হাত ধরে বললেন—

«أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ»

অর্থ: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল।”

নবীকে দেখামাত্রই তিনি ইসলাম গ্রহণ করে ফেললেন। সুবাহানাল্লাহ। আল্লাহ আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে কবুল করুন। আমিন।

ঈমানের দৃঢ়তা এবং উম্মতের চারটি অবস্থা

ঈমান হলো এমন একটি শক্তিশালী হাতল, যা কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না, ভাঙবে না। এজন্য রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া শিখিয়ে গেছেন। আমরা যে অবস্থায় আছি, উম্মত চার প্রকার।

প্রথম অবস্থা: একজন মানুষের জন্ম হবে কাফিরের ঘরে। সারাজীবন তার কাজকর্ম থাকবে কুফরি। উঠাবসা থাকবে কাফিরদের সঙ্গে। মৃত্যুও হবে কাফির অবস্থায়।

দ্বিতীয় অবস্থা: একজন মানুষের জন্ম হবে মুমিনের ঘরে। সে হবে ঈমানদার। তার কর্ম থাকবে ঈমানদারদের মতো। উঠাবসা থাকবে ঈমানদারদের সঙ্গে। মৃত্যুও হবে ঈমানের ওপর।

তৃতীয় অবস্থা: একজন মানুষের জন্ম হবে কাফিরের ঘরে। তার কাজকর্ম থাকবে কুফরি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দয়া ও মেহেরবানিতে সে ঈমান আনবে এবং ঈমান নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে।

চতুর্থ অবস্থা: একজন মানুষের জন্ম হবে মুমিনের ঘরে। তার কাজকর্ম থাকবে ঈমানের মতো। উঠাবসা থাকবে মুমিনদের সঙ্গে। কিন্তু আল্লাহ্ না করুন, নাউযুবিল্লাহ, মৃত্যুর আগে তার ঈমান হারিয়ে যাবে এবং এরপর তার মৃত্যু হবে।

এখন বলেন, আমরা যে অবস্থায় আছি, আমরা কি কোনো একটি প্রকারের মধ্যে আছি, নাকি আশঙ্কার মধ্যে আছি? আল্লাহ আমাদের হেফাজত করেন। আমিন।

ঈমানের ওপর অটল থাকার জন্য কুরআনের দোয়া এবং আল্লাহর কাছে চাওয়ার পদ্ধতি—দরখাস্তের উদাহরণ

আমরা একটু-আধটু নামাজ-কালাম পড়ি, আর অহংকারে বাঁচি না। আল্লাহ আমাদের জন্য কী পরিণতি নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা আমরা কেউ বলতে পারি না। হুজুর সুফিয়ানে সাওরী রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমতুল্লাহি আলাইহি কথা উল্লেখ করেন। তিনি তাঁর জীবনের চারজন ওস্তাদকে কোনো দিন হাসতে দেখেননি। একজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “হযরত, আপনি হাসেন না কেন? আপনাকে জীবনে কোনো দিন হাসতে দেখি নাই।” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি হাসব কীভাবে? আমার জন্মের আগেই তো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমার ব্যাপারে ফয়সালা করে রেখেছেন—আমি শাকী না সাঈদ? আমার মৃত্যু কিসের ওপর হবে, সেটাও আল্লাহ ফয়সালা করে রেখেছেন। কিন্তু আমার তো জানা নেই, আমার মৃত্যু ঈমানের ওপর হবে, না কুফরের ওপর হবে? তাহলে আমি হাসব কেন?”

আল্লাহ্ দয়া করে আমাদেরকে দরখাস্তের পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন। একসময় ঘরে ঘরে বিদ্যুতের লাইন দেওয়া হতো না। এজন্য দরখাস্তও কবুল করা হতো না। যখন বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে দেওয়া হলো, তখন দরখাস্তের ব্যবস্থা করা হলো। মানুষ ঘরে ঘরে বলত, বিদ্যুৎ লাগলে দরখাস্ত করতে হবে। দরখাস্তের ফর্ম দেওয়া হতো। আল্লাহ আমাদেরকে দোয়ার দরখাস্তের পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন। যেন আল্লাহ বলছেন, “এই যে, নাও, এটা দিয়ে দরখাস্ত করো।” এজন্য আল্লাহর কুরআন আমাদের দোয়া শিখিয়ে দিয়েছে। দোয়া করতে হবে—

«رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ» অর্থ: “হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে হিদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরকে বক্র করে দেবেন না। আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৮)

“রব্বানা লা তুযিক কুলুবানা”—হে আমাদের রব, আমাদের অন্তরকে বক্র বানিয়ে দিয়েন না। আজিব না? আল্লাহ বলছেন, আমার কাছে চাও। যেকোনো মুহূর্তে। হাদীসে কুদসিতে আছে, আদমসন্তানের অন্তরসমূহ আল্লাহর আঙুলসমূহের মধ্যে একটি অন্তরের মতো; তিনি যেভাবে চান সেভাবে তা পরিচালনা করেন। আল্লাহ চাইলে তাকে রুশদ বা হিদায়াত দেন, আর চাইলে গাইয়্য বা ভ্রান্তির দিকে যেতে দেন। আল্লাহ মানুষের অন্তরকে যেভাবে চান পরিচালনা করেন। তাই মুমিনের উচিত সর্বদা আল্লাহর কাছে হিদায়াত ও অন্তরের দৃঢ়তা কামনা করা। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। [নোট: “রুশদ” (الرُّشْدُ) ও “গাইয়্য” (الْغَيُّ) শব্দদুটি সূরা আল-বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে রয়েছে। আয়াতের প্রাসঙ্গিক অংশ: «قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ» অর্থ: নিশ্চয়ই সৎপথ ভ্রান্তপথ থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে।]

“ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব”—আপনি তো দানকারী। আল্লাহর সিফাতি অনেক নাম আছে। কিন্তু এখানে অন্য নাম ব্যবহার না করে “ওয়াহহাব (الْوَهَّابُ)” বলা হয়েছে কেন? ওয়াহহাব মানে এমন দানকারী, যিনি না চাইলে দেন না, আবার চাইলেও দেন। সুবহানাল্লাহ! রাজ্জাক—আল্লাহ রিজিক দেন। গাফফার—তিনি ক্ষমা করেন। সাত্তার—তিনি গুনাহ গোপন করেন। আল্লাহর একেকটি নামের একেকটি সিফাত রয়েছে। কিন্তু “ওয়াহহাব” নামটি এমন যে, চাইলেও দেন, না চাইলেও দেন। এজন্য যারা দোয়া করে, আল্লাহ তাদের দেন। যারা জীবনে দোয়া করে না, তারাও কি কিছু পায় না? কেন পায়? কারণ, আল্লাহর নাম আল-ওয়াহহাব। সুবাহানাল্লাহ।

«اللَّهُمَّ لَقِّنَّا حُجَّةَ الْإِيمَانِ عِنْدَ الْمَمَاتِ» অর্থ: “হে আল্লাহ! মৃত্যুর সময় আমাদেরকে ঈমানের প্রমাণ ও সাক্ষ্য উচ্চারণ করার তৌফিক দান করুন।” (আল-মু‘জামুল আওসাত, ১৯০৭। দ্রষ্টব্য: মাজমাউয যাওয়াইদ)

আল্লাহ, আমাদের মৃত্যুর সময় আপনি ঈমানের হুজ্জত আমাদের গলায় পড়িয়ে দিন। এই দোয়াটি একবচন শব্দ দিয়েও হাদীসে এসেছে— «اللَّهُمَّ لَقِّنِي حُجَّةَ الْإِيمَانِ عِنْدَ الْمَوْتِ» অর্থ: “হে আল্লাহ! মৃত্যুর সময় আমাকে ঈমানের প্রমাণ ও সাক্ষ্য উচ্চারণ করার তৌফিক দান করুন।” “মামাত” বলতেও পারবেন, “মউত” বলতেও পারবেন। তবে দোয়ার ক্ষেত্রে বহুবচন শব্দ ব্যবহার করাটা বেশি উপকারী। আল্লাহ আমাদের কবুল করেন। আয়, আল্লাহ আমাদের মৃত্যু যেন ঈমানের ওপর হয়। আমিন।

সাহাবী হয়েও অন্তর বক্র হয়ে যাওয়ার ঘটনা

একজন সাহাবী ছিলেন, কিন্তু তাঁর অন্তর বক্র হয়ে গিয়েছিল। তিনি আল্লাহর নবীর সাহচর্য লাভ করেছিলেন। একটি আয়াত নাজিল হয়েছিল। তখন তিনি মনে মনে বললেন, এই আয়াতটি নাজিল হলো। যদি এই ধরনের আরেকটি আয়াত নাজিল হতো, তাহলে এটির সঙ্গে আরেকটির মিল ভালো হতো।

কুরআন আরবি ভাষার এক অতুলনীয় কিতাব। এর শব্দচয়ন, ভাষাশৈলী, ছন্দ ও অর্থের গভীরতা মানুষের রচিত কবিতা থেকে স্বতন্ত্র। এজন্য স্বাভাবিক আরবির সঙ্গে সব সময় মিলে না। যত বড় আলেমই হোক—অধিকাংশের কথা বলছি, সবাই নয়। কেউ যদি পুরো কুরআনের তরজমা একেবারে যেখানে থেকে ধরবেন, সেখানেই চটচট করে বলে দিতে পারে, পারবে না? কবিতার সব অর্থ কি সব সময় তুলে ধরা যায়? কোনো শব্দের অর্থ বোঝার জন্য অভিধান লাগে না? কুরআনও এমন একটি কাব্যগ্রন্থের মতো বরং তার চেয়েও উত্তম।

দেখুন কুরআন কতো সুন্দর করে মিলে যাচ্ছে, আরবি টা লক্ষ্য করুন—

«وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا ۝ وَالْقَمَرِ إِذَا تَلَاهَا ۝ وَالنَّهَارِ إِذَا جَلَّاهَا ۝ وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَاهَا ۝ وَالسَّمَاءِ وَمَا بَنَاهَا» (সূরা আশ-শামস, ৯১:১–৫)

এরপর—

«وَثَمُودَ الَّذِينَ جَابُوا الصَّخْرَ بِالْوَادِ ۝ وَفِرْعَوْنَ ذِي الْأَوْتَادِ ۝ الَّذِينَ طَغَوْا فِي الْبِلَادِ» (সূরা আল-ফজর, ৮৯:৯–১১)

অতঃপর—

«وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا ۝ وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا ۝ وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا» (সূরা আন-নাবা, ৭৮:৯–১১)

সুবাহানাল্লাহ! কতো সুন্দর মিল।

সেই সাহাবীর প্রসঙ্গে ফিরে যাই, তিনি সাধারণ সাহাবী ছিলেন না। তিনি ওহী লেখার কাজে যুক্ত ছিলেন। রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসে ওহী লিখতেন। তিনি মনে মনে বলেছিলেন, এই ধরনের আরেকটি আয়াত নাজিল হলে ভালো মিল হতো। ঘটনাক্রমে তাৎক্ষণিকভাবে সেই আয়াতটি নাজিল হলো। নাউযুবিল্লাহ, তাঁর অন্তরের মধ্যে সন্দেহ ঢুকে গেল। তিনি ভাবলেন, তাহলে তিনি যে বললেন, এই ধরনের একটি আয়াত নাজিল হলে ভালো হতো, সঙ্গে সঙ্গেই সেটি নাজিল হলো! তাহলে কি এটি নবীর রচিত কিনা, বানানো কিনা?! কেউ জানে না, কিন্তু আসমানে খবর হয়ে গেছে। জিবরাইল আমিন আলাইহিস সালাম এসে বললেন, তিনি আর সাহাবী নেই, তিনি মুরতাদ হয়ে গেছেন। রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যখন ওহী এলো, তখন তিনি বুঝে ফেললেন। যিনি ওহীর কাছে বসে থাকেন, তিনি চেহারা দেখলেই বুঝতে পারেন যে খবর হয়ে গেছে। ওই সাহাবী ভয়ে পালিয়ে চলে গেলেন। নবী সাহাবীদের ডেকে বললেন— «فَاقْتُلُوهُ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُ» অর্থ: “তাকে যেখানে পাও, সেখানে হত্যা করো।” আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।

আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক—শক্তিশালী অভিভাবকের উদাহরণ

সূরা আল-বাকারার ২৫৭ নম্বর আয়াতের দিকে ফিরে আসি— «اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا» অর্থ: “আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক।” আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অভিভাবক। কাদের অভিভাবক? মুমিনদের অভিভাবক। গ্রামে গ্রামে কাইজ্জা (ঝগড়া) লাগে না? তখন মানুষ একজন শক্তিশালী ব্যক্তিকে অভিভাবক বানায়। বিচার শুরু হলে জিজ্ঞাসা করা হয়, “তোমাদের পক্ষ থেকে কে কথা বলবে?” তখন কেউ বলে, “ওই যে, আমার মামু কথা বলবে।” মামু মানে ওই এলাকার মুড়ল! মামু যখন দাঁড়ায়, তখন বিচারের মোড় ঘুরে যায়। কেন? কারণ, অভিভাবকটি শক্তিশালী। আল্লাহ কী বলেন? “লা মাওলা লাহুম”—তাদের কোনো অভিভাবক নেই। কুরআনের আয়াতে এসেছে, “লানা মাওলানা”—আমাদের অভিভাবক আছেন, আর তাদের কোনো অভিভাবক নেই। এজন্য মুমিনের অভিভাবক কে? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। আল্লাহ অভিভাবক হিসেবে কী করেন? আল্লাহ নিজেই বর্ণনা দিচ্ছেন—

«يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ»

অর্থ: “তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।”

আল্লাহ মুমিনদেরকে অন্ধকার থেকে টেনে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। সুবহানাল্লাহ!

এরপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন—

«وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ»

অর্থ: “আর যারা কুফরি করে, তাদের অভিভাবক হলো তাগুত।”

আর তাগুত কি করে? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন—

«يُخْرِجُونَهُم مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ»

অর্থ: “তারা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে বের করে নিয়ে যায়।”

এবং তাদের পরিণতি কী? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন—

«هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ» «أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ»

অর্থ: “তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।”

তারা সর্বদা সেখানে থাকবে, তাদের বের করা হবে না। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

অন্তরের নূরের জন্য রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দোয়া

যখন মানুষের ঈমানের ভেতরে নূর বাড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মনে হয়, শেষ রাত হয়ে গেছে—আমি কীভাবে ঘুমিয়ে থাকি? বন-জঙ্গলের পাশে পশুপাখিরা রব্বে কারিমকে ডাকছে, আর আমি কীভাবে ঘুমিয়ে থাকি? আমি উঠে পড়ি। মানুষের ভিতরে যখন ঈমানের নূর থাকে তখন সে খুব ছোট থেকে ছোট ভুল বা গুনাহকেও অনেক বড় মনে করে দেখে। একজন মানুষকে একটু জোরে কথা বলেছে, তো পরক্ষণেই সে চিন্তায় ছটফট করে, তিনি তো আমার বাবার বয়সী বন্ধু। আমি কীভাবে তাঁকে এভাবে বললাম? না জানি তাঁর হক নষ্ট করে ফেললাম! অন্যদিকে, যখন মানুষের ভেতরে ঈমানের নূর কমে যায়, অন্ধকার ও জুলুমাত বাড়তে থাকে, তখন সেই মানুষটির গুনাহই মজা লাগে। কেন? কারণ, তার ভেতরে আলোর জায়গায় অন্ধকার হয়ে গেছে। তার অন্তর স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অস্বাভাবিক হয়ে গেছে। যেমন মানুষের দেহ অস্বাভাবিক হয়ে গেলে তার কর্মপদ্ধতি ও সমস্ত কারবার ভিন্ন হয়ে যায়।

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের মতো উত্তপ্ত রোদে, গরমের মধ্যেও যদি একজন মানুষের অসুস্থতা দেখা দেয়, জ্বর আসে, সে কাঁপতে থাকে। তখন সে বলে, “আমার শীত লাগছে, তাড়াতাড়ি কাঁথা-কম্বল দিয়ে আমাকে ঢাকো।” আসলে কি শীত? না। অসুস্থতার কারণে শরীর অস্বাভাবিক হয়ে গেছে। আবার কন কনে শীতের মধ্যে যদি শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, শরীর কাঁপতে থাকে, তখন সে বলতে থাকে, “পাখা অন করো, এসি লাগাও। আমার শরীর পুড়ে জ্বলে শেষ হয়ে যাচ্ছে, গরম লাগছে।” আসলে কি গরম? না। শরীর অসুস্থ হয়ে অস্বাভাবিক হয়ে গেছে। মানুষের অন্তরের মধ্যে যখন ঈমানের নূর কমে যায়, তখন অন্তর অসুস্থ হয়ে যায়। এজন্য স্বাভাবিক থাকে না। গুনাহটাও তার কাছে মজা লাগে। বিবেকের ওপর আবরণ সৃষ্টি হয়। তখন খারাপ কাজও তার কাছে ভালো লাগে।

এজন্য রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, নবী যখন ঘর থেকে ফজরের নামাজের ইমামতি করতে যেতেন, তখন একটি দীর্ঘ দোয়া করতেন। দোয়াটি—

«اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا، وَفِي لِسَانِي نُورًا، وَفِي بَصَرِي نُورًا، وَفِي سَمْعِي نُورًا، وَفِي لَحْمِي نُورًا، وَفِي دَمِي نُورًا، وَفِي جِلْدِي نُورًا، وَعَنْ يَمِينِي نُورًا، وَعَنْ شِمَالِي نُورًا، وَمِنْ فَوْقِي نُورًا، وَمِنْ تَحْتِي نُورًا، وَمِنْ خَلْفِي نُورًا، وَمِنْ أَمَامِي نُورًا، اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي نُورًا»

অর্থ: “হে আল্লাহ! আমার অন্তরে নূর দান করুন, আমার জিহ্বায় নূর দান করুন, আমার দৃষ্টিতে নূর দান করুন, আমার শ্রবণে নূর দান করুন, আমার গোশতে নূর দান করুন, আমার রক্তে নূর দান করুন, আমার চামড়ায় নূর দান করুন। আমার ডান দিকে নূর দান করুন, আমার বাম দিকে নূর দান করুন, আমার ওপর দিক থেকে নূর দান করুন, আমার নিচ দিক থেকে নূর দান করুন, আমার পেছন দিক থেকে নূর দান করুন, আমার সামনের দিক থেকে নূর দান করুন। আয় আল্লাহ! আমাকে নূর বানিয়ে দিন।”

«اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا»

“আল্লাহুম্মাজআল ফী কলবী নূরান”—হে আল্লাহ, আমার অন্তরের মধ্যে আপনার পরিচয়ের নূর ঢুকিয়ে দিন।

নবী আল্লাহর পরিচয়ের নূর চেয়েছেন। প্রত্যেকটি জিনিসের পরিচয় যদি অন্তরে থাকে, তাহলে সেই জিনিসের মহত্ত্ব বোঝা যায়। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, “চোর” শব্দটির পরিচয় আমাদের মস্তিষ্কে রয়েছে। এজন্য একজন অন্ধ মানুষকে যদি বলা হয়, “চোর আসছে”, তাহলে সে কি মনে করবে গ্রামের ইমাম সাহেব আসছেন? না। সে মনে করবে, কোনো খারাপ মানুষ আসছে। “পুলিশ” বলার সঙ্গে সঙ্গে ডান্ডা ও হ্যান্ডকাফ একজন অন্ধ মানুষের মনেও আসে। “চিনি” বলার সঙ্গে সঙ্গে এমন একজন মানুষেরও মিষ্টি জিনিসের কথা মনে আসে, যে জীবনে কোনো দিন চিনির দানা দেখেনি, কিন্তু চিনি খেতে খেতে তার পরিচয় মস্তিষ্কে বসে গেছে। “হানজালা” ফল বলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে তিক্ততার ধারণা আসে। “মা” বলার সঙ্গে সঙ্গে কেউ কি ভুল করে মনে করবে গ্রামের মুরুব্বি চাচা এসেছেন? না। কারণ, মায়ের পরিচয় এমনভাবে শিশুর কাছে থাকে যে, মা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চেহারা, গুণাগুণ সব ভেসে আসে। অর্থাৎ, কোনো কিছুর প্রকৃত পরিচয় ও গুণাবলি জানা থাকলে তার গুরুত্ব ও প্রভাব অন্তরে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন—

«وَفِي لَحْمِي نُورًا»

অর্থ: “আমার গোশতের মধ্যে নূর দান করুন।”

«وَفِي دَمِي نُورًا»

অর্থ: “আমার রক্তের মধ্যে নূর দান করুন।”

«وَفِي لِسَانِي نُورًا»

অর্থ: “আমার জিহ্বায় নূর দান করুন।”

«وَفِي بَصَرِي نُورًا»

অর্থ: “আমার দৃষ্টিতে নূর দান করুন।”

«وَفِي سَمْعِي نُورًا»

অর্থ: “আমার শ্রবণে নূর দান করুন।”

«وَعَنْ يَمِينِي نُورًا»

অর্থ: “আমার ডান দিকে নূর দান করুন।”

«وَعَنْ شِمَالِي نُورًا»

অর্থ: “আমার বাম দিকে নূর দান করুন।”

«وَمِنْ تَحْتِي نُورًا»

অর্থ: “আমার নিচে নূর দান করুন।”

«وَمِنْ فَوْقِي نُورًا»

অর্থ: “আমার ওপর দিক থেকে নূর দান করুন।”

«وَمِنْ خَلْفِي نُورًا»

অর্থ: “আমার পেছন দিক থেকে নূর দান করুন।”

«وَمِنْ أَمَامِي نُورًا»

অর্থ: “আমার সামনের দিক থেকে নূর দান করুন।”

অতঃপর বলতেন—

«اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي نُورًا»

অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাকে নূর বানিয়ে দিন।” (“অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমার জীবনটাকেও নূর নূর বানিয়ে দিন।”

আরবি ভাষায় একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হলো ‘আল-আযকার’ (পূর্ণাঙ্গ দুআ ও যিকিরের গ্রন্থ। এর পুরো নাম ‘আল-আযকারুল মুন্তাখাবাতু মিন কালামি সাইয়্যিদিল আবরার’।), যা ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন। আরেকটি গ্রন্থ হলো ‘আত-তিবয়ান’ (পুরো নাম আত-তিবইয়ান ফী আদাবি হামালাতিল কুরআন)—এটিও ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহর লেখা আরবি গ্রন্থ। হুজুর বলেন, বাংলা ভাষায় এত পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর গ্রন্থ আমার নজরে পড়েনি। কিন্তু ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহিমাহুল্লাহর ‘রাহে বেলায়েত’ খুব ভালো লেগেছে। যাঁরা শিক্ষিত মানুষ, যাঁদের বোঝার শক্তি আছে, তাঁরা বইটি পড়তে পারেন। এতে অনেক চমৎকার দোয়া রয়েছে। আজকে অনেকগুলো দোয়া বলা হয়েছে। এগুলো মুখস্থ করে আমল করা চাই, ইনশাআল্লাহ।

2 thoughts on “তাফসির, সূরা বাকারা, ২:২৫৬-২৫৭; আলোচ্য বিষয়: দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই এবং আল্লাহ্ মুমিনদের অভিভাবক”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top